ইসলামী শিক্ষা

মুসলিমরা পিছিয়ে থাকার কারণ কি

“মুসলিমরা পিছিয়ে থাকার কারণ কি?” এই প্রশ্নটা প্রায় সকল মুসলিমের প্রশ্ন। আমরা যখন ইসলামের ইতিহাস পাতা উল্টাই, মনেহয়, যেন স্বপ্নরাজ্যে আছি। “সত্যিই ছিল এমন সোনালী দিন? প্রবলভাবে প্রশ্ন জাগে মনের অলিন্দে, বাস্তবেই আমরা শাসন করেছি পৃথিবী? এই ভারতবর্ষ আটশত বছর শাসন করেছি, এই আমরা- মুসলমানরা? সেই স্পেন ছিলো আমাদেরই শাসন-তলে! আমরাই হুকুম চালাতাম পৃথিবীর রাজদণ্ডে বসে! আমাদের ইতিহাস, পেবল প্রতাপের ইতিহাস। কিন্তু সেই শক্তিমত্তায় নেই মত্ততা। বরং ক্ষমতাধর মুসলিম-শাসকের যাপিত জীবন ছিল সাধারণ।

বর্তমান বাস্তবতা এই প্রশ্নকে সজোরে ছুঁড়ে মারে আমাদের দিকে। কারণ সারা দুনিয়ায় এখন একমাত্র মুসলিমরাই শোষণের স্বীকার হচ্ছে সবচে’ বেশি। আমাদের দেশেই আশ্রয় নিয়েছে লাখো রোহিঙ্গা মুসলিম। ভারতে নিগৃহিত হচ্ছে মুসলমান। মুসলমানদের প্রথম কিবলায় সালাত আদায় করতে পারছিনা আমরা। মসজিদুল আকসার সামনে থেকে ইয়াহুদিরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে মুসলিম যুবকদের। কিন্তু বিশ্ব-বিবেক? কোথায় সব মুসলিম শাসক? সব নিশ্চুপ! এসব খবর দেখে ভেতরটা আনমনেই মোচড় মেরে ওঠে। শাসকরা আজ শুধু পরাজিতই নয়। বরং তারা আজ নিষ্পেষিত। বিক্রিত।

মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার পেছনে দায়ী কী? তাদের চারিত্রিক অধঃপতন? না দীন থেকে তাদের সরে যাওয়া? নাকি জ্ঞানের ময়দান থেকে তাদের পদস্খলন? কোন কারণটা এখানে সক্রিয়? মুসলিমদের পিছিয়ে পড়ার পেছনের ইতিহাস বলতে গেলে সাধারণত এই তিনটা কারণকে সামনে তুলে আনা হয়। এবং দেখা যায় একেক জন একেকটা কারণকে মুখ্য করে আলোচনা চালাতে থাকেন। যারা যেটাকে মূল ধরে আলোচনা করেন। তাদের কাছে বাকিগুলো কোন গুরূত্ব পায় না।

কিন্তু তিনটা বিষয়ই এক ও অভিন্ন। মানুষের চরিত্র যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখনই সে ছিটকে যায় দ্বীনের পথ থেকে। তার কাছে তখন দ্বীন পালন কষ্টকর হয়ে পড়ে। সে আর দ্বীনের ধার ধারে না। মানুষ যখন দ্বীন পালনে অনিহা প্রকাশ করে, তখনই তারা সম্মুখীন হয় চারিত্রিক ধ্বসের। তাদের কাছে তখন হালাল-হারামের বালাই থাকে না। ইহকাল ও পরকাল বলে কিছু থাকে না তাদের হিসেবের খাতায়। ভোগই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র আরাধনা। বিলাস করাই যেন জীবনের একমাত্র আরাধ্য বিষয়।

অবস্থা যখন এমন দাঁড়ায়। তখনই তারা সরে যায় জ্ঞানের ময়দান থেকে। ইসলাম এমন এক দীন বা জীবন-ব্যবস্থা যা শুধু আখেরাতের কথা বলে না। বরং দুনিয়ার প্রতিটা কল্যাণকর কাজের প্রতিও তার আহ্বান থাকে সমান তালে । ইসলাম কেবল আখেরাতের বিষয় নয়। বরং দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই ইসলামের ক্ষেত্র। আমরা নামাজ শেষে দোয়ায় বলি রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানহ ওয়া ফিল আখেরাতি হাসানাহ। কল্যাণ কেবল আখেরাতের জন্যই চাই না, বরং দুনিয়ার কল্যাণটা আগে চেয়ে নেই৷ ইসলামের এক অখণ্ড দাবী হলো দুনিয়ায় শক্তি অর্জন করা। বস্তুগত উন্নতি ইসলামের দাবী। কারণ মুসলমান যেন এমন না হয়ে পড়ে যে, সে নিজেকে রক্ষা করতে পরেছে না। আত্মরক্ষা করা ইসলামে ফরজ বিধান।

কিন্তু আমরা তা থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকি। আমাদের শাসকদের চরিত্র যখন নষ্ট হয়ে গেল। যখন তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে গেল। যখন সুরার পাত্র হয়ে উঠল তাদের ধ্যান। নর্তকী হয়ে গেল তাদের জ্ঞান। তখন আমরা পিছিয়ে পড়লাম বিজ্ঞান থেকে। সমরবিদ্যায় আমরা হয়ে গেলাম অনুন্নত। আমাদের কাছে তখন ইসলাম হয়ে গেল কিছু রসম ও রেওয়াজ পালনের নাম। ইউরোপ আজ যেভাবে জ্ঞানের বাগডোড় হাতে নিয়ে, আধুনিক সমরাস্ত্র তৈরী করে পৃথিবী শাসন করছে। আমরা পারছি না তা থেকে অনগ্রসর হবার কারণে।

কোরআন যখন নাযিল হচ্ছিল। তখন তার তেলাওয়াতই শুধু করা হতো না, বরং সঙ্গে সঙ্গে তার আমলও চালু হয়ে যেত সমাজে। মুসলিম সমাজ ছিলো কোরআনেরই বাস্তবরূপ। মুসলিমরা যে দেশেই গিয়েছে। যেখানেই উড়িয়েছে ইসলামের পতাকা, গেড়েছেন তাওহীদের ঝাণ্ডা। সেখানেই তারা বাস্তবায়ন করেছেন কোরআনের আইন। বলা যায় তারা ছিলেন রক্ত-মাংসের কোরআনের ধারক ও বাহক।

যখন আমাদের শাসকদের আখলাক নষ্ট হয়ে গেল। কেরআন তখন হয়ে পড়ল অর্থস্বর্বস্ব। কোরআন তখন তেলাওয়াত হতো। ঘরে ঘরে হতো কোরআনের খতম। কিন্তু কোরআন পঠিত হতো প্রথা অনুযায়ী। হতো কোরআন তেলাওয়াতের প্রতিযোগিতা। কিন্তু ছিলো না তার আমল। আমলের সেই সাহাবিয় প্রতিযোগিতা ছিলো না। শাসকরা মানুষকে স্বান্তনা দিত সভায় কোরআন পাঠ করিয়ে। জনগণও ভাবত, বাহ! শাসক তো বেশ ধার্মীক। কিন্তু বাস্তবে ছিলো না কোরআন। তার আদেশ ও নিষেধ ছিলো আকর্ষণীয় মোড়কে রাখা প্রদর্শনীর বস্তুর মতো। যা সবাই দেখে, সবাই জানে। কিন্তু তার কোন ব্যবহার ছিলো না মুসলামনের হাতে। যতোদিন না কোরআন প্রথম যুগের মতো জীবন-নদে বহমান হবে। ততোদিন মুসলমানের উন্নতি? এ তো কল্পনাতীত। হ্যাঁ তারা যদি নাসারা হয়ে যায়। যদি গ্রহণ করে নেয় ইউরোপীয় সভ্যতা— মনে ও প্রাণে। তবে তারা উন্নতির সোপানে উঠে যাবে। তবে মুসলিম হিসেবে নয়। কোরআন ব্যতীত মুসলিমের উন্নতি অসম্ভব।

ধরুণ আধুনিক বিজ্ঞানে উন্নতি করল মুসলমানরা। তবু দীন ব্যতীত তাদের গতি নেই। দীন ও উন্নতি অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়ানো। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এক দার্শিনিক বেশ সুন্দর একটা কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় সভ্যতায় মুসলমনার উন্নতি করতে পারবে। যদি তারা ঈমান ও আকীদার বৃত্তে থাকতে পারে। এই বৃত্তির বাইরে বেরিয়ে মুসলমানরা উন্নতি তো দূরে থাক। বরং আরও নামবে অধঃপাতে। না দার্শিনিক বলছে বলে এমন ধারণা আমরা পোষণ করছি না। বরং ইতিহাস থেকেই আমরা দেখতে পাই তার নমুনা। কোন জাতি তার সভ্যতাকে বিসর্জন দিয়ে, তার আকীদা ও বিশ্বাসকে জলাঞ্জলি করে উন্নতি করতে পারে না। প্রাচ্য ও এশিয়ার কতো দেশই তো শ্বেতাঙ্গদের মতো উন্নতি করেছে। ইউরোপ থেকে তারা কম কীসের! তাদের আছে দক্ষ সমরবিদ, রয়েছে উন্নত সমরাস্ত্রও৷ বিজ্ঞানী ও কলাকুশলীও আছে এন্তার৷ এরা উন্নত মুসলমান ঠিকই৷ কিন্তু হাজার বছর আগের “তারা” হয়ে উঠতে পারে নি। কারণ তাদের এই উন্নতি জাতীয়তাবাদের তাগিদে। তারা মুসলিম হিসেবে জাগ্রত হতে চায় নি। তারা চেয়েছে ভূখণ্ডের সংকীর্ণতায় জেগে উঠতে। আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে মুসলিম হিসেবে। এর সঙ্গে থাকা চাই কোরআনের রূহ। এই শ্বাসত স্পিরিট ব্যতীত সোনলি যুগের স্বপ্ন দেখা শূন্যে স্বর্গ রচনা করা।

মুসলামানরা যেদিন সত্যিই জাগ্রত হতে চাইবে। যেদিন তাদের ভেতরে এই অনুভূতি দুলে উঠবে। সেদিন তারা কোরআনকে তুলে নেবে। কোরআনই তাদেরকে দেখিয়ে দেবে আগামীর পথ। মুসলমানের ভেতরে কোরআনের প্রভাব ফুটে উঠবে তার কাজে। সে জান-কোরবান হয়ে যাবে দীনের জন্য। সম্পদ ত্যাগ করবে দীনের জন্য৷ যতোদিন তা না হবে। উন্নতির আশা মিছে। মুসলিমরা আজ সম্পদ ব্যয় করে উন্মাদনায়। তাদের আগ্রহ আজ মত্ততায়। তারা নিরাশ হয়ে গেছে খোদার রহমত থেকে। এই নৈরাশ্যই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের জন্য। দীনের পথ থেকে স্খলিত হয়ে তারা ডুবে গেছে বাহ্যিক চাকচিক্যে। দীনের জন্য আজ আমরা ‍উৎসর্গিতপ্রাণ নই।

দীন থেকে সরে যাওয়া, চারিত্রিক স্খলন ও জ্ঞানের ময়দান থেকে পিছিয়ে পড়া, সবই এক সমীকরণে আমাদের পতনের কারণ৷ কোরআনই পারে এই পতন থেকে উঠে দাঁড়াবার শক্তি জোগাতে৷

(আমির শাকিব আরসালানের প্রবন্ধ, لماذا تأخر المسلمون, এর ছায়া অবলম্বনে)

সূত্র

মতামত দিন