ইসলামিক গল্প নারী

পূণ্যবতী মেয়েদের একটি দৃষ্টান্ত

একবার ইমাম শাবি (রহিমাহুল্লাহ) কাজি শুরাইহ (রহিমাহুল্লাহ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শুরাইহ (রহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে তার পরিবারের অবস্থা জানতে চান । শুরাইহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “আজ বিশ বছর হয়ে গেল। আমার পরিবারের কোনো অসংগতি আমি দেখিনি। এমনকি কোন দিন আমাকে রাগান্বিতও হতে হয়নি।” শাবি (রহিমাহুল্লাহ) জানতে চান, “এটি কীভাবে সম্ভব হলো?” তিনি বলেন, ‘বাসর রাতে যখন আমি স্ত্রীর ঘরে ঢুকলাম, তার অপূর্ব মুখশ্রী দেখে মুগ্ধ হলাম। মনে মনে ভাবলাম, আমার উচিত পবিত্র হয়ে দু’রাকাত সালাতুশ শুকর আদায় করা। নামাজ যখন শেষ হলো, বুঝতে পারলাম, আমার স্ত্রীও আমার সঙ্গে নামাজ পড়েছে। আমার সাথেই সালাম ফিরিয়েছে।

রাত একটু গভীর হওয়ার সাথে সাথে বিয়ে বাড়ির শোরগোলও কমে এলো। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবরা সবাই এক এক করে চলে যেতে লাগল। ঘর যখন একেবারে শান্ত হয়ে এলো, আমি ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়ালাম এবং তার দিকে হাত বাড়ালাম্ একজন পুরুষ নারী থেকে যা পেতে চায়, আমিও তা-ই চাইলাম। চকিতে সে বলে উঠল, ‘হে আবু উমাইয়া, দয়া করে একটু থামুন। কিছুক্ষণ আপন অবস্থায় থাকুন।’ তারপর সে বলতে লাগল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য নিবেদিত। আমি তাঁর প্রশংসা করছি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাইছি এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তাঁর পরিবার-পরিজনের দরূদ প্রেরণ করছি। আমি আপনার কাছে একজন অপরিচিত নারী। আপনার রুচি ও স্বভাবের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। আপনার পছন্দনীয় বিষয়গুলো বলুন, যাতে সেগুলো আমি করতে পারি। আর আপনার অপছন্দনীয় বিষয়গুলোও আমাকে জানিয়ে দিন, যাতে আমি সেগুলো ত্যাগ করতে পারি।’
সে আরও বলল, ‘আপনার গোত্রে এমন অনেক নারী ছিল, যাদের চাইলে আপনি বিয়ে করতে পারতেন। আমার গোত্রেও এমন অনেক পুরুষ ছিল, যারা আমার স্বামী হওয়ার উপযুক্ত ছিল। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা যা ফয়সালা করেন, তা-ই হয়। আপনি আমাকে পেয়েছেন। এখন আপনি তা-ই করবেন, যা আল্লাহ আপনাকে করতে আদেশ দিয়েছেন। বিষয়টি আপনার হাতে, আপনি চাইলে আমাকে ভালোভাবে রাখতে পারেন অথবা সুন্দরভাবে বিদায়ও করে দিতে পারেন। আমার কথাগুলো আমি বললাম। আমি আল্লাহর কাছে নিজের জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনার জন্য ও মাগফিরাত কামনা করছি।’
একটু থেমে শুরাইহ (রহিমাহুল্লাহ) আবার বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহর কসম! হে শাবি, সে যেন আমাকে সেখানেই একটি খুতবা দেওয়ার জন্য বাধ্য করলো। আমিও বলতে শুরু করলাম, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার জন্য। আমি তাঁর প্রশংসা করছি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাইছি এবং দরূদ প্রেরণ করছি মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর। তুমি এমন কিছু কথা বলেছ, যার ওপর অটল থাকতে পারলে তুমি পরিপূর্ণ কল্যাণ লাভ করবে। পক্ষান্তরে এর বিপরীত কিছু করলে তোমার কথাই তোমার বিপক্ষে দলিল হবে।’
তারপর আমি তাকে আমার পছন্দ ও অপছন্দগুলো একে একে খুলে বললাম। সে প্রশ্ন করল, ‘আমার বাপের বাড়ির লোকদের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারটি আপনি কীভাবে নেন?’ আমি বললাম, ‘শ্বশুর বাড়ির লোকেরা বারবার সাক্ষাৎ করে আমাকে বিরক্ত করুক, তা আমি চাই না।’
সে আবার প্রশ্ন করল, ‘আপনার প্রতিবেশীদের মধ্যে থেকে কারা ঘরে আসলে আপনি খুশি হন এবং কাদের আসা আপনি অপছন্দ করেন?’ আমি বললাম, ‘অমুক অমুক আমার বাড়ি আসুক, তা আমি চাই না। আর অমুক অমুক বাড়িতে এলে কোনো সমস্যা নাই।’ আমি আরও বললাম, ‘অমুক অমুক পরিবারের লোকেরা ভালো। সুতরাং তুমি চাইলে তাদের ঘরে আনতে পারো। আর অমুক অমুক পরিবারের লোকেগুলো খারাপ, তাদের ঘরে আসার অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে না।’
বলতে বলতে শুরাইহ একটু থামলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আল্লাহ কসম! সেই রাত ছিল আমার জীবনে সবচেয়ে সুখময় রাত। আরপর পুরো একটি বছর যেন খুশি ও আনন্দের হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সারা বছর তার মধ্যে আমি কেবল কল্যাণ ও সন্তুষ্টিই খুঁজে পেয়েছি।’
পরবর্তী বছরের শুরুর দিকের কথা। একদিন আমি আদালতের এজলাস শেষ করে বাড়ি ফিরে দেখি, আমার রুমে একজন অপরিচিতা মহিলা। আমি জানতে চাইলাম, ‘এই মহিলাটি কে?’ তারা বলল, ‘আপনার শ্বাশুড়ি।’ তিনি আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার স্ত্রীকে কেমন পেলে?’ আমি বললাম, ‘কল্যাণময় স্ত্রী।’
তারপর তিনি বললেন, ‘হে আবু উমাইয়া, নারীরা দুটি পরিস্থিতিতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকে।’
১. যখন তারা সন্তান প্রসব করে।
২. যখন তারা স্বামীর কাছ থেকে লাগামহীন ভালোবাসা ও প্রশ্রয় পায় এবং স্বামী যখন তার প্রতি অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
আল্লাহর কসম, হে আবু উমাইয়া, পুরুষের জন্য অতিরিক্ত আদর-সোহাগ ও প্রশ্রয় পাওয়া স্ত্রীর চেয়ে অধিক অনিষ্ঠকর কিছু নেই। সুতরাং, যখনই প্রয়োজন হয়, স্ত্রীকে আদব শিক্ষা দেবে আর যখন দরকার পড়ে তাকে শুধরাবে।’
শুরাইহ (রহিমাহুল্লাহ) এই বলে তার কথা শেষ করলেন, আমার সেই স্ত্রী আমার সঙ্গে দীর্ঘ বিশ বছর সংসার করেছে। কিন্তু একটি বারের জন্যও সে এমন কিছু করেনি, যা আমি অপছন্দ করি। হ্যাঁ, শুধু একবার তার একটি কাজ আমি অপছন্দ করেছিলাম। তবে পরে আমি বুঝতে পারি, ভুলটি মূলত আমার ছিল। এই অবস্থায়ই সে আমাকে ছেড়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়।’
(আল্লাহ তাকে রহম করুন।)
[বইঃ ইয়া আবি! জাওয়্যিজনি]

মতামত দিন