জীবনী

ইলম অর্জনে পূর্বসুরীদের সফর এবং ইমাম বুখারির অভিযাত্রা

ইসলামে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রথম আয়াতটিই হলো ‘পড় তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন’। রাসূল সাল্লাহু আলাইহিও সাল্লাম জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তা সংক্ষেপে বলেছেনঃ ‘প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞানার্জন করা ফরজ’।

শুধু তাই নয়, আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে এ জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে সফর করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি এই বলে যে ‘আর মুমিনদের জন্য সমীচীন নয় যে, (জিহাদের জন্যে) সবাই একত্রে বের হয়ে পড়ে; সুতরাং এমন কেন করা হয় না যে, তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে একটি ছোট দল বহির্গত হয়, যাতে তারা ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে পারে, আর যাতে তারা নিজ কওমকে (নাফরমানী হতে) ভয় প্রদর্শন করে যখন তারা ওদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে, যেন তারা সতর্ক হয়’।

(সূরা তাওবা-১২২)

রাসূল সাল্লাহু আলাইহিও সাল্লাম ইলম অন্বেষণকারীর মর্যাদা বর্ণনা এবং ইলমের উদ্দেশ্যে সফরে উৎসাহিত করে বলেনঃ ‘যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণে পথ চলবে; আল্লাহ তায়ালা এর দ্বারা তার জন্য জান্নাতের পথকে সহজ করে দিবেন।
(আবূ দাউদ, তিরমিযি)

ইলমের জন্য সফরের যে ঘটনা আল্লাহ তায়লা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, তা হলো মুসা আলাইহিস সালামের যাত্রা খিজির আলািহিস সালামের দিকে। মুসা আলািহিস সালাম খিজির আলাইহিস সালমের নিকট পৌঁছে জ্ঞানার্জনের অনুমতি প্রার্থনা করেন এই বলে যে, ‘আমি কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারি; যেন সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে তা হতে আমাকে শিক্ষা দেন’।

(সূরা কাহাফ-৬৬)

রাসূল (সাঃ) এর যুগে জাজিরাতুল আরবের বিভিন্ন গোত্র ইসলাম গ্রহণ করলে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে মদিনা অভিমূখে সফর শুরু হয়। তারা মদিনায় এসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট কিছুদিন অবস্থান করে প্রয়োজনীয় ইলম নিয়ে তাদের কওমের কাছে ফিরে যেত। যেমন আব্দুল কায়েস এর প্রতিনিধি দল রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আগমন করলে তাদের চারটি জিনিস পালন এবং চারটি জিনিস বর্জন করার আহ্বান জানিয়ে বলেনঃ ‘তোমারা পরিবারের নিকট ফিরে গিয়ে তাদেরকে বিষয়গুলো শিক্ষা দাও’।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওফাতের পর সফরের প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি করে দেখা দিলো। যেহেতু সহাবায়ে কেরাম দীনের দাওয়াত নিয়ে নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লেন এবং কোন সাহাবী এমন পরিস্থিতি অনুভব করলেন যে, সিরিয়াতে যে সাহাবী আছেন তিনি এমন একটি হাদিস জানেন, যা মদিনায় অবস্থানকারী সাহাবী জানেন না। এমন দৃষ্টান্ত মেলে জাবির (রাঃ) এর সফরে। তিনি মদিনা থেক সিরিয়াতে গিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ বিন উনাইস আনসারীর নিকট শুধু একটি হাদিস শোনার জন্য। তৎকালীন সময়ে যা ছিলো এক মাসের দূরত্বের পথ!!

সাহবায়ে কেরামের মত তাবেয়ীগণও জ্ঞানার্জনে সফরের অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত তাবেয়ী সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ( রাঃ) বলেনঃ ‘আমি দিন রাত পথ চলতাম শুধু একটি মাত্র হাদীস অন্বেষণের জন্য’।
(আর-রিহলাহ ফী ত্বলাবিল হাদীস-৭)

এরপরে আসে আয়িম্মাদের যুগ। এপর্যায়ে এসে সফরের গুরুত্ব ও পরিধি দুটোই বেড়ে যায়। যেহেতু ইসলামী জ্ঞান গবেষণার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে নতুন নতুন শহর এবং উক্ত শহরগুলোতে মুহাদ্দিসীন ও ফুক্বাহায়ে কেরামদের অবস্থান। মক্কা, মদিনার সাথে বিদ্যাচর্চার পাদপীঠ হিসেবে যে শহরগুলোর নাম উচ্চারিত হতে লাগলো তা হলোঃ শাম, কূফা, বছরা, ইয়েমেন, বাগদাদ সহ আরো কিছু শহর। তাই ইমাম (শাফি রহঃ) ইলম অর্জনের জন্যে সফর করলেন মদিনায় ইমাম মালেকে (রহঃ) এর নিকট। নিলেন মুয়াত্তার পাঠ। নতুনত্বের স্বাদ নিতে ঝুঁকলেন ইলমুল ফিরাসার প্রতি এবং তা অর্জনের জন্য ইয়েমেন গেলেন। এরপর ইরাকবাসীর ফিকহী জ্ঞান লাভের জন্য মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শায়বানী (রহঃ) গ্রন্থসমূহ কিনলেন ৬০ দিনারে। তা অধ্যয়নের জন্য দ্বারস্থ হলেন মূল লেখক মুহাম্মাদ শায়বানীর নিকট। তার শিশ্যত্ব গহণ করার মাধ্যমে মদিনা ও ইরাকী ইলমের সমন্বয় ঘটালেন। এরপর মিশরে গিয়ে তিনি আমৃত্যু দারস তাদরিস এ মশগুল হয়ে পড়েন।

★এরপর শুরু হলো হাদিস সংকলনের স্বর্ণযুগ তৃতীয় হিজরী। এ যুগের সবচেয়ে বড় নক্ষত্র হলো আমিরুল মুমেনিন ফিল হাদীস ইমাম বুখারী (রহঃ)। তিনি বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা নগরিতে ১৯৪ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ইয়াতীম অবস্থায় মায়ের স্নেহে বড় হন তিনি। ছোট বয়স থেকেই বিদ্যার স্ফুলিঙ্গ প্রকাশ পেতে থাকে। মাত্র দশ বছর বয়সে হাদিস মুখস্ত শুরু করেন। ষোল বছর বয়সে ইবনুল মুবারক ( মৃঃ১৮১ হিঃ) এবং ওয়াকী ইবনুল জাররাহ(মৃঃ১৯৮) এর গ্রন্থসমূহ মুখস্থ করেন। এরপর সফর শুরু হয় হজ ও ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে।

ইমাম বুখারী ইলম অর্জনের জন্য সে সময়ে যে দেশগুলো পরিভ্রমণ করেছেন বর্তমানে তা বড়ই আশ্চর্যের বিষয়। যেহেতু তখন ছিলো খাদ্য ও পানির সংকট। যানবাহন ছিলো অপ্রতুল এবং রাস্তাঘাট ছিলো অনুন্নত ও বিপদসংকুল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি হাজার হাজার মাইল পথ পরিভ্রমণ করতঃ হাদিস সংগ্রহ করে পরবর্তিতে তা হতে যাচাই বাছাইয়ের পর গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেছেন বলেই তিনি আজকের ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ।

তিনি যেসকল শহর ভ্রমণ করেছিলেন সে সকল শহরের বর্তমান দেশের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ

১- উজবেকিস্তানঃ এ দেশের বুখারাতে জন্ম এবং প্রথামিক শিক্ষা এখানেই সম্পন্ন করেন।

২- আফগানিস্তানঃ এ দেশের তিনি বলখ ও হেরাত শহরে সফর করেন। যা সে সময় ইলমী মারকায হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলো।

৩- ইরানঃ আলেম উলামার লীলাভূমিখ্যাত ইরানের দুটি শহরে ইমাম বুখারির আগমন ঘটে। শহর দুটি হলো রায় (راي) এ শহরের দিকে উলামারা রাযি (الرازي) নামে সম্মন্ধিত হন। যেমন ফখরুদ্দীন রাযি, আবু হাতিম রাযি সহ অনেকে। আরেকটি শহর হলো নিশাপুর। এটি ইমাম মুসলিমের শহর।

৪- ইরাকঃ ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের এ দেশে তিনি কূফা, বছরা, ওয়াসেত্ব এবং বাগদাদ সফর করেন।

৫- সিরিয়াঃ এদেশের রাজধানী দিমাশক এবং জাজিরা ফুরাতিয়ার অংশ হাসকা সফর করেন।

৬- তুরস্কঃ ঐতিহ্যবাহী শহর আন্তাকিয়াহ সফর করেন।

৭- ফিলিস্তিনের বায়তুল মাকদিসেও আগমন করেন।

৮- দখলদার ইজরাইলের আসক্বালান (عسقلان) ও ক্বায়সারিয়াহ (القيسارية) পরিভ্রমণ করেন। যা একসময় ফিলিস্তিন বা বৃহত্তর শামের অন্তর্গত ছিলো।

৯- সৌদি আরবঃ মক্কা ও মদিনায় আগমন। তিনি মদিনাতে অবস্থানকালীন সময়ে আত-তারীখ আল-কাবীর গ্রন্থটি রচনা করেন।

১০- মিশরঃ মক্কা হতে জেদ্দা। জেদ্দা বন্দর হতে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে মিশরের আইযাব বন্দরে গিয়ে ওঠেন। সেখান থেকে ওমর (রাঃ) এর শসানামলে নির্মিত ফুস্তাত শহরে যান।

১১- তুর্কমেনিস্তানঃ এদেশটির মারওয়াজ (مرو) শহরে ইলম অর্জনের লক্ষে আগমন করেন।

এভাবে তিনি বর্তমানের ১১ টি দেশ সফর করেন। শুধুমাত্র ইলম অর্জনের জন্য। যা বর্তমান কিলোমিটার হিসেবে প্রায় এগারো হাজার সাতশো আঠাত্তর (১১৭৭৮) কিলোমিটার!!!

এরাই আমাদের পূর্বসূরী। অনুপ্রেরণা নিতে হবে এখান থেকেই……..

সূত্র

মতামত দিন