জীবন দর্শন

“দ্যা মিরাকল মর্নিং” : জীবন পরিবর্তনকারী ছয় অভ্যাস

যে সকাল সুন্দর-পরিপাটি দিন উপহার দেয়, অর্থনৈতিক সাফল্য আনে, নিজের লুকানো প্রতিভা বিকাশে সাহায্য করে, স্বাস্থ্যবান করে, বিশৃঙ্খল জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটায়, অসম্ভবকে সম্ভব করতে সহায়ক হয়, অসাধারণ সব ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে, সেই সকালকে কী বলা যায়?

লেখক সেই সকালের নাম দিয়েছেন “মিরাকল মর্নিং”। অর্থাৎ এই সকাল অসম্ভব পরিবর্তনে সহায়ক। অ্যামাজনের অন্যতম বেস্ট সেলিং বই “দ্যা মিরাকল মর্নিং”। এ বইয়ের লেখক হাল এলরোড।

মাত্র ২০ বছর বয়সে গাড়ি এক্সিডেন্টে তার ১১ জায়গার হাড় ভেঙ্গে যায়, ৫/৬ মিনিট ধরে “ক্লিনিক্যাল ডেথ” এর মধ্যে থাকার পর জ্ঞান ফিরে জানতে পারলেন যে, তিনি আর কোনদিন হাঁটতে পারবেন না। এই এক্সিডেন্ট তার পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলতে শুরু করেন।

পরে একদিন তিনি এক বন্ধুর পরামর্শে সকালে উঠে দৌড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলেন। এতে তিনি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন। ধীরে ধীরে উদ্ভাবিত হয় জীবন পরিবর্তনকারী “মিরাকল মর্নিং” কনসেপ্ট। একটি সুন্দর সকাল একটি সুন্দর দিন বয়ে নিয়ে আসতে পারে। কীভাবে সেটা সম্ভব?

তার মতে একটি সুন্দর সকালের জন্য তথা সুন্দর দিনের জন্য ছয়টি কাজ করতে হবে। একে সংক্ষেপে বলে “সেভারস” (SAVERS). ছয়টি বর্ণ ছয়টি কাজের সংক্ষিপ্ত রূপ।

১। S= Silence (নীরবতা) : সকালে উঠে কিছুক্ষণ নীরব থাকতে হবে। নিজেকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে। অন্য সবকিছু থেকে নিজের মনোযোগ সরিয়ে নিতে হবে।

২। A= Affirmations (শপথ বাক্য) : কোন কাজে সফল হতে চাই তা নির্ধারণ করে কিছু অনুপ্রেরণামূলক বাক্য লিখে তা প্রতিদিন সকালে পড়তে হবে। যেমন- আমি অনার্স সিজিপিএ ৩.৮০ করতে চাই। এক্ষেত্রে লিখতে পারি, “আমি জানি এটা সম্ভব। এজন্য আমি নিয়মিত ক্লাস করবো, ভাল মানের এসাইনমেন্ট রেডি করবো, মিড টার্ম পরীক্ষায় সব কোর্সে ৮০% মার্ক রাখব। সর্বোপরি সেমিস্টার ফাইনালে সব কোর্সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো”।

৩। V= Visualization (কল্পনা করে দেখা) : নিজের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন নিয়ে চিন্তা করা। স্বপ্ন পূরণ হলে কেমন লাগবে তা নিয়ে ভাবা। এতে অনুপ্রেরণা বাড়বে।

৪। E= Exercise (ব্যায়াম করা) : শারীরিক ফিটনেসের জন্য প্রতিদিন সকালে ব্যায়াম করা। এতে অলসতা দূর হবে। কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়বে।

৫। R= Reading (পড়া): লেখকের মতে প্রতিদিন সকালে কমপক্ষে ১০ পৃষ্ঠা বই পড়তে হবে। ব্যস্ত হলে কমপক্ষে ১ পৃষ্ঠা পড়তে হবে।

৬। S= Scribing (ডায়েরি লেখা) : যা শেখা হয়েছে, নিজের দুর্বলতা, সম্ভাবনা ইত্যাদি সম্পর্কে প্রতিদিন সকালে কিছুটা হলেও ডায়েরিতে লিখে রাখতে হবে।

উপরে উল্লেখিত ছয়টি কাজকে আমরা ইসলামাইজ করে নিতে পারি। যেমন-

১। S= Salah (ফজরের সালাত আদায়)ঃ ফজরের সালাতের মাধ্যমে দিন শুরু হওয়া মানে সারাদিন আল্লাহর জিম্মায় থাকা। বিপরীত করলে শয়তানের পেশাবের মাধ্যমে দিন শুরু হয়, যা আমরা কেউই চাই না। সুতরাং একটি সুন্দর সকালের জন্য ফজরের সালাত আদায় করা অপরিহার্য। এটার প্রধান দুটি উপকারিতা রয়েছে। প্রথমত সারাদিন আল্লাহর জিম্মায় থাকা, দ্বিতীয়ত সকালের অসাধারণ উপকারিতা লাভ করা।

২। A= Azkar ( যিকর করা) ঃ সালাত শেষ করে জিকর করা সুন্নাহ। এটা আমাদের মনকে প্রশান্ত করবে। কারণে আল্লাহর জিকরে মন প্রশান্ত হয়।

৩। V= Visualization and Thinking (কল্পনা ও চিন্তা করে দেখা) : এ সময় আমরা আখিরাতের বিভিন্ন বিষয়, আল্লাহর অপার নিয়ামত নিয়ে চিন্তা করতে পারি। এই চিন্তাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এতে ঈমান বাড়বে। দ্বীনের পথে চলা সহজ হবে।

৪। E= Exercise (ব্যায়াম করা) : প্রতিদিন সকালে অল্প সময়ের জন্য ব্যায়াম করা জরুরি। এটা প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি। এছাড়াও সুস্থতার জন্য এটি অপরিহার্য। এক্ষেত্রে একটি হাদীস উল্লেখ করা যায় যেখানে রাসূল (সা.) দুর্বল মুমিনের চেয়ে সবল মুমিনের প্রশংসা করেছেন।

৫। R= Recitation (কুরআন তিলাওয়াত) ঃ যে দিন আল্লাহর শ্রেষ্ঠ কালাম তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয় সেই দিন কতই না উত্তম!

৬। Supplication = (আল্লাহর কাছে চাওয়া) ঃ সকালে আল্লাহর কাছে আমরা একটি সুন্দর, ইবাদতেপূর্ণ, মানুষের কল্যাণে দিনের জন্য প্রার্থনা করতে পারি।

এই ছয়টি কাজ ১ ঘণ্টার মধ্যে করা যায়। আমাদের সময় বণ্টন কাজের পর্যায় নিচের মত হতে পারেঃ

ফজরের সালাত ২০ মিনিট

যিকর ৫ মিনিট

চিন্তা করে দেখা ৫ মিনিট

আল্লাহর কাছে চাওয়া ৫ মিনিট

কুরআন তিলাওয়াত ১৫ মিনিট

ব্যায়াম করা ১০ মিনিট

এই ছয়টি কাজের বাইরে যে অন্য কোন কাজ করা যাবে না অথবা এই সময়ের মধ্যেই করতে হবে- বিষয়টি মোটেই সেরকম নয়। আমরা হল এলরোডের হুবহু অনুসরণ করেছি অথবা তার চিন্তা কপি করলাম-বিষয়টি এরকমও নয়। এটা ক্লারিফাই করি।

ছকের প্রথম কাজ- ফজরের সালাত আদায় করা ফরজ। দ্বিতীয় কাজ সুন্নাহ। তৃতীয় কাজও নফল ইবাদত যা সবসময় করা যায়। চতুর্থ কাজ আল্লাহর কাছে একাকী দুয়া করা নফল ইবাদত আর নফল সালাত আদায় করা সুন্নাহ। কুরআন তিলাওয়াত নফল ইবাদত। ছয় নম্বরের কাজটি জায়িজ।

হাল এলরোডের উদ্ভাবিত ছয় অভ্যাস হয়ত দুনিয়ার কিছু কাজে সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্য লাভ করতে হলে তার ফর্মুলা পুরোপুরি মানা যায় না। কিছুটা চেঞ্জ করার প্রয়োজন হয়। সেই পরিবর্তনটা আমরা এখানে করে ফেললাম। কী চমৎকার!

ঠিক এভাবেই সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। সাধারণত আমরা পশ্চিমা লেখকদের বইকে সমাদরে গ্রহণ করি। তাদের ফর্মুলা হুবহু অনুসরণ করি। যা আমাদের আখিরাত নষ্ট করে দেয় অথবা দুনিয়া বিপর্যস্ত করে দেয়। আমাদের আমাদের এ সকল পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন।

সংগ্রহ

মতামত দিন