সিয়াম

তাক্বওয়া (পর্ব-২)

পূর্বের আলোচনা থেকে “তাক্বওয়া” অর্জন করার গুরুত্ব ও কিভাবে “তাক্বওয়া” অর্জন করা যায় সে সম্পর্কে আমরা জেনেছি, কিন্তু যদি তাক্বওয়া অর্জন করতে পারি তাহলে পুরস্কার স্বরুপ আমরা কি কি পাব ?? সে সম্পর্কে আজকের আলোচনা :

কিছু আমল রয়েছে যা পালন করলে পুরস্কার ইহকালে নয় বরং তার পুরস্কার পরকালে আল্লাহর নিকট পাওয়া যাবে কিন্তু কেউ যদি আল্লাহকে ভয় করে বা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারে তবে তার পুরস্কার শুধু পরকালে নয় বরং ইহকালেও এর একাধিক পুরস্কার রয়েছে

#তাক্বওয়া_অর্জনের_ইহ-পরকালিন_পুরস্কার:

১- ইহকালিন যগতে যে কোন কাজ-কর্মে সফল হওয়া এবং পরকালে জান্নাত লাভের মাধ্যমে চুড়ান্ত সফলতা লাভ করা: আল্লাহ তআলা বলেছেন, وَاتَّقُوا اللہَ لَعَلَّکُمْ تُفْلِحُوْنَ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। (সুরা বাকারা : ১৮৯)

২- আল্লাহকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া (এটি ইহকালিন ও পরকালিন উভয় যগতেই): আল্লাহ তাআলা বলেছেন, إِنْ أَوْلِيَاؤُهُ إِلَّا الْمُتَّقُونَ মুত্তাক্বী ছাড়া কেউ তার ওয়ালী বা বন্ধু হতে পারে না।

৩- আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন: এটি ইহ-পরকাল উভয় যগতের জন্য : যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَاتَّقُوا اللہَ وَاعْلَمُوْٓا اَنَّ اللہَ مَعَ الْمُتَّقِیْنَ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর জেনে রেখ যে, আল্লাহ মুত্তাক্বীদের সাথেই রয়েছেন। (সুরা বাকারা: ১৯৪) ক্বাতাদাহ (রহ.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে আল্লাহ তার সাথে থাকন, আর যার সাথে আল্লাহ থাকেন কোন কিছু তাকে পরাজিত করতে পারেনা। কেননা আল্লাহ এমনই একজন রক্ষক যিনি ঘুমান না, তিনি এমনই একজন পথপ্রদর্শক যিনি ভ্রান্ত পথ দেখান না। (হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/৩৪০)

৪- আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা: এটিও ইহ-পরকাল উভয় যগতের জন্য: যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, بَلٰی مَنْ اَوْفٰی بِعَھْدِھ۪ وَاتَّقٰی فَاِنَّ اللہَ یُحِبُّ الْمُتَّقِیْنَ তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজের ওয়াদা পুর্ণ করবে এবং আল্লাহকে ভয় করে চলবে, নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাক্বীদেরকে ভালোবাসেন। (সুরা আলু ইমরান : ৭৬)

৫- ভালো-মন্দ পার্থক্য করার ক্ষমতা অর্জন ও পাপসমুহ মোচন : আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

یٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْٓا اِنْ تَتَّقُوا اللہَ یَجْعَلْ لَّکُمْ فُرْقَانًا وَّیُکَفِّرْ عَنْکُمْ سَیِّاٰتِکُمْ وَیَغْفِرْ لَکُمْ وَاللہُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِیْمِ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর তাহলে তিনি তোমাদেরকে ভাল ও মন্দর মধ্যে পার্থক্য করার শক্তি প্রদান করবেন, তোমাদের দোষ-ত্রুটি দুর করে দিবেন, তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল। (সুরা আনফাল: ২৯)

৬- সন্তান-সন্ততি বা পরবর্তী বংশধর রক্ষা: যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَلْیَخْشَ الَّذِیْنَ لَوْ تَرَکُوْا مِنْ خَلْفِھِمْ ذُرِّیَّةً ضِعٰفًا خَافُوْا عَلَیْھِمْﺕ فَلْیَتَّقُوا اللہَ وَلْیَقُوْلُوْا قَوْلًا سَدِیْدًاﭘ

তারা যেন ভয় করে যে, অসহায় সন্তান পেছনে ছেড়ে গেলে তারাও তাদের জন্য চিন্তিত হত, সুতরাং তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সঙ্গত কথা বলে। (সুরা নিসা: ০৯)

৭- সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَنْ یَّتَّقِ اللہَ یَجْعَلْ لَّھ۫ مَخْرَجًا যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে মুক্তির) পথ বের করে দেন। (সুরা ত্বলাক: ০২)

৮- কঠিন বিষয় সহজ করা হয়: যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَنْ یَّتَّقِ اللہَ یَجْعَلْ لَّھ۫ مِنْ اَمْرِھ۪ یُسْرًا যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য কাজ সহজ করেদেন। (সুরা ত্বলাক: ০৪)

৯- সঠিক পথের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ذٰلِکَ الْکِتٰبُ لَا رَیْبَﹴ فِیْھِﹱ ھُدًی لِّلْمُتَّقِیْنَ এটা ঐ কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাক্বীদের জন্য পথ নির্দেশ। (সুরা বাকারা: ০২)

১০- আমল গ্রহণযোগ্যতার চাবি : আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যেসকলস আমল করে থাকি তা যদি কবুল নয় হয় তাহলে সেসব আমল সম্পুর্ণ বৃথা, এজন আমল আল্লাহর নিকট কবুল হওয়ার একমাত্র চাবি হচ্ছে তাক্বওয়া অর্জন করা। তাক্বওয়া অর্জন করলে আমলসমুহ আল্লাহর নিকট কবুল হবে: যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, {إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ আল্লাহ কেবল মুত্তাক্বীদের থেকেই আমল কবুল করেন। (সুরা মাইদাহ: ২৭)

#তাক্বওয়া_অর্জনের_পরকালিন_পুরস্কার:

১- আল্লাহর অতিথি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা: যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, یَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِیْنَ اِلَی الرَّحْمٰنِ وَفْدًا যেদিন মুত্তাক্বীদেরকে দয়ামযের নিকট একত্রিত করব সম্মানিত অতিথি হিসেবে। (সুরা মারইয়াম: ৮৫) যারা আল্লাহর অতিথি হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে তারা কিয়ামতের দিন বাহনে করে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবেন এবং জান্নাতের দরজা পর্যন্ত তারা এই বাহনে করে পৌছে যাবে । (মুস্তাদরাক আল-হাকিম: ৩৪২৫)ইমাম হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বললেও ইমাম যাহাবী সানাদটিকে দুর্বল বলেছেন।

২- জান্নাত লাভ: আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَسَارِعُوْٓا اِلٰی مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُھَا السَّمٰوٰتُ وَالْاَرْضُ اُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِیْنَ

তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে ও সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি হচ্ছে আসমানসমুহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাক্বীদের জন্য তৈরী করা হয়েছে। (সুরা আলু ইমরান : ১৩৩)

৩- শেষ পরিণাম কল্যাণকর: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِیْنَ কল্যাণময় পরিণাম হচ্ছে মুত্তাক্বীদের জন্য। (সুরা আরাফ ১২৭)

৪- পুলসিরাত থেকে মুক্তি লাভ: আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

ثُمَّ نُنَجِّی الَّذِیْنَ اتَّقَوْا وَّنَذَرُ الظّٰلِمِیْنَ فِیْھَا جِثِیًّا

অতঃপর মুত্তাক্বীদেরকে আমি রক্ষা করব আর যালিমদেরকে তার মধ্যে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব। (সুরা মারইয়াম : ৭২)

সংকলন :

মোহাম্মাদ আলী গোদাগাড়ী

অধ্যয়নরত: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা মুনাওয়ারাহ, সৌদি আরব।

সূত্র

মতামত দিন