জীবনী

মূসা (আ.) ও ইউসুফ (আ.)এর ঘটনা‌‍

পবিত্র কুরআনুল কারীমে দু’জন নবীর ঘটনা বর্ণনা আছে। যাদের ঘটনার মাঝে রয়েছে আশ্চর্যজনক কিছু সামঞ্জস্য ও মিল। নবী দুইজন হচ্ছেন, সায়্যিদিনা মূসা এবং ইউসুফ (আলাইহিমাস-সালাম)।

কুরআনে তাঁদের ঘটনাগুলো বুঝে পড়ার সময় যদি একটু খেয়াল করে দেখেন, তাহলেই দেখতে পাবেন এই সুন্দর সুক্ষ্ম মিল ও সামঞ্জস্যগুলো।

মূসা এবং ইউসুফ (আলাইহিমাস-সালাম)এর ঘটনার মাঝে যা যা মিল-অমিল বৈশিষ্ট্য ও সামঞ্জস্য পাওয়া যায় তা নিম্নরূপ :

১. দু’জন নবীরই ঘটনা শুরু হয়েছে “মিসর” থেকে।

২. দু’জনই “নিখোঁজ” হয়েছিলেন।

৩. দুজনকেই “ফেলে দেয়া” হয়েছিলো।

– মূসা (আ:)কে পানিতে বা সাগরে।

– আর ইউসুফ (আ:)কে অন্ধকার কূপে।

৪. ইউসুফ (আ:)কে “ঘৃণার” হাতে নিক্ষেপ করেছিল। (তার ভাইয়েরা)

“তাকে কোন অন্ধকার কূপে ফেলে দাও।” [সুরা ইউসুফ ১০]

আর, মূসা (আ:)কে “ভালোবাসার হাতে নিক্ষেপ করেছিল। (তার মাতা)

“তুমি তাকে (মূসাকে) পানিতে নিক্ষেপ করবে। ভয় করবে না, দুঃখও করবে না।” –[সুরা ক্বাসাস ৭]

৫. নিক্ষেপ করার নির্দেশের ক্ষেত্রে যে দু’টি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে পার্থক্য: “وَأَلقُوه” এবং “فَأَلقِيه” ;

– ইউসুফ (আ:) এর ব্যপারে وَأَلقُوْهُ শব্দটি এসেছে। যার অর্থ : “তোমরা তাকে নিক্ষেপ করে দিবে।” উক্ত শব্দটির ব্যবহারে ইউসুফের প্রতি ভাইদের প্রবল ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে।

– মূসা (আ:) এর ব্যাপারে فَأَلقِيه শব্দটি এসেছে। যার অর্থ : “তুমি তাকে নিক্ষেপ করবে”। উক্ত শব্দটির ব্যবহারে প্রকাশ পেয়েছে মায়ের পরম মমতা ও যত্ন। কারণ :

শাব্দিক অর্থের দিকে থেকে দুটি শব্দ এক হলেও প্রথমটি ছিল “মানুষের” কথা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে “মানুষের রব্বের” কথা ও হুকুম। অর্থা‌ৎ আল্লাহর হুকুমে মা তাঁকে সাগরে নিক্ষেপ করেছিলেন।

৬. দুজনই মিসরের “আলিশান প্রাসাদে” বড় হয়েছিলেন।

৭. মূসা (আ:)এর “মাতা” ছিলেন সন্তান হারানোয় দুঃখিনী।

-আর ইউসুফ (আ:)এর “পিতা” ছিলেন সন্তান হারানোয় দুঃখী।

৮. যে প্রাসাদে মূসা (আ:) বড় হয়েছেন, সেই প্রাসাদের মালিকের “স্ত্রী” অর্থা‌ৎ ফেরাউনের স্ত্রী মূসা (আ:)এর লালন-পালনের আবেদন করেছিলেন। (ক্বাসাস/৯)

আর ইউসুফ (আ:) যে প্রাসাদে বড় হয়েছেন, সেই প্রাসাদের “মালিক” স্বয়ং নিজেই ইউসুফ (আ:)এর লালন পালনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানিয়েছিলেন। (ইউসুফ/২১)

৯. যৌবনে পদর্পণ করলে দুজনকেই কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সম্বধোন করেছেন প্রায় একই রকমভাবে।

– ইউসুফ (আ:)এর ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেন, “যখন সে তার পরিপূর্ণ যৌবনে পদর্পণ করল, তখন তাকে হিকমাহ ও জ্ঞান দান করলাম, আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।” (ইউসুফ ২২)

– আর মূসা (আ:)এর ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেন, “যখন সে যৌবনে পদর্পণ করল আর পূর্ণ পরিণত হল, তখন আমি তাকে হিকমাহ ও জ্ঞান দান করলাম, আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।” (ক্বাসাস ১৪)

১০. মূসা (আ:)এর “মাতা”র দুঃখের কথা কুরআনে বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ বলেন,

“অত:পর মূসার মায়ের অন্তর বিচলিত হয়ে পড়ল” (ক্বাসাস ১০)

অপরদিকে ইউসুফ (আ:)এর “পিতা”র দুঃখের কথাও কুরআনে বর্ণনা এসেছে।

আল্লাহ বলেন, “শোকে-দুঃখে তার দুচোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল।” (ইউসুফ ৮৪)

১১. ইউসুফ (আঃ)এর “ভাইয়েরা” ইউসুফ (আ:)কে কূপে নিক্ষেপ করেছিল এবং কষ্ট দিয়েছিল।

আর মূসা (আঃ)এর “বোন” মূসা (আ:)কে খুঁজেছিল এবং সাহায্য করেছিল।

১২. আর উভয়কে খুঁজে বের করার জন্য,

– মূসা (আ:)এর “মাতা” মূসা (আ:)এর বোনকে নির্দেশ দিয়েছিল। (ক্বাসাস ১১)

– আর ইউসুফ (আ:)এর “পিতা” ইউসুফ (আ:)এর ভাইদের নির্দেশ দিয়েছিল। (ইউসুফ ৮৭)

১৩. মূসা (আ:)এর মাতার দুঃখ কষ্ট অবসানের সূচনা হয়েছিল যখন… আল্লাহ বলেন, “আমি তাকে ধাত্রী-স্তন্য পান করা থেকে বিরত রেখেছিলাম।” (ক্বাসাস ১২)

আর ইউসুফ (আ:)এর পিতার দুঃখ কষ্ট অবসানের সুচনা হয়েছিল যখন… আল্লাহ বলেন, “(ইয়াকূব বললেন) অবশ্যই আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি।” (ইউসুফ ৯৪)

১৪. মূসা (আ:) যে প্রাসাদের লোকদের কাছে বড় হয়েছিল, বড় হওয়ার পর তাদের সাথেই মূসা (আ:)এর দ্বন্দ্ব হওয়ার ফলে তারা তাকে পাকড়াও করতে চেয়েছিল। (ক্বাসাস ২০)

আর ইউসুফ (আ:) যে প্রাসাদের লোকদের কাছে বড় হয়েছিল, বড় হওয়ার পর একটা সময় তারাই তার সাথে আপোষ করে তাঁকে উঁচ্চ মর্যাদা দিয়েছিল। (ইউসুফ ৫৪)

১৫. ইউসুফ (আ:)এর ঘটনা বর্ণনায় কোথাও তাঁর “মাতা”র কথা আসেনি।

আর মূসা (আ:)এর ঘটনা বর্ণনায় কোথাও তাঁর “পিতা”র কথা আসেনি।

সর্বশেষ, দুটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছুই আছে। তবে কমন যে শিক্ষাটা আমরা পাই তা হচ্ছে,

“মুমিনের জীবনে বিপদ-আপদ দুঃখ-কষ্ট আল্লাহর তরফ থেকে একটি পরিক্ষা। এ পরিক্ষায় বিচলিত হওয়া যাবে না। অত্যধিক ধৈর্যশীল হতে হবে। আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করতে হবে। সদা আল্লাহর স্মরণে লেগে থাকতে হবে, তাহলেই মুমিন পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে। আল্লাহ মুমিনের বিপদ আপদ দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিবেন। প্রশান্ত করে দিবেন তার মন ও নয়ন, যেমনিভাবে প্রশান্ত করেছিলেন মূসা (আ:)এর মাতা এবং ইউসুফ (আ:)এর পিতার মন ও নয়ন।”
————————————————
অনুবাদ ও সংযোজন:

মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ আল কাফী।

সূত্র

মতামত দিন