ইসলামিক গল্প

একজন জান্নাতী মহিলার জীবনের কিছু কাহিনী

তিনি হলেন মর্যাদাবান সাহাবী আনাস রাযিয়াল্লাহুর আনহুর মাতা এবং অন্যতম মহিলা সাহাবী উম্মে সুলাইম রুমাইসা বিনতে মিলহান। কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আগমণকারী প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্যই তাঁর জীবনীতে বিরাট শিক্ষা রয়েছে।

মক্কার যমীনে যখন ইসলামের সুশীতল ছায়া নামলো, তখন তিনি সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারীদের সাথেই ইসলাম কবুল করলেন। তাঁর স্বামী মালিক বিন নযরের কাছে যখন রুমাইসার ইসলাম গ্রহণের খবর পৌঁছে গেল, তখন সে রুমাইসাকে লক্ষ্য করে বলল, “তুমি কি বে-দ্বীন হয়ে গেছো?” জবাবে তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম! আমি বে-দ্বীন হইনি; বরং ইসলাম গ্রহণ করেছি।” অতঃপর তিনি মালিক বিন নযরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু সে ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলো।

ইসলাম গ্রহণ করার তিনি তার একমাত্র শিশু পুত্র আনাসকে অত্যন্ত গুরুত্বে সাথে ইসলামের উপর প্রতিপালন করতে লাগলেন। তিনি তার আদরের পুত্রকে খেলা-ধূলা করানোর সময় বলতেন,

“বলো বাবা لآ اِلَهَ اِلّا اللّهُ বলো বাবা, لآ اِلَهَ اِلّا اللّهُ ।”

তার স্বামী মালিক বিন নযর আনাসকে শাহাদাতের কালেমা পাঠ করতে শুনে রাগান্বিত হয়ে যেতো এবং রুমাইসাকে বলতো, “তুমি আমার পুত্রকে নষ্ট করো না।’ তিনি বলতেন, “আল্লাহর কসম! আমি তাকে নষ্ট করছি না।”

বর্ণিত আছে যে, তাঁর স্বামী একদা সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হলে তার শত্রুরা সেখানে তাকে হত্যা করে ফেলে। এবার উম্মে রুমাইসা তাঁর শিশু পুত্রকে নিয়ে বিধবা হয়ে গেলেন। এবার তিনি তাঁর একমাত্র শিশুকে দুধ পান করানোর সাথে ঈমান ও ইলম শিখাতে থাকলেন।

পরবর্তীতে মুসলিমগণ যখন মদীনায় হিজরত করলেন, তখন রুমাইসাও শিশু পুত্র আনাসসহ মদীনায় হিজরত করলেন। তখন আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। তিনি আনাসকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই তো আমি আনাসকে আপনার খেদমতের জন্য নিয়ে এসেছি। আপনি তাকে গ্রহণ করুন।” তিনি আনাসকে কবুল করলেন। সেদিন থেকেই আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু নবীজির খেদমতে আত্ননিয়োগ করলেন। তিনি একটানা দশ বছর তাঁর খেদমত করেছেন।

ঐদিকে আনসারী সাহাবী আবু তালহা রুমাইসাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলেন। আবু তালহা তখন ছিলেন মুশরিক। তাই তিনি আবু তালহার সাথে বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। আবু তালহা দ্বিতীয়বার প্রস্তাব দিলেন। তিনি যখন আবু তালহার আগ্রহ দেখলেন, তখন তার কথার জবাব এভাবে দিলেন, “তোমার মত পুরুষের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার মত নয়, তবে কথা হলো তুমি তো মুশরিক। আমার পক্ষে কোনো মুশরিক পুরুষকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।” আবু তালহা ধন-সম্পদের প্রলোভন দেখালেন। কিন্তু তিনি বললেন, “আমি তোমার ধন-সম্পদের লোভ করি না। তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করো তাহলে ইসলামই হবে তোমার সাথে আমার বিবাহের মহর।” অতঃপর রুমাইসা বললেন, “হে আবু তালহা! তুমি কি জানো না, তোমার যে মাবুদকে তুমি পূজা কারো তা কারো উপকার করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না? তোমার মাবুদকে বানানো হয়েছে কাঠের এক অংশ দিয়ে এবং অন্য অংশ চুলায় আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা হয়েছে।” কথাগুলো শুনে আবু তালহা বললেন, “আচ্ছা, আমি তোমার কথা চিন্তা-ভাবনা করে দেখবো।” পরবর্তীতে আবু তালহা এসে বললেন, “হে রুমাইসা! তোমার কথা আমার অন্তরের গভীরে প্রবেশ করেছে। অতঃপর তিনি বললেন, ﺃﺷﻬﺪ ﺃﻥ ﻻ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺃﻥ ﻣﺤﻤﺪًﺍ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ।”

অতঃপর আবু তালহার সাথে রুমাইসার বিবাহ সম্পাদিত হলো। ইসলামের ইতিহাসে এ পর্যন্ত যত মহিলার বিবাহ হয়েছে তার মধ্যে রুমাইসার বিবাহের মহর ছিল সর্বোচ্চ। ইসলামই ছিল তাঁর বিবাহের মহর।

রুমাইসার অন্তর ছিল আল্লাহর ভালোবাসা, রাসূলের ভালোবাসা এবং ইসলামের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। সেই সঙ্গে রুমাইসা স্ত্রী হিসাবে পৃথিবীর প্রতিটি স্ত্রীর জন্যই কিয়ামত পর্যন্ত আদর্শ হয়ে থাকবেন। তিনি তাঁর স্বামী আবু তালহার সাথে অত্যন্ত গভীর ভালোসার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁর স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জনে তিনি বিন্দু মাত্র ত্রুটি করতেন না।

সহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, আবু তালহার একটি শিশু পুত্র অসুস্থ ছিল। আবু তালহা তখন সফরে ছিলেন। তিনি যেদিন ঘরে ফিরলেন, ঐ দিনই শিশু পুত্রটি মৃত্যুবরণ করল। রুমাইসা বাড়ির সকলকে বললেন যে তাঁর আগে যেন আবু তালহাকে শিশুর মৃত্যু সংবাদ প্রদান না করা হয়। আবু তালহা ঘরে প্রবেশ করে শিশুটির কথা জিজ্ঞাসা করলেন। রমাইসা বললেন, “শিশুটি খুব আরামে আছে।” এতে আবু তালহা মনে করলেন যে অসুস্থ শিশুটি ভালো হয়ে গেছে এবং আরামে ঘুমাচ্ছে। রুমাইসা তাঁর স্বামীকে খাবার দিলেন। অতঃপর স্বামীর জন্য সৌন্দর্য গ্রহণ করলেন। অতঃপর তাঁর স্বামীর সাথে রাত্রি যাপন করলেন। স্বামী-স্ত্রীতে সাধারণত যা হয়ে থাকে তাই হলো। সকাল হলে রুমাইসা বললেন, “হে আবু তালহা! তোমার কাছে যদি অমুক গোত্রের কেউ কিছু আমানত রাখে আর সে যদি তোমার কাছে সেই আমানত ফেরত নিতে চায়, তাহলে কি তুমি তা আটকে রাখতে পারবে?” তিনি বললেন, “না। অবশ্যই আমানত ফিরিয়ে দিতে হবে।”

তখন রুমাইসা বললেন, “তুমি ধৈর্যধারণ করো। তোমার পুত্র আল্লাহর নিকট চলে গেছে।” এই কথা শুনে মন খারাপ করে আবু তালহা সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে চলে গিয়ে রাতের ঘটনা সম্পর্কে জানালেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, “আল্লাহ তাআলা আজ রাতে তোমাদের দুইজনের মধ্যে প্রচুর বরকত দান করেছেন।”

অতঃপর উম্মে সুলাইম ও আবু তালহার এই কাজে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদেরকে অনেকগুলো পুত্র সৎসন্তান দান করেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে দশজন কুরআনের হাফেয হয়েছিলেন।

রুমাইসার কৃতিত্ব এখানেই শেষ নয়। ইতিহাসের কিতাবগুলোতে লিখা হয়েছে, উম্মে সুলাইম নারীত্বের সীমার মধ্যে থেকেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একাধিক জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন। ইসলামের প্রতি অগাধ ভালোবাসাই এর একমাত্র কারণ।

উপরোক্ত গুণাবলী তাঁর চরিত্রের ভূষণ হওয়ার সাথে সাথে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী ও মেধাবী মহিলা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তিনি একাধিক হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে তাঁর পুত্র আনাস, ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্য সাহাবীগণ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রকৃতপক্ষেই সত্য ও ন্যায়ের একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁর জন্য জান্নাত তৈরী করে রেখেছেন।

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা বলেছেন, “আমি জান্নাতে প্রবেশ করে আবু তালহার স্ত্রী রুমাইসাকে দেখতে পেয়েছি।” [সহীহ বুখারী]

তথ্যসূত্রঃ (১) আল-ইসাবা ফী তামঈযিস-সাহাবা, (২) উসুদুল গাবাহ, (৩) আল-ইস্তিআব এবং অন্যান্য।

লিখেছেনঃ শায়খ আব্দুল্লাহিল কাফি হা’ফিজাহুল্লাহ

Source

মতামত দিন