ইসলাম গ্রহণের গল্প

জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে – আব্দুর রহিম গ্রিনের ইসলাম গ্রহণের গল্প

আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াসসালাতু ওয়াসসালাম আ’লা রাসূলিল্লাহ। প্রিয় ভাই ও বোনের, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

আমি আব্দুর রহিম গ্রিন। আমার ইসলাম গ্রহণের গল্পটা আপাদের সামনে আজ তুলে ধরব।

আমার জন্ম তানজানিয়ার রাজধানি দারুস সালামে। আমার বাবা ছিলেন জাতিতে ইংরেজ, মা পোলিশ। বাবা তখন তানজানিয়াতে ব্রিটিশ সম্রাজ্যের একজন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতেন। সেই ব্রিটিশ সম্রাজ্য! এক সময় এই সম্রাজ্য গোটা বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুড়ে ছিল। আর আজ? ফকল্যান্ডের সামান্য কিছু দ্বীপই কেবল ব্রিটেনের অধিকারে আছে।

সবকিছু কী দারুণভাবেই না বদলে যায়! একসময়ের বিশাল শক্তিধর রাষ্ট্রের সে শক্তিমত্তার তেমন কিছু আর নেই। এর মাঝেই আল্লাহ আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষা রেখেছেন। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন-

“তোমরা পৃথিবীতে ঘুরে দেখ। দেখ, অতীতের জাতিদের পরিণতি কী হয়েছিল যারা শক্তি সামর্থ্য সবদিক দিয়ে তোমাদের চেয়ে আরও অনেক বেশি উন্নত ছিল।” [সূরা আর রূম : ৯]

যাহোক, জন্মের পর আমার নাম রাখা হয় এন্থনি গ্রিন। আমার বয়স যখম দুবছর, তখন আমরা তানজানিয়া ছেড়ে যায়।

বাবার ধর্ম-কর্মে খুব একটা বিশ্বাস ছিল না। মা ছিলেন রোমান ক্যাথলিক। নিয়ম অনুযায়ী মায়ের ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসী একজনকেই বিয়ে করার কথা ছিল। যদিও মা তা করেননি। মা নিজেও খুব বেশি ধার্মিক ছিলেন না। তার প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপই কিনা, মা ঠিক করলেন আমাদের দুই ভাই, আমি আর ডানকানকে ধার্মিক ক্যাথলিক বানাবেন। দশ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের ইয়ার্কশায়ারের একটা বোর্ডিং স্কুলে আমাকে পাঠানো হয়। স্কুলটি ক্যাথলিক ধর্মগুরুদের দ্বারা পরিচালিত ছিল।

সে স্কুলে পাঠানোর আগে মা আমাকে স্কুলের কিছু নিয়ম কানুন, কিছু প্রার্থনা শিখিয়ে দিলেন। এক রাতে মা আমাদের দুজনকে নিয়ে প্রার্থনা করলেন, ‘হে মেরি! ঈশ্বর মাতা! তুমি আমাদের উপর তোমার পুত্র যিশুর মাধ্যমে দয়া কর।’
এটা ছিল ক্যাথলিকদের মধ্যে প্রচলিত বহুল ব্যবহৃত একটি প্রার্থনা।

ওয় বয়সেই আমার মনে খটকা লাগল, ‘ঈশ্বরের আবার মা থাকে কী করে! ঈশ্বর তো হওয়া উচিত এমন একজন, যার কোনো শুরু নেই, শেষ নেই। তাহলে তার জন্মদাত্রী মা আসে কোথা থেকে? আমার মনে হলো, যে মা ঈশ্বরকে জন্ম দিয়েছেন, তিনি নিশ্চয় ঈশ্বরের চেয়ে বড়। সে হিসেবে মাতা মেরি তো আরও বড় খোদা।

এটা ছিল আমার মনে উদয় হওয়া প্রথম বড় জিজ্ঞাসা।

স্কুলে পড়তে গিয়ে আমার মনে আরও অনেক প্রশ্নের উদয় হলো। স্কুলে একটা নিয়ম ছিল, সেখানকার ধর্মগুরুর সামনে নিজের সকল পাপ স্বীকার করতে হবে। বছরে কমপক্ষে একবার এই নিয়ম মানতেই হতো। বলা হতো, সব পাপ স্বীকার না করলে ঈশ্বর নাকি ক্ষমা করবেন না। আমার মাথায় ঢুকতো না, নিজের সব পাপ এই লোকের কাছে স্বীকার করতে হবে কেন? ১২-১৩ বছরের বাচ্চাদের ওই বয়সে যদি সব পাপ স্বীকার করতে বলা হয়, তাও আবার তাদেরই আবাসিক শিক্ষকের সামনে, তারা কী আসলেই তা মানবে? আপনাদের কী মনে হয়?

আমার মনে হতো, ঈশ্বরের নাম করে সব পাপ স্বীকারের বিষয়টা এক ধরণের চালাকি। যাতে কোনো ছাত্রের মনে কী আছে, কে কী করে তা জেনে নিয়ে সে অনুযায়ী সবাইকে টাইট দেয়া যায়। আমরাও কম যায় না। নিজের মতো করে অনেক কিছু বানিয়ে বলতাম। এই যেমন বলতাম, ‘গত সপ্তাহে এই ছেলেটার দামি জামা কাপড় দেখে আমার মনে একটি হিংসা হয়েছিল’, ‘এই সপ্তাহে আমি তিনবার মিথ্যা বলেছিলাম’ ইত্যাদি। এই বয়সে ছেলেরা অনেক ধরণের কাজকর্মই করে। সব কী আর বলা যায়।

আমি একবার জিজ্ঞাসাও করেছিলাম, ‘আমাকে আপনাদের সামনেই দোষ স্বীকার করতে হবে কেন? কেন সরাসরি ঈশ্বরের কাছে নয়? অথচ আমাদের পবিত্র বাইবেলে আছে, যিশু বলেছেন স্বর্গীয় পিতার কাছেই নিজের অপরাধ মার্জনা চেয়ে।’ তারা আমাকে বললেন, ‘তুমি ইচ্ছে করলে সরাসরি ঈশ্বরের কাছে বলতে পার। কিন্তু তোমার নিশ্চিত হবার সুযোগ নেই, আসলেই ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করেছেন কিনা। কিন্তু আমরা ঈশ্বরের কাছে তোমাদের পাপের জন্য ক্ষমা চাইলে, ঈশ্বর অবশ্যই তোমাকে ক্ষমা করবেন।’

বাহ! চমৎকার! আমি বললে ঈশ্বর আমার কথা শুনবেন না, কিন্তু আপনাদের কথা ঠিকই শুনবেন। অথচ আপনারা গুনে মানে কোনো দিক দিয়ে আমাদের চেয়ে আহামরি কিছু নন।’ আমি মনে মনে ভাবছিলাম। বলা বাহুল্য, তাদের এই জবাব আমাকে মোটেও সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

খ্রিষ্ট ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী সর্বশক্তিমান ঈশ্বর মানুষের রূপ ধরে পৃথিবীতে এসেছেন। যা অবতারবাদ নামে পরিচিত। এটা আমার ঠিক বুঝে আসত না। আমি বুঝতাম না, ঈশ্বরের মানুষ হয়ে পৃথিবীতে আসারই বা কী দরকার!

আমার এগার বছর বয়সে বাবা চাকরি সূত্রে মিশর চলে আসেন। ছুটির দিনগুলোতে আমরা লন্ডন থেকে মিশর চলে যেতাম। আমি ক্লাস করতাম লন্ডনে, আর ছুটি কাটাতাম মিশরে। এভাবেই কেটেছিল প্রায় দশ বছর।

আমার মনের একটা অনুভূতি আপনাদের শেয়ার করি। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আমাদের শেখায় সুখী হওয়া মানে অনেক টাকার মালিক হওয়া। কারণ, আপনার অনেক টাকা থাকলে আপনি দামি গাড়িতে চড়তে পারবেন, ড্রইং রুমে সোফায় বসে বিশাল বড় টিভি দেখতে পারবেন, ছুটির দিনগুলোতে মন ভরে দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে পারবেন। পারবেন নিজের ইচ্ছেমতো নানা ধরনের দামি জিনিস কিনতে। তাই জীবনে সুখী হতে অনেক টাকার প্রয়োজন।

কিন্তু আসলে কি টাকা সুখ এনে দিতে পারে? সত্যি কথা হলো, অঢেল সম্পদ আপনাকে কখনোই মনের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ সুখী করতে পারবে না।

এই কথাগুলো কেন বলছি? কারণ, এই বিষয়গুলো আমাকে খুবই ভাবাত। মিসরে ফুরফুরে দিনগুলো কাটিয়ে আমি যখন বোর্ডিং স্কুলের কঠোর নিয়ম-কানুনের মধ্যে ফিরে যেতাম; মনে হতো, কেন আমি এত কষ্ট করছি? এত কড়াকড়ির মধ্যে পড়াশোনা করে কী লাভ? কী লাভ এত কষ্ট করে, এত কিছু শিখে?

আমি ভাবতাম আসলে এই জীবনের মানে কী? কেনইবা পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকা? কী আমাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্য?

আমি নিজেই নিজের জবাব খুঁজে নিতাম, ‘আমি এই স্কুলে এত কষ্ট করছি যাতে আমার রেজাল্ট ভালো হয়। রেজাল্ট ভালে হলে আমি একটা ভালো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারব। ইউনিভার্সিটিতে ভালো রেজাল্ট করতে পারলে খুব ভালো বেতনের একটা চাকুরী হবে। তখন আমার দারুণ একটা বই হবে, হবে সন্তানসন্ততি। নিজের অনেক টাকা থাকলে আমার সন্তানদেরকেও ভালো ভালো স্কুলে পড়াতে পারব। যাতে তারা ভালো রেজাল্ট করে ভবিষ্যতে আমার মতোই একটা ভালো বেতনের চাকুরি পায়। তখন তারাও তাদের ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াতে পারবে, যাতে তারাও বড় হয়ে মোটা বেতনের চাকুরি করে তাদের ছেলে মেয়েদের দামি স্কুলগুলোতে পড়াতে পারে।’

আপন মনেই নিজের কাছে সব কেমন যেন লাগল। ভালো করে ভেবে দেখলে, এইতো আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য। এর জন্যইতো আমরা রাত দিন খাটা খাটুনি করছি, এত এত কষ্ট করে মরছি…

মনে জমে থাকা হাজার প্রশ্ন আমাকে গভীরভাবে ভাবতে শেখাল। একসময় নিজের আগ্রহে বুঝতে চাইলাম, অন্যান্য ধর্ম, অন্যান্য ধ্যান-ধারণায় জীবনের সত্যিকারের মানে কী।

আমার বয়স তখন ঊনিশ। এই সময়ে বেশ ইন্টারেস্টিং একটা ঘটনা ঘটল। দশ বছর মিসরীয় জীবনে বলতে গেলে একজন মানুষের সাথেই ধর্ম নিয়ে পরিচ্ছন্ন আলোচনা জমে উঠেছিল। যদিও ক্যাথলিক ধর্মমত নিয়ে আমার মনের ভেতর অনেক দ্বন্দ্ব ছিল; কিন্তু বাহ্যিক দিক দিয়ে কেউ আমার ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে, তাকে হেয় করলে, আমি মনে মনে তেতে উঠতাম। যে করেই হোক আমি তার প্রতিবাদ করতাম।

সেই মিসরীয় মানুষটির সাথে ধর্ম নিয়ে একদিন প্রায় চল্লিশ মিনিট আলোচনা হলো। তিনি আমাকে খুব সাধারণ কিছু প্রশ্ন করেছিলেন।

তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তাহলে তুমি বিশ্বাস কর, যিশুখ্রিষ্ট ঈশ্বর ছিলেন?’

আমি মাথা নাড়ালাম, ‘অবশ্যই’।

তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি বিশ্বাস কর, যিশুখ্রিষ্ট ক্রসে জীবন দিয়েছেন?

আমি দৃঢ় গলায় বললাম, ‘নিঃসন্দেহে’।

তিনি আমার চোখে চোখ রাখলেন। তারপর বললেন, ‘তাহলে তুমি বিশ্বাস কর ঈশ্বর মারা গিয়েছেন?’

বক্সিং খেলার নিয়ম জানেন তো? ইয়া বড় এক ঘুষি খেয়ে কোনো খেলোয়াড় যদি পড়ে যায়, আর রেফারি ১-১০ গোনার ফাঁকে উঠতে না পারে, তবে সে খেলোয়াড় সাথে সাথেই হেরে যায়। যাকে বলে ‘নকআউট’।

তার প্রশ্ন শুনে আমার মনে হলো, বিখ্যাত বক্সার মাইক টাইসনের এক ওজনদার ঘুষি খেয়ে আমি একেবারল চিৎপটাং হয়ে গেছি। আমার কাছে তার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। কারণ, আমি মনে মনে ঠিকই বুঝতে পারছিলাম, আমাদের এই ধারণাগুলো কতটা অযৌক্তিক। ঈশ্বর আবার মরে যায় কী কর! অথচ এত দিন ধরে আমাকে যা শেখানো হয়েছিল, তাতে তো সারমর্ম এটাই দাঁড়ায়। মনে মনে আমার ভিতর দ্বিধা ছিল, দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু আজ একজন একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে আমাকে সেটি দেখিয়ে দিলেন।

অবশ্য, আমি তখন তা স্বীকার করিনি।

‘আমার খুব জরুরি একটা কাজ আছে। আমি বাসায় যাচ্ছি। আপনার সাথে পরে কথা হবে’। আমি কোনরকম কিছু একটা বলে, তার কাছ থেকে সরে এসেছিলাম। তবে তার সে যুক্তি আমার মাথার মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল।

বিশ বছর বয়স হতে হতে ক্যাথলিক ধর্ম থেকে আমার মন প্রায় উঠেই গিয়েছিল। আমি তখন হিপি হয়ে গিয়েছিলাম। আমি নিজেই নিজের একটা ধর্ম বানিয়ে নিয়েছিলাম। সেটা কেমন? এযাবৎকাল যতগুলো ধর্ম নিয়ে যাই কিছু পড়েছি, সেগুলো থেকে বেছে বেছে আমার মনের মতো একটা পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছিলাম। সেটাকেই মানার চেষ্টা করতাম। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই বুঝতে পারলাম, এটার চেয়ে ফালতু এবং নিকৃষ্ট আর কিছুই হতে পারে না।

‘ধুর ছাই! এত ধর্ম-কর্ম, আধ্যাত্মিক চিন্তা আর জীবনের মানে খোঁজার কী দরকার? আমি নিজেকে প্রবোধ দিলাম, ‘তার চেয়ে নিজেকে সুখী রাখতে টাকা কামানের দিকে মনোযোগ দেয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ।’

আমার টাকা পয়সার অভাব ছিল না। বলা চলে আমার মা-বাবা স্বচ্ছলই ছিলেন। গাড়ি, বাড়ি, ঘরভর্তি কাজের লোক…আমাদের সবই ছিল। পকেট খরচ হিসেবে আমি বাবর কাছ থেকে যা পেতাম, তা দিয়ে অনেক মানুষ তাদের গোটা সংসার চালায়৷ তাহলে আসলে আমার কী পরিমাণ টাকা দরকার?

‘আমার কমপক্ষে এত টাকার দরকার যাতে নিজের একটা প্রাইভেট জেট প্লেন থাকে।’ আমি মনে মনে ভাবছিলাম, ‘আচ্ছা, টাকা না হয় রোজগার করব বুঝলাম, কিন্তু তা কীভাবে? কঠোর পরিশ্রম করে? উহু, এর কোনো মানেই হয় না। ছোট একটা জীবন এত কষ্ট করে কী লাভ? তার চেয়ে দেখা যাক, কম পরিশ্রমে কী করে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া যায়?’

আমি এবার বিভিন্ন জাতি আর মানুষদের নিয়ে গবেষণা করা শুরু করলাম। দেখি, পৃথিবীতে কারা কারা ধনী? প্রথমে আমি ইংল্যান্ড নিয়েই ভাবা শুরু করলাম। হ্যাঁ, ইংল্যান্ডের মানুষদের টাকা-পয়সা ভালোই আছে। কিন্তু তার পেছনে পরিশ্রমও তো কম নয়। শিপ্ল বিপ্লব ঘটেছে, অনেক অনেক মিল কারখানায় মানুষ রাত-দিন পরিশ্রম করেছে। এত কিছুর পরেই না তারা ধনী হতে পেরেছে৷ আমেরিকা? তাদের ইতিহাসপ ঘুরে ফিরে সেই পরিশ্রমের। জাপান? প বাবা! তারা তো মহা কাজ পাগল। কাজ ছাড়া কিছুই বুঝে না।

‘ইউরেকা!’ আমি মনে মনে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম ‘পেয়েছি! সৈদি আরব। সেই দেশের মানুষদের বিশেষ কোনো কাজ নেই৷ উটে করে ঘুরে বেড়ায় আর আল্লাহু আকবার বলে বারবার মাটিতে চুমু খায়। অথচ, তাদের দেশে টাকা পয়সা, তেল সম্পদের অভাব নেই। সবচেয়ে কম পরিশ্রমে সবচেয়ে বেশি রোজগার।

আচ্ছা তাদের জীবনযাপন কেমন? তাদের ধর্মই বা কী?

খুঁজতে খুঁজতে জানতে পারলাম তাদের গ্রন্থের নাম কুরআন। আমার মনে হলো পড়ে দেখা দরকার কী আছে এতে। একদিন একটা বইয়ের দোকানে গিয়ে এক খন্ড কুরআন কিনে নিয়ে এলাম।

কুরআন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। কুরআনের মাঝে বিশেষ কিছু খুজতে যায়নি কখনো। আমি খোলা মন নিয়ে বুঝতে চেয়েছিলাম, কী আছে এতে। ব্যাস! এতটুকুই। আমি কুরআন পড়া শুরু করলাম। আমি খুব দ্রুত পড়তে পারতাম। আপনাদের একটা ধারণা দেই। দাস প্রথা নিয়ে অ্যালেক্স হ্যালির বিশ্ব বিখ্যাত উপন্যাস ‘Roots’ এর নাম শুনেছেন? ইয়া মোটা। আমার মনে আছে, এক রাতেই সে বইয়ের চার ভাগের তিন ভাগ পড়ে শেষ করলাম।

কুরআন হাতে নিয়ে ভাবলাম, সে তুলনায় এ বইয়ের সাইজ খুব বড় নয়। একটা মাঝারি উপন্যাসের মতোই তো। পুরোটা শেষ করতে কতক্ষণই বা লাগবে! কিন্তু, টানা দুসপ্তাহ ধরে পড়েও আমি তার ইংরেজি অনুবাদ পড়ে শেষ করতে পারিনি। এ এমনই এক বই, যে স্টাইলের বই, এর আগে কখনোই পড়িনি।

আমরা সাধারণত যে বইগুলো পড়ি; গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাস, ভূগোল- সেগুলো সাধারণত কেমন হয়? এই বইগুলোর একটা শুরু থাকে, একটা শেষ থাকে এবং মাঝে কিছু কথা থাকে৷ কিন্তু কুরআন পুরোপুরি ব্যাতিক্রম। এর বর্ণনা ভঙ্গির মধ্যে বিষয়বস্তুর কোনো ধারাবাহিকতা নেই।

প্রথমে সূরা ফাতিহা দিয়ে শুরু। এরপরে সূরা বাকারা। সে সূরায় একবার মুনাফিকদের সম্পর্কে বলছে, আবার মূসা (আ.) এর ঘটনা, গরুর ঘটনা নিয়ে আলাপ করছে। পরের সূরা আবার অন্যরকম। ঘন ঘন বিষয় পরিবর্তন, একেকবার একেক বিষয়ের আলোচনা- আমাদের গতানুগতিক বইগুলোর সাথে কোনোই মিল নেই।

শুধু পড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করলেও এবার ভালো করে বুঝতে চাইলাম, আসলে কুরআন কী বলছে। আমি একেকটা আয়াত পড়ি আর বিভিন্ন ব্যাখ্যা জেনে বুঝার চেষ্টা করি। এভাবে কুরআন পড়তে গিয়ে আমার অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। দিনে দিনে আমার এত দিনকার অনেক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা আস্তে আস্তে পরিস্কার হয়ে গেল।

আমার আজও মনে আছে সে দিনটার কথা। ট্রেনে করে টেমস নদীর উপর দিয়ে কর্মস্থল যাচ্ছিলাম। আমার কোলে কুরআন মেলে ধরা। একবার কুরআনের দিকে চাইলাম, আরেকবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। টেমসের উপরের বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, যদি কোনো বই ঈশ্বরের কাছ থেকে এসে থাকে, তবে নিঃসন্দেহে এটাই সেই বই।

সে রাতে বাড়ি ফিরে মনে হলো, আমার নামায পড়া দরকার। কুরআন নামায পড়ার কথা বলেছে৷ যদিও কুরআনে নামায কীভাবে পড়ে তার নিয়ম-কানুন, খুঁটিনাটি বিস্তারিত বলা হয় নি। আমি সকাল-বিকাল সময় সুযোগমতো নামায পড়তাম। প্রতিদিন পাঁচবার পড়তে হয়, এটা আমার জানা ছিল না৷ নামাযের আগে অযু করে নিতাম। অযুর নিয়মটাও ভালো করে জানতাম না৷ আমি কুরআনে পড়েছি, হাত-পা-মুখ ভালো করে ধোয়া, মাথা মাসেহ করার কথা। পরিচিত এক মুসলিমকে নামাঢ় পড়তে দেখেছিলাম। আমি তার মতো করে নামায পড়ার চেষ্টা করতাম। সেভাবেই রুকু সিজদাহ-দিতাম। এভাবেই কেটেছিল দুসপ্তাহ।

একবার আমি কী একটা কাজে লন্ডন থেকে একটু বাইরে গেলাম। কী মনে করে জানি না, টিউব ট্রেন থেকে নেমে বামে না গিয়ে ডানে চলে গিয়েছিলাম। একটু হাঁটতেই একটা বইয়ের দোকান চোখে পড়ল। সে দোকানে আরবি ইংরেজিতে ইসলাম, মুহাম্মাদ ﷺ -এর জীবনীসহ আরও অনেক বই ছিল। আমি খুটিয়ে খুটিয়ে বই দেখছিলাম। এখনকার মতো তখনও আমার মাথার চুল, দাড়ি ছিল বড় বড়। পড়নে ছিল কোট টাই।

এক লোক আমার দিকে এগিয়ে এলো, ‘মাফ করবেন ভাই, আপনি কি মুসলিম?’

‘মুসলিম বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন আমি জানি না। তবে আপনাকে একটা কথা বলি। আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং মুহাম্মাদ ﷺ তার রাসূল।’ আমি উত্তর দিলাম।

তিনি বলতে গেলে চেচিয়ে উঠলেন, ‘আরে ভাই, আপনি তো মুসলিম!’

আমি বললাম, ‘ও তাই নাকি? আচ্ছা বেশ।’

তিনি বললেন, ‘আসেন ভাই, নামাযের সময় হয়েছে। নামায পড়তে যাই।’

তিনি আমাকে ভালো করে দেখিয়ে দিলেন, কী করে অযু করতে হয়। আমি সবার সাথে মসজিদে জামায়াতে নামায পড়লাম। মসজিদে ছিল উপচে পড়া ভিড়। আমার ধারণা সে দিনটা ছিল শুক্রবার। জানেনই তো, কেবল শুক্রবারেই মসজিদ মুসল্লিতে ভর্তি থাকে।

নামায শেষে আমি ইমামের সাথে সবার সামনে শাহাদাহ উচ্চারণ করলাম। আমি নিচে নেমে আসতেই মুসল্লিরা সবাই আমাকে ঘিরে ধরলেন।
বলতে গেলে সবাই চাইছিলেন ইসলামের খুঁটিনাটি সবকিছু পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাকে পুরোপুরি বুঝিয়ে দিতে। অনেকে নামাযের নিয়ম-কানুন কাগজে লিখে তাদের নাম ঠিকানাসহ আমার হাতে দিয়েছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ! মানুষগুলোর আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল।

মসজিদ থেকে বের হয়ে আসার পর আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন গোসল করে উঠে এসেছি। আমার ভেতরটা টক স্নিগ্ধ, পবিত্র, প্রশান্ত অনুভূতিতে ভরে গিয়েছিল। এই অনুভূতি এতই চমৎকার, তার সামনে মারিজুয়ানা (হেরোইনের মতো এক ধরণের মাদক) তুচ্ছ!

মাঝে মাঝেই আমি সেই মসজিদে আসা যাওয়া করতাম। কারণ, ওই মসজিদের সাথেই আমার পরিচয় ছিল৷ তাছাড়া সেখানকার অনেক মুসল্লিই ততদিনে আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন।

‘দ্যা রিভার্ট্স : ফিরে আসার গল্প’ থেকে নেওয়া একটি গল্প।

Source

মতামত দিন