ইসলামিক গল্প

ঘটনাটি পড়ার পর বুঝলাম নিয়ামত আসলে কি জিনিস!

ঘটনাটি পড়ার পর বুঝলাম নিয়ামত আসলে কি জিনিস!

(লেখাটি বড়, তবে সময় নিয়ে পড়ুন। অনেক কিছু শেখার আছে)

শায়েখ হাসান জানকি ময়দানী (রাহি) শামের একটি সত্য ঘটনা বর্ননা করেছেন।

তিনি বলেন, রমজানে একদিন মাগরিবের কিছু সময় পূর্বে আমি বাড়ি ফিরেছিলাম। যেসব গরিব অসহায় মানুষ বাড়িতে, মসজিদে আমার দারসে বারবার আসা-যাওয়া করে, তাদের একজন আমাকে থামিয়ে ডাকল। বড় ভারাক্রান্ত, বেদনাভরা কন্ঠে সালাম দিল। দুঃখময় কন্ঠ আমার চোখে আশ্রু এনে দিল।

সে আমাকে বললল, আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, আজ কি আমার সাথে ইফতার করা যায় না?

শায়েখ বলেন, তার বেদাময় দাবীর সামনে আমি কিছু বলার মত শব্দ পেলাম না। তার আগ্রহ আমাকে আগ্রহীত ও বাধ্য করে ফেলল। আমার হৃদয়ে তার শপথ করানো চেহারে ভেসে উঠল।

আমি বললমা, হে ভাই! আমার পরিবার আমার অপেক্ষারত। আর না আমার সময় আমাকে এমন সুযোগ দেয়। তবে–

শায়েখ বলেন, আমি দেখলাম আমার মন তার অনুসরণ করে তার বাড়ি দিকে চলা শুরু করেছে । আমি না জানি কোথায় তার বাড়ি! আর না জানি এত স্বল্প সময়ে ইফতারে এন্তেজাম কিভাবে করবে?

শায়েখ বলেন, আমরা তার বাড়ি পৌঁছালাম। দেখলাম, একটি রুম, একটি রান্নাঘর ও একটি আঙ্গিনা। ঘরের উপরে খালি। ছাদবিহীন সব রুম। যা তার সাথীদের থেকে সে ক্রয় করেছে। তার কাঠের একটি প্রবেশদ্বার ও খাস একটি সিঁড়ি আছে। যে সিঁড়িতে দু’জন চড়া সম্ভব না। তার কাঠ খুবি দূর্বল ও নরম।

শুকরিয়া, কৃতজ্ঞতার ধ্বনি যেন তার মুখে থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে। এবং তার হৃদয় যেন সৌভাগ্যবান হয়ে আনন্দে ভরে উঠছে।

সে বলল, গুরুজী! আপনি একটু অপেক্ষা করুন। এটা আমার বাড়ি। আল্লাহই সব কিছুর প্রকৃত মালিক। দুনিয়ার কোন ব্যক্তি আমার কাছে কোন পয়সা পায় না।

গুরুজী! সূর্য সকালের কিরণ আমার ঘরে দান করে এবং অন্য পাশ দিয়ে অস্ত গমণ করে। ফজরের পরে ও মাগরিবের আগে আমি এখানেই কোরআন পাঠ করি। আমার স্ত্রী- আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্টি হোন- ঐ জানালার ধারে বসে এবং আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া করে।

গুরুজী! কেমন যেন আমি জান্নাতে বসবাস করছি।

শায়েখ বলেন, এসব কথা আমার কানে আসছে এবং আমি সতর্কতার সাথে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি। যাতে কাঠ ভেঙ্গে না পড়ে।

রুমে প্রবেশ করে আমি বসে পড়লাম। লোকটি তার স্ত্রীর কাছে গেল এবং মৃদু আওয়াজে স্ত্রীকে বলল, শায়েখ আজ আমাদের সাথে ইফতার করবে। ইফতার রেডি কর।

তার স্ত্রী বলল, আল্লাহর শপথ! শিম ছাড়া আমাদের খাওয়ার কিছু নেই। আর আযানের বাকি মাত্র আধা ঘন্টা। এমন কোন জিনিস নেই যে রান্না করব এখন। যদি থাকত তাবুও সময়ের সাথে পারা সম্ভব হত না।

শায়েখ বলে, আমি সম্পূর্ণ আলোচনা শুনলাম। যখন বাড়িওয়ালা এলো, আমি তাকে বললাম, ভাই! আমার একটা শর্ত আছে। আমি মাগরিবের আযানের সময় কেবল পানি ও খেজুর দ্বারা ইফতার করব। আযানের পর আধা ঘন্টা পর্যন্ত যতক্ষণ না খেজুর-পানি হজম করি, সালাত আদায় ও দৈনন্দিনের যিকির-আযকার শেষ না করি, ততক্ষণ কিছু খাব না। আর যখন খাব তখন আলু ও শিম ছাড়া কিছু খাব না।
লোকটি বলল, আপনি যেমন বলেছেন গুরুজী তেমনি হবে।

শায়েখ বলল, তাবে আমাকে এখন একা আমার রবের ইবাদতের জন্য ছেড়ে দাও।

সে শায়েখের শর্ত মুতাবেক সব প্রস্তুত করল। শায়েখ তাদের ওখানে খাবার খেয়ে তড়িঘড়ি চলে আসলেন।

শায়েখ বলে, আমি আলুর কথা এজন্য বলেছিলাম যে, এটা গরীবের পাথেও। আমি ভেবেছিলাম তাদের কাছে তা থাকবে হয়ত। আমি সেখান থেকে চলে আসলাম। আল্লাহ তাকে যে বাড়ি ও তার যে হালাত দিয়েছে তার শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতার বাক্য যেন তার মুখ থেকে শেষই হয় না। সে আল্লাহ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতেই থাকে। বড় সৌভাগ্য ও আনন্দের ছিল আমার জন্য।

শায়েখ বলেন, কিছুদিন পর বড় বড় ব্যক্তিদের সাথে বড় সম্পদশালী এক ব্যবসায়ীর বাসায় আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়। সে এমন এক ব্যক্তি ছিল যাকে আল্লাহ অঢেল সম্পদ, সম্মান, সন্তান-সন্তানাদি ও বংশ মর্যাদা দান করেছেন।

অনুষ্ঠানটি ছিলন আড়ম্বনাময় মাঠে। যা ছিল মনোমুগ্ধকর -মনোরম পরিবেশ। মাঝে ছিল প্রসাদ তুল্য এক বাড়ি। তাতে একটা সুইমিন পুল ও নানান রঙ্গের ঘোড়ার পাল ছিল।

শায়েখ বলেন, আমরা তার ওখানে ইফতার করলাম। বিদায় নেবার সময় দাওয়াতদাতা আমাকে পাশে নিয়ে গেলেন। জীবনের সংকীর্ণতা, ব্যাবসায়িক ঝামেলা, ছেলেমেয়েদের নিয়ে অশান্তি, স্ত্রীর খারাপ ব্যবহার, তার প্রতি অন্যদের বিদ্ধেষ, তাদের খুশি করার জন্য তার আপ্রাণ চেষ্টা, জীবনের প্রতি তিক্ততার শেকায়েত করতে লাগল। এবং এসব থেকে মুক্তি চাওয়া ও মৃত্যু কামনার কথা সে বলতে রইল।

শায়েখ বলে, আল্লাহর শপথ! দাওয়াতদাতার বাড়ির দরজা থেকে নিয়ে গাড়ির দরজা পর্যন্ত সব আমার সামনে অন্ধকারের মতো মনে হচ্ছে। আমার অন্তরকে দুনিয়ার বাস্তবতা আঘাত করছে।

গাড়িতে চড়ে আমি আসমানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, ভাগ্যবান তো সে নই যে অনেক পেয়েছেন বরং ভাগ্যবান তো সে, যে আল্লাহর সাথে সু-সম্পর্ক তৈরি করেছে ও আল্লাহর বন্টনের প্রতি রাজি হয়েছে। .

সূত্র

মতামত দিন