ফাতওয়া সাম্প্রতিক বিষয়

মাথা ন্যাড়া করার হুকুম

ইদানীংকালে ফেসবুকে যেভাবে গণ হারে ন্যাড়া হয়ে পোষ্ট দিয়ে অন্যকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে, তা মোটেও উচিত নই। একটা রসমে পরিণত হয়ে যাচ্ছে (অনেকটা গিয়েছে)। তাই আমাদের উচিত এ ব্যাপারে স্পষ্ট ধারনা রাখা। চলুন তবে, (ফতোওয়াটি ইসলামি কিউ এর আলোকে লেখা। যেহেতু তারা খুব সহজ ও সুন্দর ভাবে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।)

চুল মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে চুল মুন্ডানো যেমন ইবাদতের তেমনি গুনাহের কাজ। আর কিছু ক্ষেত্রে জায়েজ, তবে একান্ত প্রয়োজন না হলে উত্তম না।

আলোচনা সুবিধার্থে আমরা ৬ টা ভাগ করি

১ চুল মুন্ডানো ইবাদতের কাজ হবার প্রকার

২ চুল মুন্ডানো হারাম বা গুনাহে কাজ হবার প্রকার

৩ চুল মুন্ডানো শিরকের কাজ হবার প্রকার

৪ চুল মুন্ডানো বিদয়াত, মাকরুহের কাজ হবার প্রকার

৫ চুল মুন্ডানো জায়েজের কাজ হবার প্রকার।

৬ বীনা প্রয়োজনের মাথা মুন্ডন করা।

১ চার ক্ষেত্রে চুল মুন্ডানো ইবাদতের কাজ

ক- হজের সময়।

খ- ওমরার সময়। কেননা, আল্লাহ বলেছেন,
———-محلقين رءوسكم
অর্থ: ——-তোমরা চুল মুন্ডান অবস্থায়( মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে।)(সূরা ফাতহ-এর ২৭ নাম্বার আয়াতে)

গ- নবজাতক শিশুর ৭ ম দিনে চুল মুন্ডানো।

হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালাম ফাতেমা(রাদি)কে হাসান(রাদি)-এর ব্যাপারে বলে ছিলেন, হে ফাতেমা! তার চুল মুন্ডন করে দাও——–।

(তিরমিজি-১৪৩৯)

ঘ- কোন কাফের যখন ইসলাম গ্রহণ করে।

হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালাম এক কাফেরর ইসলাম গ্রহণের পর মাথা মুন্ডাতে ও খতনা করতে আদেশ দিয়েছিলেন। (আবু দাউদ-৩৫৬)

সকল আলেমদের মতানুযায়ী এই চার স্থান ব্যতীত অন্য কোন ক্ষেত্রে মাথা মুন্ডান করা সওয়াবের কাজ না।(ইস্তেকামাত-১/২৫৬. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া(রাহি))

২ চুল মুন্ডানো হারাম বা গুনাহের কাজ হবার প্রকার:

ক- বিপদে- আপদে বা কারোর মৃত্যুর শোকে মাথা মুন্ডানো হারাম কাজ। হাদিসে এসেছে-

إن رسول الله صلى الله عليه وسلم بريء من الصالقة والحالقة والشاقة

অর্থ: নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালাম , ——মাথা মুন্ডানকারীদের (জিম্মাদারি ) থেকে মুক্ত–। (মুসলিম-১৪৯)

ইবনে হাজার হাইতামী (রাহি) লিখেছেন,

حلق الشعر عن المصيبة ، قال : لأن ذلك يشعر إشعاراً ظاهراً بالسخط ، وعدم الرضا بالقضاء

অর্থ: বিপদের কারনে চুল মুন্ডায় ফেলা কবিরা গুনাহ। কেননা, এতে আল্লাহ ফয়সালার উপর রাজি না থেকে বরং অসন্তুষ্টি থাকাটা স্পষ্ট প্রকাশ করা হয়।

খ- অমুসলিম বা ফাসেকের সাদৃশ্য অবলম্বন করার জন্য তার মতো করে চুল মুন্ডায় ফেলা।

৩ চুল মুন্ডান করা শিরকের কাজ হবার প্রকার:

গাইরুল্লাহকে সন্তুষ্টি করার জন্য মাথা মুন্ডানো।

ইমাম ইবনে কাইয়ুম (রাহি) বলেছেন,

كما يحلفها المريدون لشيوخهم ، فيقول أحدهم : أنا حلقت رأسي لفلان ، وأنت حلقته لفلان ، وهذا بمنزلة أن يقول : سجدت لفلان ، فإن حلق الرأس خضوع وعبودية وذل

অর্থ: যেমন মুরীদগন তাদের শায়েখদের জন্য মাথা মুন্ডন করে। অতপর তাদের একজন বলে, আমি তার জন্য আমার মাথা মুন্ডন করেছি তুমি তার জন্য মাথা মুন্ডন করো। এটা তেমন কথা হয়ে গেল যে, কেউ বল, আমি অমুককে সিজদা করেছি (তুমিও করো)। কেননা, মাথা মুন্ডন করা বিনয়ী, আবদিয়াত ও নত প্রকাশের নামন্তর। (যাদুল মায়া’দ-৪/১৫৯)

৪ বিদয়াত বা মাকরুহের কাজ হবার প্রকার:

এর অনেক সুরাত হতে পারে। যেমন,

ক-ইবাদত মনে করে চুল মুন্ডান করা। যেমনি খারেজি সম্প্রদায় করে থাকে।

অথবা নেককার বা দুনিয়াহত্যাগীদের নিদর্শন মনে করে করা। যেমন খারেজীরা করত। হাদিসে এসেছে,

سيماهم التحليق )

অর্থ:তাদের আলামত হল চুল মুন্ডন করা।(বুখারি-৭০০৭, মুসলিম-১৭৬৩ )

ইমাম কুরতুবী (রাহি) খারেজির ব্যাপারে বর্নিত এই হাদিসের ব্যাখ্যা বলেছেন , তারা মাথা মুন্ডন করা দুনিয়াহ বিসর্জন ও তাদের পরিচয়ের প্রতীক বানিয়ে নিয়েছিল। (শরহে উমদাহ-১/২৩২)

খ-অনেকে তাওবা করার জন্য মাথা মুন্ডন করে নেয়। এসব বিদআত।(মাজমাউল ফতওয়া-২১/১১৮)

৫ চুল মুন্ডানো জায়েজের কাজ হবার প্রকার:

যেকোনো প্রয়োজনের মাথা মুন্ডন করা। যেমন: চিকিৎসার জন্য বা উকুন থেকে মুক্তির জন্য। মোটকথা যেকোনো প্রয়োজনে মাথা মুন্ডানো।(মাজমাউল ফাতওয়া-১২/১১৭)

নোট: গরম বা ঘন চুল প্রাপ্তির আশায় মাথা মুন্ডানোতে কোন সমস্যা নেই। আল্লাহু আ’লাম।

৬ বিনা প্রয়োজনের চুল মুন্ডানো:

উপরের কারন না পাওয়ার শর্তে কেউ যদি ভাল লাগে তাই বা অন্য কোন অপ্রয়োজনীয় কারনে চুল মুন্ডায় তবে এবাপারে আলেমদের মধ্যে এখতেলাফ পরিলক্ষিত হয়।

ইমাম মালেক(রাহি) খারেজীদের আলামত বর্ননার হাদিসের প্রতি লক্ষ্য করে বীনা প্রয়োজনে মাথা মুন্ডান করা মাকরুহ বলেছেন।

বীনা প্রয়োজনে যারা মাথা মুন্ডন করা জায়েজ মত পেশকারীরা তাদের দলিল পেশ করেছেন যে, হাদিসে এসেছে,

জাফর বিন আবু তালেবের মৃত্যুর তিন দিন পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালাম তার পরিবারের কাছে আসে এবং নাপিতকে ডেকে এনে তার সন্তানদের চুল মুন্ডন করার আদেশ দেন। (আবু দাউদ-৪১৯২)

তবে বীনা প্রয়োজনে চুল মুন্ডন করা উত্তম না।

মুল্লা আলী কারী (রাহি) লিখেছেন,

الأفضل أن لا يحلق إلا في أحد النسكين ( يعني : الحج والعمرة )

অর্থ: দুই নুসুক (হজ এবং ওমরাহ) ব্যতীত মাথা মুন্ডানো উত্তম না। (আউনুল মা’বুদ-১১/২৪৮)

Source

মতামত দিন