ইসলাম গ্রহণের গল্প জীবনী

তাউফিক চৌধুরী: : একজন নাস্তিক ডাক্তার থেকে একজন ইসলামিক স্কলার

তাউফিক চৌধুরী ছোটবেলা থেকেই বই পাগল ছিলেন। একটা বই আদ্যোপান্ত শেষ না করে স্বস্তি পেতেন না। মা-বাবা, মেডিক্যালে পড়ালেখা, গান শুনা আর বই পড়া এগুলো নিয়েই ছিলো তার জীবন। তার বয়স যখন মাত্র তিন মাস তখন পরিবারের সাথে সৌদি আরব যান।

সৌদি আরবে ষোলোটা বসন্ত কাটালেও তার হৃদয়ে চৈত্রের হাহাকার বিরাজ করছিল। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, রাসূলের (সাঃ) দেশে ষোলোটি বছর কাটিয়েছেন তবুও ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারেননি। না ইংলিশ, না আরবি।

ষোলো বছর বয়সে পরিবারের সাথে অস্ট্রেলিয়া চলে যান। সেখানে গিয়ে একটা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন ডাক্তার হবার আশায়। আর্থিকভাবে কিছুটা অস্বচ্ছল হবার কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষ তার নামের সাথে ‘স্পেশাল নিডস স্টুডেন্ট’ বাক্যটি জুড়ে দেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার একজন শিক্ষকের কাছে তাউফিক চৌধুরী পড়ালেখা করেন। সেই শিক্ষক তাকে ওয়েস্টার্ন ফিলসফি নিয়ে পড়ান। তাকে atheism, secularism, liberalism এগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তার জন্য বইয়ের ব্যবস্থা করেন ঐ দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষক।

একটা সময় তাউফিক চৌধুরী শিক্ষকের ‘ভক্ত’ হয়ে যান। তার শিষ্যত্ব মেনে নেন। শিক্ষকের সাথে সুর মিলিয়ে তিনিও দাবী করেন- সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছু নেই, এই পৃথিবী এমনি এমনি সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু একটা ব্যাপারে তাউফিক চৌধুরী বেশ জেদী ছিলেন। তার নামের ব্যাপারে। এই মুসলিম নামটি তিনি কোনোভাবেই পরিবর্তন করতে চাচ্ছেন না। এতোবছর ধরে লোকজন তাকে যে নামে ডাকতো, হুট করে সেই নামটি তিনি কিভাবে পরিবর্তন করে নতুন নাম নিবেন?

যার ফলে অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সংগঠনগুলো তাকে দাওয়াত দিতো। “আসুন, আমাদের প্রোগ্রামে আসুন।” তিনি ইসলামিক প্রোগ্রামগুলোতে যেতেনও। মজার ব্যাপার হলো, প্রোগ্রামগুলোতে তিনি ইসলাম শেখার জন্য যেতেন না। যেতেন খাবার খাওয়ার জন্য। সেই প্রোগ্রামের এক ভাইয়ের মা খুব ভালো রান্না করতেন। খাওয়ার লোভটা তাকে প্রোগ্রামে নিয়ে যেতো।

সেই ভাইও বুঝতে পারতেন ব্যাপারটি। তিনি তার মাকে বলে দিতেন, “তাউফিক আসবে, তার জন্য একটু ভালো রান্না করো।”

সেই ভাইটিও ছিলো বেশ চালাক। খাওয়া শেষে তাওফিক চৌধুরীকে বলতেন, “তাওফিক, আসো নামাজ পড়ি।” তাওফিক চৌধুরী আর কী করবেন! একটু আগে লোকটার খাবার খেলেন, এখন তার কথা রাখবেন না?

লোকটির সাথে সাথে তিনিও নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। নামাজ পড়তেন, কিন্তু মন থেকে বিশ্বাস করতেন- There is no God!

ঐ ভাইটি তাকে একটা ক্যাসেট দেয়। তার নিজের ঘরে অবশ্য একটা টেপ ছিলো। কৌতূহলী হয়ে তাউফিক চৌধুরী টেপটি বাজালেন। টেপটি ছিলো আসলে কুর’আনের শেষ পারা তেলাওয়াত আর খতমে কুর’আনের দু’আ। যিনি দু’আ করেন তিনি দু’আতে হাউমাউ করে কান্না করেন।

তাউফিক চৌধুরী বুঝতে পারতেন না, একজন মানুষ কুর’আন তেলাওয়াত শেষে দু’আ করতে করতে এতো কান্নাকাটি করবে কেন? এখানে কান্নাকাটির কি আছে? শুনতে শুনতে কান্নাটির মায়ায় পড়ে যান তাউফিক চৌধুরী। যতোই শুনেন, ততোই ভালো লাগে।

কান্না শুনতে গিয়ে তিনি কুর’আনের শেষ পারা মুখস্ত করে ফেলেন!

কয়েকদিন পর আবার কারো পাল্লায় পড়ে তিনি মসজিদে যান। মসজিদের ইমাম নামাজে কুর’আন তেলাওয়াত করতে গিয়ে একটি ভুল করে ফেলেন। তাউফিক চৌধুরী নামাজের মধ্যে ইমামকে সংশোধন করে দেন। সবাই তো বেশ অবাক। সবাই ভাবলো, এই লোকটি তো ইমাম সাহেবের চেয়েও ভালো কুর’আন জানে।

পরে দেখা গেলো কখনো নামাজ শুরু হলে তাকে সবাই ঠেলাঠেলি করতে লাগলো- “আপনি নামাজটা পড়ান না, প্লিজ।” রাসূল (সাঃ) বলেছেন, একটা জামাতের মধ্যে কুর’আন সম্পর্কে যার জ্ঞান বেশি তাকে যেন নামাজের ইমাম বানানো হয়।

সেই হিসেবে তাওফিক চৌধুরীকে লোকেরা ইমাম বানায়। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি বলেন- “আমি ছিলাম একজন ‘নাস্তিক ইমাম’। আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু মানুষের চাপে আমাকে নামাজ পড়াতে হতো।”

এই ঘটনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ এটার মাধ্যমে আমাকে তাঁর দিকে ফিরে আসার সুযোগ করে দিচ্ছেন।
একে তো তিনি ছিলেন বইপোকা, সারাজীবন ইসলাম নিয়ে পড়েননি। এবার ইসলাম নিয়ে পড়া শুরু করলেন। আগের যুক্তিগুলোর ফাঁকফোকর বের করতে পারলেন।

মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা তাউফিক চৌধুরীর এবার নতুন জন্ম হলো। আগেরবার জন্মগ্রহণ করেছিলেন মানুষ হয়ে, এবার জন্মগ্রহণ করেন মুসলিম হয়ে। মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গিয়ে ইসলাম নিয়ে পড়ালেখা করেন।

ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি ইসলাম নিয়ে সেমিনার শুরু করেন। তরুণরা কিভাবে ইসলাম নিয়ে আগ্রহী হবে, তরুণরা কিভাবে disbelief থেকে ফিরে আসবে এটাই হয়ে যায় তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্য। অস্ট্রেলিয়ায় তিনি গড়ে তুলেন ‘Mercy Mission’ নামের একটি সংগঠন।

সংগঠনটির মটো হলো- Knowledge and action, জ্ঞান এবং আমল। অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হওয়া সংগঠনটি বর্তমানে যুক্তরাজ্য, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, ভারত, বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছে। জাকাতের মাধ্যমে কিভাবে দারিদ্র বিমোচন সম্ভব এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে ‘Mercy Mission’ কাজ করছে।

তাউফিক চৌধুরী বর্তমানে বিশ্বের জনপ্রিয় একজন বক্তা। পাঁচটি ভাষায় খুতবা দেন। বাংলা, ইংরেজি, জাপানি, ফ্রেঞ্চ, আরবি। খুব আবেগের সাথে তিনি ইসলাম নিয়ে কথা বলেন, যুবকদেরকে কাছে টেনে নেন। তাঁর লেকচার শুনে শ্রোতারাও আবেগী হয়ে উঠে। অডিয়েন্সদের চোখদুটো অশ্রুতে টলমল করতে দেখা যায়।

তাঁর জনপ্রিয় লেকচারগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলোঃ

– Such was our prophet.( https://youtu.be/LA4Xr5sCxMc)

– Wake Up, Ummah needs you. (https://youtu.be/9JLCtCZ3AHw)

– Paradise Guaranteed ( https://youtu.be/xC550J4kf5g)

বাংলাতে তাঁর একটা লেকচার আছে। লেকচারটির শিরোনাম- ‘পরকালের যাত্রা’। এই একটি লেকচার শুনে আমার পরিচিত একজন ইসলামে ফিরে এসেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

SOurce

মতামত দিন