আখলাক

প্রেম থেকে বিরত থাকতে পড়ুন বিস্তারিত

বাগদাদে সালিহ নামে এক মুয়াজ্জিন ছিল। সে টানা চল্লিশ বছর আজান দিয়েছে। খুবই ধার্মিক হবার কারণে সবাই তাকে খুব পছন্দ করতো। একদিন সে মিনারে উঠে আজান দিতে যাচ্ছিলো। হঠাৎ করে এক সুন্দরী মেয়ের উপর তার নজর পড়ল। মেয়েটা ছিল খ্রিষ্টান আর তার বাসা মসজিদের পাশেই ছিল। সালিহ ফিতনায় পড়ে গেল।

সে মেয়েটার বাসার দরজায় ধাক্কা দিল। মেয়েটা দরজা খোলার সাথে সাথে তাকে জড়িয়ে ধরল। মেয়েটা হতভম্ব হয়ে বলল,

– “আপনাকে একজন ঈমানদার লোক হিসেবে জানি। এটা আপনার কেমন আচরণ?”


– “আমি ইসলাম আর মুহাম্মদ যা এনেছে তা থেকে মুক্ত।” সালিহ জবাব দিল। সে মেয়েটার আরো কাছে এগিয়ে গেল।

– “আপনি আসলে নিজের কামনা পুরো করার জন্য এমনটা বলছেন। একবার আমার স্বাদ পেলে ঠিকই আবার নিজের ধর্মে ফিরে যাবেন।”-“ না! কখনোই যাব না।”

– “বিশ্বাস হয় না আমার। সত্যি বললে একটু শুকরের মাংস খেয়ে দেখান দেখি।”

– “এই যে খেলাম।”

– “আচ্ছা! একটু মদ খান তো দেখি।”

– “তাও খেলাম।”

মেয়েটা তারপর সালিহকে নিয়ে ভেতরে গেল, দরজা বন্ধ করে দিল। বলল; “আপনি ছাদে চলে যান। যাতে আব্বু এলে আমাকে আপনার সাথে বিয়ে দিতে পারেন।” লোকটা ছাদে উঠতে গেল। কিন্তু পা পিছলে পড়ে মারা গেল। মেয়েটা তাকে কাপড় দিয়ে মুড়ে বাক্সে ফেলে রাখল। বাবা এলে তাকে সব খুলে বলল। মেয়েটার বাবা সন্ধ্যাবেলা লাশটাকে রাস্তায় নিক্ষেপ করল। সবার মুখে মুখে গল্পটা ছড়িয়ে পড়ল। তার লাশ ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলা হল।[১]

ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, “খ্রিষ্টানরা যখন কোনো বন্দীকে ধর্মান্তরিত করতে চাইত, তখন খুব সুন্দরী এক মেয়েকে দিয়ে তাকে আদর আপ্যায়ন করাতো। আর যখন লোকটা মেয়েটার প্রেমে পড়ে যেতো, তখন মেয়েটা বলতো; ‘আমাকে পেতে চাইলে তোমাকে খৃষ্টান হতে হবে।’ সে সময় যারা দৃঢ় ঈমানদার, আল্লাহ্‌ তাদের মুখ থেকে বলিষ্ঠ জবাব বের করতেন।”[২]

শয়তানের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে, “নারীরা হচ্ছে আমার অব্যর্থ তীর।” সে তীরে অতীতে সালিহ, বারসিসার মতো বহু আবেদ প্রাণ দিয়েছে, ভবিষ্যতেও দিবে। সালিহ শুধু এক মেয়ের কথায় তার ধর্ম ত্যাগ করেছিলো, শুকরের মাংস খেয়েছিল, মদ পান করেছিল।

কিন্তু কেন?

প্রেমে পড়েছিল তাই ।

ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, “যখন কেউ প্রেমে পড়ে তখন সে প্রেমিকাকে দেখে কিংবা তার কথা শুনে নিজেকে তৃপ্ত করতে চায়। সে তাকে ভালোবাসতে চায়- অনুভব করে, জড়িয়ে ধরে, চুমু খেয়ে কখনো বা মিলিত হয়ে।”[৩]

মানুষ প্রেমে কেন পড়ে?

সালাফরা বলতেন, “যখন অন্তরটা অসার হয়ে থাকে।”[৪]

ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, “(দেহ যেমন অলস হয়ে পড়ে থাকে) অন্তর কখনো অলস থাকে না। আমাদের নফস আমাদেরকে হয় ভালো নতুবা খারাপ কাজে ব্যস্ত রাখে।”[৫]

শায়খ সালিহ আল মুনাজ্জিদ (হাফে.) ব্যাখ্যা করে বলেন, “কারো অন্তরে যদি আল্লাহ্‌র প্রতি তীব্র ভালোবাসা না থাকে, তবে সে অন্তর স্বাভাবিকভাবেই অন্য কারো প্রতি ভালোবাসা দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। আমাদের নফস কখনো অলস থাকে না। আমরা যদি একে আল্লাহ্‌র আনুগত্যে ব্যস্ত না রাখি, তবে তা আমাদের আল্লাহ্‌র অবাধ্যতায় ব্যস্ত রাখবে।”[৬]

তিনি আরো বলেন, “কারো অন্তরে আল্লাহ্‌র প্রতি ভালোবাসা আর প্রেমিকার প্রেম একসাথে জায়গা নিতে পারে না।”[৭]

কিন্তু আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে। আল্লাহ্‌ই যদি এই তীব্র অনুভূতিগুলো আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করে থাকেন যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তবে আমরা দোষী হবো কেন?

ইবনুল কায়্যিম (রহ.) এর উত্তর দিয়েছেন। মানুষ তার ইচ্ছার কারণেই প্রেমে পড়ে। সে ইচ্ছা করেই প্রেমিকাকে দেখে, তার কথা ভাবে, তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যায়। যেহেতু, তার নিজের কারণেই তার প্রেম তীব্র হয়, তাই সে এবং শুধুমাত্র সেইই এর কারণে দায়ী থাকবে। এটা অনেকটা মদ পান করার মতোই। মদ পান করা কারো ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। কিন্তু এর ফলাফল(যেমন স্মৃতিভ্রম, হতাশা, বারবার মদ পান করা ইত্যাদি) হচ্ছে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু যেহেতু সে ইচ্ছা করেই মদ পান শুরু করেছিল, তাই “এটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল” বললে তাকে মাফ করা হবে না। [৮]

আবার অনেকে দাবী করে, প্রেম করার কারণে তার হতাশা কেটে গেছে। সে জীবনে বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পেয়েছে।

কথাগুলো হয়তো সত্যি। কিন্তু আমাদের জীবনে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কি? সৃষ্টির জন্য নাকি স্রষ্টার জন্য? ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, “প্রেমে পড়ার কারণে মানুষ তার বুদ্ধি আর জ্ঞান হারায়, আদব আর দ্বীন হারায়, সারাক্ষণ এটা নিয়ে পড়ে থাকে যা তার দ্বীন আর দুনিয়ার উন্নতিতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এই খারাপ প্রভাবগুলো প্রেমের উপকারিতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী। প্রেম মানেই তাতে উপকারের চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশী হবে।”[৯]

শুধু তাই না প্রেম কখনো কখনো আমাদের কুফরের দিকে নিয়ে যায়। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) ব্যাখ্যা করে বলেন, “প্রেমে পড়ে মানুষ প্রেমিকাকে আল্লাহ্‌র প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে ফেলে। তাদের অন্তরে আল্লাহ্‌র চেয়ে প্রেমিকার প্রতিই বেশী ভালোবাসা থাকে। এই ধরনের প্রেমকে কখনো ক্ষমা করা হয় না। কারণ, এটা হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য শিরকের মধ্যে একটি। আল্লাহ্‌ তায়ালা তার সাথে শিরক করার গুনাহ ক্ষমা করেন না।”[১০]

আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন,”আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যদের আল্লাহর সমকক্ষ করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসে, যেভাবে শুধু আল্লাহ্‌কেই ভালোবাসা উচিত। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। আর কতইনা উত্তম হ’ত যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর।” [আল কুর’আন, সূরা বাকারাহ(২): ১৬৫]

আমাদের প্রেম করার পিছনে আরেকটা যুক্তি হচ্ছে- একে অপরকে দীর্ঘ সময় ধরে বোঝার চেষ্টা করা, ভালোবেসে বিয়ে করা। ভাবটা এমন যেন, আমাদের আগের প্রজন্মে প্রেম করে বিয়ে না করার কারণে কোনো ভালোবাসা ছিল না। অথচ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহজাত ভালোবাসা হচ্ছে আল্লাহ্‌র এক নিদর্শন। আল্লাহ্‌তায়ালা বলেন,

“তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।” [আল কুর’আন, সূরা রুম(৩০):২১]

এতো সুন্দর “কাছে আসার গল্প” সৃষ্টি করা মানুষগুলোর পরিণতি কি হচ্ছে? আল্লাহ্‌র ক্রোধ নিয়ে শুরু করা সম্পর্কগুলোতে যা হয় আর কি! ডিভোর্স রেট স্মরণকালের সব রেকর্ড ভঙ্গ করছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের জরিপ অনুসারে, শুধু রাজধানীতেই ২০১৪ সালে ডিভোর্স হয়েছে ২২ হাজার ৪৮৮টি। অথচ ২০১৩ সালে ডিভোর্সের ঘটনা ছিল ৮ হাজার ২১৪টি। ২০০০ সালেও ঢাকায় ডিভোর্সের ঘটনা ছিল মাত্র ২৭৫৩টি।[১১]

প্রেমে পড়ে গেলে তাহলে কি করতে হবে? সমাধান কি?

সিয়াম পালন করা। আল্লাহ্‌র নিকট দু’য়া করা। রাসূল (সা.) যেমন আল্লাহ্‌র নিকট দু’য়া করতেন; “হে আল্লাহ্‌! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই শোনার অনিষ্ট থেকে, দেখার অনিষ্ট থেকে, জিহ্বার অনিষ্ট থেকে, হৃদয়ের অনিষ্ট থেকে আর গোপন অঙ্গের অনিষ্ট থেকে।”[১২]

তারপরেও যদি কাজ না হয়? ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, “যদি সব ওষুধে কাজ না হয়, তাহলে তো শুধু একটা দরজাই খোলা থাকে। সে যেন তাঁকে একান্তভাবে ডাকে যিনি বান্দাদের একান্ত প্রয়োজনে সাড়া দেন। সে যেন তাঁর দরজার সামনে অনুনয় আর বিনয় নিয়ে দাঁড়ায়। যে এমনটা করতে পারে, সেই তো সাফল্য লাভ করে।”[১৩]

আমাদের আল্লাহ্‌কে ভয় করা উচিত। একবার ভাবা উচিত- যদি আমরা কোনো মন্ত্রীর মেয়ের প্রেমে পড়ি, তবে কি তাকে পাবার চেষ্টা করবো নাকি মন্ত্রীর ভয়ে বিরত থাকব? যদি উত্তরটা না হয়, তবে আল্লাহ্‌কে কি আরো অধিক ভয় করা উচিত না?

মানুষ দুনিয়াতে যাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসবে, কিয়ামতের দিন তাকে তার সাথেই উঠানো হবে। আমাদের দেখা উচিত আমাদের হৃদয়ের ভালোবাসাটুকু আমরা কাকে উজাড় করে দিচ্ছি। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি একজনকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে?

এমন কোনো বর্ণনা নেই যে, প্রেমের পর বিয়ে করে নিলে সে প্রেম মাফ হয়ে যায়। আর এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই যে, যার সাথে প্রেম করছি আমি তাকেই বিয়ে করতে পারব।

দূর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজ প্রেমকে সহজ করে বিয়েকে কঠিন করে দিয়েছে। শায়খ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) স্যার খুব দুঃখ করে বলতেন, “আমাদের সমাজে অলিখিত শ্লোগান- বিবাহকে না বলুন, ব্যভিচারকে হ্যাঁ বলুন!”[১৪]

IslamQA এর একটি ফত’ওয়াতে দেখলাম, রাসূল(সা.) তাঁর এক স্ত্রীকে বারো উকিয়া মোহর দিয়েছেন। শায়খ সেখান থেকে এর বর্তমান বাজার মূল্য বের করেছেন। টাকাতে অঙ্কটা দাঁড়ায় প্রায় ৩২,০০০। আমাদের সমাজের একেবারে নিম্নবিত্ত ছেলেও কি এ টাকায় বিয়ে করতে পারে?[১৫]

প্রেম রোগের সবচেয়ে সেরা সমাধান দিয়েছেন পৃথিবীর সেরা মানব রাসূল (সা.)। বলেছেন-

“একে অপরকে ভালোবাসে এমন দুইজনের জন্য বিয়ের চেয়ে উত্তম আর কিছুই নেই।”[১৬]

তথ্যসূত্র: 

[১] Thamm Al-Hawa (pg. 459)
[২] Al-Jawaab Al-Kaafi (pg. 155)
[৩] Qaa`idah fi Al-Mahabbah (pg. 54-55)
[৪] Zaad Al-Ma`aad (4/246)
[৫] Tareeq Al-Hijratain (pg. 413)
[৬] Lust(pg.24-25)
[৭] Lust(pg.15)
[৮] Lust(pg.10)
[৯] Al-Istiqaamah (1/459)
[১০] Al-Jawaab Al-Kaafi (pg. 150)
[১১] সংসার ভাঙছে উদ্বেগজনক হারেঃ
http://www.dailysangram.com/post/161320
[১২] আবু দাউদ(১৫৫১)
[১৩] Lust(pg.36)
[১৪] https://www.youtube.com/watch?v=N98u3n_Z5u4
[১৫] https://islamqa.info/en/3119
[১৬] ইবনে মাজাহ, হাদীসঃ ১৮৪৭

সূত্র

মতামত দিন