ইসলামী শিক্ষা

ইসলামী শরী‘আতে শাস্তির বিধান (প্রথম পর্ব)

শাস্তির ভিত্তি, মূলনীতি, বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ

প্রসঙ্গ কথা:

১. ইসলামী শরী‘আতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি। যা মানব জীবনের বিভিন্ন দিককে সুবিন্যস্ত করে, মানুষের সকল কাজের যথাযথ নির্দেশনা প্রদান করে, জীবন পরিচালনার পথ-পদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে বলে দেয় এবং আল্লাহর সাথে ও অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্কের সীমানা নির্ধারণ করে। ফলে মানুষের কোনো কিছুই শরী‘আতের  নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে না।

২. ইসলামী শরী‘আতের বিধি-ব্যবস্থা মেনে চললে, তার নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থান করলে এবং তার বিধি-নিষেধ কঠোরভাবে অনুসরণ করলে দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য-সফলতা নিশ্চিতভাবে লাভ হবে। কেননা, সঠিক পথের সন্ধান কেবল এখানেই আছে, অন্য কোথাও এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। আল্লাহ তা‘আলাতা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ جَآءَهُم مِّن رَّبِّهِمُ ٱلۡهُدَىٰٓ﴾ [النجم: ٢٣]

“অথচ তাদের কাছে তাদের রবের পক্ষ থেকে পথনির্দেশ এসেছে।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ২৩]

তিনি আরও বলেন,

﴿قُلۡ إِنَّ هُدَى ٱللَّهِ هُوَ ٱلۡهُدَىٰۖ﴾ [الانعام: ٧١]

“বলে দাও, নিশ্চয়ই আল্লাহর পথই একমাত্র সুপথ।”[সূরা আল-আ‘আম, আয়াত: ৭১]

সুতরাং ইসলামী শরী‘আতের মূলভিত্তি কুরআনই সমগ্র মানবজাতির হিদায়াত তথা পথ নির্দেশনা দানকারী। তবে কুরআনের কতিপয় আয়াতে হিদায়াত বা সঠিক পথ প্রদর্শন কেবল মুমিন ও মুত্তাকীদের জন্য নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে:

﴿هَٰذَا بَيَانٞ لِّلنَّاسِ وَهُدٗى وَمَوۡعِظَةٞ لِّلۡمُتَّقِينَ ١٣٨﴾ [ال عمران: ١٣٨]

“এটা মানব জাতির জন্য স্পষ্ট বর্ণনা এবং মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত ও উপদেশ।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৮]

অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَتۡكُم مَّوۡعِظَةٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَشِفَآءٞ لِّمَا فِي ٱلصُّدُورِ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٞ لِّلۡمُؤۡمِنِينَ ٥٧﴾ [يونس: ٥٧]

“হে মানবকুল! তোমাদের নিকট এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে উপদেশবাণী ও অন্তরের রোগের নিরাময় এবং মু’মিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।” [সূরা ইউনূস, আয়াত: ৫৭]

এ সব আয়াতের অর্থ এ নয় যে, কুরআন কেবল মুমিনদের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাদের জন্যই এর হিদায়াত সংরক্ষিত। বস্তুত: মুমিন-মুত্তাকীরা ছাড়া যেহেতু অন্য কেউই এর নির্দেশনা মেনে চলে না এবং এর দ্বারা উপকৃত হয় না, তাই আয়াতে শুধু তাদের হিদায়াতের কথাই বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইবনুল কায়্যিম রহ. কুরআন কারীম প্রসঙ্গে অনুরূপ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘যারা কুরআনের পথ নির্দেশনায় চলে কার্যত: কুরআন তাদেরকেই সে পথ দেখিয়ে দেয়, তবে যারা এর পথ নির্দেশনায় চলে না, কুরআন তাদেরকেও পথ দেখাতে সক্ষম।’[1]

৩. ইসলামী শরী‘আতের প্রদর্শিত পথ মেনে নিতে অস্বীকার করলে, বাস্তব জীবনে এর পদ্ধতি ও নীতিমালার অনুসরণ অগ্রাহ্য করলে ও এর হুকুমের অবাধ্য হলে অস্বীকারকারী-বিপথগামীদেরকে তা নিশ্চিতরূপে  দুঃখ-ভারাক্রান্ত, অসুখী জীবন ও শাস্তির দিকে ধাবিত করবে।

৪. শরী‘আতের বিধি-নিষেধের অবাধ্য ও অমান্যকারী অপরাধীদের শাস্তি দু’ধরনের:

প্রথমত: পরকালীন শাস্তি। সেদিন শাস্তির এ বিষয়টি স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলার হাতেই ন্যাস্ত থাকবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

﴿يَوۡمَ تَجِدُ كُلُّ نَفۡسٖ مَّا عَمِلَتۡ مِنۡ خَيۡرٖ مُّحۡضَرٗا وَمَا عَمِلَتۡ مِن سُوٓءٖ تَوَدُّ لَوۡ أَنَّ بَيۡنَهَا وَبَيۡنَهُۥٓ أَمَدَۢا بَعِيدٗاۗ وَيُحَذِّرُكُمُ ٱللَّهُ نَفۡسَهُۥۗ وَٱللَّهُ رَءُوفُۢ بِٱلۡعِبَادِ ٣٠﴾ [ال عمران: ٣٠]

“সে দিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভালো কাজ করেছে তা বিদ্যমান পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তাও। সে কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান হত! আল্লাহ তাঁর নিজের সম্বন্ধে তোমাদেরকে সবধান করছেন। আর আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অতিশয় দয়াবান।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩০]

ইসলামী শরী‘আতে পরকালীন এ শাস্তিই আসল শাস্তি। কেননা এ শাস্তি হবে মানুষের পরীক্ষাকাল তথা পার্থিব জীবন শেষে ‘আমলনামা গুটিয়ে নেওয়ার পর। তারপর আল্লাহর পক্ষ থেকে সব ‘আমলের মূল্যায়ন করা হবে। এ মূল্যায়নের ভিত্তিতে আল্লাহ আখিরাতে হিসেব গ্রহণ করবেন। এ কারণে আখিরাতকে বলা হয়েছে يوم الدين (প্রতিদান দিবস) তথাيوم الحساب (হিসেব গ্রহণ দিবস)। পরিশেষে সৎকর্মশীলগণ তাদের উপযুক্ত পুরষ্কার পাবে এবং অপরাধী পাবে তার যথোপযুক্ত শাস্তি।

আখিরাতের এ শাস্তি আল্লাহ তা‘আলার ন্যায় বিচারেরই দাবী এবং তাঁর আদেশ-নিষেধের অপরিহার্য পরিণতি। এ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনার স্থান এটি নয় এবং তা আমাদের আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়।

৫. দ্বিতীয়ত: পর্থিব শাস্তি। এ ধরনের শাস্তি দু প্রকারে হয়ে থাকে:

প্রথম প্রকার: আল্লাহ তা‘আলার পার্থিব নীতির ভিত্তিতে সৃষ্টি জগতে এ শাস্তি হয়ে থাকে। এর পশ্চাতে থাকে কারণ ও তার প্রতিক্রিয়া এবং কতিপয় পটভূমির মিলিত ফলাফল। আল্লাহর বিধান প্রত্যাখ্যাত হলে ব্যষ্টি ও সমষ্টির ওপর এ জাতীয় শাস্তি নেমে আসে। এর ধরণ হয় বিভিন্ন রকম। কখনও গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, কখনও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহ ও মতভেদ সৃষ্টি করে শত্রুজাতির পরাধীন করে দেওয়া হয়, কখনও তাদের ওপর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও কষ্টকর জীবন চাপিয়ে দেওয়া হয় অথবা দারিদ্রতা, ভয়ভীতি ও অস্থিরতার মধ্যে নিক্ষেপ করা হয় এবং জনসংখ্যা ও ফসল-ফলাদির উৎপাদন হ্রাস করে দেওয়া হয় কিংবা অন্য কোনো শাস্তির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।

কুরআন মাজীদের বহু আয়াতে আল্লাহর স্থায়ী নীতির অধীনে এ ধরনের শাস্তির ইঙ্গিত রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি আয়াত নিম্নে উদ্বৃত করা হলো:

ক. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿سُنَّةَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلُۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ ٱللَّهِ تَبۡدِيلٗا ٢٣﴾ [الفتح: ٢٣]

“তোমার পূর্বে আমি যত রাসূল প্রেরণ করেছি, তাদের ক্ষেত্রেও ছিল এরূপ নিয়ম। তুমি আমার নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম পাবে না।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ৭৭]

﴿قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِكُمۡ سُنَنٞ فَسِيرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَٱنظُرُواْ كَيۡفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلۡمُكَذِّبِينَ ١٣٧﴾ [ال عمران: ١٣٧]

“তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে অনেক ধরনের জীবনাচরণ। তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমন কর, অতঃপর লক্ষ কর মিথ্যারোপকারীদের শেষ পরিণতি কীরূপ ছিল।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৭]

﴿أَفَلَمۡ يَسِيرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَيَنظُرُواْ كَيۡفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡۖ دَمَّرَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِمۡۖ وَلِلۡكَٰفِرِينَ أَمۡثَٰلُهَا ١٠﴾ [محمد: ١٠]

“তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমন করে নি এবং দেখে নি, তাদের পূর্ববর্তীদেরপরিণাম কীরূপ হয়েছে? আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করেছেন এবং কাফিদেরকে জন্য রয়েছে অনুরূপ পরিণাম।” [সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১০]

আল্লাহর বিধান প্রত্যাখ্যানকারীদের শাস্তির ব্যাপারে তাঁর নীতির কোনো বদল বা পরিবর্তন হয় না। ধ্বংসই তাদের অনিবার্য পরিণতি। এটা আল্লাহর সেই শাস্তি, যা কারণ, কারণের প্রতিক্রিয়া ও সমন্বিত পটভূমির ফলাফল হিসেবে কোনো জনগোষ্ঠির ওপর তাঁর স্থায়ী নীতির ভিত্তিতে কার্যকর হয়। এ নিয়ম লঙ্ঘন হওয়া বা বাতিল হওয়া অসম্ভব। তবে ভিন্ন কোনো কারণ থাকলে পরিণতি বিলম্বে হতে পারে।

খ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَتِلۡكَ ٱلۡقُرَىٰٓ أَهۡلَكۡنَٰهُمۡ لَمَّا ظَلَمُواْ وَجَعَلۡنَا لِمَهۡلِكِهِم مَّوۡعِدٗا ٥٩ ﴾ [الكهف: ٥٩]

“ঐসব জনপদের অধিবাসীদেরকে আমরা ধ্বংস করেছিলাম, যখন তারা সীমালংঘন করেছিল এবং তাদের ধ্বংসের জন্য আমরা স্থির করেছিলাম এক নির্দিষ্ট ক্ষণ।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৫৯]

﴿فَتِلۡكَ بُيُوتُهُمۡ خَاوِيَةَۢ بِمَا ظَلَمُوٓاْۚ﴾ [النمل: ٥٢]

“এই তো ওদের ঘরবাড়ি -সীমালংঘনের কারণে যা জনশূণ্য অবস্থায় পড়ে আছে।” [সূরা আন-নামল: :৫২]

দেখা যাচ্ছে জন সমষ্টির মধ্যে যুলুমের প্রসার হওয়া তাদের ধ্বংসের কারণ। আর ধ্বংস হওয়া পার্থিব শাস্তিসমূহের মধ্যে একপ্রকার শাস্তি, যা আল্লাহর অনুসৃত নীতির অন্তর্ভুক্ত।

গ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ﴾ [ال عمران: ١٠٣]

“তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]

﴿وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَا تَنَٰزَعُواْ فَتَفۡشَلُواْ وَتَذۡهَبَ رِيحُكُمۡۖ﴾ [الانفال: ٤٦]

“তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে ও নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, করলে সাহস হারাবে এবং তোমাদরে শক্তি বিলুপ্ত হবে।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪৬]

এখানে স্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে যে, হীনবল হওয়া ও শক্তিহীন হওয়া পারস্পরিক বিবাদ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হওয়ার পরিণতি। অনুরূপ দল-উপদলে বিভক্ত হওয়া এবং আল্লাহর বিধানের ওপর ঐক্যবদ্ধভাবে অটল না থাকার পরিণতি শাস্তির দিকে ধাবিত করে। হাদীসে আছে,

«الجماعة رحمة والفرقة عذاب».

“ঐক্য রহমত আর অনৈক্য আযাব।”

     ঘ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِكۡرِي فَإِنَّ لَهُۥ مَعِيشَةٗ ضَنكٗا وَنَحۡشُرُهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ أَعۡمَىٰ ١٢٤﴾ [طه: ١٢٤]

“যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করবো।” [সূরা ত্বাহা, আয়াত: ১২৪]

মানুষ যখন আল্লাহর যিকির তথা আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে যায় তখন বস্তুগত বা অবস্তুগত বিভিন্ন ধরণের ও বিভিন্ন প্রকারের জীবনোপকরণের সংকীর্ণতা -ব্যক্তি ও সমষ্টিকে গ্রাস করে ফেলে।

ঙ. হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যকার উচ্চ শ্রেণির লোক চুরি করলে ছেড়ে দেওয়া হতো আর নিম্ন শ্রেণির লোক চুরি করলে শাস্তি দেওয়া হতো।” এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, শাস্তিদানে পক্ষপাতিত্ব করা এবং আইনকে সমতার সাথে কর্যকর না করা তাদের ধ্বংসের কারণ।

৬. এ জাতীয় শাস্তির ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো বিবেচ্য থাকে। যথা:

ক. কোনো জনগোষ্ঠির মধ্যে যখন এ জাতীয় শাস্তির কারণ বিরাজমান থাকে এবং সে কারণে তাদের ওপর শাস্তি নেমে আসে তখন সৎ-অসৎ সবাই তাতে নিপতিত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱتَّقُواْ فِتۡنَةٗ لَّا تُصِيبَنَّ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنكُمۡ خَآصَّةٗۖ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ٢٥﴾ [الانفال: ٢٥]

“আর তোমরা এমন ফিৎনা থেকে বেঁচে থাক যা বিশেষত: শুধু তাদের ওপর পতিত হবে না, যারা তোমাদের মধ্যে যালিম এবং যেনে রেখো, আল্লাহর ‘আযাব অত্যন্ত কঠোর।” [সূরা আল-আনফাল :২৫]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এ আয়াতের তাফসীরে বলেন,

أمر الله المؤمنين أن لايقروا المنكر بين أظهرهم فيعمهم العذاب.

“আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, মুমিনগণ যেন তাদের সমাজে অন্যায়ের প্রশ্রয় না দেয়। দিলে সবাই শাস্তির আওতায় পড়বে।[2]

সৎ লোকদের ওপর শাস্তি আসার দু’রকম ব্যাখ্যা করা যায়:

এক -এ শাস্তিকে রোগের পর্যায়ে গণ্য করা যেতে পারে। রোগ যখন মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সুস্থ্য লোক তাতে আক্রান্ত হয়।

দুই -যে কারণে শাস্তি এসেছে সে কারণ প্রতিহত করতে সৎ লোকদের চেষ্টার ত্রুটি থাকা। এ বিষয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করার অবকাশ নেই।

খ. দুনিয়ার এ প্রকারের শাস্তির কারণে অভিযুক্তরা আখিরাতের শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না যদিও তারা দুনিয়ার শাস্তি ভোগ করে থাকে। আখিরাতের শাস্তি পাওনা সত্ত্বেও দুনিয়ায় তাদের শাস্তি ভোগ আল্লাহর চিরন্তন বিধানেরই অন্তর্ভুক্ত এবং পরবর্তীদের জন্য তা শিক্ষা ও উপদেশ হিসেবে গণ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَقَدۡ كَانَ فِي قَصَصِهِمۡ عِبۡرَةٞ لِّأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِۗ﴾ [يوسف: ١١١]

“তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১১১]

৭. দ্বিতীয় প্রকার: সেসব পার্থিব শাস্তি এ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত যেগুলো সম্পর্কে ইসলামী শরী‘আতে সুস্পষ্ট বর্ণনা এসেছে এবং শাসকগণকে তা কার্যকরী করার নির্দেশ দিয়েছে। যারা শরী‘আতের বিধান লংঘন করে, নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত বা অবশ্য করণীয় কাজ পরিত্যাগ করে, অর্থাৎ সে কাজগুলো শরী‘আতে অপরাধ হিসেবে গণ্য তাতে যারা লিপ্ত হয় তারা এ শাস্তির আওতাভুক্ত। যেমন চুরির ক্ষেত্রে চোরের হাত কর্তন এবং ইচ্ছাকৃত হত্যায় কিসাস বা মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি। এই শ্রেণির শাস্তি সম্পর্কে আলোচনা করাই আমাদের উদ্দেশ্য -এটিই আমাদের আলোচ্য বিষয়। চারটি পরিচ্ছেদে আমরা এ আলোচনা শেষ করবো। প্রথম পরিচ্ছেদে শাস্তির উৎস ও ভিত্তি, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে শাস্তির সাধারণ নীতিমালা, তৃতীয় পরিচ্ছেদে শাস্তির বৈশিষ্ট্য এবং চতুর্থ পরিচ্ছেদে শাস্তির প্রকারভেদ।

৮. এ জাতীয় শাস্তির ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো বিবেচ্য থাকে। যথা:

ক. দুনিয়ার এ শাস্তি ভোগকারী ব্যক্তি আখিরাতের শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পাবে না। কেননা আখিরাতের শাস্তি মওকূফ হয় তওবায়ে নাসূহা দ্বারা; দুনিয়ার শাস্তি দ্বারা নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّمَا جَزَٰٓؤُاْ ٱلَّذِينَ يُحَارِبُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَسۡعَوۡنَ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوٓاْ أَوۡ يُصَلَّبُوٓاْ أَوۡ تُقَطَّعَ أَيۡدِيهِمۡ وَأَرۡجُلُهُم مِّنۡ خِلَٰفٍ أَوۡ يُنفَوۡاْ مِنَ ٱلۡأَرۡضِۚ ذَٰلِكَ لَهُمۡ خِزۡيٞ فِي ٱلدُّنۡيَاۖ وَلَهُمۡ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ٣٣ إِلَّا ٱلَّذِينَ تَابُواْ مِن قَبۡلِ أَن تَقۡدِرُواْ عَلَيۡهِمۡۖ فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣٤﴾ [المائ‍دة: ٣٣،  ٣٤]

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং দেশে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শুলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এ হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। তবে তোমাদের আয়ত্তাধীনে আসার পূর্বে যারা তওবা করবে তাদের জন্য নয়। সুতরাং জেনে রেখ, আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩৩-৩৪]

হাদীসে আছে:

«إن السارق إذا تاب سبقت يده إلى الجنة وإن لم يتب سبقت يده إلى النار».

‘‘চোর তওবা করলে তার হাত জান্নাতের দিকে অগ্রসর হয়, আর তাওবা না করলে অগ্রসর হয় জাহান্নামের দিকে।’’ এ থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, চুরির দায়ে দুনিয়ার শাস্তি হিসেবে হাত কাটা গেলেও সে আখিরাতের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে না। তবে হাঁ, তওবায়ে নাসূহা করলে ভিন্ন কথা।

খ. শাস্তির এ বিধান জারি করার উদ্দেশ্য ইসলামী শরী‘আতের বিরোধিতার পথ বন্ধ করা। এ বিরোধিতা স্বয়ং মুসলিমদের পক্ষ থেকেও হতে পারে। কেননা মানুষের সৃষ্টি উপাদানে সীমালংঘন ও অন্যায় যুলুম করার প্রবণতা নিহিত আছে। এই প্রবণতার মূলোৎপাটন করার লক্ষ্যে দুনিয়ায় শাস্তির বিধান রাখা একান্তই জরুরী, যাতে ঝোকবশতঃ এ ধরনের কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে তাকে নিবৃত্ত করা যায়।

গ. শাস্তির এ বিধান ইসলামী শরী‘আতের ব্যাপকতারই প্রমাণ, যা তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমনটি আগে বলা হয়েছে।

চলবে………

[1] ইগাছাতুল লাহফান মিন মাসাইদিশ শায়তান, ইবন কায়্যিম, ১ম খণ্ড, পৃ-৬৭।

[2] তাফসীর কুরতুবী: ৭ম খণ্ড, প্র. ৩৯১।

লেখকঃ ড. আব্দুল কারীম যাইদান

অনুবাদক: মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন

মতামত দিন