জীবন দর্শন

আত্মপ্রশান্তি ও আবু বকর (রা.)

মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

শায়খ ড. সালেহ বিন মুহাম্মদ আলে তালেব

প্রত্যেক জাতিতেই কিছু মনীষী থাকেন, যাকে নিয়ে তারা গর্ববোধ করে। তাদের জীবন ও বৃত্তান্ত তাদের উদ্দীপ্ত করে। তাদের মধ্যে ফুটে ওঠে পুরো জাতির চরিত্র ও উচ্চ মর্যাদা। মানবিক উৎকর্ষ যারা ফুটিয়ে তোলেন মহানতর রূপে ও মহত্তর ব্যঞ্জনায়। স্বর্ণের মতো ব্যক্তিরও থাকে পরিমাপক নিক্তি। কেউ থাকেন হাজারজন যার একার সমান কিংবা একাই হাজারজনের সমান। কিছু লোক আছেন পুরো একটি উম্মতকে যার ঈমান, সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে মাপা যায়।
তিনি হলেন আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। মুসলিমদের প্রকৃত ইমাম। ইসলামের আসল শায়খ। হেরা গুহায় দুজনের একজন। মৃত্যুর পর যিনি নবীজির (সা.) প্রতিবেশিত্ব লাভের সৌভাগ্যে ভূষিত। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সুবিদিত ও আলোচিত। মুসলিমদের অন্তর তাঁর ভালোবাসায় টইটম্বুর। তাঁর মর্যাদার তুল্য কোনো মর্যাদা নেই। আল্লাহর রাসুল (সা.) এর প্রিয় ও নিকটতম ব্যক্তি। পুরুষদের মধ্যে তাঁর ওপর প্রথম ঈমান আনয়নকারী।

তাঁকে নিয়েই নাজিল হয়েছে এ কয়েকটি আয়াত। ‘এ থেকে দূরে রাখা হবে খোদাভীরু ব্যক্তিকে, যে আত্মশুদ্ধির জন্য তার ধনসম্পদ দান করে। এবং তার ওপর কারও কোনো প্রতিদানযোগ্য অনুগ্রহ থাকে না। তার মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টি অন্বেষণ ব্যতীত। সে সত্বরই সন্তুষ্টি লাভ করবে।’ (সূরা লাইল : ১৭-২১)।

ওমর (রা.) বলেন, ‘যদি আবু বকরের ঈমানের সঙ্গে পুরো জগতবাসীর ঈমান পরিমাপ করা হয়, তিনিই তাদের ওপর অগ্রাধিকার পাবেন।’ হৃদয়ে আসন নেওয়া ঈমান ও বিশ্বাস এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশের সত্যায়ন ও বাস্তবায়নে আবু বকর (রা.) ছাড়িয়ে গেছেন সব সাহাবিকে। তাই তো তিনি বিখ্যাত হয়েছেন সিদ্দিক তথা মহাসত্যবাদী হিসেবে। আল্লাহর আদেশ ও ওয়াদায় তিনি দৃঢ় বিশ্বাসী। তাঁর হৃদয়ে অবতীর্ণ হয়েছে প্রশান্তি। জীবন হয়েছে আপ্লুত। তাঁর ছিল পরীক্ষিত নানা অবস্থা এবং প্রশংসিত নানা দিন।

মেরাজের বিবরণে ইমাম আহমদ বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমাকে যে রাতে (মেরাজের উদ্দেশ্যে) আকসা সফর করানো হলো আর প্রভাতে আমি উপনীত হলাম মক্কায়, বিষয়টি আমার কাছে বড় কঠিন ঠেকল। আমি জানি যে লোকেরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে।’ অতঃপর তিনি একাকী উদ্বিগ্ন বসে রইলেন। ইতোমধ্যে তার সামনে এলো আল্লাহর দুশমন আবু জাহেল। সে নবীজির মুখোমুখি বসে পড়ল। তারপর বিদ্রুপের সুরে তাঁকে বলল, ‘কিছু কি ঘটেছে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ’। সে বলল, ‘কী সেটা?’ তিনি বললেন, ‘আজ রাতে আমাকে সফর করানো হয়েছে।’ সে বলল, ‘কোথায়?’ তিনি বললেন, ‘বাইতুল মাকদিস।’ সে বলল, ‘তারপর কি আপনি সকালেই আমাদের সামনে!’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ (বর্ণনাকারী) বলেন, তিনি তাকে এর বেশি কিছু বললেন না। পাছে সে স্বজাতিকে ডেকে আনলে ঘটনা পুরোটাকে অস্বীকার করে বসে।

অতঃপর আবু জাহেল বলল, ‘আমি যদি আপনার জাতিকে ডেকে আনি, আপনি আমাকে যা বলেছেন তাদেরও তাই বলবেন?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ’। তখন সে ডাকতে শুরু করল, ‘হে কাব বিন লুয়াই গোত্রের লোকেরা, এদিকে আসো জলদি। বিভিন্ন জলসা ভেঙে তারা এদিকে আসতে লাগল। তারা এসে নবীজি ও আবু জাহেলের কাছে বসল। আবু জাহেল বলল, ‘আমাকে যা জানিয়েছেন আপনার জাতিকেও তা জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আজ রাতে আমাকে সফর করানো হয়েছে।’ তারা বলল, কোথায়? তিনি বললেন, ‘বাইতুল মাকদিস।’ এ কথা শুনে অবিশ্বাসবশত কেউ হাত তালি দিল, কেউ মাথায় হাত রাখল।

তারা বলল, আপনি কি আমাদের মসজিদটির বিবরণ দিতে পারবেন? আমাদের বংশে এমন কেউ কেউ আছেন যারা ওই দেশ ভ্রমণ করেছে এবং মসজিদটি দেখেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি বিবরণ দিতে শুরু করলাম। বিবরণ শুরু করলে কিছু ব্যাপার আমার কাছে ঘোলাটে লাগছিল। তখন আমার কাছে মসজিদটি আনা হলো। আমি দেখতে লাগলাম। এমনকি মসজিদটি আকিলের ঘরের কাছে রাখা হলো। আমি দেখে দেখে বিবরণ দিতে লাগলাম।’ লোকেরা শুনে বলল, আল্লাহর কসম, বিবরণ তো সঠিক!

এই ছিল মিথ্যা সাব্যস্ত করা মুশরিকদের অবস্থা। এদিকে কিছু মুসলিমের মনও টলে গিয়েছিল। অথচ আবু বকর সিদ্দিক (রা.) শোনামাত্র বলে উঠলেন, ‘যদি নবীজি বলে থাকেন, তবে সন্দেহাতীত সত্য বলেছেন। আর তোমরা এ কথায় আশ্চর্যবোধ করছ কেন? আল্লাহর কসম! তিনি তো আমাকে খবর দেন যে তাঁর কাছে দিন-রাতের সামান্য মুহূর্তে আসমান থেকে পৃথিবীতে বার্তা আসে। (আর আমরা নির্দ্বিধায় তা বিশ্বাস করি। সেখানে এ খবর কী এমন বিস্ময়কর?)। এই হলেন আবু বকর (রা.)। (আল্লাহ তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন)।

হিজরতের পথে রাসুলুল্লাহ (সা.) গারে হেরায় প্রবেশ করে আত্মগোপন করেন। কোরাইশরা হন্যে হয়ে তাঁকে খুঁজতে শুরু করে। তাঁকে গ্রেফতার বা হত্যা করে পুরস্কারপ্রাপ্তির লোভে পিছু নেয় শত্রুরা। দাপিয়ে বেড়ায় মুশরিকরা। উঠতে থাকে পাহাড়ে। এমনকি আবু বকর (রা.) বলে ওঠেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকায়, নির্ঘাৎ আমাদের দেখে ফেলবে।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হে আবু বকর, এমন দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণাÑ আল্লাহ যাদের তৃতীয়জন? আল্লাহ আয়াত নাজিল করেন, ‘যদি তোমরা তাঁকে (রাসুলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁর সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দুজনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষণ্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি স্বীয় সান্ত¡না নাজিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুত আল্লাহ কাফেরদের মাথা নিচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা তাওবা : ৪০)।

এরই নাম সাকিনা। হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি। এটি কলবে নাজিল হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে। বিপদ ও শঙ্কার মুহূর্তে বান্দার ওপর এটি নেয়ামতের পূর্ণতা। আল্লাহর সঙ্গে বান্দার পরিচয়, তাঁর সত্য ওয়াদার প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং নিজ রবের প্রতি অকুণ্ঠ ঈমান অনুপাতে এটি অবতীর্ণ হয়। এ আয়াতে আরও বলা হয়েছে, উদ্বেগ কখনও আল্লাহর খাঁটি ও খাস বান্দাদেরও পেয়ে বসে। কিন্তু প্রকৃত মোমিন কখনও হতাশ ও নিরাশ হয় না। বরং সে উপকরণ কাজে লাগায় আর আল্লাহর ওপর ভরসা করে। তিনিই উত্তম অভিভাবক ও সেরা সাহায্যকারী।

সিদ্দিকে আকবর (রা.) এর হৃদয়ে প্রশান্তি, ঈমান ও অবিচলতার আরেক অবস্থা প্রত্যক্ষ হয় হুদায়বিয়ার দিন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। তীব্র আগ্রহ তাদের টেনে আনে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু ওমরাহ সম্পাদন করা। মোশরেকরা তাদের কাবা ঘর পর্যন্ত পৌঁছতে বাধার সৃষ্টি করে। (অনেক ঘটনার পর) অবশেষে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে পশু কোরবানি দিয়ে মাথা নেড়া করার নির্দেশ দেন। তারা কিছুটা ইতঃস্তত করতে লাগলেন। এমতাবস্থায় উম্মে সালামা (রা.) নবীজিকে সঠিক পরামর্শ দেন। এদিন সাহাবায়ে কেরামের মনে নানা বিরূপ ভাবনা তৈরি হয়। এমনকি ওমর (রা.) এসে নবীজির উদ্দেশে বলেন, ‘হে আল্লাহর নবী, আপনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন? আমরা কি সত্যের ওপর নই আর আমাদের শত্রুরা কি মিথ্যা নয়? আপনি কি আমাদের বলেননি: আমরা অচিরেই কাবায় আসব এবং তার তাওয়াফ করব?’

রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘অবশ্যই আমি আল্লাহর রাসুল; কিন্তু আমি তাঁর আদেশের অন্যথা করতে পারি না। তিনিই আমার একমাত্র সাহায্যকারী।’ এরপর ওমর (রা.) আবু বকর (রা.) এর কাছে যান। নবীজিকে যা বলেছেন, তাকেও তাই বলেন। কথা শুনে আবু বকর (রা.) বলেন, ‘নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসুল। তবে তিনি আল্লাহর অবাধ্য হতে পারেন না। তিনিই তাঁর সাহায্যকারী। অতএব তাঁর আদেশ পালন করো। আল্লাহর কসম, তিনি সত্যের ওপর আছেন।’

সুবহানাল্লাহ! এ কোন প্রশান্তি! যা এ মহান মনীষীর হৃদয় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল! যার প্রকাশ ঘটত তাঁর ভাষায় ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে! অতএব (আল্লাহ তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন)।

২০ রজব ১৪৩৯ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার

সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : আলী হাসান তৈয়ব

মতামত দিন