অন্যান্য জীবন দর্শন

‘নফসে মুতমাইন্নাহ’ এর গুণাবলী এবং তা অর্জনের উপায়

নিম্নে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নফসে মুতমাইন্নাহ’ (প্রশান্ত আত্মা) এর পরিচয়, মর্যাদা, গুণাবলী এবং তা অর্জনের উপায় সমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হল:

و بالله التوفيق

❑ ‘নফসে মুতমাইন্নাহ’ কাকে বলে?

‘নফসে মুতমাইন্নাহ’ একটি ইসলামী পরিভাষা। এর অর্থ প্রশান্ত আত্মা বা স্থির চিত্ত।

মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস পোষণকারী সত্যের অনুগামী স্থির চিত্তের নামই নফসে মুতমাইন্নাহ। যা সুখ-দুখ,আনন্দ-বেদনা,বিপদ-মুসিবত ও জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা পোষণ করে এবং এর উপর অবিচল থাকে।

সামান্য সমস্যা ও দুর্বিপাকে অস্থির হয় না, হাহুতাশ করে না, আশাহত হয় না এবং আল্লাহর প্রতি কু ধারণা পোষণ করে না। বরং সকল অবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করে এবং তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে। এ ধরণের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী যে হৃদয়ে মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাকে সেটাই ইসলামের পরিভাষায় নফসে মুতমাইন্নাহ।

❑ ‘নফসে মুতমাইন্নাহ’ (প্রশান্ত আত্মা) এর মর্যাদা:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي – وَادْخُلِي جَنَّتِي

“হে প্রশান্ত আত্মা,তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।” (সূরা আল ফজর:২৭-৩০)

মহান রবের পক্ষ থেকে প্রশান্ত আত্মাকে লক্ষ্য করে এ কথাগুলো বলা হবে জান কবজের সময় আবার কিয়ামত দিবসে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর) অর্থাৎ এ গুণ-বৈশিষ্টের অধিকারী আত্মার জন্য এটি সরাসরি জান্নাতের ঘোষণা।

সুতরাং এখান থেকেই বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।

❑ নফসে মুতমাইন্না (প্রশান্ত আত্মা) এবং আবু বকর রা.:

ইবনে আবী হাতিম ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, উক্ত আয়াতটি নাযিল হওয়ার সময় আবু বকর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট বসা ছিলেন। আয়াতটি শুনে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, কত চমৎকার এই কথাটি!

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, أما إنه سيقال لك هذا

“একথাটি (মৃত্যুর সময়) তোমাকে বলা হবে।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর)

————————

❑ আমরা কিভাবে নফসে মুতমাইন্নাহ বা প্রশান্ত মনের অধিকারী হতে পারব?

নিম্নোক্ত গুণাবলীগুলো অর্জন করলে আমরাও এধরণের নফসের অধিকারী হতে পারব ইনশাআল্লাহ। যথা:

❖ ১) ইখলাস বা একনিষ্ঠতা:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّـهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

“তাদেরকে একমাত্র এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছে যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে।” (সূরা বাইয়েনাহ: ৫)

ইখলাসের আলামত:

● ক) জীবনের সব ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য অনুভব করা। আল্লাহর সাহায্যের কারণে একজন ব্যক্তির ইবাদত-বন্দেগী ও কার্যক্রম ত্রুটি-বিচ্যুতি ও পদস্খলন থেকে রক্ষা পায়। ইবনুল জাউযী বলেন:
إنما يتعثر من لم يخلص

“যার মধ্যে ইখলাস নেই তারই পদস্খলন ঘটে।” (সায়দুল খাতের, ১:১১৯)

● খ) ইবাদতে পর্যাপ্ত সময় ও শ্রম ব্যয় করা।

● গ) গোপনে ইবাদত করার আগ্রহ থাকা। তবে যে সব ইবাদত জনসম্মুখে করতে হয় সেগুলোর কথা ভিন্ন। যেমন জামাআতে সালাত, আল্লাহর পথে দাওয়াত, জিহাদ ইত্যাদি।

● ঘ) অতি যত্ন সহকারে সুন্দরভাবে ইবাদত করা এবং এ ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনে আন্তরিক হওয়া।

● ঙ) আল্লাহর দরবারে ইবাদত গৃহীত না হওয়ার ভয় থাকা।

❖ ২) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করা:

নফসে মুতমাইন্নার অধিকারী হতে হলে ইবাদত-বন্দেগী, লেনদেন, চরিত্র, পারিবারিক, সামাজিক তথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ ও আদর্শের আলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। নিজের জানমাল,সন্তান-সন্ততি, পিতামাতা ও সকল প্রিয়জন থেকে তার ভালবাসাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই কেবল পূর্ণ মুমিন হওয়ার সম্ভব।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

“তোমাদের কেউ প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না যে পর্যন্ত আমি তার নিকট তার পিতা পুত্র এবং অন্য সকল লোক হতে অধিক প্রিয় না হই।” (বুখারী ও মুসলিম, আনাস রা. হতে বর্ণিত)

আর এতে কোন সন্দেহ নাই যে, যে হৃদয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ভালবাসা সকল ভালবাসার উপরে স্থান পাবে সে হৃদয় হবে সবচেয়ে প্রশান্ত ও স্থির এবং তার জন্যই অপেক্ষা করছে উপরোক্ত সুসংবাদ।

❑ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অনুসরণের আলামত:

● ক) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত সম্পর্কে জ্ঞানার্জন এবং গ্রহণে উদগ্রীব থাকা

● খ) সীরাত তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবন-চরিত সম্পর্কিত বই-পুস্তক অধ্যয়ন করা।

● গ) বিদআত থেকে সাবধান থাকা।

● ঘ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ-অনুকরণে অগ্রণী থাকা।

❖ ৩) আল্লাহ তাআলাকে গভীরভাবে ভালবাসা:

আল্লাহ তাআলাকে ভালবেসে যখন কেউ আল্লাহর রঙ্গে জীবন রাঙ্গিয়ে দিতে পারে তখন সকল বিপদ-মুসিবতে সবর করা তার জন্য সহজ হয়ে যায়। সর্বাবস্থায় সে তাঁর প্রতি সুধারণা পোষণ করে। শত কষ্ট হাসিমুখে বরণ করে। বিপদে ধৈর্যের পরিচয় দেয় আর সুখ ও আনন্দের সংবাদে কৃতজ্ঞতা আদায় করে।এসব কারণে তার মন থেকে অস্থিরতা, হাহাকার, না পাওয়ার বেদনা দূরভিত হয় যায়। মন ভরে উঠে পরম প্রশান্তিতে।

❑ আল্লাহকে ভালবাসার কতিপয় আলামত:

● ক) নিভৃতে আল্লাহর ইবাদত করতে ভালো লাগা।

● খ) আল্লাহর বাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআন তিলাওয়াত ও শ্রবণ করতে আনন্দ পাওয়া।

● গ) নামায, রোযা, দান-সদকা ইত্যাদি ইবাদতে তৃপ্তি অনুভব করা।

● ঘ) তাসবীহ, তাহলীল, যিকির, দুআ, ইস্তিগফার ইত্যাদির মাধ্যমে জিহ্বাকে সিক্ত রাখা।

● ঙ) আল্লাহর পছন্দ ও অ পছন্দনীয় বিষয়ে মানসিকভাবে পূর্ণ সম্মতি থাকা।

● চ) কোন ইবাদত ও নেকির কাছে ছুটে গেলে মনে কষ্ট অনুভূত হওয়া এবং আফসোস করা।

● ছ) আল্লাহর আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘিত হতে দেখলে মনে প্রচণ্ড রাগ সৃষ্টি হওয়া।

❖ ৪) আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا”

“ওই ব্যক্তিই ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করবে যে ব্যক্তি আল্লাহকে প্রতিপালক,ইসলামকে দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাসুল হিসেবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিল।” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, আনাস রা. হতে বর্ণিত)

যে আল্লাহ তাআলাকে প্রতিপালক হিসেবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবে স্বাভাবিকভাবে তার অন্তরে অস্থিরতা ও দু:শ্চিন্তা স্থান পাবে না। কারণ সে জানে মহান আল্লাহ অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ও কুশলী আর তার প্রতিটি সিদ্ধান্তই প্রজ্ঞাপূর্ণ। তাই তার ভাল-মন্দ সকল সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি থাকার মাধ্যমেই হৃদয়ে জাগ্রত হয় অনাবিল প্রশান্তি।

❖ ৫) সত্যবাদিতা:

সত্যবাদিতার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত প্রশান্তি । পক্ষান্তরে মিথ্যায় রয়েছে মানসিক অশান্তি, সন্দেহ, সংশয় ও অস্থিরতা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

الصِّدْقَ طُمَأْنِينَةٌ ، وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةٌ

“সত্য হল প্রশান্তি আর মিথ্যা হল সংশয়।” (মুসনাদ আহমদ, মুস্তাদরাক হাকিম, মিশকাত, আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)

সত্যবাদিতার তিনটি ক্ষেত্রে রয়েছে। যথা:

● ক) আল্লাহর সাথে সত্যবাদিতা:

প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী মুমিন হবে-

– কথায় সত্যবাদী। সুতরাং তার মুখ থেকে কখনও অসত্য কথা বের হবে না।

– আচরণে সত্যবাদী। সুতরাং সে হঠাৎ করেই রঙ বদলাবে না বা ধোঁকাবাজি ও মুনাফেকি করবে না।

– কর্মে সত্যবাদী। সুতরাং সে আমল করবে ইখলাসের সাথে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেখানো পদ্ধতির আলোকে।

● খ) বান্দাদের সাথে সত্যবাদিতা: আল্লাহ ও তার মাঝে যে চেহারা থাকে মানুষের সাথে উঠবস ও লেনদেনের সময় তার চেয়ে ভিন্ন চেহারা নিয়ে হাজির হবে না।

● গ) নিজের সাথে সত্যবাদিতা: যা সে বিশ্বাস করে তা সে কর্মে বাস্তবায়ন করে। নিজেকে সংশোধন করে, আত্ম সমালোচনা করে এবং প্রবৃত্তির টানে ছুটে বেড়ায় না আর একান্ত একাকীত্বেও আল্লাহর ভয় হৃদয়ে জাগ্রত রেখে হারাম থেকে দূরে থাকে।

❖ ৬) তাকওয়া অবলম্বন:

তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। যার কারণে সে আল্লাহর ইবাদত করে; অবাধ্যতা করে না। কৃতজ্ঞতা আদায় করে; অকৃতজ্ঞ হয় না। আল্লাহকে স্মরণ করে; তাকে ভুলে থাকে না আর বেঁচে থাকে বড়-ছোট সকল প্রকার পাপাচার থেকে।

স্বাভাবিকভাবে মানুষ যখন আল্লাহর ভয় হৃদয়ে জাগ্রত রাখে তখন সে যেমন আল্লাহর অধিকার লঙ্ঘন করে না ঠিক তেমনি বান্দার হকও নষ্ট করে না। এতে হৃদয়ে বিরাজ করে এক অভূতপূর্ব তৃপ্তি ও অবর্ণনী প্রশান্তি। পক্ষান্তরে আল্লাহর দাসত্ব থেকে বের হয়ে গেলে এবং বান্দার অধিকারে হস্তক্ষেপ করলে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। যার প্রভাবে অপরাধীর হৃদয়ে অশান্তির দাবানল জ্বলতে থাকে আর অস্থিরতা ও দু:শ্চিন্তা তাকে গ্রাস করে।

❖ ৭) সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ: মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা, আল্লাহ তাআলা যে কাজে রাগ করেন সে কাজ থেকে সতর্ক করা এবং এ পথে ধৈর্য ধারণ করা।

❖ ৮) মানুষের কল্যাণে কাজ করা, গরীব, অসহায়, বিধবা ও এতিমদের সাহায্য করা ইত্যাদি।

❖ ৯) সুন্দর চরিত্র: হাসিমুখে থাকা,দেখা হলে সালাম দেয়া, মানুষের সুখে সুখী হওয়া, দু:খে দুখী হওয়া, প্রতিবেশী ও মেহমানকে সম্মান করা ইত্যাদি।

উপসংহার, শাইখ সালিহ আল ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ) এর একটি মূল্যবান বক্তব্য দ্বারা উপসংহার টানতে চাই। তিনি বলেন:

“মনকে নফসে মুতমাইন্নাহ এর পর্যায়ে উন্নীত করার উপায় হল, মনকে আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য করা আর কু প্রবৃত্তি ও হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা।”

দুআ করি, আল্লাহ যেন আমাদের মনকে মহান আল্লাহর আনুগত্যে বশীভূত করার পাশাপাশি কু প্রবৃত্তির আহ্বান এবং পাপাচার থেকে দুরে থাকার মাধ্যমে সেই প্রশান্ত আত্মার অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করেন যাকে তিনি জান্নাতে প্রবেশের জন্য নিজেই আহ্বান করেছেন। নিশ্চয় তিনি দুআ কবুল কারী। আমীন।

—————–
লেখক:

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

(লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদী আরব)

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব

সূত্র

মতামত দিন