ইসলামিক গল্প

গুহার পাথর সরে গেল

ছোটোদের হাদিসের গল্প-২
গুহার পাথর সরে গেল
তিন বন্ধু একসাথে পাহাড়ে গেল কোনো কাজে। হঠাৎ করে আকাশে মেঘ জমে ওঠল। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। তারা তিনজন দৌড় দিয়ে আড়াল খোঁজতে লাগল। পাশেই পেয়ে গেল একটি গুহা।
– ‘চলো ওই গুহায় ঢুকে বসি। বৃষ্টি চলে গেলে বের হব।’ একজন বলল।

– ‘চলো, চলো।’ বাকিরা সায় দিলো।
তারা তিনজন তাড়াতাড়ি গুহায় ঢুকে পড়ল। বৃষ্টি ঝরতে লাগল তুমুল বেগে। বৃষ্টির পানি পাহাড় থেকে স্রোত হয়ে পড়ছে গুহাটির পাশ দিয়েই। সে স্রোতে একটি বড়ো পাথর নড়ে এসে পড়ল গুহার মুখে। গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল।
একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। রোদের ঝলকানিতে চারদিক উজ্জ্বল হলো। গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটায় রোদ পড়ে চিকচিক করতে লাগল। তিন বন্ধু এবার গুহা থেকে বের হওয়ার জন্য উঠল।
– ‘হায়, হায়! পাথরটিতো সরাতে পারছি না।’ একজন বলল।
– ‘কী বলছ তুমি!’ বাকিরাও এগিয়ে এলো।
তারাও পাথরটি সরাতে পারল না গুহামুখ থেকে। এবার দু জনে মিলে একসাথে ধাক্কা দিলো। না, তাও এক চুল সরল না পাথরটি। এবার তিনজনে মিলে জোরসে ঠেলা দিলো। না, তাতেও নড়ে না পাথর। অনেক্ষণ তিন জনে সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করেও কিছুতেই কিছু হলো না। পাথরও নড়ল না। তারাও বের হতে পারল না গুহা থেকে।
তারা তিন বন্ধু খুব হতাশ হয়ে পড়ল। তারা কি আর বেরুতে পারবে না এ গুহা থেকে। বাইরের কেউও জানে না যে তারা গুহার ভেতর। বাড়িঘরও আশেপাশে নেই। তারা চিৎকার করলে কেউ শুনতেও পাবে না। তা হলে তারা কি করে বের হবে। তারা কি এখানে দিনের পর দিন আটকে থাকবে। তা হলে তো না খেতে পেয়েই তারা এখানে মারা যাবে। কেউ জানবেও না! কী বিপদ! কী বিপদ!
– ‘আমাদের আর কোনো উপায় নেই, আল্লাহর কাছে দুআ করা ছাড়া।’ একজন বলল।
– ‘হুম! আমরা আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই।’
– ‘এসো, যার যার জীবনের সবচে খাঁটি ভালো কাজ যেটা, সেটাকে স্মরণ করে আল্লাহর কাছে দুআ করি। হয়তো তাতে আল্লাহ আমাদেরকে পাথরের এ বিপদ থেকে মুক্ত করবেন।’ আরেকজন বলল।
প্রথম বন্ধু দুআ শুরু করল। সে তার ভালো একটি কাজের বর্ণনা দিয়ে বলল—-
‘হে আল্লাহ! আমার মা-বাবা খুব বৃদ্ধ। পরিবারের অন্যান্যদের আগে তাদেরকে দুধ পান করতে দিই। একদিন কাঠ সংগ্রহ করতে করতে আমি অনেক দূর চলে গেলাম। তাই ঘরে ফিরতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেল। ঘরে ফিরে এসে আমি দুধ দোহন করলাম। যখন আমার বৃদ্ধ মা-বাকে খাওয়ানোর জন্য দুধ নিয়ে এলাম, ততক্ষণে তারা না খেয়ে ঘুমিয়ে গেছেন। তাদেরকে ঘুম থেকে জাগাতে চাইলাম না। দুধের বাটি নিয়ে তাদের কাছে বসে থাকলাম। যাতে জেগে ওঠলে তাদের খেতে দিতে পারি।
এদিকে আমার ছেলে-মেয়েরা দুধ পান করার জন্য চেঁচামেচি করছিল। কিন্তু বৃদ্ধ মা-বাবার আগে তাদেরকে খেতে দেওয়াকে আমি পছন্দ করলাম না। এভাবে একসময় ভোর হয়ে গেল। মা-বাবা জেগে ওঠলেন। তাদেরকে দুধের বাটি এগিয়ে দিলাম। তারা পান করলেন। তারপর ছেলে-মেয়েদের খেতে দিলাম।
হে আল্লাহ! এটি আমি করেছি শুধু তোমার সন্তুষ্টির জন্য। আমার এ কাজ যদি তোমার পছন্দ হয় তা হলে এ পাথরের বিপদ থেকে আমাদের মুক্ত করো।’
তার দুআ শেষ হতে না হতেই পাথরটি নড়ে ওঠল। কিছুটা সরে আবার নিশ্চল। একটু ফাঁক তৈরি হলো। ঠাণ্ডা বাতাস পরশ বুলিয়ে গেল গুহার ভেতর। কিন্তু ফাঁকটা ছোটো। এটুকু দিয়ে মানুষ বের হওয়ার সুযোগ নেই।
এবার দ্বিতীয় জন দুআ শুরু করল। সে বলল–
‘হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। তাকে আমার খুব ভালো লাগত। তাকে আমি খারাপ কিছু বললাম। সে বলল, তা হলে আমাকে এক শ স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে। আমি অনেক পরিশ্রম করে তা জোগাড় করে ফেললাম। তারপর তার হাতে দিয়ে কাছে আসতে চাইলাম।
তখন সে বলল, ‘তুমি আল্লাহকে ভয় করো। আমি স্বর্ণমুদ্রার কথা বলেছিলাম তোমার হাত থেকে বাঁচার জন্য।’
এ কথা শুনে আমি তোমাকে ভয় করলাম। সেখান থেকে আমি ফিরে এলাম।
‘হে আল্লাহ! আমার এ কাজে যদি তুমি খুশি হও তা হলে আমাদের এ অবস্থা থেকে মুক্তি দাও।’
পাথরটি আবার নড়ে ওঠল। আরও একটু সরে গেল সেটি। অন্ধকার গুহা আলোয় ঝলমল করে ওঠল সূর্যের আলোতে। কিন্তু এখনও মানুষ বের হওয়ার মতো বড়ো হলো না সে ফাঁকটি।
এবার তৃতীয় জন দুআর জন্য হাত ওঠাল–
‘হে আল্লাহ! আমি একবার কিছু শ্রমিক রাখলাম কাজ করার জন্য। কথা ছিল তাদেরকে এক ফারসাক করে শষ্যদানা বেতন দেবো। কাজ শেষ হলে সবাইকে বেতন বুঝিয়ে দিলাম। একজন বলল, আমি পরে নেব, এখন আপনার কাছে রেখে দিন। এ বলে সে চলে গেল।
এর মাঝে শষ্যের মৌসুম চলে এল। কিন্তু তখনও সে এলো না। তার ভাগের শষ্যদানাগুলো আমি ফেলে না রেখে ক্ষেতে বুনলাম। তা থেকে আরও অনেক বেশি শষ্য হলো। সেগুলো বিক্রি করে গরু ছাগল উট কিনলাম। সেগুলো বাচ্চা দিয়ে আরও অনেক গরু ছাগল উট বেড়ে গেল।
অনেক দিন পর সে শ্রমিক ফিরে এলো। সে আমাকে বলল, আমার মজুরিগুলো আমাকে দিন।
– এই উট গরু ছাগল যা দেখতে পাচ্ছো, এগুলো তোমার। আমি বললাম।
– হে আল্লাহর বান্দাহ! তুমি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছ?
– না আমি তোমার সাথে মোটেও মশকরা করছি না। এ বলে আমি তাকে সবকিছু খুলে বললাম। সে সব শুনে খুশি হয়ে সেগুলো নিয়ে চলে গেল।
হে আল্লাহ! আমার এ কাজ যদি তোমার পছন্দ হয়, আমাদের এ গুহা থেকে বের হওয়ার সুযোগ করে দিন।’
পাথরটি আরও সরে গেল। এবার তারা বের হওয়ার মতো হলো ফাঁকাটি। একে একে বের হয়ে এলো তারা তিন বন্ধু। মুক্তির আনন্দে তারা আনন্দিত হলো। তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে যার যার ঘরে ফিরে গেল।
এ হাদিসটি যেখানে পাবেন
সহিহ বুখারি : ২০৭৪
অধ্যায় : কিতাবুল বুয়ু (ব্যাবসা সংক্রান্ত অধ্যায়)
বর্ণনাকারী : আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.
হাদিসের মান : সহিহ

মতামত দিন