ইসলামী শিক্ষা

হারামাইনের খুতবা : অহংকার

বিষয় : অহংকার

খুতবা প্রদানেঃ শাইখ আবদুল মোহসেন মুহাম্মাদ আল কাসেম

তারিখ: ১-৭-১৪২৪ হিজরী

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করছি, তাঁর কাছে সাহায্য ও মাগফেরাত কামনা করছি। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন মাবুদ নেই, তিনি একক তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দাহ ও রাসূল।

হে আল্লাহর বান্দাহগণ! আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর। জেনে রাখ প্রবৃত্তির বিরোধিতাই মূলত তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। পক্ষান্তরে হেদায়াতের বিরুদ্ধাচরন করা হতভাগ্যতার নামান্তর।

হে মুসলমানগণ! বনি আদমের পরিশুদ্ধি তার ঈমান এবং নেক আমলের মধ্যে নিহিত আর আর পরশুদ্ধি নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। অন্তরের কাজসমূহ সাওয়াব ও শাস্তির দিক থেকে দৈহিক কাজ সমূহের মতই। এ কারনেই আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পর সুসম্পর্ক, শত্রুতা, আল্লাহর উপর ভরসা এবং নেক কাজে দৃঢ় সংকল্প হওয়া সওয়াবের কাজ।

পক্ষান্তরে অহংকার হিংসা বিদ্বেষ প্রদর্শনেচ্ছা আত্মতৃপ্তি ইত্যাদি পাপ বা শাস্তির কাজ। আল্লাহর বান্দাহ যখনই আল্লাহর গোলামীবৃদ্ধি করে এবং বিনয়াবনত হয় তখনই সে আল্লাহর নিকট মর্যাদা লাভ করে এবং নিকটবর্তি হয়ে যায়। নিন্দিত ও খারাপ চরিত্র সমূহের মূল হচ্ছে অহংকার ও বড়াই। ইবলিস শয়তান অহংকারের চরিত্রে বিশেষিত ছিল ফলে সে আদমকে হিংসা করে এবং তার উপর অহংকার করে আর তার প্রতিপালকের নির্দেশ মান্য করতে অস্বীকার করে। আল্লাহ বলেন, “আর যখন আমরা বললাম ফেরেশতাদেরকে তোমরা আদমকে সেজদাহ কর, তখন তারা সেজদাহ করল ইবলিস ব্যতীত। সে অস্বীকার করল, অহংকার করল এবং কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হল”। [সুরা আল বাকারাহ-৩৪ ]

অহংকারের কারনেই ইয়াহুদী সম্পদায় যারা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দেখে তাঁর নবুয়তের সত্যতা সম্পর্কে জেনে ঈমান গ্রহন থেকে পিছিয়ে থাকে। এ অহংকারই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই কে ঈমান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এ কারণেই আবু জাহল ইসলাম কবুল করা হতে বিরত থাকে। কুরাইশ সম্প্রদায় ভ্রষ্টতা ও অন্ধত্বকে হেদায়াতের মোকাবেলায় গ্রহণ করে তাই আল্লাহ তাআলা বলেন, “নি:সন্দেহে যখনই তাদেরকে বলা হয় আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন মাবুদ নেই তখন তারা অহংকার করে থাকে।” [ সূরা আস সাফফাত-৩৭}

এ জন্যই সুলাইমান (আঃ) বিলকিস ও তার সম্প্রদায়কে বড়াই ত্যাগ করে আনুগত্য মেনে নিতে আহবান করেছেন। আমার উপর বড় হওয়ার চেষ্টা করোনা, মুসলমান হয়ে আমার কাছে আস।

অহংকারই মূলত সকল প্রকার বিচ্ছিন্নতা, বিবেদ, ঝগড়া ফাসাদ মতানৈক্য ও হিংসা বিদ্বেষের কারণ। মহিয়ান আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাঈল সম্পর্কে বলেন, তারা পরস্পরের মাঝে সীমালঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে জ্ঞান আসার পরও মতবিরোধ করেছে।”

এ কারণেই নবীদের সাথে বনি ইসরাঈল মিথ্যা হত্যা সহ নানা প্রকার দুরাচরণ করতে দ্বিধা করেনি। “যখনই কোন রাসূল যা তোমরা পছন্দ করনা তা নিয়ে তোমাদের কাছে আসত তখনই তোমরা  অংকার করতে আর তাদের একদলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে এবং অপর দলকে হত্যা করতে।”[ সূরা আল বাকারাহ-৮৭]।

অহংকার মুনাফিকদের বৈশিষ্টের অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা  আস, রাসূল তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন তখন তারা মাথা ঘুরিয়ে নেয়, আর আপনি তাদের দেখতে পাবেন তারা অহংকার বশত: বিমুখ হয়ে যাচ্ছে।” (সূরা আল মুনাফিকূন-৫]

এ চরিত্রে বিশেষিত হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী জাতি সমূহকে শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করেছেন। নূহ (আঃ) এর সম্প্রদায় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তারা নিজেদের বস্ত্র দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করে নেয়, বাড়াবাড়ি করতে থাকে এবং অতিশয় অহংকার করে বসে।” [সূরা নূহ-৭]

ফিরআউন ও তার সম্প্রদায় সম্পর্কে তিনি এরশাদ করেন, “আর সে এবং তার বাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহংকার করে বসে, এবং তারা ধারণা করে যে, তারা আমাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে না, ফলে আমি তাকে এবং তার বাহিনীকে পাকড়াও করলাম এবং তাদেরকে সমূদ্রে নিক্ষেপ করলাম। সুতরাং দেখুন যালেমদের পরিণতি কেমন ছিল?” [সূরা হুদ (আ:) এর সম্প্রদায় আদ জাতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন ,“আর আদ জাতি অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহংকার করেছে এবং বলেছে, আমাদের চেয়ে শক্তিধর কে রয়েছে? তারা কি চিন্তাকরে দেখেনি নিশ্চয়ই আল্লাহ যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের চেয়ে শক্তিশালী? আর তারা আমাদের আয়াত সমূহকে অস্বীকার করত ফলে আমরা তাদের উপর প্রচন্ড ঝড় অশুভদিন গুলোতে যাতে করে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনার শাস্তি তাদরেকে আস্বাদন করাতে পারি আর পরকালের শাস্তিতো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং কোন সাহায্য করা হবে না। [সুরা ফুসসিলাত – ১৫,১৬]

প্রকৃত পক্ষে অহংকারীরা হচ্ছে নবী এবং নবীর অনুসারীদের দুশমন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তার সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যারা অহংকার করেছে তারা বলল, হে শুআইব আমরা অবশ্যই তোমাকে এবং তোমার সিথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আমাদের গ্রাম থেকে বের করে দিব অথবা তোমরা  আমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে” [সুরা আল আরাফ -৮৮]।

এ কারনেই মুসা (আ:) তাঁর সম্প্রদায়ের আহংকারীদের কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করেন। “আর মুসা বলল, আমি আমার এবং তোমাদের প্রতিপালকের আশ্রয় নিচ্ছি সকল দাম্ভিক ব্যাক্তি হতে যে হিসাবের দিনের প্রতি ঈমান আনে না।”

আহংকারী মূলত নিজের প্রবৃত্তি পুজারী হয়ে থাকে ফলে সে সবসময় নিজের দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে দেখে আর অন্যের দিকে অপরিপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখে। প্রবৃত্তি যা চায় তা গ্রহন করে এজন্য আল্লাহ তা’আলা অহংকারীর অন্তরে মোহরাঙ্কিত করে দিয়েছেন। “নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল দাম্ভিক অহংকারীকে ভালবাসেননা।”

অহংকারী উপরদেশ ও নসিহত গ্রহন থেকে দুরে সরে থাকে আল্লাহ বলেন, “অচিরেই আমার নিদর্শণ থেকে ফিরিয়ে দেব তাদেরকে যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করে থাকে।”

অহংকারী কখনো কখনো বাতিলের অনুসরণের মাধ্যমে পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। দুনিআতে সে শাস্তির সম্মুখিন হয়অহংকারের কারনে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সময় এক ব্যক্তির হাত অবশ হয়ে যায়। সালমা ইবনে আকওয়া (রা:) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সামনে এক ব্যক্তি বাম হাতে খেল। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ডান হতে খাও, সে বলল আমি পারি না। তিনি বললেন, না তুমি পারতে। অহংকারই শুধু তোমাকে বারন করেছে। বর্ণনা কারী বলেন সে তার হাত মুখ পর্যন্ত আর উঠাতে পারে নি। ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। অহংকারীকে নিয়ে পৃথিবী তলিয়ে গিয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, “এক ব্যক্তি তার সুন্দর পোষাকে চলাফেরা করছিল আত্মতৃপ্তি ও দাম্ভিক অনুভব করছিল, তার মাথার চুল সুন্দরভাবে আচড়ানো চলাফেরায় অহংকার ও দাম্ভিকতার বহি:প্রকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল তখন আল্লাহ তালা তাকে সহ পৃথিবীকে ধ্বসিয়ে দিলেন, এভাবে সে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে ধ্বসতে থাকবে।” [বুখারী ও মুসলিম]

আখেরে তাদের সাথে অহংকারের বিপরীত ব্যাবহার করা হবে। যে দুনিয়াতে মানুষের উপর বড়াই ও অহংকার করেছে আখেরাতে মানুষ তাকে তাদের পা দিয়ে মাড়াতে থাকবে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, “যালিম ও দাম্ভিকদেরকে কিয়ামতের দিন অণুর আকৃতিতে ক্ষুদ্র করে হাশর করানো হবে। মানুষ তাদেরকে পা দিয়ে মাড়াতে থাকবে।” তিরমিযী বর্ণনা করেছেন।

নাওয়াওদরুল উসুলে এসেছে, যে দুনিয়াতে যত বেশী অহংকারী হবে আখেরাতে সে তত বেশী ছোট কায়া বিশিষ্ট হবে আর এর উপর ভিত্তি করে যে যত বেশী আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনীত হবে সে সৃষ্টির উপর তত বেশী সম্মান ও মর্যাদা জনক গঠন লাভ করবে। যার অন্তরের মধ্যে সামান্য পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না”। বুখারী। আর জাহান্নাম হবে তাদের আবাসস্থল। আল্লাহ তাআলা বলেন,“ আর জান্নামেই কি অহংকারীদের জন্য আবাস স্থল নয়?” [সূরা আয যুমার, আয়াত নং-৬০]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, “তোমাদেরকে কি জাহান্নামের অধিবাসীদের ব্যাপারে খবর দিব না? প্রত্যেক সীমা লংঘন কারী, অশ্লীল ভাষী ও অহংকারী।” বুখারী ও মুসলিম।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন,“ জান্নাত এবং জাহান্নাম পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হলো। জাহান্নাম বলল, আমার মাঝে রয়েছে অত্যাচারী ও অহংকারীগণ আর জান্নাত বলল, আমার মাঝে রয়েছে দুর্বল ও মিসকীন মানুষগণ।” মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

হে মুসলমানগণ! অহংকার হচ্ছে রুবুবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। এ ব্যাপারে কারো ঝগড়া করার অধিকার নেই। যে ব্যক্তি এ বৈশিষ্ট্য নিজের জন্য দাবী করে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিয়ে থাকেন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, “পরাক্রম আমার তহবন আর অহংকার আমার চাদর যে এ দু নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করে আমি তাকে শাস্তি দিব।” মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ তাআলা হচ্ছেন একমাত্র অহংকারী। অহংকার শুধুমাত্র তার জন্যই সাজে। তাই তিনি স্বীয় স্বত্ত্বা সম্পর্কে বলেছেন, “পরাক্রমশালী, মহাক্ষমতাবান ও অহংকারী।”

এ কারণেই ইসলাম তার জন্য এককভাবে অহংকার, মহত্ত বড়ত্বের অধিকার সাব্যস্ত করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হতে পারে এমন সব পথ ও দিক ইসলামে হারাম করা হয়েছে। ফলে পুরুষের জন্য স্বর্ণও রেশমি কাপড় ব্যবহার করা হারাম করে দেয়া হয়েছে কেননা এতে অহংকার ও দাম্ভিক্যের হাতছানি রয়েছে। এ কারণেই যে ব্যক্তি তার তহবন বা লুঙ্গি টাখনুর নিছে পরে তাকে কঠোরভাবে শাস্তির হুমকি দেয়া হয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন দল লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না, উপরন্তু তাদের জন্য থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি”। এ কথা তিনি তিন বার বললেন, আবু যর (রাঃ) বললেন, তারা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হলো, তারা কারা? হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)? তিনি ফরমাইলেন, টাখনুর নিছে কাপড় পরিধান কারী, ভালো কাজ করে খোটাদানকারী এবং মিথ্যা শপথ করে যে তার পণ্য বিক্রির প্রচলন করে।” ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

এ কারণেই মুখ বাঁকা করা, অন্যদের প্রতি বিমুখ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং যুদ্ধ বিগ্রহের উদ্দেশ্য ব্যতীত অহংকারের সাথে হেলে দুলে চলাফেরা করাকে ইসলাম হারাম করে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তুমি তোমার মুখ মানুষের উদ্দেশ্যে বাঁকা করো না আর যমীনে উদ্ধতভাবে চলা ফেরা করো না।”[ সূরা লুকমান-১৮] ।

এ কারণেই কথাবার্তার ক্ষেত্রে ইনিয়ে বিনিয়ে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন তোমাদের মধ্যে আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত এবং কিয়ামতের দিন আমাহতে সবচেয়ে দুরবর্তী সে ব্যক্তি হবে যারা অধিক কথা বলে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলে এবং অহংকারে ভাব নিয়ে কথা বলে” ইমাম তিরমিযি বর্ণনা করেছেন।

সুতরাং অহংকার ও বড়াইয়ের চাদর নিজে থেকে খুলে নাও কেননা এ দুটি তোমার জন্য নয় স্রষ্টার জন্য আর বিনয় নম্রতার চাদর পরে নাও এটি তোমার জন্য। মনে রেখো যে অন্তরে সামান্য পরিমান অহংকার ঢুকেছে ততটুক পরিমান বা তার চেয়ে বেশি তার বিবেক ধ্বংস করেছে। অহংকারের মূল হচ্ছে প্রতিপালক সম্পর্কে এমনকি নিজের সম্পর্কে অজ্ঞতা। কেননা কেউ যদি আল্লাহর গুনাবলী সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অনুভব করত এবং নিজের দুর্বলতা ও ভুলত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারত তাহলে সে অহংকার করতে পারত না। সুফিয়ান ইবনে উইয়ানা (র:) বলেন, যার পাপ অহংকারের সাথে সম্পৃক্ত তার। উপর ধ্বংসের ভয় কর কেননা ইবলিস অহংকার করে পাপ করেছিল ফলে অভিশপ্ত হয়েছিল। সুতরাং যার অন্তরে অহংকার প্রবেশ করে আযাব অবশ্যই তার উপর আসবেই। যে অহংকারের দরজা নিজের জন্য খুলে দিল সে হরেক রকম অনিষ্ট ও পাপকর্মের দরজা নিজের জন্য খুলেদিল পক্ষান্তরে যে এই দরজা বন্ধ করতে পারল সে অসংখ্য কল্যাণের পথ নিজের জন্য খুলে দিল। এ কারণেই ঈমানের পরিপন্থি অহংকারের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি জান্নাতে যেতে পারবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা আমার ইবাদত থেকে অহংকার করে অচীরেই তারা জাহান্নামে লাঞ্ছিতভাবে প্রবেশ করবে।”[সুরা গাফির, আয়াত-৬০]

এক প্রকারের অহংকার হচ্ছে যা ইমানের পরিপন্থী, অহংকারীকে সত্যকে অস্বীকার করতে এমনকি মানুষদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে উদ্বুদ্ধ করে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” তারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! একজন লোক পছন্দ করে তার জামা কাপড় ও জুতা সুন্দর হোক তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “অহংকার হচ্ছে হক বা সত্যকে অস্বীকার করা আর মানুষদেরকে তুচ্ছ করা।” মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

কারো উপর গর্ব করো না, জেনে রাখো তোমার এ দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে। রাসূল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, “দুনিয়ার কোন কিছু এভাবে বেড়ে গেলে আল্লাহর উপর হক হচ্ছে তাকে পদানত করে দেয়া।” বুখারী বিনয়ের মাঝেই মূলত দুনিয়া ও আখেরাতের মর্যাদা নিহিত। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, যে কেউ আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয়ী হয় আল্লাহ তাকে সুউচ্চ মর্যাদা দান করেন।” মুসলিম।

তাইতো বিনয় নবী ও মর্যাদাবানদের চরিত্রের অন্যতম। মুসা (আঃ) দু’ অবলা নারীর জন্য পাথর উঠিয়ে দিয়েছেন যাদের পিতা অত্যন্ত বৃদ্ধ ছিল। দাউদ (আঃ) নিজ হাতের উপার্জন করে খেতেন। যাকারিয়া (আঃ) কাঠ মিস্ত্রি ছিলেন। ইসা (আঃ) বলতেন, “আমার মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের উদ্দেশ্যে (আমি প্রেরিত) আর তিনি আমাকে অহংকারী ও হতভাগ্য করেন নি।” [সূরা মারইয়াম-৩২)

সকল নবী ছাগল চরিয়েছেন। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন কোমল মনা,মুমিনদের প্রতি দয়ালু, তিনি মানুষদের বোঝা বহন করতেন। নিঃস্ব মানুষের জন্য উপার্জনের ব্যবস্থা করতেন। বিপদাপদে মানুষদেরকে সহায়তা দিতেন। গাধার উপর আরোহন করেছেন এবং তার পিছনে আরোহী নিয়েছেন। তিনি বালকদেরকে সালাম দিতেন। কারো সাথে সাক্ষাত হলে প্রথমে তাকে সালাম দিতেন। কেউ তাঁকে দাওয়াত দিলে তিনি তা কবুল করে হাজির হতেন যদিও তা হাড়ি জাতীয় সাধারণ খানা হয়। আয়েশা (রাঃ) কে যখন জিজ্ঞেস করা হলো রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে কি করতেন, উত্তরে তিনি বলেন, “ঘরে আসলে তিনি তার পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। আর যখন আযান হতো তিনি নামাযের জন্য বেরিয়ে যেতেন। বুখারী বর্ণনা করেছেন।

বিনয় ভালোবাসা ও সুসম্পর্কের মাধ্যম। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা আমার কাছে ওহী রেছেন যাতে তোমরা  বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন কর এবং একে অপরের উপর বড়াই ও সীমালঙ্ঘন না করো। – মুসলিম।

বিনয়ী সদা সর্বদা আল্লাহর প্রতি অবনত ও মুখাপেক্ষী হয়, মানুষদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ পরবশ। কারো কাছে নিজের হক আছে বলে মনে করে না। বরং নিজের উপর অন্যের মর্যাদাকে বড় করে দেখে। এ চরিত্র মূলত আল্লাহ যাকে পছন্দ করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। হে মুসলমানগণ! এর পর কথা হচ্ছে, আল্লাহর হকের পর সবচেয়ে সম্মানজনক বিনয় ও নম্রতা হচ্ছে মাতা পিতার সাথে বিনয় হওয়া। তাদের সাথে সদ্ব্যবহার, তাদেরকে সম্মান, পাপকাজ ছাড়া তাদের নির্দেশ ও কথা মানা ও তাদের প্রতি অনুগত হওয়া, তাদের জন্য অধিক পরিমাণে দোআ করা,কথা বার্তায় ও সম্বোধনে তাদের প্রতি কোমলতা ও সরলতা দেখানো ইত্যাদির মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “দয়া ও বিনয়ের পার্শ্ব তাদের জন্য অবনত করে দাও এবং বলল, হে আমার রব! তাদেরকে অনুগ্রহ কর যেভাবে তারা আমায় ছোট বেলায় লালন পালন করেছে। পক্ষান্তরে তাদের নির্দেশ অমান্য করা, তাদের উপর বড়াই করা, তাদের প্রয়োজন মিটানোর চেষ্টা না করে গড়িমসি করা একপ্রকারের অহংকার ও উদ্ধত্য এবং তাদের অবাধ্যতার শামিল। এ ধরনের কাজে লিপ্ত ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশের হুমকিপ্রাপ্ত।

সুতরাং দ্বীনের ক্ষেত্রে বিনয় ও নম্রতা গ্রহণ কর। কেউ যদি তোমাকে উপদেশ দেয় তা ভালোভাবে গ্রহণ কর, পাশাপাশি তার তকৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। ফুদাইল ইবনে ইয়াদ্ব (রহঃ) বলেন, “বিনয় হচ্ছে হক বা সত্যকে মেনে নেয়া এবং তার অনুসরণ করা।” এক লোক মালিক ইবনে মিগওয়াল (রহঃ) কে বলল, আল্লাহকে ভয় কর একথা শুনে তিনি তার পার্শ্বদেশকে যমীনে ফেলে দিলেন।

ছাত্র ও শিক্ষক উভয় একে অপরের প্রতি বিনয়ী ও নম্র হতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে হবে। হাদিস বিশারদদের ইমাম আবু মুসা আল মাদীনী (রহঃ) এত বিশাল মর্যাদা সম্মানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ছোট ছোট বালকদের তিনি টুলে বসে কুরআন শিক্ষা দিতেন।

অসুস্থদের সাথে বিনয় হচ্ছে তাদের দেখা শুনা করা, তাদের বিপদাপদে সহযোগিতা করা, তাদেরকে সওয়াব ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপদেশ দেয়া, এবং ভাগ্য নির্ধারণের উপর ধৈর্য ধারণ করার নসিহত করা।

ফকীর মিসকীন ও নিঃস্ব লোকদের সাথে নরম ব্যবহার কর, তোমার সম্পদ হতে কিছু দিয়ে তাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ কর, এবং তাদের প্রতি তোমার মর্যাদানুসারে বিনয়ী হও। বিশর ইবনে হারিস (রহঃ) বলেন, “ফকীরের সাথে উঠাবসা করে এমন ব্যক্তির চেয়ে উত্তম ধনী আমি আর কাউকে দেখিনি।” আল্লাহ তাআলা বলেন, “এটাই পরকালের আবাস যা আমি নির্ধারিত করি তাদের জন্য যারা এ পৃথীবীতে বড়াই ও বিপর্যয় করতে চায় না।” [সূরা আল কাসাস, আয়াত নং-৮৩]

হে মুসলমানগণ! আল্লাহ তাআলা বান্দার বিনয় ও নম্রতাকে ভালোবাসেন। মুসলমানদের প্রতি বিনয় হওয়া, তাদের সাথে কোমল ব্যবহার করা, তাদের দেয়া দুঃখ কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা মর্যাদা লাভের উপায়। আল্লাহ বলেন, “মুমিনদের জন্য তোমার পার্শ্বদেশকে অবনত করে দাও।”

এ সব কিছু করতে হবে তিলাওয়াতে কুরআন, উত্তম চরিত্র, নেক কাজ কষ্টদানকারী কাজ পরিহার এবং পরনিন্দা ও পরচর্চা পরিত্যাগ করার মাধ্যমে। তাইতো বিনয়ী যখন কাউকে দেখে মনে করে এব্যক্তি আমার চেয়ে উত্তম। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, “সবচেয়ে মর্যাদাবান ও সম্মানিত ব্যক্তি হচ্ছে সে যে ব্যক্তি নিজের মর্যাদাকে বড় করে দেখে। সর্বাধিক অনুগ্রহপ্রাপ্ত সে ব্যক্তি যে নিজের অনুগ্রহকে বড় করে দেখে। আর যখন আল্লাহ তোমার উপর কোন নেআমত দিয়ে থাকেন তা তুমি কৃতজ্ঞতা ও মুখাপেক্ষীতার সাথে বরণ কর।” আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেন, “বিনয়ের শীর্ষস্থান হচ্ছে তুমি নিজেকে দুনিয়ার নেআমতের ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির স্থানে রাখবে যার মর্যাদা ও অবস্থান তোমার চেয়ে নিচে, যাতে তুমি তাকে এ কথা বুঝাতে সক্ষম হও যে, দুনিয়ার কারণে তার উপর তোমার কোন মর্যাদা নেই।”

Source: www.alharamainonline.org

মতামত দিন