ইসলামিক গল্প

কাঠের ভেতর সোনার মোহর

ছোটোদের হাদিসের গল্প-৪
কাঠের ভেতর সোনার মোহর
অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক ব্যবসায়ী। তিনি খুবই সৎ ও আমানতদার। কথা দিয়ে কথা রাখেন। তার এক ধনী বন্ধু আছে। তিনিও ভালো মানুষ।
ব্যবসায়ী দূরের এক জায়গায় যাবেন ব্যাবসা করতে। সমূদ্রপথে। ব্যাবসার মালমাত্তা কেনার জন্য তার বেশ কিছু টাকা প্রয়োজন। তখন অবশ্য টাকা বলা হতো না। বলা হতো দিনার ও দিরহাম। দিনার হলো স্বর্ণমুদ্রা। দিরহাম হলো রুপোর মুদ্রা। যাহোক, ব্যবসায়ীর বেশ কিছু দিনার প্রয়োজন। কিন্তু তার কাছে ততো ছিল না। সে চিন্তা করলÑ কী করা যায়, কী করা যায়?

আচ্ছা, ধনী বন্ধুর কাছ থেকে তো ধার নেওয়া যায়। যদি তার থাকে। যেই ভাবা সেই কাজ। বন্ধুর কাছে এক হাজার দিনার ধার চাইলেন তিনি। এক হাজার দিনার মানে অনেক অনেক টাকা কিন্তু। এক হাজার সোনার মোহর! আজকের দিনে প্রায় পনেরো কোটি টাকা! মানে তিনি ধার চাইলেন পনেরো কোটি টাকা!
ধনী বন্ধু ব্যবসায়ীকে খুব বিশ্বাস করতেন। তাই এত টাকা ধার দিতেও রাজি হয়ে গেলেন। তিনি বললেন,
— ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি কয়েকজন সাক্ষী নিয়ে এসো, আমি তাদেরকে সাক্ষী রেখে তোমাকে এক হাজার সোনার মোহর ধার দেবো।’
— ‘সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট, আমরা আল্লাহকে সাক্ষী রাখব।’ ব্যবসায়ী বললেন। কারণ তখন তার হয়তো স্বাক্ষী জোগাড় করার মতো অত সময় ছিল না।
— ‘তা হলে একজন জামিনদার নিয়ে এসো।’
— ‘জামিনদার হিসেবেও আল্লাহই যথেষ্ট।’
ধনী লোকটি একটু ভাবলেন। তিনি ব্যবসায়ীর আমানতদারিতা সম্পর্কে জানতেন। তিনি জানেন, বন্ধুটি খুবই সৎ। তাই তিনি তাকে বিশ্বাস করলেন। তিনি বললেন,
— ‘তুমি সত্যই বলেছ। আল্লাহকেই আমরা সাক্ষী ও জামিনদার করলাম।’ এ বলে তিনি এক হাজার দিনার দিয়ে দিলেন। ধার ফেরত দেওয়ার একটি তারিখ ঠিক করলেন দুজনে মিলে।
তারপর ব্যবসায়ী তার বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওঠে গেলেন বড়ো নৌকায়। পাল তুলে দেওয়া হলো। শা শা বাতাসে এগিয়ে চলল নৌযান। আকাশের নীল এসে ছায়া ফেলেছে সাগরে। সাগরের পানিও নীল হয়ে গেছে তাতে। দেখতে বড়োই সুন্দর।
অনেক দূর-দূরান্তে ব্যাবসাপাতি করার পর অনেক লাভ হলো ব্যবসায়ীর। বাড়ির জন্য সদাইপাতি নিলেন। নিলেন আরও অনেক জিনিসপত্তর। তারপর তিনি গেলেন বন্দরে । যত তাড়াতাড়ি পারা যায় জাহাজে বা বড়ো নৌকায় চড়তে হবে তাকে। দেশে ফিরতে হবে। বন্ধুর কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণফেরতের তারিখ যে কাছাকাছি চলে এসেছে।
কিন্তু বন্দরে এসে তিনি খুবই হতাশ হলেন। সেদিকে যাবে এমন কোনো নৌকাই পাওয়া গেল না। পরদিন তিনি আবার ঘাটে গেলেন। না, আজকেও তিনি দেশে ফেরার নৌকা পেলেন না। পরদিন আবার। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। এদিক ধারের সেই মোহরগুলো ফেরতের সময় একেবারে কাছে চলে এসেছে। ওই তারিখে ফেরত দেবেন বলে তিনি আল্লাহকে সাক্ষী রেখেছেন। আল্লাহকেই তিনি জামিন করেছেন। এখন কী করবেন!
অনেক ভেবেচিন্তে ব্যবসায়ী একটি কাঠের বড়ো টুকরো জোগাড় করলেন। সেটার মাঝখানে খোদাই করলেন একটি গর্ত। এক হাজার সোনার মোহর একটি থলিতে ভরলেন। সাথে সেই বন্ধুর জন্য একটি ছোটো চিঠি লিখলেন। কাঠের গর্তে থলিটি রেখে ওপরে আবার কাঠ দিয়ে মুড়ে দিলেন। থলিটিতে যেন পানি না ঢুকে পড়ে সেভাবে করলেন সবকিছু। তারপর?
তারপর তিনি সাগরের পাড়ে এসে কাঠটি ভাসিয়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করলেন,
— ‘ও আল্লাহ্! তুমি তো জানো, আমি আমার বন্ধুর কাছ থেকে এক হাজার দিনার ধার করেছি। সে আমার কাছে জামিনদার চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, আল্লাহই জামিন। এতে সে রাজি হয়েছে। সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। সে তাও মেনে নিয়েছে। আমি তার ঋণ ফেরতের জন্য খুব চেষ্টা করেছি। কিন্তু দেশে ফেরার কোনো জাহাজ নৌকা পাইনি। তাই আমি তোমার নিকট এ সোনার মোহর সোপর্দ করলাম।’
অতঃপর লোকটি ফিরে গেলেন। এরপরেও তিনি দেশে ফেরার জন্য নৌযান খুঁজতে লাগলেন।
ওদিকে ব্যবসায়ীর ফেরার তারিখ ঘনিয়ে এসেছে। তাই ধনীলোকটি সমুদ্রতীরে এসেছে বন্ধুর খোঁজ নিতে। না, তার কোনো নাম নিশানা নেই। ওই দূরে তাকালেন লোকটি। না, কোনো জাহাজও ফিরে আসার নামটি নেই। ঘরে ফিরবেন ফিরবেন করছেন এমন সময় সাগরের তীরে তার চোখ আটকে গেল। বাহ্! কাঠটি বেশ তো! ঘরে নিয়ে গেলে রান্নাবান্নার কাজে আসবে। যেই ভাবা সেই কাজ। কাঠটি তুলে নিলেন তিনি।
ঘরে ফিরে কাঠটি চেরার জন্য কুড়াল নিলেন। কুড়াল নিয়ে যেই না কোপ দিলেন বেরিয়ে এলো একটি সুন্দর থলে। আশ্চর্য! কাঠের ভেতর থলে! কৌতূহলী হয়ে তিনি থলিটি খুললেন। বেরিয়ে এলো এক হাজার সোনার মোহর! আর একটি চিঠি! আর চিঠির প্রাপকের জায়গায় তারই নাম লেখা। চিঠি পড়ে তিনি বুঝতে পারলেন এ মোহর ও চিঠি তার বন্ধুই সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছেন। তার জন্য।
এরপর আরও অনেকদিন কেটে গেল। একসময় নৌকা পেয়ে গেলেন ব্যবসায়ী। দেশে ফিরেই তিনি এক হাজার সোনার মোহর নিয়ে বন্ধুর বাড়ি গেলেন। তিনি বললেন,
— ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমার ঋণ সময়মতো পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ফেরার জন্য নৌকা না পাওয়ায় যথাসময়ে আসতে পারিনি। এই নাও তোমার এক হাজার দিনার।’
— ‘তুমি কি কাউকে দিয়ে আমার নিকট কিছু পাঠিয়েছিলে?’ মুচকি হেসে ধনীবন্ধুটি বললেন।
— ‘না তো! আমি তো মাত্রই ফিরলাম। কাউকে দিয়ে তো কিছু পাঠািইনি! ’
— ‘তুমি কাঠের টুকরোর ভেতরে যা পাঠিয়েছিলে, তা আল্লাহ তায়ালা তোমার পক্ষ হতে আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন।’
দুই বন্ধু খুবই আনন্দিত হলেন। তারা আল্লাহকে শুকরিয়া জানালেন।
এ হাদিসটি যেখানে পাবেন
সহিহ বুখারি : ২১৪৫
অধ্যায় : কিতাবুল কাফালা (জামিন হওয়া অধ্যায়)
বর্ণনাকারী : আবু হুরায়রা রা.
হাদিসের মান : সহিহ

মতামত দিন

কমেন্ট