ইসলামের ইতিহাস

দেশ পরিচিতি : প্যারাগুয়ে প্রজাতন্ত্র

নাম : প্যারাগুয়ে প্রজাতন্ত্র। রাজধানী এবং বৃহত্তম নগরী অ্যাসানসিওন। প্যারাগুয়ে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ভূমি পরিবেষ্টিত একটি দেশ।

অবস্থান : প্যারাগুয়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণপশ্চিমে আর্জেন্টিনা, পূর্ব ও উত্তরপূর্বে ব্রাজিল এবং উত্তরপশ্চিমে বলিভিয়া। দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যাঞ্চলে অবস্থানের কারণে এই দেশটিকে কখনো কখনো কোরাজন ডি আমেরিকা বা আমেরিকার হৃদয় বলা হয়।

আয়তন ও জনসংখ্যা : প্যারাগুয়ের আয়তন ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪৬ বর্গমাইল। জনসংখ্যা ৬৭ লাখ ৩ হাজার ৮৬০ জন। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গমাইলে ৪২ জন। জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ মেসটিজো। মেসটিজোরা হচ্ছে স্পেনিশ ও আমেরিন্ডিয়ানদের মিশ্র বংশধর। জনসংখ্যার গড় আয়ু ৭৬.৮ বছর।

প্রধান ভাষা : স্পেনিশ ও গুয়ারানি। দু’টিই প্যারাগুয়ের সরকারী ভাষা।

প্রধান ধর্ম : প্যারাগুয়ের জনসংখ্যার শতকরা ৮৯.৬ ভাগ ক্যাথলিক, ৬.২ ভাগ প্রোটেস্ট, অন্যান্য খৃষ্টান ১.১ ভাগ, অন্যান্য ১.৯ ভাগ, অবিশ্বাসী ১.১ ভাগ। এদের মধ্যে মুসলিম ০.০২ ভাগ।

প্যারাগুয়েতে ইসলামঃ

১৯৯২ সালের আদমশুমারীতে প্যারাগুয়েতে ৮৭২ জন মুসলিম গণনা করা হয়। প্যারাগুয়েতে প্রায় ১০০০ হাজারের মতো মুসলিম বাস করে রাজধানী অ্যাসানসিওনে প্রায় ৭০টি মুসলিম পরিবারের বাস। ইতাপুয়ায়ও কিছু সংখ্যক মুসলিম বাস করে। বাকিরা অন্যান্য শহরগুলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অধিকাংশ মুসলিমই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সীমান্ত এলাকায় বাস করে। এদের বেশিরভাগই সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে আগত অভিবাসীদের বংশধর। এদের মধ্যে আবার বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত কিছু মুসলিমও রয়েছে। প্যারাগুয়েতে ‘সেন্ট্রো বিনিফিকো কালচারাল ইসলামিকো অ্যাসানসিওন’ এবং ‘ইসলামিক সেন্টার অব প্যাপরাগুয়ে’ নামে দু’টি সংগঠন রয়েছে। এখানে ওমর বিন খাত্তাব নামে একটি মসজিদ, আলী বিন আবি তালিবা এবং উতবা বিন নাফে নামে দুটি স্কুল আছে যেখানে মুসলিমদের শিশু সন্তানরা পড়াশোনা করে থাকে।

সরকার পদ্ধতিঃ

প্যারাগুয়ে একটি প্রতিনিধিতৃ মূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। প্রেসিডেন্ট একাধারে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। প্রশাসনিক এলাকা ১৭টি জেলা ও রাজধানী অঞ্চলে বিভক্ত। এদেশে সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। এদেশের পার্লামেন্ট দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট। ৪৫ আসনের সিনেটর চেম্বার এবং ৮০ আসনের ডেপুটি চেম্বার। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের মেয়াদ ৫ বছর প্যারাগুয়ের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন হোরাসিও কার্টিস। তিনি ২০১৩ সালের ১৫ই আগস থেকে ক্ষমতাসীন।

ভূ-প্রকৃতি : প্যারাগুয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী দ্বারা পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে বিভক্ত। নদীটি উত্তর থেকে দক্ষিণে দেশটির মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। পূর্বাঞ্চল পারানা এবং পশ্চিমাঞ্চল চাকো নামে পরিচিত। পূর্বে তৃণময় সমভূমি ও জঙ্গলময় পাহাড়ী অঞ্চল এবং পশ্চিমে বহুলাংশে নীচু ও জলমগ্ন সমভূমি। এদেশে প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও গরম আবহাওয়া বিরাজ করে। পূর্বাঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চলের একটি অংশ আধা বিরান ভূমি হতে চলেছে।

অর্থনীতি : ভূমি পরিবেষ্টিত প্যারাগুয়ের অর্থনীতি অনেকটা বাজার ভিত্তিক। এদেশে বহু ভোগ্যপণ্য আমদানি করে পার্শ্ববর্তী  দেশগুলোতে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া জনসংখ্যার একটা বড় অংশ কৃষিখাত থেকে জীবিকা উপার্জন করে। প্যারাগুয়ের মুদ্রার নাম গুয়ারানি।

প্রধান কৃষি পণ্য : তুলা, আখ, সয়াবিন, শসা, গম, তামাক, কাসাভা, ফল, শাকসবজি, গরুর গোশত, ডিম, দুধ ও কাঠ।

প্রধান শিল্প : চিনি, সিমেন্ট, বস্ত্র, পানীয়, কাঠজাত পণ্য, ইস্পাত, ধাতু ও বিদ্যুৎ শক্তি।

রফতানি পণ্য : সয়াবিন, পশুখাদ্য, তুলা, গোশত, ভোজ্য তেল, বিদ্যুৎ কাঠি ও চামড়া।

আমদানি পণ্য : যানবাহন, ভোগ্যপণ্য, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, তামাক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ট্রাক্টর কেমিকেল এবং যানবাহনের যন্ত্রাংশ।

প্রধান ব্যবসায়িক অংশীদার : ব্রাজিল, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।

ইতিহাস :

বর্তমান কালের প্যারাগুয়ে এককালে জঙ্গলময় ও উর্বর অঞ্চল ছিল। আর এখানে তখন বাস করতে প্রাক-কলম্বীয় সমাজ। সমাজটি বেশ কয়েকটি আধা যাযাবর গোত্র নিয়ে গঠিত ছিল। প্রচন্ড যুদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য তারা বেশ সুপরিচিত ছিল। এই আদিবাসী গোত্রগুলো পাঁচটি আঞ্চলিক ভাষা পরিবার এবং ১৭টি পৃথক জাতি ভাষাগত গ্রুপের সদস্য। প্যারাগুয়ের সমাজে এখনো তারা টিকে আছে।

ইউরোপীয়রা ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এই এলাকায় প্রথম আসে এবং স্পেনিশ অনুসন্ধানী জুয়ান ডি সালাজার ডি এসপিনোসা ১৫৩৭ সালে এ্যাসাশিওন নগরী প্রতিষ্ঠা শুরু করেন। নগরটি পরিশেষে একটি স্পেনিশ উপনিবেশিক প্রদেশের কেন্দ্রে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ আমেরিকার স্পেনিশ খৃষ্টান ধর্মসভার মিশন ও বসতির প্রাথমিক স্থানে পরিণত হয়। প্রায় ১৫০ বছর ধরে পূর্ব প্যারাগুয়েতে খৃষ্টান ধর্মসংঘগুলো প্রতিষ্ঠিত হয় ও বিস্তার লাভ করে। ১৭৬৭ সালে স্পেনিশ যুবরাজ এগুলোকে বহিস্কার করেন। প্যারাগুয়ে ১৮১১ সালের ১৫ই মে স্থানীয় স্পেনিশ প্রশাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তারা স্পেন থেকে স্বাধীন হয় বটে, তবে বুয়েনেস আয়ার্সের সাথে সম্পর্ক একটি অনাগ্রাসন চুক্তি পর্যায়ে সীমিত থাকে।

প্যারাগুয়ে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে নিয়ে গঠিত ত্রয়ী জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দক্ষিণ আমেরিকায় পাঁচ বছরব্যাপী ঐ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৮৭০ সালে পরাজিত হয়। উইলিয়াম ডি রুবিনস্টেইনের বর্ণনা অনুযায়ী, ঐ যুদ্ধে প্যারাগুয়ের সাড়ে চার লাখ থেকে নয় লাখের মধ্যবর্তী জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ২ লাখ ২১ হাজার বেঁচে যায়, যাদের মধ্যে মাত্র ২৮ হাজার ছিল প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ। প্যারাগুয়ে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার কাছে তার বিস্তৃত অঞ্চলও হারায়। আরেক বর্ণনায় বলা হয়েছে ঐ যুদ্ধে প্যারাগুয়ে তার প্রাপ্ত বয়স্ক দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষ হারায়।

১৯৩০ এর দশকে বলিভিয়ার সাথে প্যারাগুয়ের চাকো যুদ্ধ হয় এবং তাতে বলিভিয়া পরাজিত হয়। প্যারাগুয়ে চাকো নামে পরিচিত ঐ অঞ্চলে তার সার্বভৌমত্ব পুনঃ প্রতিষ্ঠা করে। তবে শান্তির মূল্য হিসেবে অতিরিক্ত আঞ্চলিক অর্জন হারায়।

প্যারাগুয়ের ইতিহাসের সরকারী বর্ণনা নিয়ে ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনাবলী বিশেষ করে যুদ্ধের যথার্থ বর্ণনা, সেটি প্যারাগুয়ে, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, ব্রাজিল, বলিভিয়া, ইউরোপ অর্থ উত্তর আমেরিকায় লিখিত হয়েছে কিনা তার ওপর নির্ভর করে, কমবেশী হয়ে থাকে। কলোরাডো পার্টি ও লিবারেল পার্টি প্যারাগুয়ের ইতিহাসের সরকারী সংস্করণ সংরক্ষণ করে। ১৮৬৯ সালে রাজধানী এ্যাসাশিওন নগরী লুণ্ঠনের সময় ব্রাজিলের রাজকীয় সেনাবাহিনী প্যারাগুয়ের জাতীয় মহাফেজখানা তছনচ করে এবং সেটি রিও ডি জেনিরোতে নিয়ে যায় এবং সেখানে গোপনে রাখে। এর ফলে উপনিবেশিক ও প্যারাগুয়ের ইতিহাসের প্রাথমিক জাতীয় আমলের ইতিহাস জানা কঠিন হয়ে পড়ে।

১৯০৪ ও ১৯৫৪ সালের মধ্যে প্যারাগুয়েতে ৩১ জন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন এবং তাদের বেশীরভাগকেই জোরপূর্বক ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়। ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আলফ্রেড স্ট্রোয়েসনার এবং কলোরাডো পার্টি প্যারাগুয়ে শাসন করে। এই একনায়ক অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের যুগ তত্ত্বাবধান করেন, তবে নগণ্য মানবাধিকার ও পরিবেশ রেকর্ডের বিনিময়ে। তখন রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্যাতন ও মৃত্যু ছিল নিয়মিত ঘটনা। তার ক্ষমতাচ্যুতির পরও কলোরাডো পার্টি ২০০৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে প্রাধান্য অব্যাহত রাখে।

বামপন্থী সাবেক বিশপ ফারনান্ডো লুগো ২০০৮ সালে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন পার্টির প্রার্থীকে পরাজিত করে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেন এবং ৬১ বছরের রক্ষণশীল শাসনের অবসান ঘটান। লুগো কলোরাডো পার্টিও প্রার্থী বানকা ওভেলারের প্রাপ্ত প্রায় ৩১ শতাংশ ভোটের বিপরীতে প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।

স্বাধীনতার পর ১৮১৪ সালে প্যারাগুয়ের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন জোসে গাসপার রডরিগজ ডি ফ্রানসিয়া। তিনি নতুন আইন প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে চার্চ ও মন্ত্রিসভার ক্ষমতা কমবেশি পুরোপুরি বাতিল করা হয়, উপনিবেশিক নাগরিকদের মধ্যে পরস্পরের বিয়ে নিষিদ্ধ করা হয় তবে শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ, বর্ণসঙ্কর ও স্থানীয়দের বিয়ে করার সুযোগ রাখা হয়। তিনি সেইসাথে প্যারাগুয়েকে অবশিষ্ট দক্ষিণ আমেরিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪০ এর দশকের শেষের দিকে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার লড়াইয়ের দরুন প্যারাগুয়ের রাজনীতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। অতঃপর ১৯৫৪ সালে একনায়ক আলফ্রেডো স্ট্রোয়েসনারের স্থিতিশীল প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকেন।

স্ট্রোয়েসনার ১৯৮৯ সালের তেসরা ফেব্রুয়ারী জেনারেল আনড্রেস রডরিগজের নেতৃত্বে এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচত হন। রডরিগজ প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯৩ সালে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জুয়ান কার্লোস ওয়াসমোসি প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে দেশের প্রথম বেসামরিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্যারাগুয়ের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন হোরাসিও কার্টিস। তিনি ২০১৩ সালের ১৫ই আগস্ট থেকে ক্ষমতাসীন।

শিক্ষাঃ প্যারাগুয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রধানত ৩টি স্তরে বিভক্ত। প্রাথমিক, সেকেণ্ডারী এবং টারসিয়ারি বা উচ্চ শিক্ষা। তবে প্রাথমিক এবং সেকেণ্ডারী পর্যায়ের মাঝখানে মধ্য পর্যায় নামে একটি বিভাগ রয়েছে। ৭ বছর বয়স থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক। সেকেণ্ডারী শিক্ষার পরই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়।

তথ্যসূত্রঃ

১. http://www.infoplease.com/country/paraguay.html

২. https://en.wikipedia.org/wiki/paraguay

সংকলনে : মুহাম্মাদ ইউছুফ [মাসিক পৃথিবী পুরনো সংখ্যা থেকে সংকলিত]

মতামত দিন