ইসলামের ইতিহাস

দেশ পরিচিতি : জ্যামাইকা

নাম : জ্যামাইকা। রাজধানী কিংস্টোন। এটি জ্যামাইকার সবচেয়ে বড় শহর।

অবস্থান : জ্যামাইকা উত্তর আমেরিকায় ক্যারিবীয় সাগরের তীরে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র। এটি কিউবার ১৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং হাইতি থেকে ১৬১ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থতি দ্বীপগুলোর মধ্যে এটি চতুর্থ বৃহৎ। জ্যামাইকার আবহাওয়া গ্রীষ্মমন্ডলীয়, গরম, অত্র এবং অভ্যন্তরভাগ নাতিশীতোষ্ণ।

আয়তন এবং জনসংখ্যা : জ্যামাইকার আয়তন ৪ হাজার ২৪৪ বর্গমাইল বা ১০,৯৯১ বর্গ কিমি.। দ্বীপরাষ্ট্রটি দৈর্ঘ্যে ১৪৫ মাইল এবং প্রস্থে ৫০ মাইল। জনসংখ্যা ২৯ লাখ ৩০ হাজার ৫০ জন (২০১৪) জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গমাইলে ৬৯০ জন।

প্রধান জাতিগত গ্রুপ : কৃষ্ণাঙ্গ ৯২.১ ভাগ, মিশ্র ৬.১ ভাগ, ইস্ট ইন্ডিয়ান ০.৮ ভাগ, এবং অন্যান্য ০.৪ ভাগ, চিহ্নিত করা যায়নি ০.৭ ভাগ।

প্রধান ধর্ম : প্রটেস্ট্যান্ট ৬৪.৮ ভাগ, রোমান ক্যাথলিক ২.২ ভাগ, অন্যান্য ৯.৫ ভাগ, অধার্মিক ২১.৩ ভাগ, চিহ্নিত করা যায়নি ২.২ ভাগ।

প্রধান ভাষা : ইংরেজী এবং জ্যামাইকান ক্রিওলি।

জ্যামাইকায় ইসলাম :

জ্যামাইকার প্রথম মুসলিমরা হলেন ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া পশ্চিম আফ্রিকান দাস। তারা জাহাজে করে জ্যামাইকায় আসে। জাতিগত গ্রুপগুলোর সাথে বাধ্যতামূলক মিশ্রণের কারণে। তাদের বেশিরভাগ ইসলামী আদর্শ হারিয়ে ফেলে। মানডিনকা, ফুলা, সুসু, আশানতি ও হাওসা ইসলামী জাতিগত গ্রুপের মুমিনান দাসরা যখন জ্যামাইকায় চাষাবাসের কাজ করতো তখন গোপনে তারা ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা চালাতো। কিন্তু যখন দাসরা মুক্তি পেল ততদিনে তাদের অতীতের মুসলিম বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনেকাংশে ম্লান হয়ে যায়। ফলে মুক্ত দাসরা তাদের প্রভুদের চাপিয়ে দেয়া ধর্মের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে।

১৮৪৫ ও ১৯১৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে যে ৩৭ হাজার ভারতীয় অভিবাসী জ্যামাইকায় যায়। তাদের প্রায় ১৬ শতাংশ ছিল মুসলিম।

বর্তমানে জ্যামাইকায় মুসলিমদের মোট সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। এদেশে বেশ কয়েকটি ইসলামী সংস্থা ও মসজিদ আছে। রাজধানী কিংস্টনে রয়েছে জ্যামাইকা ইসলামী কাউন্সিল এবং ইসলামী শিক্ষা ও দাওয়াহ কেন্দ্র। এই দু’টি সংস্থায় ইসলাম শিক্ষা দেওয়া হয় ও জামায়াতে নামায পড়া হয়। কিংস্টনের বাইরে ম্যানডেভিলে রয়েছে মসজিদ আল হক, নেগ্রিলে মসজিদ আল-ইহসান, ওচো রিওসে মসজিদ-ই-হিকমাহ এবং সেন্ট মেরীতে পোর্ট মারিয়া ইসলামিক সেন্টার।

অর্থনীতি :

জ্যামাইকায় প্রাকৃতিক সম্পদ বিদ্যমান। প্রাথমিকভাবে বক্সাইট উত্তোলন, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ এবং পর্যটনের জন্য জ্যামাইকার জলবায়ু খুবই উপযোগী। এক সময় জ্যামাইকার অর্থনীতি চিনি ও কলা নির্ভর ছিল। ১৯৪০ সালের দিকে বক্সাইট আবিষ্কার এবং বক্সাইট এলুমিনিয়াম শিল্পের প্রতিষ্ঠার ফলে জ্যামাইকার অর্থনীতি এদিকে স্থানান্তরিত হয়। এমনকি ১৯৭০ এর দশকে খনিজ রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছিল। মুদ্রার নাম জ্যামাইকা ডলার যা ১০০ সেন্টে বিভক্ত। এক ডলার সমান ৮৮.৬৭ জ্যামাইকা ডলার। দেশের অর্থনীতি বহুলাংশে সেবাখাতের ওপর নির্ভরশীল। জিডিপির ৬০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। দেশটির বেশিরভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আসে পর্যটন, রেমিটেন্স এবং বক্সাইট/এলুমিনা রফতানি থেকে।

কৃষি পণ্য : আখ, টক ফল, কলা, কফি, মিষ্টি আলু, শাক-সবজি, তরমুজ-বাঙ্গি ইত্যাদি; গবাদি পশুর মধ্যে রয়েছে গরু-মহিষ ও ছাগল। এদেশের বনে রয়েছে গোলাকার কাঠ।

খনিজ সম্পদ : বক্সাইট, এলুমিনা ও জিপসাম।

প্রধান শিল্প : পর্যটন, বক্সাইট/এলুমিনা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, হালকা তৈরি শিল্প, সিমেন্ট, ধাতব, কাগজ, কেমিকেল দ্রব্য ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, পশুখাদ্য ও চিনি। এদেশের মোট ভূমির ১৬.১ ভাগে অস্থায়ী ফসল, ১০.২ ভাগে স্থায়ী ফসল, ২১.১ ভাগে চারণভূমি এবং ৩০ ভাগে সার্বিক বন এলাকা রয়েছে।

প্রধান আমদানি পণ্য : খাদ্য ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য, মূলধনী পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও পরিবহণ সরঞ্জাম, নির্মাণ সরঞ্জাম, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, অন্যান্য জ্বালানি ও লুব্রিক্যান্ট, অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম।

প্রধাণ রফতানি পণ্য : এলুমিনা, বক্সাইট, খনিজ জ্বালানি, কেমিকেল, পোশাক, পরিশোধিত চিনি, মিষ্টি আলু ও কফি।

আমদানি-রফতানি শরীক : যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, ত্রিনিনাদ ও টোবাগো, ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ে।

সরকার পদ্ধতি :

জ্যামাইকায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভাসহ (২১ সদস্যের সিনেট এবং ৬০ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদ) সংসদীয় রাজতন্ত্র পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। জ্যামাইকার রাষ্ট্রপ্রধান হচ্ছেন রাণী এলিজাবেথ দ্বিতীয়। প্রধানমন্ত্রী এনড্রিও হলনেস। তিনি ৩ মার্চ ২০১৬ থেকে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে আছেন।

সামরিক বাহিনী :

জ্যামাইকার সক্রিয় সৈন্য সংখ্যা ৩,৪৫০ জন। সেনাবাহিনীতে যোগদানের বয়স ১৭ বছর। প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট জাতীয় উৎপাদনের ০.৬ ভাগ।

ইতিহাস :

ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯৪ সালে এই দ্বীপটি আবিস্কার করেন। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে স্পেনিশরা এখানে বসতি স্থাপন করে। বহু শতাব্দী ধরে জ্যামাইকায় বসবাস করে আসা স্থানীয় তাইনো ইন্ডিয়ানদেরকে ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয় এবং আফ্রিকান ক্রীতদাসরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। ইংল্যান্ড ১৬৫৫ সালে দ্বীপটি দখল করে এবং আখ, কোকা ও কফি ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলে। ১৮৩৪ সালে দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটলে প্রায় আড়াই লাখ ক্রীতদাস মুক্তি পায় এবং তাদের অনেকেই ছোট চাষীতে পরিণত হয়। জ্যামাইকা ক্রমান্বয়ে বৃটেন থেকে ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতা লাভ করতে থাকে। ১৯৫৮ সালে জ্যামাইকা অন্যান্য বৃটিশ উপনিবেশের সাথে যোগ দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফেডারেশন গঠন করে। জ্যামাইকা ১৯৬২ সালের ৬ই অগাস্ট ফেডারেশন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭০ এর দশকে অবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে উপর্যুপরি সহিংসতা ঘটে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী দুবৃত্ত দলগুলো শক্তিশালী সুসংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্কে পরিণত হয় এবং আন্তর্জাতিক মাদক ও অর্থ পাচারে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রচন্ড অপরাধ, মাদক পাচার ও দারিদ্র সরকারের প্রতি তাৎপর্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে রেখেছে। তবুও বহু গ্রামীণ ও অবকাশ এলাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং দেশের অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে।

৬০০ খৃস্টাব্দে আরাওয়াক ইন্ডিয়ানরা জ্যামাইকা দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। আরেক বর্ণনায় বলা হয়, দক্ষিণ আমেরিকায় উদ্ভূত আরাওয়াক ও তাইনো দেশীয় জনগণ খৃস্টপূর্ব ৪০০০ থেকে ১০০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এই দ্বীপটিতে বসতি স্থাপন করে। ১৪৯৪ সালে জ্যামাইকা দ্বীপ ক্রিস্টোফার কলম্বাসের দৃষ্টিগোচর হয়। স্পেন ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দ্বীপটিকে। উপনিবেশে পরিণত করে কিন্তু স্বর্ণের মজুদ না থাকায় এটাকে অবহেলা করে। বৃটেন ১৬৫৫ সালে এর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে এবং অষ্টাদশ শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই ক্রীতদাস শ্রমিকদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ চিনি উৎপাদনের দরুন জ্যামাইকা অন্যতম মূল্যবান উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৮৩০ এর দশকের শেষ দিকে দাস প্রথা বিলুপ্ত হয় এবং চাষাবাদ প্রথা ভেঙ্গে পড়ে। জ্যামাইকা ১৯৫৯ সালে অভ্যন্তরীণ স্বশাসন লাভ করে এবং ১৯৬২ সালে বৃটিশ কমনওয়েলথের আওতায় স্বাধীন দেশে পরিণত হয়।

তথ্যসূত্র :

১. http://www.infoplease.com/country/jamaica.html

২. https://en.wikipedia.org/wiki/jamaica

গ্রন্থনায় : মুহাম্মাদ ইউছুফ

[মাসিক পৃথিবী থেকে সংগৃহীত]

মতামত দিন