ইসলামের ইতিহাস

শেকড়ের সন্ধানে : আফগানিস্তান পর্ব

আজকের রাজনৈতিক ভৌগলিক সীমারেখার আফগানিস্তান জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ইতিহাসের পাতায় কতটুকু জায়গা করে নিতে পারবে, সেই প্রশ্ন ভবিষ্যতের জন্য রেখে একটু অতীতে চলে যাই। আমরা সেই সোনালী অতীতে একটু ঘুরে আসি, যখন আফগানিস্তান নামক রাষ্ট্রটি ছিলো অসংখ্য মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকীহ, জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ, চিকিৎসক, ভাষাবিদ ও কবি- সাহিত্যিকদের জন্মভূমি খোরাসানের অন্তর্গত একটি অঞ্চল। আজ যদিও রাজনৈতিক মানচিত্রে খোরাসার নামক কোন স্বাধীন দেশের স্হান হয়নি, তবে সে স্হান করে নিয়েছে পৃথিবির তাবৎ ঘটনাবলির বিবরণ সংরক্ষণকারী মহাকালের লাইব্রেরিতে সজ্জিত সহস্র গ্রন্থের পাতায়। যা মহাপ্রলয় ছাড়া বিলুপ্ত হবার নয়।

যখন ইসলামের সুমহান বানী ছড়িয়ে পড়ল আরব উপদ্বীপের বাইরে, তখন ইসলামের অনুপম আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতে লাগলো ক্রমাগত দূর্বল হয়ে পড়া পারস্য সাম্রাজ্যের অধিবাসিরা। আর যারা পথের কাঁটা হয়ে পথ আগলে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছিলো এবং পুর্বের অত্যাচার ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্হা টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো,তাদের ফায়সালা হয়েছিলো রণাঙ্গনে। এভাবেই জুলুমবাজদের ভিত কাঁপিয়ে আহনাফ বিন কায়েসের নেতৃত্বে একদল মুসলিম বাহিনির বিজয়রথ বিস্তৃত হয়ে পৌছে গিয়েছিলো বর্তমান আফগানিস্তানের সিজিস্তান, হেরাত, কাবুল, গজনী পর্যন্ত। এ বিজয় ছিলো ওমর এবং উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমার শাসনামলে।

বলখের রাজধানী মাজার-ই শরিফের নিল মসজিদ+ মাজার। স্থানীয়রা বিশ্বাস করে এটি আলী রাঃ এর মাজার। এটি যে ভুল বিশ্বাস তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

★সোনালী যুগেই যেহেতু এখানে ইসলামের আগমন ঘটেছে, এ ভূমিও জন্ম দিয়েছে অজস্র সোনার মানুষ- যাদের হাতে সোনালী ফসল ফলেছে। এ ভূমি উপহার দিয়েছে এমন কিছু আলোকিত নক্ষত্রমালা, যা জ্ঞানের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখায় গবেষণারত অনুসন্ধিৎসুদের পথ দেখিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত- যেমনিভাবে তিমিররাতে সাগর পাড়ের বাতিঘর পথ দেখিয়ে যায় সমুদ্রের বুকে চলমান জাহাজের কাপ্তান কে। চলুন তাহলে এবার পরিচিত হই আফগানিস্তানের সেসকল উল্লেখযোগ্য কিছু ভূমির সাথে, যেখানে গ্রোথিত আছে মহান মনীষিদের শেকড়ঃ

# হেরাতঃ এখানে যে সকল বিদ্বানগণ জন্মগ্রহণ করেছেন বা জীবনের একটা বড় অংশ অতিবাহিত করে মারা গেছেন, তারা স্হানটির দিকে সম্পৃক্ত করে নামের শেষ “আল-হারাওয়ী” যুক্ত করেন। এ ভূমি এমন অসংখ্য বিদ্বান উপহার দিয়েছে, যারা নামের শেষে হারাওয়ী যুক্ত করেন। তন্মধ্যে বিশিষ্ট ভাষাবিদ আবুল মানসুর আল আজহারি (২৮২-৩৭০হিঃ), “তাহজিবুল লুগাহ” নামক গ্রন্হের লেখক। যেটি গবেষকদের নিকট প্রমাণপঞ্জি হিসেবে সমাদৃত।

# বলখঃ আফগানিস্তানের এ প্রদেশটির রাজধানি হলো মাজার-ই শরিফ যা পরিচিত একটি নাম। উক্ত শহরের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করে “বলখী” যুক্ত করেন এমন মনীষা জ্ঞানের জগতে অনেক। এর মাঝে হলেনঃ প্রখ্যাত তাবেয়ী, তাফসির বিশারদ যাহ্হাক ইবনু মুযাহেম আল-বলখী (মৃঃ১০০হিঃ পরে)। আরেকজন হলেন উপমহাদেশের মানুষের নিকট অত্যন্ত পরিচিত মুখ, “মসনবিয়ে রুমি” এর রচয়িতা, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি আল- বলখি (৬০৪-৬৭২ হিঃ)। তিনি জন্মগ্রহণ করেন বলখে তবে পরবর্তিতে হিজরত করে বর্তমান তুরস্কের ক্বুনিয়া শহরে চলে যান এবং আমৃত্যু সেখানেই অবস্হান করেন। তুরস্ক যেহেতু পূর্ব রোম (বাইজানটাইন/কনস্টান্টিনোপল) এর কেন্দ্র ছিলো তাই তিনি সেখানে আমৃত্যু বসবাস করার কারণে রুমি নামে পরিচিত হন

# সিজিস্তানঃ এটি সিস্তান নামেও পরিচিত। শহরটির বৃহৎ অংশ ইরানে অবস্হিত এবং বাকি অংশ আফগানিস্তানে। বর্তমানের আফগান অংশেই জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আবূ দাউদ আস-সিজিস্তানী রহঃ (মৃঃ২৭৫ হিঃ)। তাঁর অমর রচনা হলো “সুনানু আবি দাউদ” যা মূলত বিধিবিধানমূলক হাদিসের উপর রচিত এবং কুতুবুস সিত্তাহ বা মৌলিক ছয়টি হাদিসগ্রন্হের অন্তর্ভূক্ত।

# বাগলানঃ আফগানিস্তানের ৩৪ প্রদেশের একটি প্রদেশ হলো বাগলান, যেখানে জন্মেছিলেন প্রখ্যাত হাদিসের পন্ডিত, অসংখ্য জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণের শিক্ষক ক্বুতায়বা ইবনু সাঈদ আল-বাগলানী রহঃ (১৪৯-২৪০ হিঃ)। তাঁর নিকটে হাদিস শিক্ষালাভ করেছেন ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবূ দাউদ এর মত মনীষাগণ।

# গজনীঃ শহরটি ইসলামের ইতিহাসে স্হান করে নিয়েছে মূলত এটাকে কেন্দ্র করে গজনী শাসন ব্যবস্হার গোড়াপত্তন হওয়ার কারণে। উক্ত নামে সুন্নি রাস্ট্রটির সময়কাল ছিলো ৯৬১ খ্রি: হতে ১১৮৬ খ্রিঃ পর্যন্ত। এদের একজন অন্যতম শাসক হলেন সুলতান মাহমুদ গজনবী (৯৭১ -১০৩০খ্রিঃ)। যার উপাধি হলো ফাতিহুল হিন্দ বা হিন্দুস্তান বিজেতা। এ শহরে শায়িত আছেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ, গণিতজ্ঞ আবু রাইহান আল-বেরুনী। তার রয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ। তন্মধ্যে হলো “আল -কানূন আল- মাসউদি”। গ্রন্থটিতে জ্যোতির্বিদ্যা ও ত্রিকোণমিতি স্হান পেয়েছে। গ্রন্থটি সুলতান মাহমুদের ছেলে সুলতান মাসউদের নামে নামকরণ করা হয়, এ জন্য গজনির সুলতান মাসউদ আনন্দচিত্তে বৃহতপরিমাণ সম্পদ উপঢৌকন দিলেও তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। এর দ্বারা প্রমাণ হয় তিনি সুলতানকে ভালোবসেই বইটির নামকরণ করেছিলেন, দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়।

গজনী শাসনামলের অধিভুক্ত অঞ্চলেরর মানচিত্র। কমলা কালারের রেখা বর্তমান ভৌগলিক সীমানার নির্দেশক।

আফগানের এছাড়াও উল্লেখযোগ্য মনীষিদের শহর হলো যুউজাযান ফারয়াব সহ অনেক। স্ট্যাসটি দীর্ঘ হতে হতে বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে যাওয়ার আশংকায় এখানেই ইতি টানছি।

রচনায়: রায়হান উদ্দিন

ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা।

Source

মতামত দিন