আখলাক

প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার

সমাজে বাস করতে হলে সমাজের সব মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। কারণ সমাজে প্রত্যেকেই একে অপরের উপর নির্ভরশীল। মানুষ তার দৈনন্দিন কাজে প্রত্যেকটি ব্যাপারে একে অপরের সাহায্য ও সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারে না। মানুষ সমাজে যাদের সাথে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করে এবং একসঙ্গে কাজ করে ইসলামের পরিভাষায় এরা সবাই প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর আওতাভুক্ত কারা? এ সম্পর্কে রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা। হলে তিনি বলেন- “সম্মুখে, পশ্চাতে, ডানে ও বামে চারদিকে চল্লিশ বাড়ি পর্যন্ত সকলেই প্রতিবেশী।”

কুরআন ও হাদীসে প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রতিটি মুসলিম পরিবারকে তাদের প্রতিবেশীদের অধিকার সম্পর্কে সবসময় সতর্ক থাকা উচিত। কেননা এসব অধিকার রক্ষা করা বা না করার উপর ঈমানের যথার্থতা নির্ভর করে। প্রতিবেশীরা পরস্পরের সাথে ভালো ব্যবহার করলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। কারো প্রতিবেশী ভালো হলে তিনি শান্তিতে বাস করতে পারেন আর মন্দ হলে তাকে অশান্তিতে বাস করতে হয়।

নিম্নে প্রতিবেশীদের সাথে কিভাবে ভালো ব্যবহার করতে হবে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলোঃ

ভালো ব্যবহার বলতে কি বুঝায়?

কুরআনে আল্লাহ মানুষের সাথে ভালো কথা ও সুন্দর কথা বলতে বলেছেন। ভালো ব্যবহার বলতে আমরা যা বুঝি তা হচ্ছে- কারো সাথে সুন্দর করে কথা বলা, মন্দ কথা না বলা, ঝগড়া না করা, ধমক বা রাগের সুরে কথা না বলা, কারো সম্পর্কে অনুমান করে কিছু বলা, গীবত না করা, তাকে অপমান না করা, দেখা হলে সালাম দেয়া, এবং সব সময় হাসিমুখে কথা বলা। অপরের সুখে সুখী হওয়া এবং অপরের দুঃখে দুঃখী হওয়াও ভালো ব্যবহারের অন্তর্ভুক্ত। মানুষের সাথে এমন কোনো ব্যবহার করা যাবেনা যাতে সে অসন্তুষ্ট হয় বা মনে কষ্ট পায়। ভালো ব্যবহার না করলে সম্পর্ক বিনষ্ট হয় এবং অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। নবী সা. বলেছেন,

“তোমরা হাসিমুখে যদি নিজের ভাইয়ের দিকে তাকাও তাও সাদাকায় (দান) পরিণত। হয়।” হাসিমুখে একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার গুরুত্ব অপরিসীম। অনেকেরই এ কথা জানা নেই যে, তার ব্যক্তিত্বে কি পরিমাণ শক্তি লুকায়িত আছে? তা তার ঈষৎ হাসি দিয়েই বুঝা যায়।

ভালো ব্যবহারের ফলে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে এবং অনেক সময় শত্রু বন্ধু হয়ে যায়। যারা ভালো ব্যবহার করে তাদেরকে সবাই পছন্দ করে। তাই আমাদের সবার উচিত সর্বক্ষেত্রে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করা।

ইসলামে ভালো ব্যবহারের গুরুত্ব। ইসলামে ভালো ব্যবহারের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কুরআনে বলা। হয়েছে- “হে ঈমানদাররা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সহজ সরলভাবে কথা বলো।”

ইসলামে সবার সাথে সুন্দর ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং দয়া, সহানুভূতি ও নম্রভাবে কথা বলতে বলা হয়েছে। সবার সাথে হৃদয়স্পর্শী কথা বলতে বলা হয়েছে। হাদীসে বলা হয়েছে-

“মুমিন সে নয়, যে উপহাস করে, অভিশাপ দেয়, অশ্লীল ভাষায় কথা বলে এবং যে বাচাল।”

তাই আমাদের প্রকৃত মুসলমান হতে হলে অবশ্যই সুন্দর আচরণ করা উচিত এবং এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যে আচরণে অপরের মনে কষ্ট লাগে। মহানবী (সা) সবার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। কেউ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করলেও তিনি তার সঙ্গে ভালো ব্যবহারই করতেন। রাসূল (সা) এর উম্মত হিসেবে আমাদেরও উচিত তার আদর্শ অনুসরণ করা।

প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহারের গুরুত্ব

মহানবী সা. বলেছেন, “জিবরাইল আমাকে সবসময়ে প্রতিবেশীদের সাথে ভালো ব্যবহার। করার জন্য তাকীদ করতেন। এতে আমার ধারণা হচ্ছিল হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হবে।” (বুখারী, মুসলিম)

সুতরাং এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে প্রতিবেশীদের সাথে ভালো ব্যবহারের গুরুত্ব কতখানি। মুসলমান এবং অমুসলমান উভয় ধরনের প্রতিবেশীদের সাথেই ভালো ব্যবহার করা উচিত। প্রতিবেশীদের সাথে ভালো ব্যবহার করলে আল্লাহ খুশি হন, রাসূল খুশি হন, প্রতিবেশীরা খুশি হন এবং নিজের মনেও প্রশান্তি আসে। কর্মক্ষেত্রের সঙ্গী, সহযোগী এবং আশেপাশের লোকেরা এমনকি ভ্রমণসঙ্গী—এরা সবাই আমাদের প্রতিবেশী। এদের সবার সঙ্গেই সুন্দর আচরণ করা উচিত। এক ব্যক্তি রাসূলকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ওগো আল্লাহর রাসূল! আমি ভালো করছি না মন্দ ব্যবহার করছি তা কি করে জানবো? তিনি বললেন, যখন তোমার প্রতিবেশীকে বলতে শুনবে, তুমি ভালো করছে, তখন তুমি প্রকৃতই ভালো করছো, আর যখন প্রতিবেশীরা বলবে তুমি মন্দ করছে, তখন তুমি সত্যি মন্দ করছে।”

রাসূলে করীম (সা) প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

ভালো প্রতিবেশী ও মন্দ প্রতিবেশী

আমাদের সমাজে ভালো ও মন্দ উভয় ধরনের প্রতিবেশীই রয়েছে। ভালো প্রতিবেশী হচ্ছে তারা, যারা সব সময় অন্য প্রতিবেশীদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, প্রতিবেশীর আনন্দে আনন্দ প্রকাশ কর ও দুঃখ-কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করে। প্রতিবেশী কোনো বিপদে। পড়লে সাহায্য করে, সাধ্যানুসারে প্রতিবেশীর উপকার করে। বাসায় কোনো কিছু রান্না হলে তা থেকে প্রতিবেশীকে পাঠায়, প্রতিবেশীকে উপহার দেয়। কোনো অনুষ্ঠান হলে প্রতিবেশীকে দাওয়াত দেয় এবং প্রতিবেশী কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিলে তাতে অংশগ্রহণ করে। প্রতিবেশীর দুর্নাম বলে বেড়ায় না। সর্বোপরি প্রতিবেশীর সবকিছুতে ভালো হোক এটাই চায়।

আর খারাপ প্রতিবেশী বলতে বুঝায় যারা সবসময় প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া-বিবাদ করে, প্রতিবেশীর দুর্নাম রটায়, প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখেনা। বিপদে এগিয়ে আসেনা। প্রতিবেশীদের হিংসা করে অর্থাৎ যারা সবসময় প্রতিবেশীর কিভাবে ক্ষতি করা যায় সে। চেষ্টায় থাকে।

প্রতিবেশীর অধিকার

একজন প্রতিবেশীর প্রতি আরেকজন প্রতিবেশীর বিরাট অধিকার রয়েছে। হাদীসে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি নিজের প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেট পুরে খায়, সে মুমিন নয়।” প্রতিবেশী অভাবগ্রস্ত হলে তার অভাব মোচন করা উচিত। সে ক্ষুধার্ত হলে তাকে খাদ্য দান করা উচিত। প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া এবং তার সেবা-যত্ন করা উচিত।

প্রতিবেশীর উপর অত্যাচার উৎপীড়ন করা উচিত নয়। তাকে কোনো প্রকার কষ্ট দেয়া উচিত নয় এবং তার সঙ্গে ঝগড়া করা উচিত নয়। কারণ এতে অশান্তি ঘটে।

রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তির প্রতিবেশী তার অত্যাচার ও অন্যায় আচরণ থেকে নিরাপদ নয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা।”

প্রতিবেশীর সাথে সবসময় ভালো ব্যবহার করা উচিত। কারণ ভালো ব্যবহার না করলে প্রকৃত মুসলমান হওয়া যায় না। সে কোনো সুকাজে সাহায্য চাইলে সাহায্য করা উচিত।

প্রতিবেশীর কোনো দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ানো ঠিক নয়, তার নিন্দা করা ঠিক নয়। প্রতিবেশীর সাথে সর্বদা মধুর ব্যবহার করা উচিত। প্রতিবেশীদের ছেলেমেয়েদের আদর করা উচিত। দেখা হলে সালাম দেয়া এবং হাসিমুখে কথা বলা উচিত। আমাদের বাড়িতে যদি কোনো উৎকৃষ্ট খাবার রান্না করা হয়, তবে প্রতিবেশীকে উপহার হিসেবে তা থেকে পাঠানো উচিত। রাসূল (সা) বলেছেন, “কেউ যখন তরকারী রান্না করে তাহলে সে যেনো তাতে বেশী ঝোল দেয় এবং প্রতিবেশীর নিকট কিছু পাঠিয়ে দেয়।” যদি প্রতিবেশীকে খাবার পাঠানো সম্ভব না হয় তাহলে এমনভাবে খেতে হবে যেন তারা দেখতে না পায়!

রাসূল (সা) অন্যত্র বলেছেন, “হে মুসলিম নারীরা! প্রতিবেশীর কোনো হাদীয়াকে তুচ্ছ মনে করোনা তা যদি বকরীর একটি পায়াও হয়।”

প্রতিবেশী রোগাক্রান্ত হলে তাকে দেখতে যাওয়া উচিত। সে মৃত্যুবরণ করলে তার জানাযায় অংশগ্রহণ করা ও দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা উচিত। প্রতিবেশী কিছু ধার চাইলে প্রদান করা আমাদের কর্তব্য। প্রতিবেশী যদি কোনো কিছুতে সৌভাগ্যবান হয় তবে আমাদের উচিত তাকে মুবারকবাদ জানানো। নৈকট্যের ভিত্তিতে প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। অর্থাৎ যার ঘর আমাদের ঘরের বেশি নিকটে তার অধিকার বেশি।

সুসমাজের ভিত্তি

পৃথিবীতে যতো আদর্শই প্রচারিত হয়েছে তা হয়েছে ভাল ব্যবহার ও সুন্দর ব্যবহার দিয়ে। সব ভালো কাজই মানুষের মন জয় করতে পারে। সবার সাথে ভালো ব্যবহার করা, কল্যাণকর কাজ করা, মানুষের উপকার করা- এসবই হচ্ছে সুসমাজের ভিত্তি। এসবের উপর ভিত্তি করেই একটা সুসমাজ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সমাজের মানুষ শান্তিতে থাকতে। পারে এবং সেখানে কোনো বিশৃংখলা থাকে না। তাই একটা সমাজে শান্তি আনয়ন করতে এবং সমাজকে একটা সুসমাজে পরিণত করতে আমাদের সবারই উচিত সবার। সাথে ভালো ব্যবহার করা।

শেষ কথা

ভালো ব্যবহার হচ্ছে এমন একটা জিনিস যা আমাদের ব্যক্তিত্ব পরিস্ফুটনে সাহায্য করে। একটু চেষ্টা করলেই আমরা সবার সাথে ভালো ব্যবহার করতে পারি। প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের অবশ্যই ভালো ব্যবহার করা উচিত, কারণ আমাদের বিপদে প্রথমেই এগিয়ে। আসে প্রতিবেশী। যারা প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করে, আল্লাহ তাদেরকে খুব পছন্দ করেন। হাদীসে বলা হয়েছে “আল্লাহর নিকট সেই সর্বাপেক্ষা উত্তম, যে তার প্রতিবেশীর নিকট উত্তম।” তাই আল্লাহকে খুশি করার জন্য, প্রতিবেশীর অধিকার পালন করা আমাদের অবশ্যই কর্তব্য। এতে নিজের মনেও প্রশান্তি আসে। আল্লাহ তালা কুরআনে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন। “তোমরা পিতামাতা, নিকটবর্তী আত্মীয়, ইয়াতীম, দরিদ্র, নিকটস্থ প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথিক এবং যারা তোমাদের অধিকারে এসেছে তাদের সকলের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” (সূরা আন নিসা : ৩৬)।

রচনায় : সাজেদা হোমায়রা হিমু [মাসিক পৃথিবী থেকে সংগৃহীত]

মতামত দিন