বিজ্ঞান ও ইসলাম

মুসলমানদের ভূ-বিজ্ঞান চর্চা

‘জুগরাফিয়া বা ‘জিগরাফিয়া’ (Djughrafiya or Djighrafiya) কথাটি পুরাকালে ভূ-বিদ্যার সাথে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হতোনা। বরং খৃষ্টপূর্ব (৭০-১৩০) এর মারিনুস এবং (৯০-১৬৮) এর টলেমীর ভূগোল সংক্রান্ত গ্রন্থাদিকেই বুঝানো হতো। ‘জুগরাফিয়া’ শব্দের আরবী প্রতিশব্দ হলো ‘সুরাতুল আরদ’ বা পৃথিবীর আকৃতি-প্রকৃতি।

প্রখ্যাত মুসলিম ভূগোলবেত্তা মাসউদী (মৃ. ৯৫৬) এর মতে, ‘ফাতউল আরদ’ বা ভূমি জরিপ। ১৩৪৭ ঈসায়ী সালে কায়রো থেকে প্রকাশিত ‘রাসাইলু ইখওয়ানুস সাফা’ গ্রন্থে এ শব্দটিকে পৃথিবীকে মানচিত্র অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। মধ্যযুগ পর্যন্ত প্রধানত ভূ-বিদ্যা বলতে এই অর্থেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে ভূগোল বিদ্যা বলতে পৃথিবী সম্পর্কিত যাবতীয় আলোচনাই বুঝানো হয়। ডব্লিউ জিমারম্যান বলেনঃ ‘পৃথিবীর জলস্থল, পাহাড়-পর্বত, মৃত্তিকা, অরণ্য-জলবায়ু, দেশ-দেশান্তরের মানুষ, মানুষের প্রয়োজনে উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের ভাগ্য ও কার্যক্রম ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত হওয়াই ভূগোলের মর্মকথা’। এই পরিধি ক্রম প্রসারমান। তাই ভূবিজ্ঞান আজ হয়ে উঠেছে আকাশ, সমুদ্র, কৃষি, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি সম্পর্কিত এক বিজ্ঞান। জাহেলীয়া যুগে আরবদের ভূ বিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান ছিল বেশ সীমিত।

তখনকার আরবদের ভূ-বিদ্যা সংক্রান্ত জ্ঞানের উৎস ছিল প্রাচীন ব্যবিলনীয় মুসলিম তথা ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার পর এই ধারণায় যুক্ত হয় সম্পূর্ণ এক নতুন মাত্রা নতুন দর্শন ও ধারণা। অসংখ্য বিজ্ঞান ও জ্ঞান গবেষণার আধার পবিত্র কুরআনে ভূগোল চর্চায় এক নতুন চিন্তাধারা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তা বুঝে উঠার পূর্বেই যে তাগিদে মুসলমানরা ভূগোল চর্চায় মনযোগী হন যে সম্পর্কে যুরজী যায়দান লিখেন : ‘পবিত্র হজ্জ পালন, মসজিদের কিবলা নির্ধারণ এবং নামাজের সময় নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা মুসলমানদের ভূগোল গবেষণার মূল প্রেরণা ছিলো’।

পবিত্র কুরআনে ঐতিহাসিক স্থানসমূহ পরিদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে অনেকবার। বিশেষ করে খোদাদ্রোহী অধ্যুষিত জনপদের অবস্থা দেখার কথা বলা হয়েছে। সূরা। ইউনুসের ১০৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা কি পৃথিবী পৃষ্ঠ ভ্রমণ করে দেখেনি, যেখানে তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম ঘটেছিলো’। কুরআনে কারীমে বহু শহর নগরের আনুপুংখ বর্ণনা রয়েছে যেমন তেমনি তার অধিবাসীদের সম্পর্কেও রয়েছে আলোচনা। যেমন জুলকারনাইন সম্পর্কিত কাহিনী ভৌগলিকদের অনুসন্ধিৎসার বিষয়।

পৃথিবী বক্ষে পাহাড় পর্বত এবং বিভিন্ন প্রকার ভূমির সৃষ্টি সম্পর্কে কুরআনে বিস্ময়কর সব তথ্য দেয়া হয়েছে যা শত বছরের বিজ্ঞান গবেষণায়ও জানা সম্ভব নয়। সূরা নাহলের ১৫ নং স্তবকে বলা হয়েছে- ‘এবং তিনিই পৃথিবীপৃষ্ঠে পাহাড় সমূহ স্থাপন করেছেন যাতে উহা (পৃথিবী) তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়।

পৃথিবীর আবহাওয়া সম্পর্কে বলা হচ্ছে-‘তুমি কি দেখনি, আল্লাহ মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন তারপর তাদের একত্রিত করেন; অতঃপর দেখ উহা হতে বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে, আর আকাশস্থিত শিলাস্তূপ হতে তিনি বর্ষণ করেন শিলা।’ (সূরা নূরঃ ৪৩)

সূরা নাহলের ৬০ নং আয়াতে বলা হচ্ছে- ‘আকাশ হতে পানি বর্ষণের মাধ্যমে আমি তোমাদের জন্য উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করি। এসব উদ্যানের গাছপালাসমূহ উদগমনে তোমাদের কোন ক্ষমতা নেই।’

সমুদ্র এবং পানি সম্পদ সম্পর্কে কুরআনের আশ্চর্য আশ্চর্য বর্ণনা রয়েছে, সমুদ্র এখনো হাজারো রহস্যের আধারে। যে সমুদ সম্পর্কে মানুষ আজো জানছে তার সম্পর্কে হাজার বছর আগে মহাগ্রন্থ আল কুরআন ঘোষণা করেছে- “তিনিই সমুদ্রকে অধীন করেছেন, যাতে তোমরা উহা হতে তাজা মৎস আহরণ করতে পার, আর যাতে উদ্ধার করতে পার রত্নাবলী- যা তোমরা অলংকার স্বরূপ পরিধান কর।’ (নাহল : ১৪)

ঋতু পরিবর্তন, দিন রাত্রির পরিক্রম ও চন্দ্র-সূর্যের কক্ষপথ সম্পর্কে কৌতুহলউদ্দীপক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক বিবরণ রয়েছে। সূরা ইয়াসীনে বলা হচ্ছে- ‘সূর্য সন্তরণ করে উহার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। ইহা মহা পরাক্রান্ত, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। এবং চন্দ্রের জন্যও আমি নির্দিষ্ট নিজস্ব কক্ষপথ ঠিক করে দিয়েছি। অবশেষে উহা শুষ্ক, বক্র, পুরানো খর্জুর বিথীর আকার ধারণ করে। সূর্যের জন্য কভু সম্ভব নয় সে চন্দ্রের নাগাল পাবে আর রজনীরও সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করার।

প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে ভাসমান বিচরণশীল রয়েছে। অন্যত্র বলা হয়েছে- ‘তিনি তোমাদের জন্য নক্ষত্রপুঞ্জ সৃষ্টি করেছেন যেন তা থেকে তোমরা জলে ও স্থলে অন্ধকারে দিক নির্ণয় করতে পার। চিন্তাশীল জ্ঞানীদের জন্য আমি এ আয়াত বর্ণনা করেছি।’ (আন’আম : ৯৭)।

এ রকম আরো অনেক বর্ণনায় ভূ-বিষয়ক গবেষণার নির্দেশনা রয়েছে। প্রধানত এই মাল মসলার মধ্য দিয়েই মুসলমানদের ভূগোল চর্চার মোড় পরিবর্তিত হয়। মুসলমানরা গ্রীক বিজ্ঞানের অনুরাগী ছিলেন এবং তাদের উপর গ্রীক প্রভাব ছিল। বলা হয় গ্রীক প্রভাবেই মুসলমানদের বিজ্ঞানসম্মত ভূগোল চর্চার সূত্রপাত হয়। ইউরোপ এবং কোন কোন মুসলিম গবেষকও তা উল্লেখ করেন পাশ্চাত্য লেখকদের অনুসরণে। কিন্তু কুরআনের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই মুসলমানদের বিজ্ঞানসম্মত ভূগোল চর্চার প্রধান নিয়ামক ছিল। দিন-রাতের পরিবর্তন, পৃথিবীর চতুষ্পর্শে চাঁদের পরিভ্রমণ, পৃথিবী গোল হওয়ার ধারণা এবং মানুষের উপর এগুলোর নানা প্রভাব সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি মুসলমানরা আবিষ্কার করেছেন যা গ্রীক, রোম ও পারসিক ভৌগলিকদের কাছে অজানা ছিলো কুরআনে গ্রীক, ব্যবীলনীয় ও রোমকদের অজানা অনেক ভৌগলিক তথ্য রয়েছে। যার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক ও বিশুদ্ধ ভূগোল চর্চায় মুসলিম বিজ্ঞানীরা নতুন পথ প্রদর্শন করেন। মহানবীর (সা) বানী ছিল তাদের চলার আরেক পাথেয়।

গ্রীকরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন তা প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের হাতেই প্রকৃত মর্যাদা পেয়েছিল। আদর্শগতভাবে গ্রীকরা ইসলামী বিশ্বাসের সাথে ছিল সামঞ্জস্যহীন। কিন্তু জ্ঞানের বিষয়ে ইসলামের যে উদারতা, তার কারণে গ্রীকদের মনীষার কদর যথাযথই লালিত্য পেয়েছিল মুসলমানদের হাতে। মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতা যদি গ্রীক বিজ্ঞান-সাহিত্য অনুবাদে নিয়োজিত না হত তাহলে গ্রীক সভ্যতার অনেককিছু হারিয়ে যেত আধুনিক ইতিহাসের পাতা হতে, একথা অনেকেই স্বীকার করেন।

ভূগোল-বিদ্যার পথিকৃৎ ক্রাউডিয়াস টলেমী সহ আরো অনেকের রচনাবলী বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ থেকে উদ্ধার করে আরবীতে অনুবাদের মাধ্যমে ভৌগলিক ও জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গ্রীক মুসলমানদের হস্তগত হয়। আরবীতে অনূদিত টলেমীর গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে AImagest (আল মাদজিসতী), Tetrabislon (আল মাকত আল আরবা), Apparitions of fixed stars (কিতাবুল আনওয়া) ইত্যাদি আর আল মরীনুসের গ্রন্থাদির মধ্যে রয়েছে- Timaeus, প্লেটোর Meterology (আল আতহারুল উলুয়িয়্যাহ), Decaelo (আস সামা ওয়াল আলাক) ইত্যাদি।

আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও বাগদাদ মুসলিম জাহানের রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠার পরই মুসলমানরা প্রধানত ভূ-বিদ্যায় ব্যাপক গবেষণায় ব্রত গ্রহণ করেন। দিগ্বিজয়ী মুসলমানরা শত শত বর্গ মাইলের দেশ সমূহের অজানা অচেনা পথ ধরে চলতে গিয়ে এবং ইসলামী আদর্শ প্রচারের ব্যাপদেশে তাদের ভূ-বিদ্যা বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা চালাতে হয়। ফলে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, স্পেনের বিজিত অঞ্চলসমূহে মুসলমানরা বহু নতুন ভৌগলিক তথ্য আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছেন। প্রাচীন বহু অমূল্য দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ অনুবাদ, খলীফাদের পৃষ্ঠপোষকতা তাদের সাফল্যের পেছনে বিরাট অবদান রাখে। আব্বাসীয় যুগে গ্রীকদের বহু ভূগোল গ্রন্থ মুসলিম বিজ্ঞানীরা আরবীতে অনুবাদ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ বিন মুসা আল খারিজমী (মৃ. ৮৪৭ খৃ.) আল ফিন্দি (মৃ. ৮৭৪ খৃ.) সাবিত বিন কুরা (মৃ. ৯০১ খৃ.)। টলেমীর বিখ্যাত ভূগোল গ্রন্থ ব্যাপক আরবী অনুবাদ এবং নতুন টীকা ভাষ্য সংযোজনের পর নিজস্ব মৌলিকত্ব হারিয়ে ফেলে।

আল খারিজমী (মৃ. ৮৪৭) বিখ্যাত ভূগোলবিদ ছিলেন এবং তাঁর রচনায় আরবীতে ভূ-বিজ্ঞানের বুনিয়াদ স্থাপন করে। ‘সুরাতুল আরদ’ নবম শতকের প্রথমার্ধে রচিত তার অনন্য কীর্তি। খলীফা আল- মামুনের আমলে (৮১৩-৮৩৩ খৃ.) যে সকল মনীষী পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র অংকন করেন তাদের মধ্যে আল খারিজমী অন্যতম। খলীফার উৎসাহে তিনি পৃথিবীর একটি পরিমাপও তৈরী করেছিলেন। তাঁর গ্রন্থ সম্পর্কে অধ্যাপক মিনবক্সি বলেনঃ ইউরোপীয়রা তাদের বিজ্ঞান চর্চার প্রথমদিকে এর সমতুল্য গ্রন্থ রচনা করতে পারেনি। তার পরে আল ফারগানী (মৃ. ৮৬০), আল বাত্তানী (মৃ. ৯২৯), ইবনে ইউনুছ (মৃ. ১০০০) অক্ষরেখা, দ্রাঘিমা ও ভূমণ্ডল বিষয়ে গবেষণা চালিয়েছেন।

খারিজমীর নেতৃত্ত্বে বিজ্ঞানীদের একটি দল ফোরাত নদীর উত্তরে পামিরের নিকটবর্তী সিনজিরার প্রান্তরে পরিমাপ কার্য চালান। তার হিসাব মতে, পৃথিবীর পরিধি ২০ হাজার ৪০০ মাইল এবং ব্যাস ৬,৫০০ মাইল। এই পরিমাপ কার্যে খারিজমীর নিজস্ব উদ্ভাবিত জীজ ব্যবহৃত হয়।

ইয়াকুব বিন ইসহাক আল ফিন্দি (মৃ. ৮৭৪) দর্শন ও জ্যোতির্বিদ্যার সাথে ভূগোল চর্চায়ও খ্যাতি লাভ করেন। এই বিষয়ে তার মূল্যবান দু’টি গবেষণা কর্ম রয়েছে। তাহলো ‘রসমুল মামুর মিনাল আরদ’ এবং ‘রিসালাতুন ফিল বিহার ওয়াল মদ ওয়াল জাযর।’ গ্রীক ভাষার পণ্ডিত এ আরব বিজ্ঞানী এথেন্স ও আলেকজান্দ্রিয়ার বিদ্বান সমাজ থেকে যে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তা তার গ্রন্থে বিবৃত করেন। ফিন্দির সুযোগ্য উত্তরসূরী আহমদ বিন মুহাম্মদ আত্ তায়ীর আস্ সারাকসী ও (মৃ. ৮৯৯) দুটি মূল্যবান ভূগোল রচয়িতা। তাহলো যথাক্রমে ‘আল মাসালিক ওয়াল মামালিক’ ও ‘রিসালাতু ফিল বাহারমীয়াহ ওয়াল জাবল। গাণিতিক ও প্রাকৃতিক ভূগোলের গবেষকদের মধ্যে আরো রয়েছেন আল্ ফাজারী (৮ম শতক), আল ফারগানী (মৃ. ৮৫১), জাফর বিন মুহাম্মদ বলখী (মৃ. ৮৮৬) প্রমুখ।

আরবদের প্রথম দিকের ভূগোল গ্রন্থগুলি ছিল সাধারণত পথ বৃত্তান্ত। মুসলিম বিশ্বে সর্বপ্রথম ভূগোল বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন পারস্যের বিখ্যাত ভৌগলিক ইবনে খুরদাদবীহ। আরবী ভুগোল গ্রন্থের প্রকৃত রূপরেখা ও পদ্ধতির প্রথম নির্মাতা ছিলেন বলে তাঁকে ভূগোলবিদদের ‘জনক’ বলা হয়। তাঁর ‘কিতাবুল মাসালিক ওয়াল মামালিক’ একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। এতে আরবের প্রধান প্রধান বাণিজ্যপথ, জাপান, চীন, কোরিয়া প্রভৃতি দেশের বর্ণনা রয়েছে। গ্রন্থের প্রথম খসড়া প্রস্তুত হয় ৮৪৬ খৃষ্টাব্দে এবং দ্বিতীয় খসড়া ৮৮৫ খৃ.। এই গ্রন্থটিকে পরবর্তীতে যারা প্রামাণ্য ভিত্তি হিসাবে নিয়েছেন তন্মধ্যে ইবনুল ফকীহ, ইবনে হাওকাল, আল মুকাদ্দেসী অন্যতম।

বিখ্যাত পর্যটক ও ভৌগলিক ইবনে ওয়াদী আল ইয়াকুবী (মৃ.২৭৮ হি.) আর্মেনিয়া ও খোরাসানে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। তিনি ভারত ও উত্তর পশ্চিম আফ্রিকা ভ্রমণ করেন। ৮৯১ খৃ. প্রকাশিত তার ‘কিতাবুল বুলদান’ এ অনেক ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক আলোচনা স্থান পায়। ৯২৮ খ. পরবর্তী বাগদাদের কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব কর্মকর্তা কুদামা তার ‘আল খারাজ’ গ্রন্থ রচনা করেন। এতে সাম্রাজ্যের প্রদেশ বিভাগ, ডাক বিভাগের সংগঠন, এবং প্রত্যেক জেলার রাজস্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য আলোচিত হয়েছে। মুহম্মদ ইবনুল ফকীহ খৃ. নবম শতকের খ্যাতিমান ভুগোলবেত্তা ছিলেন। তাঁর রচিত ‘কিতাবুল বুলদান’ এ ভারত, আরব, চীন, মিশর, পাশ্চাত্য দেশসমূহ ফিলিস্তিন, রোম, পারস্য, বসরা, দুজলা ও ফোরাতের মধ্যবর্তী স্থান সমূহের ভৌগলিক বিবরণ স্থান পেয়েছে। ইখাহানের ইবনে রুতাহ আল আলাক আন নাফীফা (রচনাকাল ৯০৩-১৩ খৃ.) নামক বিবরণমূলক গাণিতিক ও জনতাত্ত্বিক ভূগোলের রচয়িতা। বিষয় বৈচিত্র্যে কারণে এই গ্রন্থটি ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক বিশ্বকোষ হিসাবে পরিগণিত হত।

যায়েদ আল বলখী (মৃ. ৩২২ হি.) ছিলেন মুসলিম মানচিত্র নির্মাতাদের অন্যতম। সাসানীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত এই মনীষীর বিখ্যাত রচনা ‘সুরাতুল আকালীম’ এবং ‘মামলিক ওয়াল মামালিক (৯২১ খৃ.)।

মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল মুকাদ্দেসী (মু. ৩৭৫ হি.) সর্বশ্রেষ্ঠ ভূগোলবিদ ছিলেন। সুদীর্ঘ ২০ বছর ভ্রমণ করে তিনি পৃথিবীর বহু নির্ভুল উপাত্ত সংগ্রহ করেন। তাঁর সংক্ষেপ সার ৯৮৫ খৃ. রচিত ‘আহসানুত তাকাসীম ফী আরিফাতিল আকালীম’ গ্রন্থ। সমকালে এবং পরবর্তীতে অনেক ভূগোল বিশেষজ্ঞ এই গ্রন্থের উপর নির্ভর করতেন। পাশ্চাত্যেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। মুসলিম জাহানকে তিনি ১৪টি ভাগে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক বিভাগের পৃথক মানচিত্র তৈরী করেন। এই সময়েই ইয়েমেনী ভৌগলিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক হাসান বিন আহমদ আল হামদানী তার ‘আল ইকলীল’ ও ‘সীফাতে জজীরাতুল আরব’ গ্রন্থদ্বয়ের জন্য বিশিষ্টতা লাভ করেন।

আব্বাসীয় যুগের শেষ ভাগে প্রাচ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ভৌগলিক ইয়াকুত বিন আবদুল্লাহ আল হামাভী (জ. ১১৭৯ খৃ.) আবির্ভূত হয়েছিলেন। এশিয়া মাইনরের এক গ্রীক পরিবারে জন্ম গ্রহণকারী হামাভী ১২২৮ খৃ. ‘মুজমাউল বুলদান’ রচনা করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির বিবরণ ও বিচিত্র জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্য এতে বর্ণক্রম অনুসারে সজ্জিত হয় বলে এটি একটি বিশ্বকোষ হিসাবে মর্যাদাপ্রাপ্ত। তার অন্য গ্রন্থের নাম ‘মুজামুল উদাবা’। ড. আর এ নিকলসন লিখেছেনঃ A store house of geographical information the value of which it would be impossible to overestimate.

আল বিরুনী (৯৭৩-১০৪৮ খৃ.) বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভূগোলবিদ। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘কিতাবুল হিন্দ’ আধুনিক যুগেও একটি শ্রেষ্ঠ রচনা। গ্রীক, ইরান ও ভারতের ভৌগলিক জ্ঞানের তিনি সুপণ্ডিত। তিনিই সর্বপ্রথম গোলাকার মানচিত্র তৈরী করে ‘কিতাবুত তাফহীম’ গ্রন্থে তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করেন।

মুসলিম স্পেনের অন্যন্য প্রতিভা আল ইদ্রিসী (জ. ১০৯৯ খৃ.) পাশ্চাত্যের সর্বাপেক্ষা সুপরিচিত ভূগোলবিদ ছিলেন। রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ‘কিতাবুর রোজারী’ লিপিবদ্ধ করেন। তিনি একটি খ-গোলক (Gelestial sphere) তৈরী করেছিলেন এবং একটি গোলকে জ্ঞান জগতের অবস্থান নির্দেশ করেছিলেন। ইদ্রিসী নিঃসন্দেহে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ মানচিত্র নির্মাতা। তিনি প্রায় ৭০টি মানচিত্র নির্মাণ করেন এবং এতে পৃথিবীর অক্ষাংশ পরম্পরায় ৭টি আবহাওয়া বিভাগ দেখান। রৌপ্যপাত্রেও তিনি একটি মানচিত্র প্রস্তুত করেছিলেন।

মুসলিম ভূগোলবিদদের মধ্যে আরো যারা খ্যাতি লাভ করেছিলেন তাদের মধ্যে আল মাসউদী, ফাজারী, ফারগানী (মৃ. ৮৫১), ইবনুল হায়েক (মৃ. ৩৩৪ হি.) ইবনে ফাজলান, আবু ইসহাক ফারিমী, কাযবিনী, আল বকরী (মৃ. ৪৮৭ হি.) আবু হামিদ আল গ্রানাডী (মৃ. ৫৬৪ হি.) ইবনে যুবাইর (মৃ. ৬১১ হি.), আল হারাবী (মৃ. ৬১১ হি.), আবদুল লতিফ বাগদাদী (মৃ. ৬২৯), বুরহানুদ্দীন আল ফাজারী (মৃ. ৭২৯), ইয়াহিয়া বিন জীয়ান, নাসির উদ্দীন সুয়ুদী (মৃ. ৮০৩ হি.), ইসহাক খতীব (মৃ. ৮৩৩ হি.) সিরাজুদ্দীন আল ওয়াদী (মৃ. ৮৬১), আবদুল লতিফ আল কাদাসী (মৃ.৮৫৬ হি.), তাজউদ্দীন হোসাইনী (মৃ. ৮৭৫ হি.), তকীউদ্দীন আল বদরী (মৃ. ৮৮৭ হি.), আবু হামিদ আল কাদাসী (মৃ. ৮৮৮ হি.), শামসুদ্দীন সুয়ূতি (মৃ. ৮৮০ হি.) অন্যতম।

এছাড়া আরো রয়েছেন, আল মাজিনী (১০৮০-১১৬৯), ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৭৭ খৃ.), ইমামুদ্দী আল হানাফী (মৃ. ৯২০ হি.), মুহিউদ্দীন নাঈমী (মৃ. ৯২৭ হি.), আবু মুহাম্মদ আবদারী (মৃ. ৬৮৮ হি.), আল-ফালাবী (মৃ. ৮২০ খৃ.), আবুল ফাতাহ ইসকান্দারী (মৃ. ১১৬৫ খৃ.), আবুল ফিদা (মৃ. ১৩৩১ খৃ.) ইবনু সাঈদ (মৃ. ১২৭৪ খৃ.), আবু হামিদ আন্দালুসী (মৃ. ১১৬২ খৃ.), আল মাফয়িজী (১৪৪১ খৃ.), ইবনে খালদুন (১৪০৬ খৃ.), ইবনে আলী আরাকেলী (১২৬২ খৃ.), ইবনে ইবারী (১২৮৬), ইবনে মাজেদ (১৪৯৮), সাদী আল রঈস (১৫৬২) এর নাম উল্লেখযোগ্য।

ভূ-বিদ্যায় এদের রয়েছে রচনা গবেষণা এবং গ্রন্থাবলী। পাশ্চাত্যের আধুনিক বিজ্ঞানকেও তারা প্রভাবিত করেছিলেন। আধুনিক সভ্যতাকে মুসলমান বিজ্ঞানীরা পথ দেখালেও ইতিহাসের গৌরবকে ধারণ করা ছাড়া বর্তমানে মুসলমানদের তেমন বড় বৈজ্ঞানিক ও ভৌগলিক উত্তরাধিকার বলতে গেলে নেই।

তথ্যসূত্র :

১. পবিত্র কুরআনুল কারীম (অনুবাদ)।

২. ইসলামিক ফাউণ্ডেশন পত্রিকা/৩২ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা, ৩৩ বর্ষ ১ম সংখ্যা

৩. ইসলামিক ফাউণ্ডেশন পত্রিকা/এপ্রিল-জুন/৯৩

৪. মুসলিম সংস্কৃতির ইতিহাস ও কে আলী/ ১৯৮১, ৮ম সংস্করণ।

৫. হযরত মুহাম্মদ (সা) ও জীবনী বিশ্বকোষ : আফজালুর রহমান প্রণীত, সম্পাদনা পরিষদ অনূদিত/ইফা, ১৯৮৯

৬. ইসলামী বিশ্বকোষ ও ইফা প্রকাশিত/৪র্থ খণ্ড

৭. আরব জাতির ইতিহাস : মুহাম্মদ রেজা-ই-করীম/ বাংলা একাডেমী

৮. দি স্পিরিট অব ইসলাম : সায়্যিদ আমীর আলী, দরবেশ আলী খান অনূদিত/ইফা, ১৯৯৩ ঢাকা

৯. দুহাল ইসলাম (১ম খণ্ড) : ড. আহমদ আমীন/আবু তাহের মেছবাহ অনূদিত, ইফা, ১৯৯৪

সংকলেনে :  মুহাম্মদ নূরুল আমীন হাবিলদার [মাসিক পৃথিবী পুরনো সংখ্যা থেকে সংগৃহীত]

মতামত দিন