নারী

নারীবাদী বনাম একজন খাদীজা (রাঃ)

{{ এই লেখার মূল টার্গেট নারীবাদী নারীগণ, নরমাল নারী নন। তবে কো-ল্যাটেরাল ড্যামেজ হিসেবে কোনো নরমাল নারী আঘাতপ্রাপ্ত হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন }}

কথা ছিল—

একটা শিক্ষিত মা পেলে,

পাবো একটা শিক্ষিত জাতি!

কিন্তু আফসোস! আজকালকার মায়েরা শিক্ষিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের আর ‘মা’ হয়ে ওঠা হচ্ছে না।

বাবার আদরের খুকুমনিটা ইশকুলে যাচ্ছে, লেখাপড়া করছে। শুধু লেখাপড়া নয়, তার পাশাপাশি ‘হায়ারেস্টাডি’ও করছে। এ কি চাট্টিখানি কথা? উহু… মিনিমাম আট্টিখানি কথা!!

‘অনাস’ হলো, ‘মাস্টাস’ হলো, বিদেশ থেকে ‘হায়ারেস্টাডি’ও হলো। অতঃপর, খুকুমনির এখন ক্যারিয়ার গড়তে হবে… ক্যারিয়ার! ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে আমাদের মামনিরা বিয়ে করারও সময় পাচ্ছে না। বিয়ে করলেও, ক্যারিয়ারের পিছে সময় দিতে দিতে বরের পিছে (কিংবা সামনে) সময় দিতে পারছে না, তাই বাচ্চা নেওয়ারও সুযোগ নেই।

অনেকে তো ক্যারিয়ারের ভবিষ্যত নিয়ে এত্ত যত্নশীল যে, ফ্যামিলি থেকে বাচ্চা নেওয়ার কথা বললে তারা বলে, “উফফফ! সাসুমা.. কি যে বলেন! বিয়ে করলাম এই মাত্র ছ’ বছর হলো; এখনই বাচ্চা? ক্যারিয়ার নিয়ে কত স্বপ্ন আমার, কত্তকত্ত প্ল্যান করেছি, আর এখনই বাচ্চা নিলে হবে? উফফ… আমি আর ভাবতে পারছি না!”

Career এর যত্ন নিতে গিয়ে নিজের বাচ্চার Carrier হতে পারেনা এসকল খুকুমনিরা! তারা ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যত ভাবে, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও অত ভাবে না; ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে তো নয়-ই! এরা বাচ্চা-কাচ্চাকে ‘ঝামেলা’ মনে করে, কারণ তা তাদের ক্যারিয়ার গঠনে ‘বাধা’।

ফ্যামিলির ঠেলায় পড়ে (কিংবা দুয়েকজন হাউশের বসে) বাচ্চা নেয় ঠিকই, কিন্তু পরে দেখা যায় বাচ্চার পিছে তাল দিতে গিয়ে ক্যারিয়ার শিকেয় উঠে যাচ্ছে। না! এমনটা হতে দেওয়া যাবে না!! অতঃপর তারা বাচ্চার জন্য ‘বেবি-সিটার’ রেখে নেয়। বাচ্চারা বড় হয় বুয়ার সান্নিধ্যে।

কবি বলেছেন— সঙ্গদোষে স্বপ্নদোষ!

তাই, বুয়ার সান্নিধ্য পেয়ে বেড়ে ওঠা বাচ্চাকাচ্চাদের আচরণও হয় বুয়ার আচরণের মত। না পায় ঐশ্বরিক শিক্ষা, না পায় বৈশ্বিক শিক্ষা। পাশাপাশি, বুয়ার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হতে থাকা বাচ্চাকাচ্চাগুলো কখনও কখনও বুয়ার কাছে বেদম পিটানিরও শিকার হয়। বুয়া কি কখনও অন্যের বাচ্চা-কাচ্চাকে মাতৃস্নেহ দিতে পারে? সম্ভব কখনো?? [https://youtu.be/6kkFbYVEfh0 ]

এইযে আমাদের শিক্ষিত মায়েরা, এইযে তারা সন্তান জন্ম দিয়েই বুয়ার ঘাড়ে বাচ্চার দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে ক্যারিয়ার পূজায় গায়েব হয়ে যায়, এদের সাথে পাটক্ষেতে আকাম করে ধানক্ষেতে প্রসব করে চটের বস্তায় বাচ্চা ভরে ডাস্টবিনে ফেলে আসা মহিলাদের মধ্যে ‘বিবাহ’ ব্যতীত অন্য কোনো পার্থক্য নেই। কথাগুলো শুনতে কটূ হলেও এটাই বাস্তব, এটাই সত্য।

নারী অধিকার, নারীমুক্তি আর নারী প্রগতির বাণী কপচানো ভালো মানুষের মুখোশধারী টাউট সম্প্রদায়ের ফন্দিফিকির এখনও অনেক মা-বোনেরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।

শুরুটা হয়েছিল মীনা-রাজু কার্টুন দ্বারা গল্পে-গল্পে নারীর সমানাধিকারের নামে বাচ্চাদের অবচেতন মনে বিধ্বংসী নারীবাদের বিষাক্ত বীজ বুনে দেওয়ার মাধ্যমে। যে প্রজন্মটা মীনা-রাজু দেখে বড় হয়েছে তারা ছোটবেলায় ঠিক ধরতে পারেনি যে এই কার্টুন দেখিয়ে তাদেরকে কোন জিনিসের প্রতি সমর্থনের মানসিকতা তৈরী ‘করিয়ে নেওয়া’ হচ্ছে। তবে, দর্শকমণ্ডলী সেটা না বুঝলেও, “মীনা-রাজু” নামক হাতিয়ারটা যারা তৈরী করেছিল, এবং যে উদ্দেশ্যে তৈরী করেছিল তা কিন্তু সফল হয়েছে। যাদেরকে ঘায়েল করার জন্য এ হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়েছিল, তাদেরকে ঠিকই ঘায়েল করা গেছে। যার ফল হিসেবে আমরা পেয়েছি হাজার খানেক প্রোডাক্টিভ নারীবাদী! যথাসময়ে বীজবপন, নিয়মিত সেচ দিয়ে ক্রমাগত ব্রেইনওয়াশ, অতঃপর ঋতুকালে বিপুল পরিমাণ নারীবাদীর ফলন! এ এক দারুণ চাষাবাদ!!

কার্টুনটার উদ্দেশ্য বাহ্যদৃষ্টিতে সৎ মনে হলেও তার সেই বাহ্যিক উদ্দেশ্যটাকে ভিন্ন পন্থায় ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

‘সমানাধিকার’ হচ্ছে আলকাতরা, আর তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’ হচ্ছে নৌকা। নৌকা ভাসাতে হলে যেমন নৌকার গায়ে আলকাতরার প্রলেপ লাগাতে হয়, তেমনি স্বাধীনতার নামে অবাধ স্বেচ্ছাচারের জন্যও গায়ে সমানাধিকারের প্রলেপ লাগাতে হয়।

স্বাধীনতার নারীবাদীপ্রসূত সংজ্ঞা হলো— ক্যারিয়ার, চাকরি, টাকা।

নারীবাদীরা নারীদেরকে এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তুমি যদি লেখাপড়া শিখে চাকরি করতে না পারো, মানে টাকা কামাতে না পারো, তাহলে তোমার কোনো মূল্য নেই। তোমার অধিকার, তোমার স্বাধীনতা সবই নির্ধারিত হবে তুমি চাকরি করতে পারলে কি পারলে না তার উপর, টাকা কামাতে পারলে কি পারলে না তার উপর। একজন নারীর মূল্য কতটুকু তা নির্ধারণ করার ‘নারীবাদী স্কেল’ হচ্ছে— টাকা!

তুমি যদি চাকরি করতে পারো তাহলে তুমি স্বাধীন। তুমি যদি নিজের শরীরের অবয়ব জনতার হাটে মেলে ধরতে পারো তাহলে তুমি স্বাধীন। তুমি যদি ডজনখানেক ছেলেবন্ধু নিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে পার্টি দিতে পারো তাহলে তুমি স্বাধীন। কিন্তু তুমি যদি ‘নিজের ইচ্ছায়’ সংসারে মনোযোগী হতে চাও, স্বামী-সন্তানের দেখভাল করতে চাও, তাহলে তুমি স্বাধীন না। তুমি যদি হাফস্কার্ট, জিন্স, টপ্স পরে রাস্তায় ঢ্যাংঢ্যাং করে হেটে বেড়াতে পারো তাহলে তুমি স্বাধীন, তুমি স্মার্ট, তুমি কুউল। কিন্তু নিকাব পরে ভার্সিটিতে গেলেই তুমি ব্যাকডেটেড, গেরাম্য, ক্ষ্যাত, অবরোধবাসিনী, মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার! হ্যাঁ, এগুলোই হচ্ছে নারীবাদীদের ‘স্বাধীনতার’ সংজ্ঞা, এগুলোই তাদের সমানাধিকারের প্রোপাগান্ডা।

নারী হয়ে ক্যারিয়ারের পিছে ছোটা কেন বৈধ হবে না— এই মর্মে আপত্তি উত্থাপনপূর্বক তারা হযরত খাদিজা (রাঃ) এর উদাহরণ টেনে আনেন। খাদিজা (রাঃ) নিজেই যখন ব্যাবসা করেছেন তাহলে এখনকার নারীরা ক্যারিয়ারের পিছে ছুটলে মোল্লাদের এত জ্বলে ক্যান? এরা কি নারীদের উপর জুলুম করতেছে না? এরা কি নারীদেরকে ঘরে বন্দী করে রাখছে না?

কিন্তু মজার বিষয় কী জানেন? যারা হযরত খাদিজা (রাঃ) এর উদাহরণ টেনে এনে নারীর ক্যারিয়ারপূজাকে ‘জায়েজ’ প্রমাণ করতে চায়, এদের অনেকে এটাই জানে না যে খাদিজা (রাঃ) কে ছিলেন! মা ছিলেন, নাকি স্ত্রী ছিলেন, নাকি কন্যা ছিলেন! নাউজুবিল্লাহ! এদেরকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে, বলেনতো খাদিজা (রাঃ) কে ছিলেন? তখন দেখবেন এরা পেঁচার মত মুখ করে তাকায় আছে।

এমন দৃশ্য সাধারণত সদ্য নারীবাদে বাইয়্যেতপ্রাপ্ত আধুনিক ও প্রগতিমনা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই অধিক দেখা যায়। কারণ, এদের বেশিরভাগই ছোটবেলা থেকে ফ্যামিলি পার্সনদের সঙ্গ কম পেয়েছে, নতুবা তাদের ফ্যামিলিটাই ইসলামি আদর্শ ও ইতিহাসজ্ঞান বিবর্জিত। এরা অনেকে হযরত খাদিজা (রাঃ) এর নামটাই শুনেছে কোনো নারীবাদীর মুখ থেকে, তাও হয়ত “খাদিজা (রাঃ) তো ব্যাবসা করেছেন, তাহলে এখনকার নারীরা করলে কী দোষ” টাইপের কোনো তর্কাতর্কি অবলোকন করে।

তাছাড়া, এরা শুধু ক্যারিয়ারপূজার বৈধতা প্রমাণের উদ্দেশ্যেই মোল্লাদের যুক্তি ‘বাইপাস’ করে দিতে খাদীজা (রাঃ) কে আইডল মেনে চলে। কিন্তু, তাঁর ইবাদাত-বন্দেগী, স্বামীভক্তি, স্বামীসেবা, সংসারের প্রতি যত্ন ও দায়িত্ববোধ, সততা, উদারতা, শালীনতা, নম্রতা, ভদ্রতা, দয়া-দাক্ষিণ্য, রুচিশীলতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলো দেখিয়ে কখনোই বলবে না যে, এগুলোও খাদিজা (রাঃ) এর মধ্যে ছিল, নারী হিসেবে এগুলোও তাহলে মেনে চলা উচিত। কিন্তু না… এরা শুধু জানে তিঁনি ব্যাবসা করতেন, আর তাঁর এই ব্যবসা করাটাই নারীবাদীদের একমাত্র গ্রহণযোগ্য দৃষ্টান্ত।

এবার হযরত খাদিজা (রাঃ) সম্পর্কে বলি এবং সেইসাথে বর্তমান তথাকথিত আধুনিকাদের চরিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করি, চলেন…

খাদীজা (রাঃ) ছিলেন কুরাইশ বংশের বনু আসাদ গোত্রের সদস্য। তৎকালীন আরবের সিংহভাগ লোকেরা যখন অজ্ঞতা, মূর্খতা ও বর্বরতার মধ্যে নিবিষ্ট ছিল, তখনও কিছুকিছু ব্যাক্তির মধ্যে শিক্ষা, নৈতিকতা ও আদর্শের উপস্থিতি ছিল; ছিল স্রষ্টার একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাসও।

খাদীজা (রাঃ) এর পিতা খুওয়াইলিদ নিজেও ছিলেন যথেষ্ট শিক্ষিত। জন্মের পর পরিবার থেকেই খাদীজা (রাঃ) এর শিক্ষা-দীক্ষা শুরু হয়। তাঁর পিতা খুওয়াইলিদ ও মাতা ফাতিমা দুজনে মিলেই খাদীজা (রাঃ)-কে পড়ালেখা শেখান। খাদীজা (রাঃ) ছিলেন তুখোড় মেধাবী। খুব অল্প সময়েই তাওরাত ও ইঞ্জিল সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করে ফেলেন।

কিন্তু আমাদের এখনকার বাবা-মায়ের অবস্থা দেখেন! পেট থেকে বাচ্চা প্রসব করামাত্র কিন্ডারগার্টেনে দিয়ে চলে যায় ক্যারিয়ার ঠেকাতে। সেই সাথে গানের ইশকুল, নাচের ইশকুল, আর্ট ইশকুল, আবৃত্তি ইশকুল… ইশকুলের অভাব নাই! যা শিখবি শেখ, বাইরে থেকে শেখ; বাপ-মা দরকার নেই। বাপ থাকবে চাকরি নিয়ে ব্যস্ত, মা-ও থাকবে ‘ক্যারিয়ার’ নিয়ে ব্যস্ত। সারাদিনের ব্যস্ততা সেরে রাতে ফিরবে বাসায়। ফিরে ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে সোফার উপর নেতিয়ে পড়বে। ফলে বাচ্চার কপালে বাপের সান্নিধ্যও জোটে না, মায়ের সান্নিধ্যও জোটে না; জোটে বুয়ার সান্নিধ্য। লেখাপড়াও চলে বাইরে বাইরে দিয়ে; হোম টিউটর, অমুক কোচিং, তমুক কোচিং ইত্যাদি।

খাদীজা (রাঃ)-এর পিতা খুওয়াইলিদ সুস্থ থাকতে তিঁনি কখনো ব্যবসা করেন নি। তাঁর পিতা যখন শয্যগত, মৃত্যু যখন নিকটবর্তী, তখন তাঁর পিতা নিজের ব্যবসার হাল তাঁর হাতে ছেড়ে দেন। তবে এর পিছে আরও একটা কারণ ছিল— খাদীজা (রাঃ) ইতোমধ্যে দুই-দুইবার স্বামীহারা হয়েছেন। স্বামী হারানোর বেদনায় গভীর মনস্তাপক্লিষ্ট খাদীজাকে ব্যবসা সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হলে সহজেই সে তাঁর দুঃখ-বেদনা ভুলে থাকতে পারবে, এই ভেবেই তাঁর পিতা তাঁর হাতে ব্যবসার দায়ভার অর্পন করেন।

সুতরাং, বোঝা-ই যাচ্ছে, খাদীজা (রাঃ) ‘শখের বশে’ ব্যবসা করেন নি। ব্যবসা না করলে তিনি মূল্যহীন হয়ে পড়বেন— এমন ধারণা নিয়েও ব্যবসায় নামেন নি। নেমেছেন পিতার অনুপস্থিতিতে ব্যাবসা সামাল দেওয়ার জন্য, এবং নিজের দুঃখ-কষ্ট বিস্মৃত করার জন্য।

এর পরের পয়েন্ট—

মা খাদীজা (রাঃ) নিজে গায়ে-গতরে খেটে ব্যাবসা করতেন না। তোমরা যেমন বাসা থেকে (বসের মনোরঞ্জনের জন্য) সেজেগুজে, ঠোঁটে লিবিশটিক মেখে, মেকাপ ঘষে, গেঞ্জি-প্যান্ট পরে ঢ্যাংঢ্যাং করে রাস্তায় নেমে পড়ো… তেমনটা না। তিঁনি ছিলেন পর্দানশীন, সম্ভ্রমশীল। তিঁনি ঘরেই থাকতেন। ঘরে থেকেই লোক নিয়োগ করে ব্যাবসায়িক কার্য পরিচালনা করতেন। মক্কার বাইরেও তাঁর ব্যাবসায়ের পরিধি ছিল শাম, সিরিয়া, বসরা, ইয়েমেন প্রভৃতি শহরে বিস্তৃত।

তাঁর বাবা যখন বেঁচে ছিলেন তখন তিনিই উক্ত বহির্বিশ্বের ব্যাবসা-বাণিজ্য কেমন চলছে তা সশরীরে গিয়ে তদারকি করে আসতেন। কিন্তু, তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর তিঁনি নিজে সশরীরে গিয়ে তদারকি করে আসার কাজটা করতেন না; বরং বিশ্বস্ত কাউকে নিয়োগ দিতেন তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকার্য পরিচালনার জন্য। এরকম এক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বহির্বিশ্বের বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য নিয়োগ দেন খাদীজা (রাঃ)।

সুতরাং, “খাদীজা (রাঃ) যখন ব্যাবসা করেছেন তখন আমরা চাকরি করলে দোষ কোথায়”— এহেন কথা যারা বলে বেড়ান তারা একটু চিন্তা করে দেখবেন, আপনার ‘ক্যারিয়ার’ এবং খাদীজা (রাঃ)-এর ক্যারিয়ার এক কিনা; বরং আকাশ-পাতাল ফারাক! আপনাদের মধ্যে না আছে পর্দাশীলতার বোধ, না আছে শালীনতার বালাই। “I have nothing to hide” বলে নেমে পড়েন দেখাতে, ওই ‘দেখানো’ ছাড়া আর আছে কী? ওভাবে ‘দেখিয়ে’-ই টাকা কামাই করা লাগবে, এছাড়া উপায় নাই!

তার পরের পয়েন্ট—

জেনারালি, দুই চাকরিজীবীর মধ্যে বিয়ে হলে, “আমার ইনকাম আর তোমার ইনকাম তো একই কথা, দুটোই তো আমাদের সংসারের কাজেই লাগছে” এরকম একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকে। এতে স্বামীর ইনকাম বেশী হোক বা স্ত্রীর ইনকাম বেশি হোক, সেটা বিষয় না।

কিন্তু, স্বামী যদি হয় জবলেস, আর স্ত্রী যদি হয় চাকরীজীবী! ওরে দাড়ান, স্বামী-স্ত্রী হওয়া লাগবে না, যাস্ট বিয়ের আগের অবস্থাই চিন্তা করুন। পাত্র হচ্ছে জবলেস আর পাত্রী চাকরিজীবী, কিংবা, পাত্রের যা ইনকাম, তার পাঁচগুণ বেশি ইনকাম করে পাত্রী। তাহলে কেমনটা দাড়াবে? বিয়ে হবে??

“তুই এত ভাল চাকরি করিস, অথচ বিয়ে করবি একটা জবলেসকে?”

“তুই এত সুন্দরী, মেধাবী, সরকারী চাকরি করিস, মাসে এত্ত টাকা কামাইস, অথচ বিয়ে করছিস এক বেসরকারি কামলা রে? এই তোর চয়েজ? ছেলে কি সব দেশ থিক্কা গায়েব হয়ে গেছে?”

যাইহোক, এমন অনেক কথা-ই বেচারীকে শুনতে হবে যদি সে তার চেয়ে কম ইনকাম করা ছেলেকে বিয়ে করে। যে সমাজ নারী-পুরুষের সমানাধিকারে বিশ্বাস করে, তাদের কাছে বেশি কামানো ছেলের সাথে কম কামানো মেয়ের বিয়েটা স্বাভাবিক হলেও কম কামানো ছেলের সাথে বেশি কামানো মেয়ের বিয়েটা অস্বাভাবিক, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও রুচিহীনতার বহিঃপ্রকাশ। বেলুনের মত স্থিতিস্থাপক কাপড়ে তৈরী টাইট-ফিটিং থ্রী-কোয়ার্টার প্যান্টের উপর পাতলা ফিনফিনে হাফস্লীভ গেঞ্জি পরে রাস্তায় বের হওয়াটা “It’s her choice” হতে পারবে, কিন্তু নিজের চেয়ে কম আয় করা ছেলেকে বিবাহ করা “It’s her choice” হতে পারবে না। এটাই সমানাধিকারের সাইন্স! ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে! 😎

যাইহোক! তৎকালীন আরবের কুরাইশ বংশেও এমন কিছু পাবলিক ছিল যারা সুন্দরী, রূপবতী, গুণবতী, সতী-সাধ্যি, শিক্ষিতা, মেধাবী ও অঢেল ধন-সম্পত্তির মালিক খাদীজা (রাঃ)-এর সাথে হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মত একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন গরীবের বিবাহ মেনে নিতে পারেনি। এ নিয়ে তাদের অনবরত কটূক্তি ও সমালোচনার গুঞ্জনে আলোড়িত হয়ে ওঠে মক্কার আকাশ-বাতাস।

এটা জানতে পেরে একদিন কুরাইশদেরকে একত্র করে তাদের যাবতীয় আপত্তির জবাবে মা খাদীজা (রাঃ) বলে দিলেন—

“শুনলাম, জনৈক গরীব ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি বলে আপনারা আমাকে সমাজ থেকে পৃথক করে দিতে চাইছেন, আমার সাথে আর সম্পর্কই রাখবেন না। আপনাদের এহেন সিদ্ধান্ত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে আপনারা মানুষের প্রকৃত সম্পদ জ্ঞান, গুণ, সততা, সত্যবাদিতা তথা মহৎ চরিত্রের তুলনায় অর্থ ও সম্পদকে বেশি মূল্যবান মনে করেছেন। আসলে তা কিন্তু মানুষের মহত্ত্বের কাছে একেবারেই নগণ্য।

আপনাদের কাছে যেহেতু ধন-সম্পদই বড় বিষয়, ধন-সম্পদ না থাকার কারণেই যেহেতু আমার স্বামীকে আপনারা মেনে নিতে পারছে না, তাই আমি আমার স্থাবর-অস্থাবর অর্থ-সম্পদ যা কিছু আছে সমুদয়ই আমার স্বামী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দান করে দিলাম। এখন থেকে তিঁনি আমার সম্পূর্ণ সম্পদের মালিক হলেন। অতঃপর তিঁনি যদি আমার মত রিক্ত, নিঃস্ব কাঙ্গালীকে পাক চরণে আশ্রয় দেন, তবে তাই আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করবো।”

হ্যাঁ, এবার একটু দম নেন! এখানে কিছু বুঝার বিষয় আছে।

খাদীজা (রাঃ) কিন্তু এটা বলতে পারতেন যে, আমার সম্পদ তো তারই সম্পদ। আমি ব্যাবসা চালানো যে কথা, আমার স্বামী ব্যাবসা চালানোও তো সেই একই কথা। আজ থেকে আমি ব্যাবসা চালাবো না, ব্যাবসা চালাবে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।

কিন্তু না! তিনি সেটা করেননি। তিনি কী করলেন? তিনি তার সব সম্পত্তি ‘দান’ করে দিলেন। আচ্ছা… এই ‘দান’ বিষয়টা কোন কারক যেন? সম্প্রদান কারক!

সম্প্রদান কারকের ব্যাসিকটা হলো— যা দেওয়া হয়ে যাবে তার উপর আর কোনো অধিকার থাকবে না, তা আর নিজের বলে দাবী করা যাবেনা। যাকে দেওয়া হবে, সে-ই ওই সম্পত্তির মালিক।

আরবের লোকেরা যাতে বিন্দুমাত্র খোঁটাও দিতে না পারে যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অমুক সম্পত্তি তো খাদীজার (রাঃ) দেওয়া, তমুক সম্পত্তি তো খাদীজার (রাঃ) মূলধন ব্যাবহার করে অর্জিত; এজন্য তিঁনি বলেননি যে, “আমার সম্পদ আর আমার স্বামীর সম্পদ একই কথা”, বরং তিঁনি নিজের সব সম্পত্তি ‘দান’ করে দিয়েছেন এবং নিজে কনভার্ট হয়েছেন সম্পদহীন নিঃস্বে।

যাহোক… এখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। এ যুগের প্রগতিমনারা যেমন অর্থবিত্ত ব্যতীত মানুষকে মূল্যহীন মনে করে, পাত্রপাত্রীর মধ্যে ম্যাচিং করতে গেলেও আগে আয়-ইনকামের স্কেলটা দিয়ে মেপেজুখে দেখে নেয়, খাদীজা (রাঃ) তেমনটা করেননি। তিঁনি একজন মানুষের মনুষ্যত্ব, মহত্ত্ব দেখেছেন। তিঁনি নিজের ভালবাসাটাকে বড় করে দেখেছেন, অর্থবিত্তকে নয়। তাইতো তাঁর পক্ষে এতবড় একটা ‘দান’ সম্ভব হয়েছিল।

এর পরের পয়েন্ট—

ব্যবসায়িক দায়িত্ব যখন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সামাল দিচ্ছিলেন তখন খাদীজা (রাঃ) মন দিলেন ঘরের কাজে। নিজেকে নিয়োগ করলেন স্বামীসেবার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন, খাদীজা (রাঃ) তখন নিজে তাঁর জন্য হেরা গুহা পর্যন্ত খাবার বয়ে নিয়ে যেতেন। এমনকি, নবিজী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কেন সেখানে ধ্যানে যেতেন, ধ্যান করে কী এমন পাচ্ছেন, এসব নিয়েও খাদীজা (রাঃ)-এর বিন্দুমাত্র আপত্তি ছিল না। তিঁনি সেখানে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিলেও তা নিয়ে খাদীজা (রাঃ) কখনও বিরক্ত হন নি।

ঠিক এই জিনিসটাই যদি এখন ঘটে? ধ্যানে যাওয়া লাগবে না, যাস্ট স্বামী যদি কাজের চাপে একঘন্টা দেরী করে বাসায় ফেরে, ব্যাস, তাতেই হয়ে যাবে! দেরী হওয়ার জন্য প্রথমে সন্দেহ করবে, তারপরে খোঁটা মেরে দুয়েকটা কথা বলবে, তারপর শুরু হয়ে যাবে তুলকালাম!

আবার, স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা… নারীবাদীগণ স্বামীকে রেঁধেবেঁড়ে খাওয়ানোটাকে এক প্রকার দাসীত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। স্বামীকে রেঁধে খাওয়ানোটা তাদের জন্য নিতান্তই অপমানজনক। “আমি কেন স্বামীকে রেঁধে খাওয়াতে যাব? নিজে রেঁধে খেতে পারেনা? আমি তো স্বাধীন, স্বাধীনতা নিয়ে কেবল রাস্তাঘাট চরাই করে বেড়ানোটাই আমার কাজ; স্বামীকে রেঁধে খাওয়াতে গেলে তো আমার স্বাধীনতায় ভাটা পড়ে যাবে! তাছাড়া, নারী-পুরুষ সমানাধিকার… ছেলেরাও রাঁধুক, সমস্যা কী?”

পরবর্তী পয়েন্ট—

জিব্রাইল (আঃ) যখন প্রথম প্রথম নবীজি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে আসতেন, তিঁনি তখন প্রচন্ড ভয় পেতেন। কখনও হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তাঁকে এসে সালাম দিয়ে যেতেন, কখনও মেঘের আড়াল থেকে তাঁর নাম ধরে ডাক দিতেন। আর তিঁনি এসব দেখে ভয় পেয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে এসে খাদীজা (রাঃ)-কে বলতেন, “খাদীজা, আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত করো, শীঘ্রই আবৃত করো আমায়, আমার খুব ভয় করছে।”

আম্মাজান খাদীজা (রাঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন। তাঁর মুখ থেকে সব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শুনে তিঁনি তাঁর জ্ঞানের আলোকে বুঝতে পারতেন, তাওরাত-ইঞ্জিলে যে শেষ নবীর বর্ণনা আছে, তাঁর স্বামীই সেই ব্যক্তি। সান্ত্বনা দিতে দিতে তিঁনি নবীজিকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করতেন।

অথচ, স্বামীর বিপদে-আপদে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া, তাকে মানসিক শক্তি যোগানো, তার অসহায়বস্থায় তার পাশে থেকে তাকে সাপোর্ট দেওয়া… এগুলো একজন নারীবাদীর জন্য খুবই লজ্জাজনক। “একজন পুরুষ কেন ভয় পাবে? ভয়ই যদি পাবে তাহলে সে কীসের পুরুষ?”— ইত্যাকার আপত্তির শেষ নেই। যেন ভয় পাওয়াটা পুরুষের জন্য মারাত্মক কোনো অন্যায়। পুরুষ মানুষ হয়ে নারীর (স্ত্রী) কাছে মানসিক সাপোর্ট চাওয়াটাও খুব বড়সড় অন্যায়। কিন্তু নারীর সেসব চাওয়ায় কোনো অন্যায় নেই। যদিও তারা নারী-পুরুষ সমানাধিকারে বিশ্বাসী! (তবুও তাদের অবচেতন মন অস্ফূটে স্বীকার করে নেয়— কিছু দৌর্বল্য শুধু নারীতেই মানায়, পুরুষের জন্য তা নয়; এক্ষেত্রে পুরুষ আর নারীকে সমান বলা চলবে না, চলবে না, চলবে না!)

কিন্তু তথাপি তাদের নারীকে পুরুষে রূপান্তরকরণ প্রক্রিয়া থেমে নেই। এরা ভাবে, পুরুষের মত ড্রেস পরলেই তারা পুরুষ হয়ে যাবে, যোগ্যতা ও ক্ষমতাবলে পুরুষের ঠিকঠিক সমান হয়ে যাবে। বস্তুত এরা নারী হয়ে থাকাটাকেই অভিশাপ মনে করে। তাই আমি বলি— নারী থেকে নারীত্বকে বাদ দেওয়াটাই নারীবাদ; এটাই নারীবাদের ব্যাসিক।

যাইহোক… স্বামীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস, অপরিসীম ত্যাগ, মহানুভবতা, সততা, সহমর্মিতা এবং শত ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও পাশে থাকার অবিচ্ছেদ্য কমিটমেন্টের বিনিময়ে আম্মাজান খাদীজা (রাঃ) কী পেয়েছিলেন?

নবীজি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নবুয়্যতের আগেই স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে তিঁনি সালাম পেয়েছিলেন। তিঁনি যখন খাবার নিয়ে হেরা গুহায় যেতেন, তখন জিব্রাইল (আঃ) নবীজি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বলতেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ), খাদীজা (রাঃ) আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসছেন। তাঁকে বলবেন, আল্লাহ তাঁকে সালাম জানিয়েছেন।” সুবহানআল্লাহ!

এছাড়া, তিঁনি হলেন জান্নাতে মু’মিন নারীগণের সর্দার হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর গর্বধারিনী মা।

সমগ্র নারীকুলের মধ্যে ইমরানের কণ্যা মারিয়াম (আঃ) হলেন সর্বোত্তম এবং নারীদের সেরা হলেন খাদীজা (রাঃ)। [সহীহ বুখারী, ৩৪৩২]

আল্লাহ নবীজি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে খাদীজা (রাঃ)-এর জন্য জান্নাতের মধ্যে মুক্তা নির্মিত একটি প্রাসাদের সুসংবাদ দিতে বলেছেন। [সহীহ বুখারী-৩৮১৬; মুসলিম-২০১৭]

বিঃদ্রঃ

— এখানে নারীশিক্ষার বিরোধিতা করা হয়নি, বরং “শিক্ষার আল্টিমেট সাকসেস ক্যারিয়ার” এই কন্সেপ্টের বিরোধীতা করা হয়েছে।

— মা খাদীজা (রাঃ)-এর সাথে উলুখাগড়াদের তুলনা যে একেবারেই যায়না, সেটা তুলে ধরা হয়েছে।

— নারীবাদীগণ কতটা হিপোক্রেট সেটা তুলে ধরা হয়েছে, মোটেও নারীবিদ্বেষ ছড়ানো হয়নি। (নারীবাদীবিদ্বেষ ছড়াতে চেয়েছি)

— উপরের তিনটি পয়েন্ট লিখেছি যাতে আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অস্বচ্ছতা থাকলে তা দূর হয়!

সূত্র

মতামত দিন