জীবন দর্শন

রামাযান শেষে ঈদের অনুভূতি : আমরা বনাম সালাফে ছালেহীন

মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর জন্য উৎসবের দিন হিসেবে দুই ঈদকে নির্ধারণ করেছেন। দ্বিতীয় হিজরী সালে ঈদায়েনের বিধান বিধিবদ্ধ হয়। ঈদ ইসলামের প্রকাশ্য ও সেরা নিদর্শন সমূহের মধ্যে অন্যতম। ইসলামের স্বর্ণালী যুগের ঈদের উৎসব ছিল পবিত্রতাময় ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ। রাসূল (ছাঃ)-এর তিরোধানের পরে পূণ্যবান ছাহাবায়ে কেরাম, তৎপর্বর্তী সালাফে ছালেহীন যেভাবে ঈদ উদযাপন করতেন এবং মনের মুকুরে ঈদের অনুভূতি যেভাবে লালন করতেন, তার সাথে আমাদের ঈদের অনুভূতি ও উদযাপনের মাঝে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

সৎকর্মশীল ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে ইযাম ও তাদের পরবর্তী সালাফে ছালেহীন শাওয়ালের মুচকি হাসা নতুন চাঁদ দেখার সাথে সাথে চন্দ্র দেখার দো‘আ পড়তেন এবং তাকবীর ধ্বনিতে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মুখরিত করে তুলতেন। রাস্তা-ঘাটে, হাট-বাজরেও তাদের তাকবীর গুঞ্জরিত হত। আর আমরা চাঁদ দেখার সাথে সাথে আতশবাজি ও পটকাবাজিতে গোটা পরিবেশ কলুষিত করে ফেলি। আল্লাহর অনুগ্রতপ্রাপ্ত বান্দা ছাড়া খুব কম সংখ্যক মানুষই চাঁদ দেখার দো’আর পড়ে, তাকবীর দেয় ও পূর্ণ হক্ব আদায় করে ঈদের যাবতীয় কার্যাবলী বাস্তবায়ণ করে ৷

রামাযানে সঞ্চিত তাক্বওয়ার রসদ নিয়ে তারা ঈদের দিন শুরু করতেন। বেশী বেশী তাসবীহ ও ইসতিগফার-তাওবাহ করতেন। আর আমরা গান-বাজনা, নাটক-সিনেমা, ডিজে পার্টি, আল্লাহর অবাধ্যতা, নির্লজ্জতা-বেহায়াপনা এবং হরেক রকম অপচয় দিয়ে ঈদ উদযাপন করি। কারণ আমরা ঈমান-ইহসানের সাথে পালিত ছিয়ামের ঢাল লাভ করতে ব্যর্থ হই । ফলে শয়তান শৃঙ্খল মুক্ত হয়েই পূর্ণোদ্দমে আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং আমাদেরকে নাস্তানাবুদ করে ফেলে। আর আমরা আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই ধরাশায়ি হয়ে যাই।

রামাযানের শেষ দিকে আমাদের ইবাদতে শিথিলতা চলে আসে। হর্ষ-উল্লাসে ঈদ মার্কেটের ধুম পড়ে যায়। এর প্রভাব আমাদের ইবাদতে চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়। ফলে ঈদানন্দের প্রবল বাতাসে শেষ দশকের ইবাদতের একাগ্রতার ও একনিষ্টতা খড়-কুটার মত মনের দিগন্ত থেকে উড়ে যায়।

অথচ সালাফে ছালেহীনের (সৎকর্মশীল পূর্বসূরীগণ) অবস্থা ছিল আমাদের ঠিক উল্টো। তারা শেষ দশকে ইবাদতের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিতেন এবং তাদের আমল কবুল হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন।

কারণ সালাফগণ কোন কাজ পরিপূর্ণ ও নিঁখুতভাবে করতে যেমন কঠোর পরিশ্রম করতেন, কাজটি সুন্দরভাবে করার পরে তা কবুল করানোর জন্য তারা তৎপর থাকতেন এবং আল্লাহ কর্তৃক ফেরত দেওয়ার ভয় করতেন। আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বলেন, ‘তোমরা আমল করার সাথে আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারেও খুব গুরুত্ববান হও। কেননা তাক্বওয়া ব্যতীত আমল কবুল হয় না’। [হিলয়াতুল আওলিয়া ১/৭৫]

তারা বলতেন, ‘রামাযান চলে যাচ্ছে, সে শেষ হওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যে ব্যক্তি রামাযানকে কাজে লাগিয়েছে তার জন্য জান্নাত অবধারিত। আমার মত গাফিল, মিসকীন ভেঙ্গে পড়ছে। আফসোস, আমি হয়ত এর নিয়ামত থেকে বঞ্চিত। চারা বপনের সময়ই যদি সেটি বপন না করা যায়, তাহলে ফসল তোলার সময় তো দুঃখ-দুশ্চিন্তা আর অনুশোচনা ব্যতীত কিছুই পাব না’। [লাত্বাইফূল মা‘আরিফ, পৃ:১৮৪]

আমরা ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য যে বাক্যগুলো ব্যবহার করি, যেমন- ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিন কুম’ (অর্থ:আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের পক্ষ থেকে নেক আমল কবুল করুন) এবং ‘ঈদ মুবারক’ (আপনার ঈদ বরকতমণ্ডিত হোক)। এগুলো কিন্তু নিছক শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের বাক্য নয়; বরং পরস্পরের আমল কবুল হওয়ার জন্য দো‘আ-প্রার্থনা। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শুধু ঈদের শুভেচ্ছ বিনিময়ের চেয়ে পরস্পরের জন্য দো‘আ করার উদ্যেশ্যেই এখানে মুখ্য। যেন তারা রামাযানে সম্পাদিত আমলগুলো আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য পরস্পর এই বাক্য দিয়ে দো‘আ করতেন।

কোনো এক সৎপূর্বসূরীর চেহারায় ঈদের দিন দুশ্চিন্তা দেখা গেল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, এটি তো আনন্দ ও খুশির দিন। তিনি বললেন, তোমরা ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি তো আল্লাহর বান্দা মাত্র। তিনি আমাকে আমল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমার আমল কবুল হয়েছে কি হয় নি তা তো আমি জানি না। [লাত্বাইফুল মা‘আরিফ, পৃ:২০৯]

সেকারণ সৎকর্মশীল সালাফগণ রামাযানে ইবাদত-বন্দেগী করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন, তদ্রুপ এই আমলগুলো কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করাও তাদের নিকট সমান গুত্ববহ কাজ ছিল। মু‘আল্লা ইবনু ফাদ্বল (রহঃ) বলেন,

كانوا يدعون الله تعالى ستة أشهر أن يبلغهم رمضان، ويدعونه ستة أشهر أن يتقبَّل منهم

‘তারা রামাযান মাস পাওয়ার জন্য ছয় মাস আগে থেকে আল্লাহর কাছে দো‘আ করতেন এবং তাদের আমল কবুল হওয়ার জন্য রামাযান পরবর্তী ছয় মাস দো‘আ করতেন’। [লাত্বাইফুল মা‘আরিফ, প:১৪৮]

ঈদের দিন আমরা সাহিত্যরসে ভরপুর বিভিন্ন চমকপ্রদ এসএমএস দিয়ে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাই। যদিও এটা দোষের কিছু নয়। আর আলী (রাঃ) রামযানের শেষ রাতে অন্যদেরকে ডেকে বলতেন,

يا ليت شعري من هذا المقبول فنهنيه ومن هذا المحروم فنعزيه.. أيها المقبول هنيئا لك أيها المردود جبر الله مصيبتك

‘হায় আফসোস! আমি তো জানি না, কার আমল কবুল হয়েছে, যাকে আমি অভিনন্দন জানাবো, আর কার আমল কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যাকে আমি সমবেদনা জানাব।

হে যার আমল গ্রহণ করা হয়েছে, তোমার জন্য সুসংবাদ, আর হে যার আমল কবুল না হয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, দো‘আ করছি আল্লাহর তোমার মুছীবত দূর করে দিন’। [লাত্বাইফুল মা‘আরিফ, পৃ:২১০]

আমরা অনেকেই আছি, যারা ঈদে দিন আনন্দের আতিশয্যে রামাযানকালীন ইবদতের অভ্যাসগুলো একেবারে ভুলে যাই। আবার কেউ রামাযান চলে যাওয়ার সাথে সাথে ছালাত ছেড়ে দেয়। রামাযানের পূর্ববর্তী খারাপ অভাসগুলো আবার শুরু করে দেয়। আমাদের উদ্যেশেই ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) বলেন,

فيا أيها العاصي وكلنا ذلك لا تقنط من رحمة الله بسوء أعمالك فكم يعتق من النار في هذه الأيام من أمثالك فأحسن الظن بمولاك وتب إليه فإنه لا يهلك على الله هالك.

হে অপরাধী গুনাহগার (আমরা সকলেই গুনাহগার)! তোমার পাপের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। তোমার মত কত পাপীকে রামাযানের এ দিনগুলোতে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তাই তোমার রবের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ কর, তাঁর কাছে তাওবা কর। কেননা নিজেকে নিজে ধ্বংসকারী ব্যতীত অপর কাউকে আল্লাহ ধ্বংস করেন না’। [লাত্বাইফুল মা‘আরিফ, পৃ:২১৩]

বিশর আল-হাফী (১৭৯-২২৭ হিঃ) রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হ’ল- সেই লোকদের ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? যারা রামাযানে কঠোর পরিশ্রম করে ইবাদত বন্দেগী করে এবং নেক আমল সম্পাদন করে। কিন্তু রামাযান চলে যাওয়ার সাথে সাথে তারা সেই আমলগুলো পরিত্যাগ করে। তিনি জবাবে বলেন, ‘তারা কতই না নিকৃষ্ট লোক যারা শুধু রামাযান মাসেই আল্লাকে চিনতে পারে (অর্থাৎ, তারা শুধু রামাযান মাসেই আল্লাহকে ভয় করে, অন্য মাসে করে না)’। [মিফতাহুল আফকার, পৃ:২/২৮৩]

কা‘ব রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি সাওম পালন করল আর মনে মনে ভাবল যে, রামাযান শেষ হলে তার রবের অবাধ্যতা করবে, তাহলে তার ছাওম প্রত্যাখান করা হবে। আর যে ব্যক্তি ছাওম পালন অবস্থায় এ নিয়াত করল যে, রামাযান মাস শেষ হলে আর গুনাহ করবে না, তাহলে তার ছাওম কবুল করা হবে এবং সে বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে’। [লাত্বাইফ, পৃ:২১৫]

মূলত ঈদের প্রকৃত আনন্দ সেই সকল পরহেযগার মুমিনদের জন্য, মহান আল্লাহ যাদেরকে রামাযানে ঈমান ও ইহসানের সাথে ছিয়াম-কিয়াম করার তাওফীক্ব দান করেছেন, লাইলাতুল ক্বদরের ইবাদতে আত্মনিয়োগ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং দান-ছাদক্বাহসহ যাবতীয় নেক আমল সম্পাদন করার সক্ষমতা দিয়েছেন।

ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) বলেন,

ليس العيد لمن لبس الجديد، إنما العيد لمن طاعاته تزيد، ليس العيد لمن تجمل باللباس والركوب، إنما العيد لمن غفرت له الذنوب

‘যে ব্যক্তি নতুন কাপড় পরিধান করে, তার জন্য ঈদ নয়; বরং ঈদের আনন্দ সেই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর প্রতি যার আনুগত্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যে ব্যক্তি বাহন ও পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়, ঈদের আনন্দ তার জন্য নয়। ঈদের খুশি তো কেবল সেই ব্যক্তির জন্য, যার পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে’। [ইবনু রজব, লাত্বাইফুল মা‘আরিফ, পৃ:২৭৭]

সুতরাং শুধু দামী পোশাক-পরিচ্ছদ, হরেক রকম খদ্য খাওয়ার মধ্যে প্রকৃত ঈদানন্দ লাভ করা যায় না; রবং রামাযান ব্যাপী তাক্বওয়ার শিক্ষা নিয়ে সারা বছর জীবন পরিচালনার অনুপ্রেরণা ও পাপ বর্জনের সংকল্প নেওয়ার মাধ্যমেই ঈদের প্রকৃত খুশি ও তৃপ্তির আমেজ পাওয়া যায়।

সুফিয়ান আছ-ছাওরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি সর্ব প্রথম দৃষ্টি সংযত রাখার মাধ্যমে আমার ঈদের দিন শুরু করি’। [ইবনুল জাওযী, আত-তাবছিরাহ, পৃ:১০৬]

হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ (২১-১১০হিঃ) বলেন,

كُلُّ يَوْمٍ لَا يُعْصَى اللهُ فِيهِ فَهُوَ عِيدٌ، فَالْيَوْمُ الَّذِي يَقْطَعُهُ الْمُؤْمِنُ فِي طَاعَةِ مَوْلَاهُ وَذِكْرِهِ وَشُكْرِهِ فَهُوَ لَهُ عِيدٌ

‘প্রত্যেক ঐ দিন মুমিনের জন্য ঈদের দিন, যেদিন সে আল্লাহর অবাধ্য হয় না (অর্থাৎ কোন পাপ করে না)। ঐ দিনটি মুমিনের জন্য ঈদের দিন, যেদিনটি সে প্রভুর আনুগত্যে, তাঁর স্মরণে এবং তাঁর প্রতি শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে অতিবাহিত করে’। [লাতাইফুল মা‘আরিফ, পৃ:২৭৮]

আরশের অধিপতি মহান রবের নিকট আমদের প্রার্থনা- আমরা যেন একমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টির লক্ষে ইবাদতে আত্মনিয়েগ করতে পারি। রামাযানের শিক্ষা নিয়ে সারা বছর ব্যাপী পাপমুক্ত জীবন যাপন করতে পারি। যদি কখনো পাপ হয়ে যায়, তাহলে যেন সাথে সাথে তাওবাহ-ইস্তিগফারের মাধ্যমে আবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারি। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাত অনুযায়ী আমরা যেন জীবনের সকল ঈদ উদযাপন করতে পারি। রবের নিয়ামত প্রাপ্ত নেককার সালাফদের যোগ্য উত্তরসূরী হতে পারি। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক্ব দান করুন এবং আমাদের জানা-অজানা, ছোট-বড় সকল পাপরাশি ক্ষমা করুন।

আমীন! ইয়া রাব্বাল আলামীন।

রচনায়: আবদুল্লাহ আল মারুফ

সংগ্রহ

মতামত দিন