আক্বীদা

আল্লাহ্‌ কি মানুষের মাঝে প্রবেশ করেন?

গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদিস দিয়ে গুরুতর একটি ভুল আকিদাহ প্রমানের চেষ্টা!

আল্লাহ্‌ কি মানুষের মাঝে প্রবেশ করেন?

(আমাদের হাদিস অধ্যয়নের চেষ্টা থাকে নিজেদের দল-মত প্রতিষ্ঠা করার জন্য। জান্নাতকে সুন্দর করা ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য নয়। যদি তাই হত ,তবে হাদিস বুঝায় জন্য আমরা নিজেদের খেয়াল খুশির বদলে সাহাবাগনের বুঝ ও সালাফদের ব্যাখ্যা অবশ্যই সামনে রাখতাম। একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ হাদিসকে কেন্দ্র করে গুরুতর একটি ভুল মত , শিরকি মত, যাকে বলে “হুলুলের আকিদা”, প্রতিষ্ঠা করার জন্য কিছু তাসাউফপন্থী লোক অপচেষ্টা করছে। আমাদের উচিত হাদিসটির ব্যাপারে সালাফদের কি মত তা সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তবে চলুন…

হাদিসটি

وَمَا تقرَّبَ إِلَيَ عبْدِي بِشْيءٍ أَحبَّ إِلَيَ مِمَّا افْتَرَضْت عليْهِ: وَمَا يَزالُ عَبْدِي يتقرَّبُ إِلى بالنَّوافِل حَتَّى أُحِبَّه، فَإِذا أَحبَبْتُه كُنْتُ سمعهُ الَّذي يسْمعُ بِهِ، وبَصره الَّذِي يُبصِرُ بِهِ، ويدَهُ الَّتي يَبْطِش بِهَا، ورِجلَهُ الَّتِي يمْشِي بِهَا، وَإِنْ سأَلنِي أَعْطيْتَه، ولَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لأُعِيذَّنه

অর্থঃ —–আমার বান্দা আমি যা তাঁর উপর ফরজ ইবাদতের চাইতে আমার কাছে অধিক প্রিয় কোন ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে না। আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারা সর্বদা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে, তার সেই কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শোনে। তার সেই হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে। তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে সওয়াল করে তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে দান করি। যদি আশ্রয় চায়, তবে অবশ্যই আশ্রয় দান করি। (বুখারি-৬৫০২)

পর্যালোচনাঃ

এই হাদিসটি ভাল করে বুঝতে তিনটি জিনিস সামনে রাখা লাগবে।

১. আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দার হাত, পা, চোখ ও কান হয়ে যায় , এই জাতীয় শব্দগুলো ব্যবহার অন্যান্য হাদিসে কিভাবে এসেছে এবং কেন এসেছে?

২. এ হাদিসের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগনের ব্যাখ্যা কি?

৩. এ হাদিসের আলোকে সুফীদের ব্যাখ্যাকৃত ভয়ানক শিরকি আকিদাহটি কি?

প্রথম আলোচনাঃ

আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দার হাত, পা, চোখ ও কান হয়ে যায় , এই জাতীয় শব্দগুলোর ব্যবহার অন্যান্য হাদিসে কিভাবে এসেছে এবং কেন এসেছে?

আমরা জানি কোরআনে “রুহুল্লাহ”(সূরা ইউসূফ-৮৭) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে অথচ আল্লাহ্‌ “রূহ” থেকে পবিত্র।

কা’বাকে “বাইতুল্লাহ” বলা হয়ে থাকে অথচ আল্লাহ্‌ সেখানে থাকেন না।

এক হাদিসে কুদসীসে বর্ণিত হয়েছে,

إنَّ اللَّهَ عزَّ وجلَّ يقولُ يَومَ القِيامَةِ: يا ابْنَ آدَمَ مَرِضْتُ فَلَمْ تَعُدْنِي، قالَ: يا رَبِّ كيفَ أعُودُكَ؟ وأَنْتَ رَبُّ العالَمِينَ، قالَ: أما عَلِمْتَ أنَّ عَبْدِي فُلانًا مَرِضَ فَلَمْ تَعُدْهُ، أما عَلِمْتَ أنَّكَ لو عُدْتَهُ لَوَجَدْتَنِي عِنْدَهُ؟ يا ابْنَ آدَمَ اسْتَطْعَمْتُكَ فَلَمْ تُطْعِمْنِي، قالَ: يا رَبِّ وكيفَ أُطْعِمُكَ؟ وأَنْتَ رَبُّ العالَمِينَ، قالَ: أما عَلِمْتَ أنَّه اسْتَطْعَمَكَ عَبْدِي فُلانٌ، فَلَمْ تُطْعِمْهُ؟ أما عَلِمْتَ أنَّكَ لو أطْعَمْتَهُ لَوَجَدْتَ ذلكَ عِندِي، يا ابْنَ آدَمَ اسْتَسْقَيْتُكَ، فَلَمْ تَسْقِنِي، قالَ: يا رَبِّ كيفَ أسْقِيكَ؟ وأَنْتَ رَبُّ العالَمِينَ، قالَ: اسْتَسْقاكَ عَبْدِي فُلانٌ فَلَمْ تَسْقِهِ، أما إنَّكَ لو سَقَيْتَهُ وجَدْتَ ذلكَ عِندِي.

অর্থঃ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ কিয়ামতের দিন বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি রোগাক্রান্ত হয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমার সেবা করোনি। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! তুমিতো বিশ্বজগতের প্রভু, আমি কি করে তোমার সেবা করতে পারি? আল্লাহ্ বলবেন, তোমার কি মনে নেই যে, আমার অমুক বান্দাহ রোগাক্রান্ত হয়েছিলো। তখন তুমি তাঁর খোঁজখবর নাওনি। যদি তুমি তার সেবা করতে তাহলে আমাকে সেখানে পেতে। অতঃপর অপর এক ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ্‌ বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে খেতে দাওনি। সে বলবে, হে প্রতিপালক! তুমি তো সারা জাহানের মালিক, আমি কিভাবে তোমাকে খাওয়াতে পারি? আল্লাহ্‌ বলবেন, তোমার কি স্মরণ নেই যে, আমার অমুক বান্দাহ তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলো কিন্তু তুমি তাকে খেতে দাওনি। তোমার কি একথা জানা ছিল না যে, তুমি যদি তাকে খেতে দিতে তবে আমাকে তাঁর কাছে পেতে। অতঃপর তিনি (অপর একজনকে) বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম কিন্ত তুমি আমাকে পান করাওনি। সে বলবে, প্রভু হে! আমি তোমাকে কিভাবে পান করাতে পারি? তুমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক! আল্লাহ্‌ বলবেন, আমার অমুক বান্দাহ তোমার কাছে পানি চেয়েছিল তুমি তাকে পানি দাওনি, যদি তখন তুমি তাকে পানি পান করাতে তবে আমাকে তাঁর কাছে পেতে।(মুসলিম-২৫৬৯)

এই হাদিসে আমরা দেখলাম, আল্লাহ্‌ অসুস্থ, পান করা , খাদ্য গ্রহণ করা থেকে পবিত্র তা সত্বেও তিনি নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে এসব কথা বলেছেন। এখন প্রশ্ন হল এই ধরনের শব্দ যা থেকে তিনি পবিত্র তারপরেও কেন নিজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করলেন?

ইমাম নববী (রাহি) এর কারণ বর্ণনা করে লেখেন,

قَالَ الْعُلَمَاءُ إِنَّمَا أَضَافَ الْمَرَضَ إِلَيْهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى وَالْمُرَادُ الْعَبْدُ تَشْرِيفًا لِلْعَبْدِ وَتَقْرِيبًا لَهُ قَالُوا وَمَعْنَى وَجَدْتنِي عِنْدَهُ أَيْ وَجَدْتَ ثَوَابِي وَكَرَامَتِي —

অর্থঃ ” উলামাগন বলেছেন, অসুস্থতাকে আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দিকে সম্পৃক্ত করার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বান্দাকে (এসব) ইবাদতের (কারনে বিশেষ) সম্মানিত করা ও তাঁর নিকটবর্তী করা। তাঁরা বলেছেন,”তার নিকট আমাকে পেতে” এর অর্থ হল, “আমার সওয়াব ও বিশেষ দয়া পেতে”। ——-।(শরহে মুসলিম- ১৬/১২৬)

আমি বলি (আব্দুর রহমান), আল্লাহ্‌ গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বা কাজের আরো গুরুত্ব ,সম্মান ও মূল্যায়ন বোঝাতে অনেক সময় নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে থাকেন। তার মানে এই নয় যে, সে বস্তুতে আল্লাহ্‌ প্রবেশ করেন বা সে বস্তুতিতে তিনি রুপান্তারিত হয়ে যান। এসব ভুল ব্যাখ্যা। নতুবা বলতে হবে, আল্লাহ্‌র ঘর মানে আল্লাহ্‌ সেখানে থাকেন, আল্লাহর রূহ মানে , আল্লাহর আত্মা, নাউজুবিল্লাহ। আর অসুস্থ , খাবার ও পান করানোর হাদিসে তো স্পষ্ট দেখলাম এর দ্বারা কি উদ্দেশ্য। তা সত্ত্বেও কিছু সুফি বলে , প্রথম হাদিস দ্বারা নাকি আল্লাহ্‌ মানুষের মাঝে প্রবেশ করে একথা প্রমান হয়। অথচ আমরা এসব আকিদাহ কখনও পোষণ করি না, করতে পারিও না।

দ্বিতীয়ত, হাদিসটির ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের ব্যাখ্যাঃ

ইবনে রজব হাম্বালি (রাহি ) বলেছেন,

والمعنى: أن محبةَ اللَّه إذا استغرقَ بها القلبُ واستولتْ عليه لم تنبعثِ
الجوارحُ إلا إلى مراضِي الربِّ، وصارتِ النفسُ حينئذ مطمئنةً بإرادةِ مولاها
عن مرادِها وهواه

অর্থঃ” এর অর্থ হল, যখন আল্লাহর ভালোবাসায় অন্তর পূর্ণ হয়ে যায় এবং নফসের উপর কর্তৃত্ব লাভ করে, তখন তাঁর অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেবল রবের সন্তুষ্টি (অর্জনের) জন্য উত্থিত হয়। তার মন তখন নফসানী ও কু-প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে তার মাওলার ইচ্ছা পুরনে পরিতৃপ্ত হয়। (তাফসীরে ইবনে রজব-২/২৫৭)ا

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ

فَمَعْنَى الْحَدِيثِ أَنَّ الْعَبْدَ إِذَا أَخْلَصَ الطَّاعَةَ صَارَتْ أَفْعَالُهُ كُلُّهَا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَلَا يَسْمَعُ إِلَّا لله، ولا يبصر إلا لله أَيْ مَا شَرَعَهُ اللَّهُ لَهُ، وَلَا يَبْطِشُ وَلَا يَمْشِي إِلَّا فِي طَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وجل،
_________

অর্থঃ হাদিসের অর্থ হল, বান্দা যখন এখলাসের সাথে ইবাদত করে তার সকল কাজ তখন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। তার শোন কেবল আল্লাহর জন্য হয়। আল্লাহর বৈধকৃত জিনিস ছাড়া সে আর কিছু দেখে না। তার কিছু ধরা ও চলা আল্লাহ্‌ আযযা ওয়া যাল্লাহর জন্যই হয় কেবল। (তাফসীর ইবনে কাসির-৪/৫০৬)

সারকথাঃ তাঁরা এটা বুঝাতে চেয়েছেন যে, ইবাদতের দ্বারা সে এমন এক দরজায় পৌঁছে যায় যে তার প্রত্যেকটা আমল নফসের খাহেশাত থেকে মুক্ত হয় এবং আল্লাহর মর্জি মাফিক হয়ে যায়। আর তার এই অবস্থার সম্মান প্রকাশ স্বরূপ আল্লাহ্‌ নিজের দিকে নিসবত করেছে। আল্লাহর সত্ত্বা তাতে প্রবেশ করে এটা বুঝানো হয়নি।

তৃতীয় আলোচনাঃ

সুফীদের জঘন্য ব্যাখ্যা ও তাঁর উত্তরঃ সুফীগণ এই হাদিস থেকে প্রমানের চেষ্টা করে যে, বান্দা ইবাদাত করতে করতে এমন এক স্তরে উপনীত হয় যে আল্লাহ্‌ তাঁর মাঝে প্রবেশ করে, নাউজুবিল্লাহ । তাদের কথার ভ্রান্ততা বুঝতে এই জাতীয় অন্যান্য হাদিস সামনে রাখলে উক্ত হাদিসের সমাধান এমনি এমনি হয়ে যায়। তবে ইবনে হাজর আসকালানী(রাহি) প্রায় চার পৃষ্ঠা ব্যাপী তাদের এসব শিরকি কথার খন্ডন পেশ করেছে। অনেক লম্বা হবার ভয়ে সেসব বাদ দিতে হচ্ছে। তবে দুটি কথা পেশ করছি। আশাকরি মোটামুটি উত্তর পেয়ে যাবেন। আর বিস্তারিত জানার জন্য “ফাতহুল বারী-১১/৩৪২-৩৪৬” পৃষ্ঠা দেখা যেতে পারে।

প্রথম কথাঃ হাদিসের শেষেই বলা হয়েছে, যদি সে আমার কাছে চায় তবে আমি অবশ্যই তাকে দেই। এখন আল্লাহ্‌ যদি তাঁর মধ্যে প্রবেশ করে -নাউজুবিল্লাহ, তবে সে আবার কার কাছে চাইবে? আর এই কথা তো এটাই প্রমান করে যে, উক্ত ব্যক্তি নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র এমন প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়েছে যে এখন তার দোয়া আল্লাহ্‌ চাওয়া মাত্রই কবুল করছেন। সে আল্লাহ্‌ হয়ে যায়নি বরং বান্দা হিসাবেই দোয়া করছে আর আল্লাহ্‌ রব হিসাবেই দোয়া কবুল করছেন। সুতরাং আল্লাহ্‌ বান্দার মধ্যে প্রবেশ করেছে কথাটি প্রমান হয় না।

দ্বিতীয় কথা  শায়েখ ইবনে উসাইমিন(রাহি) বলেছেন,

فأنت ترى أن الله تعالى ذكر في الحديث عبدا ومعبودا، ومتقربا ومتقربا إليه، ومحبا ومحبوبا، وسائلا ومسئولا، ومعطيا ومعطى، ومستعيذا، ومستعاذا به، ومعيذا ومعاذا فالحديث يدل على اثنين متباينين، كل واحد منهما غير الآخر،

অর্থঃ আর আপনি দেখছেন যে, আল্লাহ্‌ হাদিসে কুদসির মধ্যে গোলাম ও মনিব, নিকটবর্তী হওয়া ব্যক্তি ও যার নিকটবর্তী হতে চাওয়া হয়, ভালোবাসনেওয়ালা ও যাকে ভালোবাসা হয়, সওয়ালকারী ও যার কাছে সওয়াল করা হয়, দান প্রদত্ত ব্যক্তি ও দাতা, আশ্রয় প্রার্থনাকারী ও আশ্রয়দাতা, ভিন্ন ভিন্ন এমন দুই জিনিসের আলোচনা করা হয়েছে যা একটি আরেকটি থেকে একেবারেই ব্যতিক্রম। (মাজমাউল ফাতওয়া-১/১৪৫)

© উস্তায Abdur Rohman (হাফিযাহুল্লাহ)

সংগ্রহ এখান থেকে

মতামত দিন