সাম্প্রতিক বিষয়

করোনা মহামারীতে মসজিদ ও অন্যান্য

(যাদেরকে এখনো দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভাগ্যসন্ধানে সারাদিন বাইরে কাজ করে যেতে হচ্ছে, তাদের জন্য এই লেখাটা নয়। এটা সেসব মানুষের জন্য, যাদের এখন সুযোগ আছে ঘরে থাকার)

ইতিহাসে কিছু এমন মুহূর্ত আসে, যাতে খুব দ্রুত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যর্থতা জাতিকে বহুকাল ভোগায়। সেই সিদ্ধান্ত নিতে গেলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইগো আর ওভার কনফিডেন্স। অন্যান্য জাতির মতো মুসলিম জাতিও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে কম ভোগে নি। মুসলিম জাতি এসব মুহূর্তে তাকওয়ার ফ্যালাসিতে পড়েছে বারবার। প্রজ্ঞাকে তারা তাকওয়ার মাপে মেপেছে আর কমতি মনে করে ছুঁড়ে ফেলেছে। আর কে না জানে, লোকে তাকওয়া বলতে কাঠিন্য বোঝে, যেখানে ইসলাম বলে যাচ্ছে তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না।

“এই কঠিন করো না”কে আমরা নিতে পারছি না কঠিন করোনার আঘাতের সময়ে এসেও। বাংলাদেশে অলরেডি যে ডিজাস্টার হয়ে গেছে তা কল্পনাতীত। সচেতন মানুষমাত্রই জানেন দেশে এখন কী ভয়াবহ অবস্থা। মানুষ কী নির্বোধের মতো আচরণ করে যাচ্ছে। দেশে দেশে যখন বহিরাগমন ফ্লাইট বন্ধ করে দিল তখন আমাদের দেশে লক্ষাধিক প্রবাসীকে আনা হলো। হোম কোয়ারেন্টিনের তামাশা হলো, বিদেশফেরতরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ালেন, কর্মস্থলে গেলেন, সবার সাথে মিশে গেলেন। ১৭ মার্চ পর্যন্ত স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি খোলা রাখা হলো। এরপর তারা দলবেঁধে গেল বিচে। এখনো গ্রামে গ্রামে গণজমায়েত হয়ে দোয়ার আয়োজন হচ্ছে। এরমধ্যে কত হাজার লোকের গায়ে ভাইরাস ছড়িয়েছে কেউ জানে না। হাসানুজ্জামান শ্যামল ভাইয়ের নোটটা পড়ে দেখবেন, লেখার শেষে লিঙ্ক দিয়েছি। একটা বিষ্ফোরণের অপেক্ষা শুধু। সরকার চেষ্টা করবে যতটা ঢাকা যায়, প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। ভুগবে মানুষ। আমি-তুমি-আপনি। আর এমন সময়ে এসে মসজিদ বন্ধের প্রসঙ্গে নিয়ে আসা হচ্ছে ইসলামিস্ট বনাম সেক্যুলার অনর্থক তর্ক।

যারা বলছেন অফিস-আদালত-গার্মেন্টস-মার্কেট-বাজার সব খোলা রেখে মসজিদ কেন বন্ধ হবে- তাদের উত্তর দেবার আগ্রহটাও হারিয়ে যায়। কেউ যদি নিজের কাজটা করতে অন্যরা কী করলো তার ওপর নির্ভরশীল হয় তাহলে বলার কিছু নেই। তবু এমন মানুষের সংখ্যাটা অপ্রতুল নয় বলেই দুয়েকটা কথা বলি- ভাই শোনেন। যারা সেগুলো এখনো খোলা রাখছে তারা মানুষের সর্বনাশ করছে। আর কদিন পর যে আউটব্রেকটা হবে তখন দলে দলে লোকের কপাল চাপড়ানো লাগবে (আল্লাহ্‌ মাফ করুক)। সেই দলে আমি থাকতে চাই না বলেই মসজিদ বন্ধের (বা অন্তত জামাত বন্ধ) কথা বলি। তাছাড়া সেসব প্রতিষ্ঠান তো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। লোকে কাজ করলে মালিকেরা লাভ তুলছে। মালিকের কাছে কর্মচারীর জীবনের মূল্য থাকতে না-ই পারে। কিন্তু একই চিন্তা কীভাবে আমার মুসল্লি ভাইদের ব্যাপারে করা সম্ভব?

সত্যি কথাটা হচ্ছে যারা এখনো সব ধরণের জমায়েত (ইনক্লুডিং মসজিদ-মাহফিল) বন্ধ রাখতে চাচ্ছেন না তারা লিটারেলি মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন।
তাছাড়া, কথাটা অনেক তিক্ত লাগবে, ইভেন স্কুল-কলেজ-অফিসের চেয়েও মসজিদে ভাইরাস ছড়ানো বেশ সহজ। করোনাভাইরাস সংক্রমণের উপযুক্ত জায়গা হলো জনসমাগম- এটা সারাবিশ্বেই স্বীকৃত। আর মসজিদে সমাগমের কিছু স্পেশাল বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য সমাগমের চেয়েও ভালনারেবল। যেমন- মসজিদে গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো লাগে। আবার নামাজের মধ্যে থাকলে পাশের জন কাশলে দূরে সরাও যায় না, তাকে মুখ ঢাকতে বলাও যায় না। তাছাড়া নামাজের মনোযোগ যত গভীর হবে (যা কাম্য) ততই আশেপাশে কী হচ্ছে তা থেকে মন সরে যাবে।

এগুলো হলো ইন জেনারেল মসজিদে জামাতের চিত্র। আর বাংলাদেশে মসজিদে আরো কিছু স্পেশাল ব্যাপার আছে। যেমন-

১। মুসল্লিরা বেশিরভাগই বৃদ্ধ ও বয়স্ক। তারাই করোনাভাইরাসের প্রধান টার্গেট। তাদের অনেকে সারাবছরই অসুস্থ থাকেন। আর কিছু না হোক এই মুরুব্বিদের তো মসজিদে আসা (এবং সম্ভব হলে ঘর থেকে বের হওয়াই) বন্ধ করা জরুরি। যদি জামাত চালু রেখে বলা হয় বয়স্করা আসবেন না তাহলে তারা সেটা ভয়ঙ্কর অফেনসিভভাবে নেবেন, এদেশের কালচারটাই এমন। এই শ্রেণী বিভাজন গণ্ডগোল তৈরি করবে। হয় সবার জন্যই জামাত বন্ধ থাকবে নয় সবার জন্যই খোলা থাকবে। নিঃসন্দেহে প্রথমটা বেশি প্র্যাক্টিক্যাল।

২। মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন না, অন্যের সমস্যাও কেয়ার করে না। সারাক্ষণ কাশি-থুতু ফেলা বাংলাদেশিদের বৈশিষ্ট্য। মসজিদে একজন কাশলে বিশজন কাশা শুরু করে। মুখে হাত বা কাপড় যে দেয় না তা বলাই বাহুল্য। নামাজের মধ্যে তারা মোবাইলে কল আসলে কেটে দিতে পারে না আবার মুখে কাপড় দেবে! এ অবস্থায় বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়ানোর দায় কে নেবে?

৩। মসজিদ একটা উন্মুক্ত জায়গা। এখানে সবাই আসে, যায়। কাউকে এন্ট্রি করতে হয় না,কারো পরিচয় জানাতে হয় না। কে অসুস্থ, কে বিদেশ থেকে এসেছে- এসবের কোনও খবর থাকে না। অফিস কিংবা গার্মেন্টসে তো অন্তত পরিচয়টা থাকে, কেউ অসুস্থ হলে অন্যরা জানার সুযোগ পায়। মসজিদে তো তা নেই। তাই এমনকি অফিস-আদালত-স্কুল-কলেজে যে সুরক্ষাটুকু নেওয়া সম্ভব মসজিদে সেটাও সম্ভব না।

এসব শোনার পর বলা হয়, যারা সংক্রমণে অসুস্থ তাদের তো মসজিদে আসা জায়েযই নেই, যারা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে তারাও না চাইলে আসবে না, এটা শরয়ী ওজর; কিন্তু যে আসতে চায় তাকে বাধা দেবার আপনি কে? জামাত বন্ধ করার কথা কেন বলছেন?

ভাইরে, এই যে আপনাদের বুঝটা, এটাই সবচেয়ে মারাত্মক ব্লান্ডার। মানুষকে, বিশেষ করে বাঙালিকে তার ইচ্ছাধীন করে দেবার মতো অপরাধ আর হয় না। এই জাতিকে বাধ্য করা না হলে সে কিছু করবে না। একে তো দেশে টেস্টিং কীটসের অপ্রাচুর্য, তার ওপর হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষ ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ায়। ফলে কে করোনায় আক্রান্ত অনেকসময় রোগী নিজেই জানে না। আর জানলেও সুরসুর করে নিয়ম মানা শুরু করবে এই আশা অন্তত এই দেশের লোকের কাছ থেকে করা যায় না। তাছাড়া ভাইরাস শরীরে থাকলেই তো আর লক্ষণ প্রকাশ পাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। সে অবস্থায় সে মসজিদে গিয়ে আরো দশজনকে দিয়ে আসবে। “যারা রোগী তারা ঘরে থাকবেন আর যারা সুস্থ তারা মসজিদে আসবেন”- এই কথার কোনও প্র্যাক্টিক্যালিটি এই অবস্থায় বাংলাদেশে নেই।

আর যারা বৃষ্টির হাদীস করোনায় আসবে কি না, আগেকার মহামারীতে মসজিদ বন্ধ হয়েছিল কি না এসব নিয়ে তর্ক করছেন- তারা আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে থেমে যান। এই করোনা মহামারী একটা নতুন জিনিস। আমরা জীবদ্দশায় এরকম কিছু দেখি নি। আগেকার যুগের মহামারী, সেসময়কার জলবায়ু, পরিস্থিতি, সোশিও-ইকোনোমিক ব্যবস্থা সমস্তই আলাদা ছিল। অজস্র ফ্যাক্টর বিবেচনা করে তখনকার আলেমরা সেই সময়ের সাপেক্ষে কী বলেছিলেন তা দয়া করে কপিপেস্ট করতে যাবেন না। এই নতুন সমস্যাকে নতুনভাবে বুঝতে চেষ্টা করুন।

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, অনেক করোনা ভাইরাসবহনকারী লক্ষণহীন মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, মসজিদে যাচ্ছে, আরো অজস্র মানুষকে ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। যখন এই লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া শুরু করে লিটারেলি দেশ অচল হয়ে পড়বে। অন্যান্য দেশের প্রস্তুতির সাথে আমাদেরটা তুলনা করে দেখুন, আমরা আগুন নিয়ে খেলছি। কমাতে না পারুন, দয়া করে একে বাড়াবেন না। আকলহীন আবেগ দেখানোর সময় এটা না। সেক্যুলার-ইসলামিস্ট তর্কের বিষয়ই এটা না। ইগো দেখানোর সময় এটা না। কালক্ষেপনের সময় এটা না।

হাতজোড়-পা জোড় যা করতে হয় সব করেই বলছি, যাদের ঘরে থাকার সুযোগ আছে, মসজিদে জামাত বন্ধ করুন, মসজিদে যাওয়া বন্ধ করুন। মসজিদ খোলা রাখলে শুধু ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম এরকম তিন-চারজন পড়ে ফেলুন। সাধারণ মানুষদের বলুন জামাতে না আসতে। মসজিদ থেকেই ঘোষণা দিয়ে বলুন।

সারাজীবন মানুষকে মসজিদে আসতে বলেছি আর আজ মসজিদে না যেতে বলছি, আমার জন্যও কতটা কষ্টের। এটাকে অন্তত একটু মূল্য দিন। বাসায় নামাজ পড়ুন। বেশি বেশি পড়ুন। নফল বাড়িয়ে দিন। তাহাজ্জুদ পড়ুন। যিকর-দুয়া-কুরআন তিলাওয়াত সব করুন বেশি বেশি। কিন্তু বাড়ির ভেতর।

যদি এমন হতো আপনি অসুস্থ, মসজিদে না যাওয়ার ওজর আছে, তবু গেলেন, কারণ মসজিদকে ভালোবাসেন। তাহলে কখনোই বলতাম না-যেয়েন না। কিন্তু এই মহামারী তো সেটা নয়। একজন মানুষ আরো অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা ভাইরাস শরীরে থাকলেই তা বোঝা যাবে এমন না, পৃথিবীর বহু দেশে এই অজানা অচিহ্নিত রোগীদের দ্বারাই করোনা ছড়িয়েছে। আপনার না হয় নিজের জীবনের দাম নেই, কিন্তু অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অধিকার কে দিল? এটা তো সরাসরি হাক্কুল ইবাদ, মানুষের হক। আপনার সুস্থতার সাথে এখন হাজারো মানুষের জীবন জড়িয়ে গেছে। একটু বুঝুন। একটু মাথা খাটান।

আমার ফ্রেন্ডলিস্টে যারা আছেন এবং যারা আমার লেখা পড়ছেন, তাদের বেশিরভাগের চেয়ে আমার তাকওয়া নিচুস্তরের তাতে সন্দেহ নেই, যদিও আমার সম্পর্কে আপনারা অনেকে অতিরিক্ত সুধারণা রাখেন। কিন্তু তাকওয়া কম হলেও এই পার্টিকুলার প্রসঙ্গে আমার বুঝটা আপনাদের বুঝের চেয়ে বেশি সঠিক, এটা কি হতে পারে না? হতে পারে না আমি এমন কিছু বুঝতে পারছি যা দেশের মেজরিটি আলেম এখনো বুঝতে পারেন নি? যদি এমন হওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকে তাহলে আমার লেখাটা অগ্রাহ্য করবেন না।

আমার চিন্তাভাবনা খুব সিম্পল। যে ডিজাস্টার অলরেডি হয়ে গেছে সেটা তো ঠেকাতে পারবো না। কিন্তু এটা যাতে আমার কারণে আর না বাড়ে সেটা নিশ্চিত করবো। আমার কারণে যেন একজনও ঝুঁকিতে না পড়ে সেটা আমি এনশিওর করবো। বাকিরা যা খুশি বলতে থাকুক।

পরিশেষে, যা লেখাটি পড়ছেন, সবার প্রতি একান্ত অনুরোধ, নিজ বাড়ির ভেতর সেঁধিয়ে যান। একান্ত বাধ্য না হলে বেরোবেনই না, জনসমাগম তো অনেক দূরের কথা। জানি, অনেককেই এগুলো মেনে চলার মতো সৌভাগ্য আল্লাহ্‌ দেন নি, অফিস বা অন্যান্য কাজে বাইরে যেতেই হচ্ছে। তাদের জন্য আল্লাহ্‌ সহজ করুন। মসজিদের কথা তো বলেইছি, অন্যান্য জায়গাতেও যাতায়াত বন্ধ করুন। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে, এটার রাশ টানতে হবে। বেটার লেট দ্যান নেভার।

– জুবায়ের

সূত্র

মতামত দিন