ইসলামী শিক্ষা

‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার পরিণতি

ইন শা আল্লাহ’ শব্দের অর্থ ‘যদি আল্লাহ চান’। শব্দটির গভীরতা ব্যাপক। একজন মুমিন বান্দার সাথে গুরুত্বপূর্ণ এই শব্দটির সংযোগ সবসময়েই থাকে যখনই সে ভবিষ্যতে কোন কাজ করার ইচ্ছে পোষণ করে। এই শব্দটি একজন মুমিন বান্দার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা চলুন দেখে আসা যাক কয়েকটি ঘটনা দিয়ে।

ঘটনা ১ : নাবী করিম (সাঃ) যখন নিজেকে নাবী দাবি করলেন তখন কুরাইশ সম্প্রদায় তা বিশ্বাস করতে চাইলো না (অনেকে বিশ্বাস করলেও মানতে চাইলো না)। তো, সে সত্য নাবী কিনা তা যাচাইয়ের জন্যে তাদেরই মধ্য থেকে দুজন লোককে ইহুদি পন্ডিতদের কাছে পাঠালো যারা ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ। তাওরাতে উল্লেখ করাই ছিলো যে এই পৃথিবীতে একজন নাবী আসবেন এবং তারপর আর কোন নাবী আসবেন না। যেহেতু, ইহুদি পন্ডিতগণ আগে থেকেই অবগত ছিলেন যে একজন নাবী আসবেন তাই কুরাইশ সম্প্রদায় থেকে আগত সেই দুই লোককে বলা হয়, মুহাম্মাদ (সাঃ) কে গিয়ে ৩টি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে। যদি এ তিনটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয় তাহলে বুঝবে সে সত্য বলছে আর যদি না দিতে পারে তাহলে বুঝবে লোকটি ভন্ড।

১ম প্রশ্ন : গুহাবাসী সেই যুবকদের ঘটনায় কি হয়েছিলো?

২য় প্রশ্ন : কে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে ভ্রমণ করেছিলো?

৩য় প্রশ্ন : রূহ কি?

তারা সাথে এও জুড়ে দেয় যে, ৩টি প্রশ্নের উত্তরে যদি ১ম দুইটি সঠিক বলে তবেই বুঝবে তিনি সত্য নাবী।

লোক দুজন প্রশ্ন শুনে চলে যায় এবং নাবী (সাঃ) কে গিয়ে জিজ্ঞেস করে। নবিজী বললেন, তোমরা আগামীকাল এসো, উত্তর পেয়ে যাবে। কিন্তু তিনি ইন শা আল্লাহ বলতে ভুলে গেলেন। তিনি ভাবলেন, আল্লাহ তায়ালাই তাঁকে ওয়াহীর মাধ্যমে উত্তর জানিয়ে দিবেন। পরদিন লোকগুলো এলো, কিন্তু ওয়াহী তো এলো না। তিনি তার পরদিন আবার লোকগুলোকে আসতে বললেন, পরদিনও কোন ওয়াহী নাযিল হলো না। এভাবে, একদিন একদিন করে চলে যায় ওয়াহী তো আর আসে না। নবিজী এবার বেশ চিন্তিত হলেন। ওদিকে কুরাইশ সম্প্রদায় কে আর পায় কে? তাঁরা তো এবার উপহাসের বড় একটা সুযোগ পেয়ে গেলো। হাসাহাসি, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ চলতেই থাকলো। এভাবে, ১৫ দিন পর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে জীবরাঈল (আঃ) ওয়াহী নিয়ে এলেন নবিজীর কাছে। ৩টি প্রশ্নেরই উত্তর নিয়ে এসেছেন। নাযিল হলো সূরাতুল কাহফ (পবিত্র কুরআনের ১৮ নম্বর সূরা)। সেখানে ইহুদিদের দেয়া ১ম প্রশ্ন ছিলো আসহাবে কাহফ (গুহাবাসী যুবকদের) ঘটনা কি, যা কিনা সূরাতুল কাহফের ১০-২৭ আয়াত পর্যন্ত বর্ননা করা হয়েছে। ২য় প্রশ্নের উত্তরে সূরাতুল কাহফের ৮৩-৯৮ আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ উত্তর দিয়েছেন যুলকারনাইন সম্পর্কে। ৩য় প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ বলেছেন, “তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, রূহ আমার রবের আদেশ থেকে আর তো।আদের জ্ঞানের থেকে অতি সামান্যই দেয়া হয়েছে” (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৮৫)।

তো, সব প্রশ্নেরই উত্তর এসেছে ঠিক। তবে, অনেকদিন পর। এর কারণ কি? এর জবাবে আল্লাহ নাবীকে বলেছেন, ” আর কোন কিছুর ব্যাপারে তুমি মোটেও বলবে না যে নিশ্চয় আমি আগামীকাল তা করবো। তবে, আল্লাহ যদি চান। আর যদি ভুলে যাও তবে তুমি তোমার রবের যিকির করো। ” (সূরা কাহফ, আয়াত ২৩-২৪)

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় ইন শা আল্লাহ বলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যতে কোন কাজ করার ইচ্ছে পোষণ করলে।

ঘটনা ২ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “সুলাইমান ইবনে দাউদ ‘আলাইহিমাস সালাম বললেনঃ আমি আজ রাতে আমার সত্তর জন স্ত্রীর উপর উপগত হব। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে- নব্বই জন স্ত্রীর উপগত হব, তাদের প্রত্যেকেই একটি ছেলে সন্তান জন্ম দেবে যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। তখন তাকে ফিরিশতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন যে, বলুনঃ ইনশাআল্লাহ। কিন্তু তিনি বললেন না। ফলে তিনি সমস্ত স্ত্রীর উপর উপনীত হলেও তাদের কেউই কোন সন্তান জন্ম দিল না। শুধু একজন স্ত্রী একটি অপরিণত সন্তান প্রসব করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ, সে যদি বলত ইনশাআল্লাহ, তবে অবশ্যই তার ওয়াদা ভঙ্গ হত না। আর তা তার ওয়াদা পূর্ণতায় সহযোগী হত’৷ [বুখারীঃ ৩৪২৪, ৫২৪২,৬৬৩৯, ৭৪৬৯, মুসলিমঃ ১৬৫৪, আহমাদঃ ২/২২৯, ৫০৬]

ঘটনা ৩ : সূরাতুল কাহফে যুলকারনাইন অশান্তি সৃষ্টিকারী জাতি ইয়াজুজ মাজুজ কে একটা সুদৃঢ় প্রাচীরে আবদ্ধ করেছিলেন বলে এসেছে। সূরা কাহফ, আয়াত ৯৩-৯৮। তো, এই ইয়াজুজ মাজুজ কিন্তু পৃথিবীর বুকেই আছে। কোথায় আছে কেউ জানে না। তারা কিন্তু প্রতিদিন এই প্রাচীর খনন করতে থাকে। কিন্তু, পারে না। কেন পারে না জানেন? কারণ, ইন শা আল্লাহ বলে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ইয়াজুজ-মাজুজ প্রত্যেহ যুলকারনাইনের দেয়ালটি খুঁড়তে থাকে। খুঁড়তে খুঁড়তে তারা এ লৌহ-প্রাচীরের প্রান্ত সীমার এত কাছাকাছি পৌছে যায় যে, অপরপাশ্বের আলো দেখা যেতে থাকে। কিন্তু তারা একথা বলে ফিরে যায় যে, বাকী অংশটুকু আগামী কাল খুঁড়ব কিন্তু ইন শা আল্লাহ বলে না। ইন শা আল্লাহ না বলার কারণে আল্লাহ তা’আলা প্রাচীরটিকে পূর্ববৎ মজবুত অবস্থায় ফিরিয়ে নেন। পরের দিন ইয়াজুজ-মাজুজ প্রাচীর খননে নতুনভাবে আত্মনিয়োগ করে। খননকার্যে আত্মনিয়োগ ও আল্লাহ তা’আলা থেকে মেরামতের এ ধারা ততদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যতদিন ইয়াজুজ-মাজুজকে বন্ধ রাখা আল্লাহর ইচ্ছা রয়েছে। যেদিন আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে মুক্ত করার ইচ্ছা করবেন, সেদিন ওরা মেহনত শেষে বলবেঃ ইন শা আল্লাহ আমরা আগামী কাল অবশিষ্ট অংশটুকু খুঁড়ে ওপারে চলে যাব। (আল্লাহর নাম ও তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভর করার কারণে সেদিন ওদের তাওফীক হয়ে যাবে।) পরের দিন তারা প্রাচীরের অবশিষ্ট অংশকে তেমনি অবস্থায় পাবে এবং তারা সেটুকু খুঁড়েই প্রাচীর ভেদ করে ফেলবে। [তিরমিযিঃ ৩১৫৩, ইবনে মাজাহঃ ৪১৯৯]

ঘটনা ৪ : পবিত্র কুরআনে বাগান মালিকদের ঘটনা এসেছে। সেখানে তারা মিসকীনদের তাদের বাগানের ফল খেতে দিতে চাচ্ছিলো না। তাই, তারা এক ফন্দি আঁটলো যে সকালেই ফলগুলো তুলে নিবে। তারা নিজেরা নিজেরা কসম কাটলো যে অবশ্যই এই কাজ করবেই। কিন্তু, ইন শা আল্লাহ বললো না। তাই, আল্লাহ রাতেই সেই বাগানগুলোকে আগুন দ্বারা ছাই বানিয়ে দেন।

” নিশ্চই আমি এদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম বাগানের মালিকদের। যখন তারা কসম করেছিল যে,অবশ্যই তারা সকালবেলা বাগানের ফল আহরণ করবে। আর তারা ‘ইন শা আল্লাহ’ বলে নি। অতঃপর তোমার রবের কাছ থেকে এক বিপর্যয় হানা দিল সে বাগানে, যখন তারা ছিল ঘুমন্ত। ফলে তা পুড়ে কালো বর্নের হয়ে গেলো” (সূরাতুল ক্বলাম, আয়াত : ১৭- ২০)

উপরোক্ত, ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয় ইন শা আল্লাহ বলার গুরুত্ব কতখানি। একজন মুসলিম বিশ্বাস করে তার তাকদীর একমাত্র আল্লাহ জানেন। আমরা কেউই জানি না আগামীকাল আমাদের হায়াত থাকবে কি থাকবে না। অথচ, কত নিশ্চিন্তেই বলে ফেলছি যে আগামীকাল করবো। যখন কোন কাজের নিয়তে আল্লাহর নাম নেয়া হয় না, সেই কাজে বারাকাহ ও রহমাতও থাকে না। ঠিক এ কারণেই, আল্লাহর নাম সাথে জুড়ে দিতে হয় যে ‘যদি আল্লাহ চান’। একজন মুমিন বান্দা আল্লাহর উপর ভরসা করে বলে ‘আগামীকাল বা অমুক দিন আমি আসবো ইন শা আল্লাহ’। তার মানে, তার আসা – না আসা, করা – না করা ইত্যাদি সম্পূর্ণই আল্লাহর ইচ্ছায় হবে। যেখানে আমি ১ মিনিট পর বেঁচে থাকবো কিনা তারই নিশ্চয়তা নেই সেখানে আমি আল্লাহর নাম ছাড়াই বলে দিচ্ছি ওমুক দিন আমি যাবোই এর মানে হলো আমাকে কারো সাধ্য নেই ঠেকানোর (আস্তাগফিরুল্লাহ)। আর ভবিষ্যতে করবো এমন কোন কাজে আল্লাহকেও স্মরণ করার অর্থ হলো যদি আমি বেঁচে থাকি ওইদিন, বেঁচে থাকলেও যদি আল্লাহ চান তবেই আমার পক্ষে করা সম্ভব। তাই, আমরা ভবিষ্যতে কোন কাজ করবো তা কাউকে বলার সময় বা নিয়ত করার সময় যেন ইন শা আল্লাহ বলতে না ভুলি। যেখানে, নবীগণের এই পরিণতি হয়েছিলো, সেখানে আমরা দূর্বল ঈমানের আমজনতা। তাহলে, আমাদের উপর দিয়েই বা কি যেতে পারে সেটা যেন মাথায় রাখি আমরা।

– জেনিফার করিম

SOURCE

মতামত দিন