জীবন দর্শন ভ্রান্ত মতবাদ

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত নিজের বিবেক

এমন মানুষ হয়তো পাওয়া দায় যে এ বাক্যটি শুনেনি। পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে যানবাহনের গায়েও এ বাক্যটি বেশ নজরে পড়ে। এ বাক্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়, বিবেকই মূল। মানুষের বিবেক কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল, কোনটা অন্যায় আর কোনটা ইনসাফ—তা নির্ধারণ করতে সক্ষম। তাই মানুষ যদি বিবেককে কাজে লাগাতো তবে বহুলাংশে অন্যায়-অপরাধ কমে যেত।

ইসলাম বিবেকের ব্যাপারে অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। বিবেককে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করতে বলেছে এবং এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। যারা আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করে না, তাদের নিন্দা করেছে।

ইসলাম বিবেকের ব্যাপারে গুরুত্ব দিলেও তার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু বিবেককে সর্বশ্রেষ্ঠ আদালত ঘোষণা করেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিবেকের ফয়সালাকে ছুড়ে ফেলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফয়সালাকে বিনা বাক্যে মেনে নিতে বলেছে। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا (36)

আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কিছু সিদ্ধান্ত নিলে কোনো ঈমানদার পুরুষ কিংবা নারীর পক্ষে ভিন্ন কিছু করার ক্ষমতা থাকে না। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হয়, সে স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট হয়। [১]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (65)
অতএব, আপনার রবের শপথ, তারা কখনই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না তারা নিজেদের সকল বিরোধে আপনাকে বিচারক মানে, তারপর আপনি যে বিচার করেন তাতে তাদের মন সবরকম সঙ্কীর্ণতামুক্ত থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়। [২]
.
এসব আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, মানুষের বিবেকের সকল সিদ্ধান্ত সঠিক নাও হতে পারে; বরং অনেক সিদ্ধান্ত ভুল ও ইসলামী শারীআত পরিপন্থি হতে পারে। তাইতো আল্লাহ তাআলা অনেক আয়াতে অধিকাংশ মানুষ সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাদের বিবেকে বোঝে না’। মানুষের বিবেক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত হলে তাদের না-বোঝার কোনো মানেই হয় না।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়াহ রাহি. বলেন,
والعقل قد يعلم به صواب القول وخطؤه وليس كل ما كان خطأ في العقل يكون كفرا في الشرع كما أنه ليس كل ما كان صوابا في العقل تجب في الشرع معرفته
বিবেকের মাধ্যমে কখনো সঠিক কথা জানা যায় আবার কখনো ভুল কথা জানা যায়। বিবেক কোনো জিনিসকে ভুল বললেই শারীআতে তা কুফরী হয়ে যায় না। আবার বিবেক কোনো জিনিসকে সঠিক বললেই শারীআতে তা জানা আবশ্যক হয়ে যায় না। [৩]

তাছাড়া বাস্তবতার নিরীখেও এ কথা ভুল প্রমাণিত হয়। সমাজে লাখো লাখো অন্যায়-অপকর্ম হয়ে থাকে। যারা অন্যায়-অপকর্মে জড়িত তারা দুশ্রেণির। একশ্রেণি তা অন্যায়-অপকর্ম মনে করে তা করে আর অন্যশ্রেণি তা সঠিক মনে করেই করে। বিবেক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত হলে দ্বিতীয় শ্রেণির লোকদের অন্যায়-অপকর্মে জড়ানোর কোনো প্রশ্নই আসে না।

আমরা যদি আমাদের ইসলামের অতীত ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে দেখতে একদল লোক বিভ্রান্ত হয়ে গেছে বিবেককে শ্রেষ্ঠ আদালত হিসেবে গণ্য করার কারণে। তারা মনে করত, বিবেক যা সঠিক মনে করবে তাই সঠিক আর বিবেক যা ভুল মনে করবে তাই ভুল।

অতএব, ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত নিজের বিবেক’ এ বাক্যটি সঠিক নয়, তা কুরআন-সুন্নাহ, বাস্তবতা এমনকি বিবেকের আলোকে প্রমাণিত হয়।

তথ্যসূত্র :

১. সূরা আহযাব, আয়াত : ৩৬
২. সূরা নিসা, আয়াত : ৬৫
৩. দারউ তাআরুযিল আকল ওয়ান নাকল, ১/২৪২

সূত্র:

মতামত দিন