ইসলামিক গল্প হাদীস

আবু দাহদার ব্যাবসা

ছোটদের হাদিসের গল্প-১
আবু দাহদার ব্যাবসা
প্রিয় নবির শহর মদিনা। সেখানকার এক এতিম ছেলে। এতিম মানে যার মা-বাবা বেঁচে নেই। একটি খেজুর বাগান আছে ছেলেটির। তার বাগানের পাশে আরও অনেকের বাগান আছে। সারি সারি বাগান। দখিনা বাতাস দোল দিয়ে যায় এখানে সেখানে। মন জুড়ায় সে বাতাসে। খেজুরে খেজুরে ছাওয়া গাছের সারি দেখে জুড়ায় চোখ।
এতিম ছেলেটি তার বাগানের সীমানা বরাবর একটি প্রাচীর দেবে। প্রাচীর দিয়ে দিলে সীমানাটির আর নড়চড় হবে না। ঠিক জায়গায় থাকবে সবকিছু। তাই এই পরিকল্পনা। কিন্তু প্রাচীর দিতে গিয়েই গোলটা বাধল। পাশের বাগানের একটি খেজুর গাছ এই পাশে থেকে গেছে। প্রাচীর সোজা করতে চাইলে গাছটি পড়বে প্রাচীরের ভেতর। কিন্তু গাছটি তো তার না, পাশের বাগানের। আরেকজনের গাছ প্রাচীরের ভেতর নেওয়া কি ঠিক হবে? কখনোই না।

কী করা যায়? কী করা যায়? পাশের বাগানের মালিকের কাছ থেকে গাছটি কিনে নিলেই তো হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রতিবেশি বাগান মালিকের সাথে কথা বলে সে। গাছটি কিনতে চায়। কিন্তু না, সে লোক কিছুতেই রাজি হলো না। সে নাকি এ গাছ বিক্রি করবে না। তো কী করবে এতিম ছেলেটি! তার তো আর প্রাচীর দেওয়াই হচ্ছে না তা হলে। তার এ সমস্যার কথা সে কাকে বলবে। তার বাবা তো বেঁচে নেই।
অবশেষে এতিম ছেলেটি এলো নবিজির কাছে। সবকিছু খুলে বললেন তাকে। নবি সা. লোকটিকে ডেকে পাঠালেন। তাকে বুঝিয়ে বললেন যেন সে গাছটি বিক্রি করে। কিন্তু না, সে নাছোড়বান্দা। কিছুতেই গাছ বিক্রি করতে রাজি হলো না।
অবশেষে নবি সা. তাকে বললেন, ‘তুমি খেজুর গাছটি তাকে দিয়ে দাও। তা হলে এর পুরস্কার হিসেবে জান্নাতে একটি খেজুর গাছ পাবে। আমিই এর জিম্মাদার।’
আশ্চর্য! লোকটি তাতেও রাজি হলো না। নবিজি কষ্ট পেলেন তার এমন আচরণে। তিনি চাইলেই জোর করে গাছটি নিয়ে নিতে পারেন। কারণ তিনি মদিনার শাসকও। তাঁর হাতে সে ক্ষমতা আছে। কিন্তু তিনি তা চাইলেন না। তিনি জোর খাটানো পছন্দ করলেন না। তাই মনের ব্যথা মনে লুকিয়ে চুপ করে থাকলেন।
সেখানে যারা উপস্থিত আছেন তাদের একজনের নাম সাবিত। নবিজির সাহাবি। তাঁর আসল নাম সাবিত হলেও লোকে ডাকে আবু দাহদাহ নামে। আবু দাহদাহ মানে দাহদার বাবা। তাঁর স্ত্রীকে ডাকে উম্মে দাহদাহ। উম্মে দাহদাহ মানে দাহদার মা। তাদের দাহদাহ নামে একটি বাচ্চা আছে বলেই এই নামে ডাকে সবাই।
আবু দাহদাহ সামনে এগিয়ে এলেন। প্রিয় নবির কাছে জানতে চাইলেন,
– ‘ও আল্লাহর রাসূল! আমি যদি ওই খেজুর গাছটি কিনি। তারপর এই ছেলেটিকে দিয়ে দিই। তা হলে আমার জন্যও কি জান্নাতে খেজুর গাছ থাকবে?’
– ‘আবু দাহদাহ! হ্যাঁ, তোমার জন্যও থাকবে।’ নবিজি বললেন।
এবার আবু দাহদাহ গেলেন খেঁজুর গাছটির মালিকের কাছে। তাকে বললেন,
– ‘আমার খেজুর বাগানটি দিয়ে আপনার গাছটি আমি কিনতে চাই। দেবেন?’
আবু দাহদার বাগানে আছে ছয়শত খেজুর গাছ। আর সুন্দর একটি বাড়ি। সে বাড়িতেই পরিবার নিয়ে আবু দাহদাহ বসবাস করেন। আছে মিষ্টি পানির একটি কূপও। মদিনার সকলেই সেই বাগানটি এক নামে চেনে। বাগানটি যেমন বড়ো তেমনি সুন্দর। সেই বিরাট বাগান, বাড়ি আর কূপ দিয়ে আবু দাহদাহ কিনতে চান মাত্র একটি খেজুর গাছ। এমন লোভনীয় প্রস্তাব পেয়ে লোকটি তো থ হয়ে গেল! এমন অবিশ্বাস্য প্রস্তাব! একটু ঢোক গিলে সে বলল,
– ‘অবশ্যই অবশ্যই! আমি খেজুর গাছটি বিক্রি করব আপনাকে।’
আবু দাহদাহ তাই করলেন। গাছটি কিনে নিলেন বাগান, বাড়ি ও কূপের বিনিময়ে। তারপর সেটি উপহার দিলেন সেই এতিম ছেলেটিকে। আবু দাহদার এই কাজে নবিজি অভিভূত হলেন। তিনি বললেন,
– ‘আবু দাহদার জন্য জান্নাতে বিশাল খেজুর বাগান থাকবে।’
আবু দাহদাহ খুশিতে আত্মহারা। তিনি ছুটলেন বাড়ির দিকে। বাড়িতে গিয়েই স্ত্রীকে ডাক ছাড়লেন,
– ‘ও দাহদার মা! এসো এসো, ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে এসো ঘর থেকে। এ বাগান আমি বিক্রি করে দিয়েছি।’
– ‘কাকে বিক্রি করলেন? কত দাম পেলেন।’ জানতে চাইলেন দাহদার মা।
– ‘জান্নাতে একটি বাগানের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছি।’ জানালেন আবু দাহদাহ।
– ‘আপনি তো খুবই লাভজনক ব্যাবসা করেছেন!’ আনন্দে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন উম্মে দাহদাহ।
তাঁরা বাচ্চাদেরকে নিয়ে বাগানবাড়ি ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন। তাদের মনে আনন্দ। তাঁরা জান্নাতে একটি মনোরম বাগানবাড়ির মালিক এখন।
এ হাদিসটি যেখানে পাবেন
মুসনাদে আহমাদ : ১২৪৮২
বর্ণনাকারী : আনাস বিন মালিক রা.
হাদিসের মান : সহিহ

মতামত দিন