ইসলামী শিক্ষা

রুযী ও বরকতের চাবিকাঠি

আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহই আমাদের রুযীদাতা। যে রুযী পাই, সেই রুযীতে বরকতদাতা তিনি। অনেকের রুযী আছে, রুযী কামাইয়ের পথ আছে। কিন্তু তবুও যেন, ‘নাই নাই, চাই চাই, খাই খাই।’ ‘হাতে দই পাতে দই, তবু বলে কই কই।’ আর তার মানেই হল তার রুযীতে বরকত নেই। কারণ, রুযীতে বর্কত থাকলে অল্পতে কাজ হয়। অভাব থাকে না। পক্ষান্তরে বর্কত না থাকলে বেশীতেও কাজ হয় না। অভাব ঘোঁচে না।

বর্কত শুধু রুযীতেই নয়; বরং বর্কত হয়, সংসারের সকল জিনিসের উপর। বাড়ি, গাড়ি, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধু, ধন-সম্পদ, শিল্প, ব্যবসা, চাষ, কামাই, ইলম, জ্ঞান, দাওয়াতী কর্ম প্রভৃতিতে।

নিম্নের উপদেশ ও পথ-নির্দেশনা গ্রহণ কর। ইন শাআল্লাহ রুযীতে বরকত পাবে। অবশ্য সেই অনুযায়ী কাজ করে যাওয়া তোমার দায়িত্ব।

১। আল্লাহর তাকওয়া মনের মণিকোঠায় সঞ্চিত রাখ। এটি এমন একটি ধনভান্ডার যার বরকতে তোমার জীবনের সব কিছু প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ হবে। মহান আল্লাহ বলেন, “গ্রামবাসীরা যদি ঈমান আনত এবং মুত্তাকী হত, তাহলে তাদের উপর আকাশ ও পৃথিবীর বর্কতসমূহের দরজা খুলে দিতাম।” (সূরা আ’রাফ ৯৬ আয়াত) তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উদ্ধারের পথ সহজ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রুযী দান করেন, যে জায়গা থেকে রুযী আসার কথা সে কল্পনাও করতে পারত না।” (সূরা ত্বালাক্ব ২-৩ আয়াত)

২। আল্লাহর উপর যথার্থ আস্থা ও ভরসা রাখ। “আর যে আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হন।” (সূরা ত্বালাক্ব ৩ আয়াত) মহানবী ﷺ বলেন, “তোমরা যদি যথার্থরূপে আল্লাহর উপর ভরসা রাখ, তাহলে ঠিক সেই রকম রুযী পাবে, যে রকম পাখীরা রুযী পেয়ে থাকে; সকাল বেলায় খালি পেটে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যা বেলায় ভরা পেটে বাসায় ফিরে।” (আহমাদ)

৩। অভাব পড়লে মাথা উঁচু রাখ এবং আল্লাহর কাছে তোমার অভাবের কথা জানাও; কোন মানুষের কাছে নয়। মহানবী ﷺ বলেন, “যার অভাব আসে, সে যদি তা মানুষের কাছে (পূরণের কথা) জানায়, তাহলে তার অভাব দূর হয় না। কিন্তু যার অভাব আসে, সে যদি তা আল্লাহর কাছে (পূরণের কথা) জানায়, তাহলে তিনি বিলম্বে অথবা অবিলম্বে তার অভাব দূর করে দেন।” (তিরমিযী)

৪। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত কর; কুরআন হল বরকতময় জিনিস।

৫। ফজরের নামাযের পর নিয়মিত দুআতে রুযী ও বরকত প্রার্থনা কর,

‘আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা ইলমান না-ফিআঁউ ওয়া রিযক্বান ত্বাইয়িবাঁউ ওয়া আমালাম মুতাক্বাব্বালা।’ অর্থাৎ, হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার নিকট ফলদায়ক শিক্ষা, হালাল জীবিকা এবং গ্রহণযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি। (সহীহ ইবনে মাজাহ ১/১৫২, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১০/১১১)

অপরকে রুযী দান করে তার নিকট থেকেও বরকতের দুআ লাভ করতে পারো।

৬। নিয়মিত ইস্তিগফার (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা) করতে থাক। কারণ, তাতে রুযী আসে। মহান আল্লাহ হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমি তাদেরকে বললাম, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) কর। তিনি তো মহা ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত করবেন। তিনি তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করবেন। আর তোমাদের জন্য বাগান তৈরী করে দেবেন এবং প্রবাহিত করে দেবেন নদী-নালা।” (সূরা নূহ১০-১২)

৭। যতটাই রুযী তুমি পাও, যে হালেই তুমি থাক, সর্বহালেই তুমি রুযীদাতার শুকরিয়া আদায় কর। কারণ, শুকরে সম্পদ বৃদ্ধি হয়। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন।” (সূরা আলে ইমরান ১৪৪) “তোমরা কৃতজ্ঞ হলে, আমি অবশ্যই তোমাদের ধন আরো বৃদ্ধি করব। আর কৃতঘ্ন হলে আমার আযাব নিশ্চয়ই কঠিন।” (সূরা ইবরাহীম ৭)

মহান প্রতিপালক আল্লাহ আমাদেরকে কত নেয়ামত দান করেছেন, তা গুনে শেষ করা যায় না। এই সকল নেয়ামতের শুকর আদায় করা বান্দার জন্য ফরয। শুকর আদায়ের নিয়ম হল, প্রথমতঃ অন্তরে এই স্বীকার করা যে, এই নেয়ামত আল্লাহর তরফ থেকে আগত। দ্বিতীয়তঃ মুখে তার শুকর আদায় করা। তৃতীয়তঃ কাজেও শুকর প্রকাশ করা। অর্থাৎ, সেই নেয়ামত তাঁরই সন্তুষ্টির পথে; গরীব-মিসকীনদের অভাব মোচনের পথে, আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার পথে এবং তাঁর শরীয়তকে বাঁচিয়ে রাখার পথে খরচ করা। অন্যথা নাশুকরী বা কৃতঘ্নতা হবে।

৮। মন থেকে লোভ দূর কর। কারণ, লোভে বর্কত বিনাশ হয়। মহানবী ﷺ হাকীম বিন হিযাম (রায্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলেন, “হে হাকীম! এ মাল হল (লোভনীয়) তরোতাজা ও সুমিষ্ট জিনিস। সুতরাং যে তা মনের বদান্যতার সাথে গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বর্কত দেওয়া হবে। আর যে তা মনের লোভের সাথে গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বর্কত দেওয়া হবে না। তার অবস্থা হবে সেই ব্যক্তির মত, যে খায় অথচ তৃপ্ত হয় না।” (মুসলিম)

৯। ব্যবসা-বাণিজ্যে সত্য কথা বল। মিথ্যা বিলকুল বর্জন কর। মহানবী ﷺ বলেন, ব্যবসায়ী (ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে) যদি (ক্রয়-বিক্রয়ে) সত্য বলে এবং (পণ্যদ্রব্যের দোষ-গুণ) খুলে বলে তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বর্কত দেওয়া হয়। অন্যথা যদি (পণ্যদ্রব্যের দোষ-ত্রুটি) গোপন করে এবং মিথ্যা বলে তাহলে বাহ্যতঃ তারা লাভ করলেও তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বর্কত বিনাশ করে দেওয়া হয়। আর মিথ্যা কসম পণ্যদ্রব্য চালু করে ঠিকই, কিন্তু তা উপার্জনের (বর্কত) বিনষ্ট করে দেয়।” (বুখারী ২১১৪, মুসলিম ১৫৩২, আবূদাউদ ৩৪৫৯, তিরমিযী ১২৪৬নং, নাসাঈ)

১০। সূদ খাওয়া তথা সর্ব প্রকার হারাম উপার্জন বর্জন কর। ব্যাংকের সূদও সূদ। অতএব তাও ত্যাগ কর। কারণ, মহান আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ সূদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন।” (সূরা বাক্বারাহ ২৭৬) মহানবী ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তিই বেশী-বেশী সূদ খাবে তারই (মালের) শেষ পরিণাম হবে অল্পতা।” (ইবনে মাজাহ ২২৭৯, হাকেম ২/৩৭, সহীহ ইবনে মাজাহ ১৮৪৮নং)

সূদখোর সূদ খেয়ে তার মালের পরিমাণ যত বেশীই করুক না কেন, পরিণামে তা কম হতে বাধ্য। আপাতদৃষ্টিতে তা প্রচুর মনে হলেও বাস্তবে তার কোন মান ও বর্কত থাকবে না। এ শাস্তি হবে আল্লাহর তরফ থেকে।

১১। সকাল সকাল কাজ সারো। ফজরের পর সকালের মাঝে বর্কত আছে। নবী (সাঃ) বলেন, “হে আল্লাহ! তুমি আমার উম্মতের প্রত্যূষে বর্কত দাও।” আর তিনি কোন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করলে সকাল-সকাল প্রেরণ করতেন। সাহাবী সখর (রায্বিয়াল্লাহু আনহু) একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনিও সকাল-সকাল ব্যবসায় (লোক) পাঠাতেন। ফলে তিনি ধনবান হয়েছিলেন এবং তাঁর মাল-ধন হয়েছিল প্রচুর। (আবু দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, সহীহ আবু দাঊদ ২২৭০নং)

১২। খাবারে বরকত পেতে সুন্নাহ অনুযায়ী খাও। মহানবী ﷺ বলেন, “খাবারের মধ্যভাগে বরকত নামে। অতএব তোমরা মাঝখান থেকে খেয়ো না।” (বুখারী)

১৩। তোমার কাছে যেটুকুই মাল আছে, তা থেকে কিছু করে দান কর। আর মোটেই বখীলী (কার্পণ্য) করো না। কারণ, দানে মাল বর্কত লাভ করে এবং কার্পণ্যে মাল ধ্বংস হয়। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা যা (আল্লাহর পথে) খরচ কর, আল্লাহ তার স্থলে আরো প্রদান করে থাকেন।” (সূরা সাবা ৩৯ আয়াত) আল্লাহ বলেন, “হে আদম সন্তান! ‘তুমি (অভাবীকে) দান কর আমি তোমাকে দান করব।” (মুসলিম ৯৯৩ নং)

মহানবী (সাঃ) বলেন “বান্দা প্রত্যহ প্রভাতে উপনীত হলেই দুই ফিরিশ্তা (আসমান হতে) অবতরণ করে ওঁদের একজন বলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি দানশীলকে প্রতিদান দাও।’ আর দ্বিতীয়জন বলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি কৃপণকে ধ্বংস দাও।” (বুখারী১৪৪২ নং, মুসলিম ১০১০ নং)

১৪। তালেবে ইলমকে ইলম তলবে সহায়তা কর। ইলম অনুসন্ধানে তাকে অর্থ দিয়ে যথার্থ সহযোগিতা কর। তাতেও তোমার শিল্প, বাণিজ্য ও জীবিকা বরকতলাভ করবে। আল্লাহর রসূল ﷺ এর যুগে দুই ভাই ছিল। একজন নবী ﷺ এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর হাদীস ও ইলম শিক্ষা করত। অপরজন কোন হাতের কাজ করে অর্থ উপার্জন করত। একদা এই শিল্পী ভাই নবী ﷺ এর নিকট হাযির হয়ে অভিযোগ করল যে, তার ঐ (তালেবে ইলম) ভাই তার শিল্পকাজে কোন প্রকার সহায়তা করে না। তা শুনে তিনি তাকে উত্তরে বললেন, “সম্ভবতঃ তুমি ওরই (ইলম শিক্ষার বরকতে) রুযী পাচ্ছ!” (তিরমিযী ২৩৪৬, সিঃ সহীহাহ ২৭৬৯নং)

১৫। আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি চায় যে, তার রুযী (জীবিকা) প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং তার আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখে।” (ইবনে হিব্বান ৪৩৯নং)

“যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, তার রুযী (জীবিকা) প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখে।” (বুখারী ২০৬৭, ৫৯৮৬, মুসলিম ৬৬৮৭-৬৬৮৮নং)

“আত্মীয়তার সুসম্পর্ক বজায় রাখাতে সম্পদ বৃদ্ধি হয়, পরিজনের মধ্যে সম্প্রীতি থাকে এবং আয়ুষ্কাল বেড়ে যায়।” (ত্বাবারানীর কাবীর ১৭২১, আওসাত্ব ৭৮১০, সহীহুল জামে ৩৭৬৮নং)

১৬। হজ্জ-উমরাহ কর। আল্লাহর রসূল ﷺ বলেন, “তোমরা হজ্জকে উমরাহ ও উমরাহকে হজ্জের অনুগামী কর। (অর্থাৎ হজ্জ করলে উমরাহ ও উমরাহ করলে হজ্জ কর।) কারণ, হজ্জ ও উমরাহ উভয়েই দারিদ্র ও পাপরাশিকে সেইরূপ দূরীভূত করে যেরূপ (কামারের) হাপর লোহার ময়লাকে দূরীভূত করে ফেলে।” (নাসাঈ ২৬৩০-২৬৩১, তিরমিযী, নাসাঈ প্রমুখ অন্য সাহাবী হতে, ত্বাবারানী ১১০৩৩নং)

(সংগ্রহে) : আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী

সূত্র

মতামত দিন