জীবনী

ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান (রা)-এর জীবনী

ইয়াযীদ (রা) এর কুনিয়াত বা ডাকনাম আবূ খালিদ। পিতা বিখ্যাত কুরায়শ নেতা আবু সুফইয়ান সাখর ইবন হারব (রা) এবং মাতা উম্মুল হাকাম যায়নাব বিনত নাওফাল। মতান্তরে হিন্দ বিনতু হাবীব ইবন ইয়াযীদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুহবত বা সাহচর্য অবলম্বন করেন। তার একটি বড় পরিচয় তিনি উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা মুআবিয়া ইবন আবী সুফইয়ানের (রাঃ) ভাই।[1] মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে যারা ছিলেন বিশেষ গুণ-বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার অধিকারী তিনি তাদের একজন। তিনি ছিলেন আবু সুফইয়ানের (রাঃ) সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। একারণে ইতিহাসে তাকে ‘ইয়াযীদ আল-খায়র’ বা উত্তম ইয়াযীদ বলা হয়েছে।[2]

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে হুনায়ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ শেষে গণীমত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ১০০ (একশো)টি উট এবং চল্লিশ ঊকিয়া স্বর্ণ দান করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে বিলাল (রা) সেই স্বর্ণ ওজন করে তাকে বুঝিয়ে দেন।[3]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর আবু বকর সিদ্দীক (রা) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর মুসলিম জাহানের চতুর্দিকে নানা রকম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তখন তা দমনের জন্য তিনি কয়েকজন সেনা কমান্ডারের নেতৃত্বে কয়েকটি বাহিনী বিভিন্ন দিকে পাঠান। ইয়াযীদের (রা) নেতৃত্বে একটি বাহিনী শামের দিকে পাঠান। মদীনা থেকে যাত্রাকালে খলীফা আবু বাকর (রা) তাঁর সাথে হেঁটে হেঁটে বহুদূর পর্যন্ত চলে তাকে বিদায় দেন।[4]

ইবন ইসহাক বলেন, আবূ বাকর (রা) হি. ১২ সনে হজ্জ থেকে ফেরার পর ‘আমর ইবনুল আস, ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান, আবু উবায়দা ইবন আল-জাররাহ ও শুরাহবীল ইবন হাসান (রা) কে বাহিনীসহ ফিলিস্তীন অভিমুখে পাঠান। তাদেরকে দামেশকের পার্শ্ববর্তী বালকার ভিতর দিয়ে অগ্রসর হতে বলেন। এদিকে ইরাকে অবস্থানরত খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদকে (রা) শামের দিকে যাত্রার নির্দেশ দেন। তিনি সামাওয়াহ অঞ্চলের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হন এবং দামেশকের পার্শ্ববর্তী ‘মারজে রাহিত’ নামক স্থানে বসবাসরত গাসসানীদের উপর অতর্কিত আক্রমন চালান। তারপর সেখান থেকে ‘কানাতে বুসরী’ নামক স্থানে গিয়ে অবস্থান করতে থাকেন। আর এদিক থেকে ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান, আবু উবায়দা ও শুরাহবীল (রা) স্ব স্ব বাহিনী নিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হন। বুসরার অধিবাসীরা আত্মসমর্পন করে। এ ভাবে শামের প্রথম শহর মুসলিম বাহিনী কতৃক বিজিত হয়। তারপর এই সম্মিলিত বাহিনী ফিলিস্তীনের দিকে যাত্রা করে। রামলা ও বায়তে জাবরীন এবং মধ্যবর্তী আজনাদায়নে রোমান বাহিনীর সাথে তাদের যুদ্ধ হয়। হিজরী ১৩ সনের জমাদিউল আওয়াল মাসে সেই যুদ্ধে রোমান বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর আবু উবায়দাকে (রা) তথাকার এবং ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ানকে (রা) ফিলিস্তীনের ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দেন। আবু উবায়দার (রা) মৃত্যুর পর মু’আয ইবন জাবাল (রা) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। আর মু’আযের (রা) মৃত্যুর পর ইয়াযীদ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আর ইয়াযীদের মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন তার ভাই মু’আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান (রা)। উল্লেখিত সেনাপতিদের সকলের মৃত্যু হয় হিজরী ১৮ সনে শামের আমওয়াস নামক স্থানে ‘তা উন’ তথা প্লেগে আক্রান্ত হয়ে। অবশ্য আল-ওয়ালীদ ইবন মুসলিম বলেছেন, হিজরী ১৯ সনে কায়সরিয়্যা বিজয়ের পর ইয়াযীদ (রা) মৃত্যুবরণ করেন।[5] উল্লেখিত সকল সেনা কমান্ডারের মৃত্যু হয় একই সময়, স্থান ও একই রোগে।

ইয়াযীদ (রা) সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এবং আবূ বাকরের (রা) হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর ইয়াযীদের (রা) নিকট থেকে শুনে যারা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তারা হলেন: আবু আবদিল্লাহ আল-আশআরী, ‘ইয়াদ আল-আশআরী ও জুনাদা ইবন আবী উমাইয়্যাহ (রা)।[6]

আবু আবদিল্লাহ আল-আশ’আরী (রা) তাঁর সূত্রে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন:[7]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

مثل الذي يصلي ولا يتم ركوعه ولا سجوده مثل الجائع لا يأكل إلا المرة والمرتين لا يغنيان عنه

‘রুকূ ও সাজদা যথাযথভাবে না করে যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে তার দৃষ্টান্ত হলো সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তি যে দু’ একটি খেজুর ছাড়া কিছুই খায় না, যা তার জন্য মোটেই যথেষ্ট নয়।

মৃত্যুকালে তিনি কোন উত্তরাধিকারী রেখে যাননি।[8]

ইবনুল মুবারাকের (রহ) একটি বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় ইয়াযীদ (রা) একটু ভোজনবিলাসী মানুষ ছিলেন। একদিন ‘উমার (রা) ইয়াযীদের পেটের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে দেখেন তাঁর পেটের চামড়া খুবই পাতলা। তিনি সংগে সংগে হাতের ছড়িটি ‘উঁচু করে মারতে উদ্যত হন এবং বলেন: তার চামড়া কি অকৃতজ্ঞ হয়ে গেছে? অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান (রা) ভোজন রসিক মানুষ, তিনি নানা রকম খাবার খান- একথা ‘উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) কানে গেলে তিনি বলেন: ওহে ইয়াযীদ: তুমি সারাদিন খাবার খাও? যার হাতে আমার জীবন সেই সত্ত্বার শপথ! যদি তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি-পদ্ধতির ব্যতিক্রম কর, তাহলে তোমাদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে তাদের রীতি-পদ্ধতির ব্যতিক্রম করা হবে।[9]

তথ্যসূত্র : 

[1] উসুদুল গাবা-৪/৬৮; আল-ইসাবা-৩/৬৫৬; তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা আর-রিজাল-২০/৩১৯

[2] প্রাগুক্ত

[3] প্রাগুক্ত

[4] উসুদুল গাবা-৪/৬৮৮

[5] প্রাগুক্ত; আল-ইসাবা-৩/৬৫৭; তাহযীব আল-কামাল-২০/৩১৯

[6] আল-ইসাবা-৩/৬৫৭; তাহযীব আল-কামাল-৪/৬৮৯

[7] উসুদুল গাবা-৪/৬৮৯

[8] প্রাগুক্ত।

[9] আল-ইসাবা-৩/৬৫৬

সংকলনেঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ

সংগ্রহ : পুরনো পৃথিবী পত্রিকা।

মতামত দিন