জীবনী বিজ্ঞান ও ইসলাম

ইবনুন নাফিস এর জীবনী

পুরো নাম আলাউদ্দিন আবুল হাসান আলী ইবনে আবুল হাজম ইবনুন নাফিস। তবে তিনি ইবনুন নাফিস নামেই বেশি পরিচিত।

তিনি ৬০৭ হিজরি মোতাবেক ১২০৮ সালে সিরিযার দামেস্কে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন সিরিয়ার দামেস্ক শহরে আবার কেউ বলেছেন মিসরে।

তাঁর অবদান

উইলিয়াম হার্ভের ৪০০ বছর আগে ইবনে নাফিস রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। মানবদেহে বায়ু ও রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন ইবনুন নাফিস। ইবনুন নাফিস মানবদেহে রক্তসঞ্চালন পদ্ধতি, ফুসফুসের সঠিক গঠন পদ্ধতি, শ্বাসনালী, হৃদপিন্ড, শরীরে শিরা উপশিরায় বায়ু ও রক্তের প্রবাহ ইত্যাদি সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন।

শ্বাসনালির অভ্যন্তরীণ অবস্থা কি? মানবদেহে বায়ু ও রক্ত প্রবাহের মধ্যে ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার ব্যাপারটা কি? ফুসফুসের নির্মাণ কৌশল সভ্যজগতকে সর্বপ্রথম কে অবগত করিয়েছিলেন? রক্ত চলাচল সম্বন্ধে তৎকালীন প্রচলিত গ্যালেনের মতবাদকে ভুল প্রমাণিত করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ১৩০০ শতাব্দীতে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন কে? এসব জিজ্ঞাসার জবাবে যে মুসলিম মনীষীর নাম উচ্চারিত হয় তিনি হচ্ছেন ইবনুন নাফিস।

নাফিস তাঁর কানুনের এনাটমি অংশের ভাষ্য ‘শরহে তসরিহে ইবনে সিনা’ গ্রন্থে এ মতবাদ প্রকাশ করেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে-

শিরার রক্ত এর দৃশ্য বা অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে ডান দিক থেকে বাম দিকের হৃৎকোষ্ঠে চলাচল করে না বরং শিরার রক্ত সব সময়ই ধমনী শিরার ভেতর দিয়ে ফুসফুসে গিয়ে পৌঁছায়; সেখানে বাতাসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে শিরার ধমনীর মধ্য দিয়ে বাম দিকের হৃৎকোষ্ঠে যায় এবং সেখানে এ. জীবনতেজ গঠন করে। তিনি প্রমাণ করেন যে হৃৎপিন্ডে মাত্র দুটি প্রকোষ্ঠ রয়েছে।

বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী ইবনুন নাফিসের মতবাদট সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত বলে গৃহীত হলেও তাঁকে পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞান জগতে স্বীকৃতি দেয়নি। তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ৭০০ বছরের জন্য হারিয়ে গিয়েছিল। মানুষ ভুলে গিয়েছিল তাঁর এই অবদানের কথা। অবশেষে ১৯২৪ সালে হঠাৎ করেই বার্লিনের একটি লাইব্রেরীতে তাঁর লেখা একটি পাণ্ডুলিপি (সিয়ারাহ তাসরিহ আল-কানুন) পাওয়া যায় এবং বিশ্ববাসী আবিষ্কারটি জানতে পারে।

আল-শামিল ফি আল-তিব্ব নামের ৩০০ খণ্ডের এক বিশাল বই লিখেছিলেন তিনি। এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি বর্তমানে দামেস্কে সংরক্ষিত আছে। তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত বইগুলো হল- মুয়াজ আলকানুন, আল-মুখতার ফি আল-আগজিয়া।

১২৩৬ সালে নাফিস মিশর গমন করেন। সেখানে আল-নাসরি নামক হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা করতেন। পরবর্তীতে আল-মুনসুরী হাসপাতালে তিনি প্রধান চিকিৎসক এবং সুলতানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ইবনে নাফিস ছিলেন একই সঙ্গে চিকিৎসক, জীববিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, হাদিস বিশারদ এবং ফিকহবিদ। হাদিস গবেষণা বিষয়েও তিনি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

মনরোগ চিহিংসা এবং মনোবিজ্ঞান বিষয়ে তিনি ছিলেন একজন পথিকৃত। চোখ এবং আলোক বিজ্ঞান বিষয়েও অনেক মৌলিক তথ্যের আবিষ্কার করেছিলেন ইবনে আল নাফিস।

কোনো ওষুধ প্রয়োগ না করে খাদ্যাভাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চিকিৎসা করার ব্যাপারে ইবনে নাফিস বিশেষ আগ্রহী ছিলেন এবং কিছু ক্ষেত্রে এর সফল প্রয়োগ করতেও তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ওষুধ হিসেবেও মদ ব্যবহার না করার সমর্থক ছিলেন এবং মদের অপকারিতা বিষয়েও বক্তব্য রাখতেন।

ব্যক্তি জীবনে সুন্নাহর অনুসরণকারী ইবনে নাফিস ধর্ম ও দর্শন পারস্পরিক সম্পর্কিত বিষয় বলে মত প্রকাশ করেন। দর্শন বিষয়ে তিনি মৌলিক গ্রন্থও প্রণয়ন করেন। মুসলিম সভ্যতার পতন রোধের উদ্দেশ্যে ইবনে নাফিস তরুণদেরকে সুন্নতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন এবং তিনি সুন্নতে রাসূল-এর অন্তর্ভুক্ত আচরণসমূহের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এই সময়ই তিনি রচনা করেন আরবী সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম। দিকের মৌলিক উপন্যাস ‘আল রিসালাহ আল কামিল ফি সিরাতিল নবী”।

তার নিজের বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক মতবাদের প্রকাশ করাও এই উপন্যাস রচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তিনি ১২৬৮ থেকে ১২৭৭ সালের মধ্যে এই গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থটির নামের অর্থ হচ্ছে নবীর সিরাত বা জীবন-এর উপর কামিলের রচনা বা থিসিস’। গ্রন্থটি রিসালায়ে ফাদিল বিন নাতিক নামেও পরিচিত।

ইবনে নাফিস বিভিন্ন বিজ্ঞান বিশেষত শরীরবিদ্যা এবং মনোবিজ্ঞান বিষয়ে তার গবেষণার ফলাফল এবং তার বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ে তার মতামতও এই বইটির মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তিনি এই উপন্যাসে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন যে মানুষের মন যুক্তি ও বিশ্লেষণের সাহাজ্যে প্রাকৃতিক, দার্শনিক এবং ধর্মীয় সার সত্যকে আবিষ্কার করতে পারে।

ইবনে নাফিসের এই উপন্যাস প্রাথমিক কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বিষয়ক রচনার একটি অন্যতম উদাহরণ। এই উপন্যাসে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সত্যকে তার কাল্পনিক ব্যবহার দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনে নাফিস তার এই রচনাটিকে বলেছেন ইসলামকে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিগতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা।

ইবনে নাফিস ছিলেন ইসলামি সভ্যতা ও বিজ্ঞানের একজন প্রধান বিশেষজ্ঞ। বিজ্ঞান বিশেষত শরীরবিজ্ঞান বিষয়ে তিনি ছিলেন প্রথম আধুনিক গবেষক যার গবেষণা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কিছু ছাড়াও তিনি পৃথিবীর অন্যতম প্রথম এবং প্রথম মুসলিম সাইন্স ফিকশন রচয়িতা হিসেবেও চির স্মরণীয়।

তিনি ১২৮৮ সালে কায়রোতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যু শয্যায় তার মিসর ও কায়রো চিকিৎসক বন্ধুরা তার রোগের প্রতিষেধক হিসেবে তাকে মদ পান করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি এক ফোটা মদও পান করতে রাজী হননি। তিনি তার বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আল্লাহপাকের দরবারে চলে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি চিরদিন এই নশ্বর পৃথিবীতে থাকতে আসিনি। আল্লাহ আমাকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন আমি চেষ্টা করেছি মানুষের কল্যাণে কিছু করে যেতে। বিদায়ের এই সময়ে শরীরে মদ নিয়ে আল্লাহপাকের দরবারে উপস্থিত হতে আমি চাই না’। মুসলিম এই মহামনিষী ১২৮৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ডিসেম্বর শুক্রবার সকালে ইন্তেকাল করেন।

তথ্যসূত্র :

১. বুক অব ইসলামিক নলেজ, ইকবাল কবীর মোহন।

২. bdlive24.com

৩. উইকিপিডিয়া

গ্রন্থনায় : নাকিব মাহমুদ [পুরনো পত্রিকা হতে সংগৃহীত]

মতামত দিন