জীবনী

আল্লামা বালাযুরী (রহঃ) এর জীবনী

আল্লামা আহমদ ইবন ইয়াহইয়া বালাযুরী (রহঃ) এর জীবনী

যে সব জ্ঞানীগুণী পণ্ডিত গবেষকের কল্যাণে বিশ্ব ইতিহাসে ইসলামের বিজয়গাঁথা চিরভাস্বর হয়ে আছে এবং অনাগতকাল ধরে তা দোদীপ্যমান থাকবে, আল্লামা বালাযুরী তাঁদের অন্যতম। তাঁর পূর্ণ নাম হচ্ছে আবুল হাসান আহমদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন জাবির ইবন দাউদ। বালাযুর (marking nut,) নামক একটি ফল অত্যধিক সেবন তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়েছিল বলে ইতিহাসে তিনি বালাযুরী নামে বিখ্যাত।

বালাযুরী নিজে একজন কুলজিবিশারদ, ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদরূপে বিশ্ব সাহিত্যে এক গৌরবময় আসনের অধিকারী হলেও তাঁর নিজের কুলজি সম্পর্কে কিন্তু খুব বেশী কিছু জানা যায় না। তার পিতা ইয়াহইয়া সম্পর্কে ইতিহাস নীরব। অবশ্য, তাঁর পিতামহ জাবির ছিলেন খলীফা হারুনুর রশীদের আমলের মিসরের রাজকীয় কোষাধ্যক্ষ ‘আল-খাসীব’-এর কাতিব বা সচিব। লাইডেনের পাঠাগারে রক্ষিত এবং মাকরেযীর লিখিত বলে অনুমিত একটি লিপিতে বালাযুরীকে আবু বকর, আবু জাফর মতান্তরে আবুল হাসান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

          হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষ দিকে অথবা তৃতীয় শতকের শুরুর দিকে তাঁর জন্ম হয় এবং বাগদাদে তিনি প্রতিপালিত ও বয়ঃপ্রাপ্ত হন। বাগদাদ তখন মুসলিম জাহানের তথা গোটা বিশ্বের উন্নততম সমৃদ্ধতম নগরী এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগুণীদের মিলন-তীর্থ। সেখানকার বিশিষ্ট পণ্ডিতগণের নিকট তিনি বিদ্যাশিক্ষা করেন। তারপর তিনি বিভিন্ন দেশ সফর করে সেসব দেশ ও অঞ্চলের আলিম-উলামাদের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন।

ইবন আসাকির তাঁর তারীখে দামিশক’ গ্রন্থে লিখেনঃ

“তিনি দামিশকে হাশশাম ইবন আম্মার এবং আবু হাফস উমর ইবন সাঈদের নিকট, হিমসে মুহাম্মদ ইবন মুসাফফার নিকট, এন্টিয়কে মুহাম্মদ ইবন আবদুর রহমান ইবন সাহম ও আহমদ ইবন বুরদ আল-আন্তাকীর নিকট, ইরাকে আফফান ইবন মুসলিম, আবদুল ‘আলা ইবন হাম্মাদ, আলী ইবন মাদীনী, আবদুল্লাহ্ ইবন সালিহ্ আল-ইজুলী, মুসআব যুবায়রী, আবু উবায়দ আল-কাসিম ইবন সাল্লাম, উছমান ইবন আবী শায়বা, আবুল হাসান আলী ইবন মুহাম্মদ আল-মাদাইনী এবং ওয়াকিদীর বিখ্যাত সচিব (কাতিব) মুহাম্মদ ইবন সাদ-এর নিকট জ্ঞানার্জন করেন।

জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে তিনি হালাব (আলেপ্পো) দামিশক, হিমস, ইরাক, মাম্বজ এন্টিয়ক ও ছাপূর (সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহ) সফর করেন। ইবনুন নাদীম এর ভাষায়

انه زار جميع المدن الواقعة في شمال الشام ثم تحول منها الى البلاد الواقعة ما بين النهرين وهي المسماة بالجزيرة وساح بها تكريث وانه كان يجمع في كل سياحته الروايات المحفوظة بين سكان تلك الاصقاع ليقارتها بما حفظه عن علماء بغداد.

অর্থাৎ তিনি উত্তর সিরিয়ায় অবস্থিত সকল শহরই ভ্রমণ করেন। তারপর দুই সাগরের মধ্যবর্তী এলাকা যা আল-জাযীরা নামে বিখ্যাত সেদিকে সফর করেন।

তাঁর প্রত্যেকটি ভ্রমণকালে তিনি ঐসব অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে রক্ষিত বর্ণনাসমূহ সংগ্রহ করতেন- যাতে করে তিনি বাগদাদের পণ্ডিতদের নিকট থেকে প্রাপ্ত তার তত্ত্বসমূহের সাথে ঐগুলোকে মিলিয়ে দেখতে পারেন ও ঐগুলির সত্যাসত্য নির্ণয় করতে পারেন। তাঁর অর্জিত তত্ত্বজ্ঞান যাতে পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং তিনি পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে রিওয়ায়েত করতে পারেন, এটাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

          ইবন আসাকির বর্ণিত তাঁর পূর্বোক্ত উস্তাদগণ ছাড়াও আরো যেসব উস্তাদের কাছে থেকে তিনি জ্ঞানার্জন করেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেনঃ

  • খালাফ ইবন হিশাম
  • শায়বান ইবন ফারূহ
  • আহমদ ইবন ইবরাহীম দূরাকী
  •  হাওযা
  • মুহাম্মদ ইবন সাব্বাহ্ দূলাবী
  • মুহাম্মদ ইবন হাতিম আস-সামীন
  • আব্বাস ইবনুল ওয়ালীদ আ-যামানী
  • আবদুল ওয়াহিদ ইবন গিয়াছ
  • আবুর রবী আ-যুহুরানী
  • প্রমুখ যুগবিখ্যাত মুহাদ্দিছ ও উলামাবৃন্দ।

তাঁর নিকট থেকে যারা জ্ঞানার্জন ও হাদীছ রিওয়ায়েত করেছেন তাঁর সেসব শিষ্যশাগরেদদের মধ্যে রয়েছেনঃ

  • ইয়াহইয়া ইবনুন নাদীম- বিখ্যাত আল ফিহরিস্ত কিতাবের গ্রন্থকার।
  • জাফর ইবন কুদামা- কিতাবুল খারাজের লেখক।
  • আহমদ ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন আম্মার ।
  • আবদুল্লাহ্ ইবন সা’দ আল-ওরাক।
  • মুহাম্মদ ইবন খালাফ
  • ইয়াকূব ইবন নুয়াইম কারকারা আল-আরযানী
  • ওকী আল-আল-কাযী
  • আবুল আব্বাস আবদুল্লাহ্।

তাঁর এ শেষোক্ত শিষ্যটি ছিলেন খলীফা মু’তায (ইবন মুতাওয়াক্কিল ইবন মুতাসিম ইবন হারুনুর রশীদ)-এর পুত্র। তাঁর মাত্র পাঁচ বছর বয়সের সময় খলীফা মুতা বালাযুরীকে তার ঐ সন্তানটির গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। ইতিপূর্বে মু’তায-এর পিতা খলীফা মুতাওয়াক্কিলেরও তিনি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পারিষদ ছিলেন। তাঁর এ ঘনিষ্ঠতা এ পর্যায় পৌঁছেছিল যে, খলীফা মুতাওয়াক্কিল তাঁকে সাথে না নিয়ে খেতেই বসতেন না। তাঁর পরবর্তী খলীফা আল-মুস্তাঈনও তাকে অত্যন্ত সমাদর করতেন।

খলীফা-তনয় আবুল আব্বাস আবদুল্লাহ যে তার সুযোগ্য উস্তাদের কাছে বিদ্যাভ্যাস করে কী পরিমাণ জ্ঞানগরিমার অধিকারী হয়েছিলেন, তাঁর লিখিত কাসীদা-ই-বা-ইয়া, কিতাবু যাহর ওয়ার রিয়ায, ‘কিতাবুল বাদী’, কিতাবু মাকাতিবাতিল ইখওয়ান বিশ-শে’র, কিতাবুল জাওয়ারিহ ওয়াস্ সায়দ, কিতাবুস সুরকাত, কিতাবু আশআরিল মুলুক, কিতাবুল আদব (বৃটেনের যাদুঘরে সংরক্ষিত), কিতাবু হুলইল আখবার, কিতাবু মুখতাসার তাবাকাতুশ শু’আরা, কিতাবুল জামি ফিলগেনা, কিতাবু আরজুযাতিন ফী যামমিস্ সাবূহ প্রভৃতি গ্রন্থ দৃষ্টে অনুমান করা যায়। (দ্র. ইবন খাল্লিকান, জিলদ ১, পৃঃ ২৫৮, তাবাকাতুল উদাবা, পৃঃ ২১৯, আল-ফিহরিস্ত, পৃঃ ১১৬, আল-আগানী, জিলদ ৯, পৃঃ ১৪০)।

উঠতি বয়সেই বালাযুরী মুসলিম জাহানের একটি ইতিহাস রচনা করেন। তাতে তার সমসাময়িক বাদশাহদেরকে অসন্তুষ্ট না করে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে তিনি ঐতিহাসিক তত্ত্বাদি লিপিবদ্ধ করেন। সে ইতিহাস বর্ণনায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দেন। এ পুস্তকটি তিনি খলীফা মু’তাযের ইন্তিকালের পর লিখেন বা সমাপ্ত করেন বলেই অনুমিত হয় : কেননা, তাতে মু’তাযই হচ্ছেন সর্বশেষ আলোচিত খলীফা। এমনও হতে পারে যে, খলীফা আল-মুস্তাঈনের সময় শুরু করে আল-মু’তায-এর শাসনামলে তিনি তার রচনাকার্য সমাপ্ত করেছেন।

 ‘আর্দশীরের শাসনামল’ নামক তাঁর আরেকখানি গ্রন্থ রয়েছে। এটি তিনি ফার্সী ভাষা থেকে ভাষান্তরিত করেন। এটি ছিল তাঁর আরবী কাব্যানুবাদ। তাঁর লিখিত ‘আবুল আশরাফ’ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। প্রাচীন ইতিহাস আলোচনার এটি একটি মূল্যবান উপকরণ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।

তাঁর সর্বাধিক মশহুর কিতাব হচ্ছে ফুতূহুল বুলদান তাঁর শিষ্য ইবনুন নাদীম-এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, এ নামে তিনি ছোট ও বড় দু’খানি গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। ছোট গ্রন্থখানাই এখন আজ আমাদের সম্মুখে রয়েছে। এ নামের তাঁর বড় কিতাবখানার জন্যে এত বেশী তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেন যে তাতে চল্লিশ খণ্ডের এক বিশাল গ্রন্থ রচিত হতো। কিন্তু সে পরিকল্পনা তিনি বাস্তবায়িত করে যেতে পারেন নি।

ইবনুন নাদিম তাঁর বিখ্যাত ‘তারীখে হালাব’ গ্রন্থে লিখেনঃ

“বালাযুরী লেখক, সাহিত্যিক, উঁচু দরের কবি, তত্ত্বজ্ঞান ও শিষ্টাচারের উৎস এবং ওকে ভাল ভাল গ্রন্থের গ্রন্থকার”।

তিনি আরো লিখেনঃ এক সময় বালাযুরী আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে ছিলেন, অথচ তিনি না কারো কাছে যাচ্ঞা করতেন, আর না কোন অর্থকরী কিছু করতেন। লোকজন তাঁকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ

একদা আমি কয়েকজন কবি সাহিত্যিকসহ খলীফা আল-মুস্তাঈন-এর দরবারে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ  আপনাদের মধ্যে এমন কে আছেন যিনি আমার চাচা আল-মুতাওয়াক্কিল সম্পর্কে কবি আল-বুহতরী লিখিত ঐ পংক্তি থেকে উত্তম পংক্তি আমার সম্পর্কে লিখতে পারেন, যাতে বুহতারী লিখে ছিলেন।

ولو ان مشتاقاً تكلف فوق ما

في فُسعه لثنىَ إليك المسيرا

অর্থাৎ কোন উদ্যমী উৎসাহী ব্যক্তি যদি তার সাধ্যের অতীত চেষ্টায় নিমগ্ন হয়, তা হলে তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করা ছাড়া তার গত্যন্তর থাকবে না। (কেননা, তুমি এতই প্রশংসনীয় গুণাবলীর অধিকারী যে, এ গুণাবলী অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না)।

বালাযুরী বলেনঃ তারপর আমরা সে দিনের মত চলে আসি। এর কয়েকদিন পর আমি গিয়ে তাকে বললাম, আমীরুল মু’মিনীন! আমি আপনার সম্পর্কে বুদতারী রচিত খলীফা মুতাওয়াকিলের স্মৃতিগাথার চাইতে উত্তম কবিতা লিখে নিয়ে এসেছি। খলীফা বললেনঃ যদি তা যথার্থ হয় তা হলে আপনাকে উপযুক্ত পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে। তখন আমি আমার কবিতার পংক্তিগুলো বললামঃ

ولو ان يرد المصطفى اذ حويثة

يظن لظن البرد انك صاحبه

وقال قد اُعطيته فلبسته

نعم هذه اعطافه ومناكبه

“আপনি যদি মুস্তাফা (সা.)-এর চাদর গায়ে দেন, তা হলে ধারণা করা হবে যে, আপনিই বুঝি ঐ চাদরের মালিক।

আর যখন তা আপনাকে প্রদত্ত হবে এবং তা আপনি গায়ে দেবেন তখন তা বলবে, হাঁ, এই যে তার পার্শ্বদেশসমূহ এবং এই যে তার স্কন্ধসমূহ।”

কবিতার এ পংক্তিগুলো শুনে মুস্তাঈন বলে উঠলেন : সত্যিই আপনি অপূর্ব কবিতা লিখেছেন। যান, আপন ঘরে গিয়ে আমার কাসেদের অপেক্ষা করুন!” আমি ঘরে পৌছতে না পৌছতেই খলীফার কাসেদ একটি চিরকুট নিয়ে হাযির হলো। তাতে লিখিত ছিল-আমি আপনাকে সাত হাজার স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করলাম। আমি জানি, আমার পরে আপনার উপর বিপদ নেমে আসবে। আপনি নির্জনবাসে বাধ্য হবেন। (এমন কি শেষ পর্যন্ত আপনাকে জীবন ধারণের জন্যে লোকের কাছে যা করতে হবে। কিন্তু কেউ আপনার যা পূরণের জন্যে এগিয়ে আসবে না।) তাই এ দীনারগুলো খুব হিফাযত করে রাখবেন এবং ঐ অনাগত বিপদের দিনে তা খরচ করবেন, কারো কাছে যা করবেন না। আর আমার জীবদ্দশায়, আপনাকে কারো কাছে জীবন ধারণের জন্যে কিছু চাইতে হবে না।”

          বালাযুরী বলেন, তারপর তিনি আমার জন্যে বেতন-ভাতা এবং উত্তম জীবিকার ব্যবস্থা করেন। আর কোনদিন আমার কোন অসুবিধা হয়নি এবং আজও আমি তাঁর প্রদত্ত সে সাত হাজার স্বর্ণমুদ্রা ভেঙ্গে খাচ্ছি। কারো কাছে হাত পাতার আমার প্রবৃত্তি হচ্ছে না। আমি তার জন্যে রহমতের দুআ করছি।

          খলীফা মামুনের প্রশংসায়ও তিনি কবিতা লিখেছেন। কিন্তু প্রশংসামূলক কবিতার চাইতে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক ও নিন্দামূলক কবিতার পাল্লাই ভারী মনে হয়। ১৩১৯ইং/১৯০১ খ্রী. সনে মিসর থেকে প্রকাশিত ফুহুল বুলদানের ১ম সংস্করণ যখন মুদ্রিত হয় তখন গ্রন্থকার-পরিচিতি লিখতে গিয়ে মিসরীয় লেখক আলী বাহজাত তাই বলেছেনঃ

ولم يكن البلاذرى مورخا فقط بل كان شاعرا وله هزليات واهاج في غاية الرقة ولم يبق لنا منها الا القليل.

          অর্থাৎ “বালাযুরী কেবল একজন ঐতিহাসিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন কবি। তাঁর প্রচুর ব্যঙ্গাত্মক ও নিন্দাসূচক কবিতা রয়েছে। এগুলোর আবেদন অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কিন্তু তার খুব অল্পসংখ্যকই আমাদের জন্যে অবশিষ্ট রয়েছে।”

  বালাযুরীর নিজের বর্ণনা, একবার মাহমূদ আল-ওরাক আমাকে এ মর্মে ফরমায়েশ করলেন যে, এমন একটি কবিতা রচনা করুন যাতে আপনি অমরত্ব লাভ করতে পারেন এবং নিন্দাসূচক কাব্যচর্চার পাপ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারেন। তাঁর সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি লিখলামঃ

استعدى يا نفس للموت واسعى * لنجاة فالحازم المستعد

قد تبينت انه ليس للحى * خلود ولا من الموت بد

انما انت مستعيرة سوف * تردين والعوارى ترد

انت تسهين والحوادث لاتسهوا * وتلهين والمنايا تجد

অর্থাৎ- “রে মন তুই মৃত্যু তরে কররে আয়োজন

বাঁচতে যদি চাস,

সাবধানীরা আয়োজন রয় না পিছে পড়ে

(চায় না রে বিনাশ।)

জীব মাত্রেরই মৃত্যু আছে রীতি চিরন্তন

জানে সর্বজন,

প্রত্যেকেই মৃত্যু-স্বাদ করবে আস্বাদন

নাই যে ব্যতিক্রম।

নিশ্চয়ই তুই ধার করা ধন-

ফিরিয়ে দেয়া হবে,

ধার করা ধন ফেরৎ লাজিম

কে তা ধরে রাখে?

তুই তো গাফেল সময় সুযোগ কাটাস্ খেলে হেসে।

যুগচক্র সদা সচল

রয় না মোটে বসে ।

তুই তো গাফেল গাফলতিতে[1]

সময় কেটে যায়-

মৃত্যু কিন্তু রয়না অচল

সচল ত্রস্ত পায়।

বিশিষ্ট প্রাচ্যবিশারদ পণ্ডিত এম, জে, ডি, জুইয়া (M. J. D Goeje) বালাযুরীর গবেষণাপদ্ধতি, তাঁর প্রদত্ত তত্ত্বাবলীর নির্ভরযোগ্য এবং ইতিহাস বর্ণনায় তাঁর মাপজোঁকা ভাষা ব্যবহারের অত্যন্ত প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেনঃ

“বালাযুরী যদিও আব্বাসী খলীফাদের যুগে তাঁদেরই ছত্রছায়ায় প্রতিপালিত, মুতাওয়াক্কিল ও আল-মুস্তাঈনের মত খলীফাগণের অন্তরঙ্গ পারিষদ এবং তাঁদের অকৃপণ দানরাশি তাঁর উপর অহরহ বর্ষিত হয়েছে, এতদসত্ত্বেও তাদের শাসনামলের বর্ণনায় তিনি কোন উচ্ছসিত ভাষা ব্যবহার না করে একান্তই সাদামাঠাভাবে তত্ত্বাদি বর্ণনা করে গেছেন।

না তিনি তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন, আর না তাঁদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোনরূপ কটাক্ষ ও সমালোচনা করেছেন। এমন কি সে যুগের প্রচলিত ধারা অনুসারে সমসাময়িক রাজা বাদশাহদের প্রশংসা সম্বলিত কোন ভূমিকাও তিনি তাঁর পুস্তকে সংযোজিত করেন নি। (হয়তো বা ভূমিকা লিখতে গেলে ঐ ধারা অনুসরণে খলীফার গুণকীর্তন করতে হবে বলে, আদৌ তিনি কোন ভূমিকাই তাঁর পুস্তকে রাখেন নি।) বড়জোর তিনি যতটুকু আনুকুল্য তাদের প্রতি প্রদর্শন করেছেন তা হলো আব্বাসীয় খলীফাদের বর্ণনাকালে তিনি সকলকেই ‘খলীফা বলেছেন, পক্ষান্তরে উমাইয়া শাসকদের মধ্যে কেবলমাত্র উমর ইবন আবদুল আযীয ব্যতীত আর কাউকেই তিনি খলীফা’ বলে উল্লেখ করেন নি”।

সে যুগের দর্পণে বিবেচনা করলে এটা তার উন্নত চরিত্র ও সৎসাহসের পরিচায়ক ছিল সন্দেহ নেই।

জনৈক জার্মান ঐতিহাসিক- যিনি তাঁর গ্রন্থের স্থানে স্থানে বালাযুরীর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন- বলেন,

 “বালাযুরী হচ্ছেন সেই সব ঐতিহাসিকদের অন্যতম, যারা নিজেদের সংগৃহীত তত্ত্বভাণ্ডার থেকে যাচাই-বাছাই করে তত্ত্বাদি পরিবেশনে সুস্থ রুচি ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

এম, জে, ডি, জুইয়া বলেন, “বালাযুরীর প্রতি ঐ ঐতিহাসিকের শ্রদ্ধানিবেদন ও সুধারণা পোষণের ব্যাপারে আমিও একমত। কিন্তু আমার মতে, তাতে বালাযুরীর প্রশংসার হক পুরাপুরি আদায় হয় না।”

ফুতূহুল বুলদান

বলাবাহুল্য, বালাযুরীর সেরা পুস্তক ফুতুহুল বুলদানকে কেন্দ্র করেই তাঁর স্তুতিবাদ করা হয়ে থাকে। প্রাচ্যবিদ এম, জে, ডি, জুইয়া বলেন, “তার ঐ গ্রন্থটি আমাদেরকে এমন সব সূক্ষ্ম তত্ত্ব নির্দেশ করে- যা আমরা অন্য কারো কোন গ্রন্থেই খুঁজে পাই না। বিশেষতঃ যে সব স্থানে তিনি ইরাকের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন শহরগুলো বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন, সেগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি মিটে গেছে, কেবল কতকগুলো ধ্বংসস্তুপই ও টিলা-টিবিই অবশিষ্ট রয়েছে। সেগুলো নির্ভরযোগ্য বর্ণনা তিনি এজন্যেই দিতে পেরেছেন যে, সেসব শহর নগরীর পূর্ণ সমৃদ্ধির দিনের অনেক অধিবাসীই তাঁর সমসাময়িক যুগের লোকে ছিলেন যারা ঐ সব শহর-বন্দরের চরম উৎকর্ষের যুগ করেছিলেন। তাঁর পুস্তকের বর্ণনা অতি সংক্ষিপ্ত বলে তাঁর বিরূপ সমালোচনা করা চলে না এ জন্যে যে, এটি তাঁর প্রণীত সংক্ষিপ্ত পুস্তক। এ ব্যাপারে প্রণীত তার বিশদ পুস্তকে হয়তো তিনি তা সবিস্তারেই আলোচনা করে থাকবেন।

ফুতুহুল বুলদান সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এম, জে, ডি, জুইয়া বলেনঃ “এ গ্রন্থটি সম্পর্কে মন্তব্য করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। কেবল এতটুকুই বলবো, এ যেন একটি দর্পণ-যাতে ইসলামী রাজ্যসমূহের প্রাথমিক যুগের চিত্র চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এ গ্রন্থের পাঠক ইসলামী রাষ্ট্রের স্বার্থক রূপকার উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে একজন সুযোগ্য নেতা এবং ইসলামী চরিত্র-মাহাত্ম্যের উন্নত আদর্শরূপে দেখতে পাবেন। মুত্তাকী, বিনয়ী, মিতব্যয়ী, দরিদ্র, নিঃস্বদের তোষণ-পোষণ অথচ ইসলামের শত্রুদের প্রতি কঠোর। তিনি লোকদের সম্পদের প্রতি লোভ করা এবং বিলাস-বসন প্রদর্শনীকে ঘণা করতেন। তিনি নগরবাসীদেরকে যাযাবরদের আগ্রাসী তৎপরতা থেকে রক্ষা করতেন। মক্কার বৈরী ভাবাপন্ন সমাজপতিদের বাড়াবাড়ি থেকে সাহাবীদের হকের হিফাযত করতেন। এই গ্রন্থের পাঠক এটাও লক্ষ্য করবেন যে, আরব বীরগণ কিভাবে রোম ও ইরানে তাদের বিজয় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের নিরক্ষরতা যাযাবর জীবন এবং নাগরিক সংস্কৃতি সম্পর্কে সুদীর্ঘকাল ধরে অনবহতি সত্ত্বেও তারা কিভাবে কঠোর পরীক্ষাসমূহে উত্তীর্ণ হয়ে তাদের একক উদ্দেশ্য অর্থাৎ দীন ইসলামের প্রচার প্রসার ও আরব জাতির বিজয় বৈজয়ন্তী উড়িয়ে যাচ্ছেন”। ইসলামী বিশ্বকোষে (C. H. Becker S F. Rosenthal-এর লিখিত প্রবন্ধে ‘ফুতূহুল বুbলদান’-এর মূল্যায়ন করা হয়েছে এভাবেঃ

“ফুতুহুল বুলদান, অর্থাৎ মুসলিম জাতির বিজয় ইতিহাস। ইহা একটি বিশাল গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত সার। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুদ্ধ হইতে গ্রন্থখানি শুরু হইয়াছে। ইহার পর রিদ্দা যুদ্ধ এবং শাম, আল-জাযীরা আর্মেনিয়া, মিসর ও আল-মাগরিব-এর বিজয়সমূহের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। গ্রন্থখানির শেষভাগ ইরাক ও ইরান অধিকার এবং ইহাদের শাসনব্যবস্থার বিবরণ রহিয়াছে। ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করার সময়ে আল-বালাযুরী মধ্যে মধ্যে তখনকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়াছেন। যেমন তিনি এইসব বিষয়ে আলোকপাত করিয়াছেনঃ সরকারী দফতরে গ্রীক এবং ফারসীর বদলে আরবীকে সরকারী ভাষা রূপে ব্যবহার, মিসর হইতে প্রেরিত চিঠিপত্রের উপরিভাগে ইসলামী বাক্যের (মনোগ্রাম) ব্যবহারে বাইজান্টিয়দিগের বিরোধীতা, ভূমি রাজস্ব ও কর-এর বিষয়। সীলমোহর ব্যবহার, মুদ্রা প্রস্তুতি ও তখনকার প্রচলিত মুদ্রাসমূহ এবং আরবী লিপির ইতিহাস। আরবদের বিজয় সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্যে পূর্ণ এই গ্রন্থখানি M. J. Goeje, Liber expugnations regionun নামে সম্পাদন করেন, লাইডেন ১৮৬৩-১৮৬৬ খৃ.। ইহার পর আরও কয়েকবার ইহা মুদ্রিত হইয়া প্রকাশিত হয়। P. K. Hitti ও F. C. Margatten কৃত ইংরেজী অনুবাদ The origin of the Islamic State নিউইয়র্ক ১৯১৬ খৃ. ও ১৯২৪ খৃ. জার্মান অনুবাদ de goeje সং- এর ২৩৯ পর্যন্ত) O. Rescher কৃত লাইপযিগ ১৯১৭-১৯২৩ খৃ.।

(ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৬শ খণ্ড (১ম ভাগ)

পৃ. ৭১-৭২ ‘আল-বালাযুরী’ নিবন্ধ দ্র.)

বালাযুরীর অপর গ্রন্থ ‘আসাবুল আশরাফ’-এ রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনের জীবনচরিত দিয়ে শুরু করে আব্বাসীয় ও উমাইয়া বংশীয় খলীফাদের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামী বিশ্বকোষের ভাষায়ঃ

“এ গ্রন্থের শেষ উল্লেখযোগ্য জীবনী হইল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের ‘কিতাবুল আনসাব’। বাহ্যতঃ কুলজিগ্রন্থ হইলেও প্রকৃত পক্ষে ইহা ইবন সা’দ-এর তাবাকাত জাতীয় রচনা যাহা বংশানুক্রমিক ভাবে বিন্যস্ত হইয়াছে। প্রত্যেকটি শাসকের যুগের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী সর্বদাই প্রাসঙ্গিক অধ্যায়সমূহে সংযোজিত হইয়াছে। অতএব কিতাবুল আনসাব খারিজীদের ইতিহাসের জন্য একটি অতি মূল্যবান উৎস। C. H Becker ইস্তাম্বুলে উক্ত গ্রন্থখানির একটি পরিপূর্ণ কপি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। আশীর আফেন্দী-র পাণ্ডুলিপি পৃ. ৫৯৭-৫৯৮ পূর্ণ গ্রন্থের বিষয়সূচী মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ কৃত (Bull d. Et. or. এ ১৪ খ. দামিশক ১৯৫৪ খৃ. পৃ. ১৯৭-২১১), আরও দ্র. আনসাবুল আশরাফ সম্পা, মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ্ মিসর ১৯৫৯ খৃ. ৩৪-৫৩ সম্পাদকের ভূমিকা। জেরুসালেম এর হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুকূল্যে এই সংস্করণের যে দায়িত্ব গ্রহণ করা হইয়াছিল, তথা হইতে তাহার তত্ত্বাবধানে ৪খ. সম্পা, M. Scholossinger ১৯৩৮-৪০ খৃ. এবং ৫খ. সম্পা, S. D. Goitirein ১৯৩৬ খৃ. একটি প্রয়োজনীয় ভূমিকা সহ) প্রকাশিত হইয়াছে। O. Pinto এবং G. Della vida ইহার অনুবাদ করিয়াছেন । It Califfo Mu’awiya, 1 Secondo il – “Kitab An-sab al Asraf” রোম ১৯৩২ খৃ. নামে উহার একাংশের অনুবাদ করিয়াছেন। আরও F. Gabrieli La Revota dei Muhallabitinel rage it ruovo Baladuri, Rendiconti -তে, R. Accad die Lincei, Cl, sc. mor, stor.e ilole ৬ খন্ড (১৯৩৮ খৃ.) ১৯৯-২৩৬। প্রথম খণ্ড যাহা সীরাতুন্নবী বিষয়ে লিখিত তাহা মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ দারুল মা’আরিফ, মিসর হইতে ১৯৫৯ খ. প্রকাশ করিয়াছেন। এই খণ্ডেও একটি প্রয়োজনীয় ও জ্ঞানগর্ভ ভূমিকা সন্নিবেশিত হইয়াছে।

…. আল-বালাযুরী অনেক ক্ষেত্রেই তাঁহার প্রাপ্ত তথ্যাবলী সংক্ষেপ করিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। তবে প্রায়শ তিনি মূল সূত্রের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন-যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে ইহাতে সাহিত্যরস ক্ষুন্ন হইয়াছে। তাহার রচনায় অতি অল্পসংখ্যক দীর্ঘ কাহিনী স্থান পাইয়াছে। ফুতুহুল বুলদান-এ আল-বালাযুরী ঐতিহাসিক ঘটনা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করার এবং উহা বিভিন্ন নিবন্ধে পরিবেশন করার প্রাচীন নিয়ম চালু রাখিয়াছেন। অন্যপক্ষে (ইহার ঠিক বিপরীত) ‘আনসাবুল আশরাফে’ তিনি তাবাকাত (ইবন সা’দ জাতীয় গ্রন্থসমূহ এবং প্রাচীন ইতিহাস (ইবন ইসহাক, আবু মিখনাফ, আল-মাদাইন)-এর তথ্যসমূহকে এক তৃতীয় ধরনের পদ্ধতিতে অর্থাৎ বংশানুক্রমিক বিবরণ পদ্ধতিতে সমন্বিত করিয়াছেন। (ইবনুল কালবী)-ইসলামী বিশ্বকোষ, ষোড়শ খণ্ড (১ম ভাগ পৃ. ৭২)

          দাক্ষিণাত্যের বিখ্যাত উছমানীয়া বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দ্রাবাদ থেকে ১৯৪৭ সালের বিভাগ পূর্বকালে ‘ফুতুহুল বুলদান’ এর উর্দু অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছিল। অনুবাদ করেছিলেন মওলবী সাইয়েদ আবুল খায়ের মওদূদী। করাচীর বিখ্যাত ‘নফীস একাডেমী’ ১৯৬২ সালে এ উর্দু সংস্করণটির ১ম পাকিস্তানী সংস্করণ প্রকাশ করে। উক্ত উর্দু সংস্করণের ভূমিকায় মুহাম্মদ ইকবাল সলীম গাহেন্দরী বালাযুরীর জন্মসাল ২০৩ হিজরী এবং মৃত্যু ২৭৯ হিজরীতে বাগদাদে হয় বলে উল্লেখ করেছেন।

তাঁর মৃত্যুর কারণ পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি ‘বালাযুর’ নামক এক প্রকার ফল সেবন করেছিলেন। তাঁর শিষ্য ইবনুন নাদীম লিখেছেনঃ

وسوس اخر ايامه فشد في البيمار ستان ومات فيه وكان سبب وسوسته انه شرب ثمر البلاذر على غير معرفة فلحقه مالحقه (الفهرست ص 113)

অর্থাৎ- তাঁর শেষ বয়সে তিনি উন্মাদ অবস্থায় ‘বিমারিস্তান’ তথা আব্বাসী খলীফা মামুনের বিখ্যাত হাসপাতালে জিঞ্জিরাবদ্ধ অবস্থায় নীত হন এবং সেখানে ইন্তিকাল করেন। ফলটি না চিনে তা সেবন করায়ই তাঁর এ দশা হয়েছিল।–আল-ফিহরিস্ত, পৃ. ১১৩ কিতাবুল আ’লাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৫।

কথিত আছে যে এ ফলটি সেবনে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু অধিক সেবনে মানুষ উন্মাদ হয়ে যায়। বালাযুরীর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল।

কিতাবুল ওযারা ওয়াল কুত্তাব (كتاب الوزرأء والكتاب)-এর লিখক জাহশিয়ারী (মৃত্যু ৩৩১ হি/৯৪২) যখন লিখেনঃ

جابر ابن داؤد البلاذرى كان يكتب للخصيب بمصر

“জাবির ইবন দাউদ বালাযুরী মিসরের খাসীব এর কাতিবরূপে কাজ করতেন” তখন এ সন্দেহ না করে উপায় থাকে না যে, বালাযুরী ফল সেবনে অপ্রতিস্থ হওয়া ও মতবরণের ঘটনাটি আমাদের আলোচিত ফুতুহুল বুলদানের লেখক আবুল হাসান আহমদ ইবন ইয়াহইয়া বলিযুরী নন, তিনি ছিলেন তার পিতামহ জাবির ইবন দাউদ বালাযুরী। মিসরের খাসীবের কাতিব জারির ইবন দাউদ যখন বালাযুরী বলে অভিহিত হচ্ছেন, তখন কি পরবর্তীকালে বিখ্যাত তার পৌত্র বালারীর জন্ম হয়েছে? তাই ‘মু’জামুল উদাবা’ গ্রন্থে অত্যন্ত সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছেঃ

ولا ادري ايما شرب البلاذر احمد بن يحى او جابر بن داؤد الا ان ماذكره الجهشيارى يدل على ان الذي شرب البلاذر هو جده لانه قال “جابر بن داود البلاذرى ولعل ابن ابنه لم يكن حينئذ موجودا والله اعلم”.

 অর্থাৎ- জানি না, পিতামহ ও পৌত্র দু’জনের কে বালাযুর সেবন করেছিলেন। তবে জাহশিয়ারী যখন বলেন, “জাবির ইবন সউদ বালাযুরী” তখন প্রতীয়মান হয় যে, পিতামহই বলযুর সেবন করেছিলেন। কেননা, তার নাতিটির হয়তো তখন অস্তিত্বই ছিল না। আল্লাহ সম্যক অবগত।”

আল্লামা বালাযুরী তাঁর গ্রন্থাদির মাধ্যমে মুসলমানদের বিজয় কাহিনী ও গৌরব গাথার যে বিশ্বস্ত বর্ণনা রেখে গেছেন, অনাগতকাল ধরে তা বিশ্ব মুসলিমের আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির উপাদানরূপে বিরাজমান থাকবে। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চতম আসন দান করুন এবং আমাদেরকেও তার অনুসৃতপথে তাগ্রসর হয়ে একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়ে তোলার তওফীক দান করুন। আমীন।

আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী

[1] কায়রো সংস্করণে انت تسهين রয়েছে, পক্ষান্তরে লাইডেনে মুদ্রিত কপিতে আছে انت ساهيمه এটা শব্দগত ফারাক অর্থে তেমন ফারাক পড়ে না

বিশেষ দ্রষ্টব্য: জীবনী সংগ্রহ করা হয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত “ফুতুহুল বুলদান” এর বাংলা অনুবাদ বই থেকে।

মতামত দিন