জীবনী বিজ্ঞান ও ইসলাম

জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল বাত্তানী-এর জীবনী

তার আসল নাম হলো আবু আব্দুল্লাহ ইবনে জাবির ইবনে সিনান আল বাত্তানী। তবে তিনি আল বাত্তানী নামেই বেশি পরিচিত। ৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মেসোপটেমিয়ার অন্তর্গত ‘বাত্তান’ নামক স্থানে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মস্থানের নামেই তিনি বিশেষ ভাবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর পিতার নাম জাবির ইবনে সানান। তাঁর পিতাও ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন বিখ্যাত পন্ডিত ও বিজ্ঞানী। আল বাত্তানী পিতার নিকটই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। শৈশব কাল থেকেই শিক্ষা লাভের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। তিনি যে শিল্প কর্মেই হাত দিতেন তা নিখুঁত ভাবে শুরু করতেন এবং এর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। পিতার নিকট প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর উচ্চ শিক্ষার জন্যে তিনি ইউফ্রেটিস নদীর নিকটবর্তী রাক্কা নামক শহরে গমন করেন।

আল বাত্তানীর অবদান

তিনি মানব জাতিকে উপহার দিয়ে গেছেন সৌর বছরের সঠিক পরিমাপ। তিনিই সর্ব প্রথম নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়ে ছিলেন যে, এক সৌর বৎসরে ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড হয়।

মাত্র ২০ বছর বয়সেই তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পন্ডিত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র প্রভৃতির প্রকৃতি, গতি ও সৌরজগৎ সম্পর্কে তাঁর সঠিক তথ্য শুধুমাত্র অভিনবই নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানে টলেমীসহ পূর্বত বহু বৈজ্ঞানিকের ভুলও তিনি সংশোধন করে দেন। সূর্য ও চন্দ্র গ্রহন সম্পর্কিত টলেমী যে মতবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, আল বাত্তানী তা ভুল বলে সম্পূর্ণ বাতিল করে দিতে সক্ষম হন। তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে সূর্যের আপাত কৌণিক ব্যাসার্ধ বাড়ে ও কমে। নতুন চাঁদ দেখার ব্যাপারে আল বাত্তানী সম্পূর্ণ নতুন ও নির্ভুল বক্তব্য পেশ করেন। সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ সম্পর্কেও তাঁর বক্তব্য সুস্পষ্ট। আল বাত্তানী তাঁর নতুন উদ্ভাবিত যন্ত্র দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন যে, সূর্য স্থির বলে এতদিন ধরে প্রচলিত টলেমীর মতবাদটি সত্য নয়। সূর্য তার নিজস্ব অক্ষে গতিশীল। সুতরাং স্থির নিশ্চল নয় এবং তার নিজস্ব কক্ষে গতিশীল। বিজ্ঞানী ডেনথর্ণি চন্দ্রের গতি নির্ধারণে চাদ ও সৌরগ্রহের আল বাত্তানীর চমৎকার পর্যবেক্ষণটি গ্রহণ করেন।

এ আবিষ্কার সূর্যের গতি ও সময়ের সমীকরণে সামান্য পরিবর্তন আনেন। কপারনিকাস সূর্যের ইকুইটারিয়েল গতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আল-বাত্তানী তা কখনও বিশ্বাস করতেন না। আলবাত্তানী গ্রহণের সময়ের সূর্যের ও চাঁদের সঠিক পরিমাপ নির্ণয় করেন। তিনি ঋতুর সময়-পরিধিও নির্ণয় করেন। সঠিকভাবে সূর্যের কক্ষপথে পরিভ্রমণ পরিস্থিতি তুলে ধরতে সক্ষম হন। তিনি এর সবচে’ কম গড়ও নির্ধারণ করেন। আল বাত্তানী টলেমীর প্রচারিত আরো বহু মতবাদকে ভুল বলে প্রমাণ করেন।

আব্দুল্লাহ আল-বাত্তানী জ্যোতির্বিদ্যা ও ত্রিকোণমিতি বিষয়ে অনেক বই লিখে গেছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত বই হচ্ছে : আল জিজ। তিনি ৮৮০ সালে তারকাগুলির একটি ক্যাটালগ তৈরি করেন। যেখানে তিনি ৪৮৯টি তারকার নামকরণ করেন। টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত সবচেয়ে মূল্যবান তারকা ক্যাটালগগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। এছাড়াও এই বইটির মাঝখানে তিনি সূর্য, চাঁদ, এবং পাঁচটি গ্রহের (বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি) গতির তত্ত্ব ব্যাখা করেন। তার এই আল জিজ বইটি লাতিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। রোমের ভ্যাটিকানে এর মূল কপি পাওয়া যায়। আল জিজে ৫৭টি অধ্যায় রয়েছে। এর বাইরেও আল বাত্তানী এই বইতে আরো একটি প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছেন সেটি হলো- ভবিষ্যত প্রজন্মকে তিনি আপন কর্মের ফলাফলের ভিত্তিতে উন্নতির জন্য উৎসাহিত করেছেন। রেনেসাঁ-পূর্ব ইউরোপকে তাঁর আবিষ্কার ও ধারণা ব্যাপকভাবে প্রভাবান্বিত করতে পেরেছিল। তাঁর বইগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। জ্যোতির্বিদ্যা ও ত্রিকোণমিতি সম্পর্কিত তার আবিষ্কার-উদ্ভাবন ছিল শিক্ষণীয়। বিজ্ঞানের এই দুটি শাখার উন্নয়নে তাঁর অবদান আমাদের জন্যে প্রেরণার উৎস।

আল বাত্তানীর বয়স যখন মাত্র ২৫ বছর খলিফা মুতাওয়াক্কিলের ইন্তেকাল হয়। পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক উত্থান পতনের কারণে তরুণ বয়সেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং সিরিয়ার গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত হন। রাষ্ট্রীয় কাজের চরম ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি জ্ঞান বিজ্ঞান সাধনার কোন ক্ষতি করেননি। রাজধানী রাক্কা ও এস্টিয়োক থেকে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে গবেষণা চালাতেন। তিনি ছিলেন একজন অংক শাস্ত্রবিদও।

আল বাত্তানীই সর্ব প্রথম আবিষ্কার করেন যে, ত্রিকোণমিতি হচ্ছে একটি স্বয়ং স্বাধীন বিজ্ঞান। তিনি গোলাকার ত্রিকোণমিতির কিছু সমস্যার অত্যন্ত বিস্ময়কর সমাধান দিয়েছেন। অন্যান্য বৈজ্ঞানিকগণ ত্রিকোণমিতির প্রতি এতদিন অমনোযোগী ছিলেন। আল বাত্তানীর অসাধারণ প্রতিভার সংস্পর্শে নির্জীব ত্রিকোণমিতি সজীব হয়ে উঠে। সাইন, কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক আল বাত্তানীই প্রথম আবিষ্কার করেন। ত্রিভুজের বাহুর সঙ্গে কোণের ত্রিকোণমিতি সম্পর্কও তাঁর আবিষ্কার। বাত্তানী সর্ব প্রথম অংক শাস্ত্রে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রীক স্বর গ্রামের পরিবির্তে লম্বের ব্যবহার করেন। কোপারনিকাস তার ‘ডি রিভউলিউশনস অরবিয়াম কাস্টিয়াম’ গ্রন্থে আল বাত্তানীর কাছে দায় স্বীকার করেছেন।

এক কথায় আল বাত্তানীর জীবন ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিস্তৃত। এ মহান মনীষী ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে ৭২ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন।

তথ্যসূত্রঃ

১. বুক অব ইসলামিক নলেজ, ইকবাল কবীর মোহন।

২.উইকিপিডিয়া

৩. http://www.encyclopedia.com/people/science-and-technology/astronomy-biographies/al-battani

গ্রন্থনায় : নাকিব মাহমুদ

লেখাটি মাসিকপৃথিবী পুরনো সংখ্যা থেকে সংগৃহীত ও অনুলিপিকৃত।

মতামত দিন