জীবনী

আবু উমামা আল-বাহিলী (রা)-এর জীবন

সংকলনে:  ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ

আবু উমামা তাঁর ডাকনাম। আসল নাম সুদায় ইবন ‘আজলান আল-বাহিলী। ডাকনামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ।[1] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তাঁর গোত্র আল-বাহিলার নিকট দীনের দাওয়াত দানের উদ্দেশ্যে পাঠান। তিনি নিজ গোত্রের লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে ইসলামের বিধি-বিধান শেখান। এসম্পর্কে তিনি বলেছেন:[2]

بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى قومي أدعوهم إلى الله تبارك وتعالى وأعرض عليهم شرائع الاسلام.

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে আমার নিজ গোত্র বা বাহিলার নিকট পাঠান, যাতে আমি তাদেরকে আল্লাহ তা’আলার দিকে আহ্বান জানাই এবং তাদেরকে ইসলামের বিধি-বিধান শেখাই।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনকালে যে সকল সাহাবীকে মুআল্লিম তথা শিক্ষক হিসেবে গণ্য করা হয় তিনি ছিলেন তাঁদের একজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের সময় তিনি ছিলেন তিরিশ বছরের একজন যুবক। তিনি বলেন যখন এ আয়াত নাযিল হলো:

تحت الشجرة.

لقد رضي الله يا محمد عن المؤمنين إذ يبايعون

(আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি খুশী হয়েছেন, যখন তারা বৃক্ষের নীচে তোমার হাতে বায়’আত করছিল।) তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমিও গাছের নীচে বায়আত করেছি। তিনি বললেন: তুমি আমার এবং আমি তোমার অন্তর্ভুক্ত। তাবারানীর একটি দুর্বল বর্ণনা মতে তিনি উহুদ-যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।

তিনি ‘উমার, উছমান, ‘আলী, আবু উবায়দা মু’আয ইবন জাবাল, আবুদ দারদা’ ‘উবাদা ইবন সামিত, ‘আমর ইবন ‘আবাসা (রা) এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রথমে মিসরে, তারপরে শামে স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলেন।[3] সেখানে মাসজিদে তাঁর শিক্ষাদানের মাজলিস অনুষ্ঠিত হতো। সুলাইম ইবন ‘আমির বর্ণনা করেন:[4]

كنا نجلس إلى أبي أمامة الباهلي فيحدثنا حديثا كثيرا عن رسول الله صلي الله عليه وسلم فإذا سكت قال اعقلوا بلغوا عنا كما بلغنام

‘আমরা আবূ উমামা আল-বাহিলীর (রা) মাজলিসে বসতাম। তিনি আমাদের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বহু হাদীস বর্ণনা করতেন। যখন চুপ করতেন তখন বলতেন, তোমরা এগুলো স্মৃতিতে ধারণ কর, বোঝ এবং যেভাবে আমরা তোমাদের নিকট পৌছে দিলাম, তোমরাও অন্যদের নিকট পৌছে দাও।’

তাঁর ছাত্র হাবীব ইবন উবাদা তাঁর হাদীস বর্ণনার ধরন সম্পর্কে বলেছেন:[5]

إنه كان يحدث الحديث كالرجل الذي عليه يؤدي ماسمع.

তিনি সেই ব্যক্তির মত হাদীস বর্ণনা করতেন, যে যা কিছু শোনে হুবহু তাই বর্ণনা করে। অর্থাৎ একই শব্দ ও বাক্যে।

হাসান ইবন জাবির আবু উসামার (রা) নিকট হাদীস লেখার ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলেন। তিনি বলেন, এতে কোন দোষ নেই। অথবা বলেন, এতে কোন দোষ দেখি না। একবার তিনি তার ছাত্রদের বলেন:[6]

إن هذا المجلس من بلاغ الله إياكم و أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قد بلغ ما أرسل به وأنتم فبلغوا عنا أحسن ماتسمعون.

‘এই মাজলিস হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য তাবলীগ স্বরূপ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে পয়গাম দিয়ে পাঠানো হয়েছে তিনি তা আমাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। আর তোমরা আমাদের নিকট থেকে যে সকল ভালো কথা শুনবে তা অন্যদের নিকট পৌঁছে দেবে। আবূ উমামার (রা) নিম্নের উক্তিটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য:[7]

والله لقد فتحت هذه الفتوح سيوف ماحليتها ذهب ولا فضة ولكن حليتها الانك والعلالي والحديد.

‘আল্লাহর কসম: এসকল বিজয় যেসব তরবারি বাস্তবায়িত করেছিল তা সোনা-রূপো দ্বারা কারুকার্য খচিত ছিল না; বরং তা ছিল রং ও লোহা দ্বারা কারুকার্য খচিত।

তাঁর সংগী-সাথী ও ছাত্র-শিষ্যদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হলেন: আবু সাল্লাম আল-আসওয়াদ, মুহাম্মাদ ইবন যিয়াদ আল-হানী, শুরাহবীল ইবন মুসলিম, শাদ্দাদ ইবন আওস, আবু ‘আম্মার, কাসিম ইবন আবদির রহমান, শাহর ইবন হাওশাব, মাকহুল শামী ও খালিদ ইবন মাদান (রহ)[8]

আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, আপনি আল্লাহর নিকট আমার জন্য দু’আ করুন, তিনি যেন আমাকে শাহাদাত দান করেন, তিনি দুআ করেন, হে আল্লাহ! তুমি তাদেরকে নিরাপদে রাখ এবং তাদেরকে গণিমাত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) দান কর।[9]

আবু উমামা (রা) বলতেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই কথাগুলো বলতে শুনেছি:[10]

أكفلوا لي بست أكفل لكم بالجنة إذا حدث أحدكم فلا يكذب، وإذا أوئمن فلا يخن، وإذا وعد فلا يخلف ، غضوا أبصاركم و كفوا أيديكم ، واحفظوا فروجكم.

‘তোমরা আমাকে ছয়টি ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দাও, আমি তোমাদেরকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। তোমাদের কেউ যখন কথা বলবে মিথ্যা বলবে না; তোমাদের কারো কাছে কোন কিছু আমানত রাখলে খিয়ানত করবে না; অঙ্গীকার করলে, ভঙ্গ করবে না: তোমরা তোমাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখবে; হাতকে সংযত রাখবে এবং লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করবে।’

তিনি হিজরী ৮১ সনে, মতান্তরে ৮৬ সনে শামে মৃত্যুবরণ করেন। তবে হিজরী ৮৬ সনের মতটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। অনেকের মতে তিনি শামে মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী।[11]

তথ্যসূত্র: 

[1] আল-ইসাবা ফী তাময়ী আস-সাহাবা-২/১৮২; উসুদুল গাবা-৫/১৫

[2] আল-ইসাবা-৪/১৭৮; খায়রুল কুরূন কি দারসগাহী-২২৮

[3] আল-ইসাবা-২/১৮২; উসুদুল গাবা-৫/১৬

[4] শারফু আসহাব আল হাদীস-৯২; জামি’উ বায়ান আল-ইলম-১/১৪৪

[5] ইবন সা’দ, আত-তাবাকাত-৭/৪১৩

[6] শারফু আসহাব আল-হাদীস-৯৬

[7] তারীখু কাবীর-খ.৪, অধ্যায়-২, পৃ. ২২৫

[8] আল-ইসাবা-২/১৮২; খায়রুল কুরূন কি দাসগাহী-২৩০

[9] আল-ইসাবা-২/১৮২

[10] উসুদুল গাবা-৫/১৭

[11] প্রাগুক্ত; আল-ইসাবা-২/১৮২; খায়রুল কুরূন কি দারসগাহী-২৩০

সংগ্রহ করা হয়েছ: পুরনো পৃথিবী পত্রিকা হতে।

মতামত দিন