জীবনী

আবু সুফইয়ান সাখর ইবন হারব (রা) এর জীবনী

ইতিহাসে যিনি আবূ সুফইয়ান নামে অধিক খ্যাত তাঁর আসল নাম সাখর ইবন হারব। মক্কার কুরায়শ গোত্রের উমাইয়্যা শাখার সন্তান। আবু সুফইয়ান ছাড়াও তাঁর আরো একটি কুনিয়াত বা ডাকনাম ছিল। সেটি হলো আবু হানজালা।[1]

তাঁর মা সাফিয়্যা বিনত হারব আল-হিলালিয়্যা ছিলেন উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা)-এর ফুফু। তাঁর আরো একটি পরিচয় হলো, তিনি ছিলেন উমাইয়্যা খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম খলীফা মু’আবিয়া (রা)-এর পিতা। তিনি হাতীর বছরের দশ বছর পূর্বে জন্ম গ্রহণ করেন। সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড় ছিলেন। অবশ্য এ ব্যাপারে একটু মতপার্থক্য আছে।[2]

আবু সুফইয়ান মক্কার অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তৎকালীন মক্কার একজন বড় ব্যবসায়ীও ছিলেন। মক্কার কুরায়শদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশুনা করতেন এবং তাদের ব্যবসাপণ্য তদারকি করে শাম ও অন্যান্য অনারব দেশে পাঠাতেন। অনেক সময় তিনি নিজেও বাণিজ্য কাফেলাগুলোর সাথে যেতেন। সেকালে বিভিন্ন বাণিজ্য কাফেলার নেতার হাতে থাকতো ভিন্ন ভিন্ন ঝান্ডা। কাফেলা গুলোর সাথে তিনি বের হলে, তিনিই হতেন নেতাদের নেতা এবং তাঁর হাতেই শোভা পেত ‘আল-’উকাব’ নামক সর্বাধিক সম্মানীয় পতাকাটি। যেটি থাকতো যুদ্ধের সময় কুরায়শদের নেতার হাতে।[3]

ঐতিহাসিকদের অনেকে বলেছেন:

رأيا في الجاهلية ثلاثة : عتبة و أبو جهل و أبو سفيان ، فلما أتى الله بالإسلام

كان أفضل قریش أدبروا في الرأي.

‘জাহিলী যুগে কুরায়শদের তিন ব্যক্তি ছিল চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতর। তারা হলো: উতবা, আবু জাহল ও আবূ সুফইয়ান। তবে আল্লাহ যখন ইসলাম দান করেন তখন তাদের চিন্তা-অভিমত পেছনে চলে যায়’।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত উহুদ ও খন্দক যুদ্ধে মক্কার পৌত্তলিক বাহিনী আবু সুফইয়ানের একক নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। এর পূর্বে শুধুমাত্র “নাকীফ” যুদ্ধটি ছাড়া আর কোন যুদ্ধে কোন একক ব্যক্তি কুরায়শ বাহিনী পরিচালনা করেনি। উল্লেখ্য যে, ‘নাকীফ’ যুদ্ধটি হয় জাহিলী যুগে কুরায়শ ও বানূ কিনানার মধ্যে। আর সেই যুদ্ধে কুরায়শ বাহিনী পরিচালনা করেন আল-মুত্তালিব। একথা আবু আহমাদ আল-’আসকারী বলেছেন।[4]

ইসলামের অভ্যুদয়ের পর মক্কার কুরায়শদের মধ্যে যারা মহানবী (সা) ও ইসলামের চরম দুশমন হিসেবে ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছে আবূ সুফইয়ান (রা) ছিলেন তাদের একজন। সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে তার সেই সময়ের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড সবিস্তার বিধৃত হয়েছে। এক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় তিনি হিদায়াত লাভ করেন। মক্কা বিজয়ের অল্প কয়েকদিন পূর্বে, মতান্তরে পূর্ব রাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রতি যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করেন। সেদিন তিনি ঘোষণা করেন:[5]

من دخل دار أبي سفيان فهو أمن.

‘যে আবূ সুফইয়ানের গৃহে আশ্রয় নিবে সে নিরাপদ থাকবে’।

আবু সুফইয়ান (রা) যে সম্মান ও মর্যাদার প্রত্যাশী ছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ঘোষণার মাধ্যমে তিনি তা লাভ করেন। আর এ ঘোষণা তাঁর ঈমান ও ইসলামকে সুদৃঢ় করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসলামের প্রতি আবু সুফইয়ানের (রাঃ) অন্তরে যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছিল তা দূর করার জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি এত সম্মান প্রদর্শন করেন। এর মাধ্যমে তাঁকে এ বার্তাটি পৌঁছে দেন যে, যদি তিনি নিষ্ঠাবান মুসলিম হতে পারেন তাহলে কুরায়শদের মধ্যে তার যে মর্যাদার আসন ছিল তা ইসলামেও অক্ষুন্ন থাকবে।

ইসলাম গ্রহণের পর আবু সুফইয়ান (রা) একজন ভালো মুসলিম হন। পরবর্তীতে সকল যুদ্ধ ও অভিযান এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। হুনায়ন যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংগে ছিলেন। তায়িফ অবরোধে অংশগ্রহণ করেন এবং একটি চোখ হারান। ইয়ারমুক যুদ্ধে দ্বিতীয় চোখটিও হারান’। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুগীরা ইবন শু’বার (রা) সাথে তাঁকে ছাকীফ গোত্রের শ্রেষ্ঠ দেবী লাত-এর বিগ্রহ ভাঙ্গার জন্য পাঠান।[6]

কুরায়শ গোত্রও লাত-কে দেবী বলে পূজা করতো। এদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তাঁর অন্তরে ঈমান কত মজবুত রূপ ধারণ করেছিল। নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের প্রতি লোভ ও আকর্ষণ তার ইসলাম গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন, তাই তিনি মক্কা বিজয়ের দিন ঘোষণা দেন: যে ব্যক্তি আবু সুফইয়ানের গৃহে আশ্রয় নিবে সে নিরাপদ থাকবে।

ইসলামের বিরুদ্ধে আবু সুফইয়ান (রা) যে কঠোর ভূমিকা পালন করেন তা তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মোটেও ভুলে যাননি। সে কথা মনে রেখেই তিনি ইসলামের প্রচার-প্রতিষ্ঠায় আরো বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ইবনু কাছীর (রহ) তাঁর সম্পর্কে বলেন: জাহিলী যুগে তিনি ছিলেন অন্যতম কুরায়শ নেতা। তবে বদর যুদ্ধের পর তিনি হন কুরায়শদের একক নেতা। অত:পর যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি একজন চমৎকার মুসলিমে পরিণত হন। ইসলামের সেবায় অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ইয়ারমূক যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল অতি প্রশংসিত।[7]

সাঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন: ইয়ারমূক যুদ্ধে যখন সকলের কণ্ঠস্বর স্তব্দ হয়ে যায় তখন একটি মাত্র কণ্ঠ থেকে একথাটি বার বার উচ্চারিত হতে শোনা গেল:

يانصر الله اقترب.

‘হে আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী হও’।

মুসলিম ও রোমান বাহিনী তখন তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত। কণ্ঠস্বরটি কার তা জানার জন্য আমি এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম। দেখলাম, তিনি হলেন আবু সুফইয়ান (রা)। তিনি তার পুত্র ইয়াযীদের পতাকাতলে সমবেত হয়ে যুদ্ধ করছেন। তিনি যুদ্ধের ময়দানে একটি বিশাল অশ্বারোহী বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন কাহিনী শুনিয়ে সৈনিকদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুলতেন। যেমন তিনি বলতেন:

الله الله ، إنكم ذادة، لعرب ، وأنصار الاسلام ، وإنهم ذادة الروم وأنصار المشر کین . نهم دهد يوم من أيامك ، اللهم أنزل نصرك على عبادك.

“আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহকে ভয় কর! তোমরা হলে আরবদের রক্ষক, ইসলামের সাহায্যকারী। আর তারা হলো রোমানদের রক্ষক, মুশরিকদের সাহায্যকারী। হে আল্লাহ! তোমার দিনগুলির (যুদ্ধগুলির) মধ্যে এ একটি দিন (যুদ্ধ)। হে আল্লাহ! তুমি তোমার বান্দাদের সাহায্য কর”।[8]

বর্ণিত হয়েছে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুসলিমদের সংখ্যার আধিক্য দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাসকে (রা) লক্ষ্য করে বলেন: তোমার ভাতিজার সাম্রাজ্য বিশাল আকার ধারণ করেছে। আব্বাস (রা) বলেন: এটাই হলো নুবুওয়াত। আবু সুফইয়ান (রা) বলেন: হাঁ, তাই।[9]

ইয়ারমূক যুদ্ধটি হয় বিশাল রোমান বাহিনীর সাথে। এ যুদ্ধে কেবল মুসলিম বাহিনীকে বক্তৃতা-ভাষণের মাধ্যমে উত্তেজিত করণের মধ্যেই থেমে থাকেননি, এ যুদ্ধে তিনি একটি চোখ হারান। এর দ্বারা বোঝা যায়, তিনি সামনা-সামনি যুদ্ধও করেন। শত্রুর থেকে দূরে ছিলেন না।

হুনাইন ও তায়িফ অভিযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংগে অংশগ্রহণ করেন। হুনাইন যুদ্ধে পাওয়া গনীমতের সম্পদ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ১০০ (একশো)টি উট ও ৪০ (চল্লিশ) উকিয়া স্বর্ণ দান করেন। যেমন অন্য মুয়াল্লাফাতুল কুলূবকে দেন। তাঁর দু’ ছেলে মু’আবিয়া ও ইয়াযিদকেও দান করেন। তখন আবু সুফইয়ান (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বলেন:

والله إنك لكريم فداك أبي وأمي ، والله لقد حاربتك فلنغم المحارب کنت ، ولقد سالتك فنعم المسالم أنت ، جزاك الله خيرا.

‘আল্লাহর কসম! অবশ্যই আপনি একজন মহৎ ব্যক্তি। আমার মা-বাবা আপনার প্রতি নিবেদিত হোন! আল্লাহর কসম! আপনার সাথে আমি যুদ্ধ করেছি, আপনি কতনা সুন্দর যোদ্ধা ছিলেন। আপনার সাথে শান্তি চুক্তি করেছি, আপনি কত না চমকার শান্তিকামী মানুষ! আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন’।[10]

তায়িফ যুদ্ধে তার একটি চোখ তীরের আঘাতে বের হয়ে যায়। সা’ঈদ ইবন উবায়দ (রা) বলেন, আমি তায়িফের দিন আবু সুফইয়ানকে লক্ষ্য করে তীর ছুড়ি। সেটি তাঁর চোখে বিদ্ধ হয়। আহত অবস্থায় তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলেন, আমার এই চোখটি আল্লাহর রাস্তায় আহত হয়েছে। জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আপনি যদি চান, আমি দু’আ করবো, চোখটি ভালো হয়ে যাবে। আর যদি চান চোখ নয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে আপনাকে জান্নাত দান করুন! বললেন: আমি জান্নাত চাই।[11]

তিনি ইয়ারমূক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বক্তৃতা-ভাষণের মাধ্যমে মুসলিম সৈনিকদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করতেন।[12]

ইউনুস ইবন ‘উবায়দ (রা) বলেন: “উতবা ইবন রাবী’আ, তার ভাই শায়বা ইবন রাবী’আ, আবু জাহল ইবন হিশাম ও আবু সুফইয়ান- এ চার ব্যক্তির কোন মতামত জাহিলী যুগে একটুও অমান্য করা হতো না। তবে ইসলাম আসার পর তাদের মতামতের কোন গুরুত্ব ছিল না। শেষ জীবনে আবু সুফইয়ান অন্ধ হয়ে যান। তখন তাঁর একজন দাস তাঁকে নিয়ে বেড়াতো।[13]

তিনি ছিলেন ‘মুআল্লাফাতুল কুলূব-এর একজন। উল্লেখ্য যে, তাঁরা হলেন সেই শ্রেণীর মুসলিম যারা দেরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পদ-পদবী ও অর্থ-বিত্তের অভিলাষী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে ইসলামে অটল রাখার জন্য অন্যের তুলনায় কিছুটা সুযোগসুবিধা ও প্রাধান্য দান করেন। পরবর্তীতে আবূ সুফইয়ান (রা) একজন ভালো মুসলিম হন।

আবূ সুফইয়ানের (রা) জানাযার নামাযের ইমামতি করেন ‘উছমান ইবন আফফান (রা)। তবে অপর একটি বর্ণনায় আবূ সুফইয়ানের (রা) ছেলে মুআবিয়ার (রা) কথা বলা হয়েছে।[14]

একটি বর্ণনা মতে আবু সুফইয়ান (রা) ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নাজরানের শাসক নিয়োগ করেন। তবে ইবন হাজার (রহ) বলেন, বর্ণনাটি সঠিক নয়। আল-ওয়াকিদী বলেন, আমাদের সঙ্গী-সাথীরা এ বর্ণনাটির সত্যতা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের সময় আবু সুফইয়ান (রা) মক্কায় ছিলেন। আর তখন মক্কার ‘আমির তথা শাসক ছিলেন ‘আমর ইবন হাযম (রা)।[15]

আবূ সুফইয়ান (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁর ছেলে মু’আবিয়া, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, ও কায়স ইবন হাযিম (রা)।[16]

মৃত্যু

তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে মতপার্থক্য আছে। যেমন: হিজরী ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ সন। তাঁর জানাযার নামায পড়ান তাঁর ছেলে মু’আবিয়া (রা)। তবে আরেকটি মতে ‘উছমান (রা)-এর কথা বলা হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩, মতান্তরে ৯০ বছরের কিছু বেশি। তিনি ছিলেন মাঝারি গড়নের, মাথাটি ছিল বড় আকারের। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি ছিলেন চিকন ও বেঁটে আকৃতির।[17]

আবূ সুফইয়ানের (রা) স্ত্রী

হিন্দ বিনতু ‘উতবা ইবন রাবী’আ ছিলেন আবু সুফইয়ানের (রা) স্ত্রী। ইসলাম-পূর্ব ও ইসলাম-পরবর্তী যে সকল মহিলা বিশেষ খ্যাতির অধিকারিণী তিনি তাঁদের একজন। তাঁর বড় পরিচয় তিনি উমাইয়্যা খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা মু’আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ানের (রা) গৌরবান্বিত মা। কুরায়শ বংশের যুবক আল-ফাকিহ ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযুমীর সাথে হিন্দ-এর প্রথম বিয়ে হয়, কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। অত:পর আবু সুফইয়ানের (রা) সাথে তাঁর বিয়ে হয়। আবু সুফইয়ান (রা) তাঁর দ্বিতীয় স্বামী। ইবন সা’দ অবশ্য বলেছেন, হিন্দ-এর প্রথম স্বামী হাফস ইবন আল-মুগীরা ইবন আব্দুল্লাহ এবং তার ঔরসে হিন্দ-এর পুত্র আবান-এর জন্ম হয়।[18]

মক্কায় ইসলামের অভ্যুদয় হলো। পরবর্তী বিশ বছর পর্যন্ত তিনি ইসলামের আহ্বানের প্রতি মোটেও কর্ণপাত করেননি। বরং এ দীর্ঘ সময় তাঁর আল্লাহর রাসূল, ইসলাম ও মুসলিমদের মাত্রাছাড়া বিরুদ্ধাচারণ ও শত্রুতায় অতিবাহিত হয়েছে।

এ সময় তিনি মুসলিমদের সাথে চরম নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় হলে সবচেয়ে বেশি খুশি হন তিনি। কুরায়শ নারীদের সংগে নিয়ে নিহত মুসলিম সৈনিকদের লাশের উপর ঝাপিয়ে পড়েন এবং তাদের নাক, কান, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে চরমভাবে বিকৃতি সাধন করেন। সায়্যিদুশ শুহাদা হামযার (রা) বুক চিরে কলিজা বের করে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে থুথু করে ফেলে দেন। এ জন্য ইতিহাসে তিনি হামযার (রা) কলিজা চিবানো হিন্দ নামে পরিচিত। সে এমনই এক নিষ্ঠুর ও অমানবিক কাজ ছিল যার দায়ভার তার স্বামী কুরায়শ দলপতি আবু সুফইয়ানও নিতে অস্বীকার করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা বিজয়ের আগের দিন হিন্দ-এর স্বামী আবু সুফইয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন। একথা শোনার সাথে সাথে হিন্দ তাঁর মাথাটি সজোরে চেপে ধরে বলেন: তুমি তোমার সম্প্রদায়ের একজন নিকৃষ্ট নেতা। তারপর হিন্দ মক্কাবাসীদের প্রতি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং মুহাম্মাদকে (সা) হত্যা করতে আহ্বান জানান।[19]

তাই মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ছয়জন পুরুষ ও চারজন মহিলাকে ক্ষমার আওতার বাইরে রাখেন এবং তাদেরকে নাগালের মধ্যে পাওয়ামাত্র হত্যার নির্দেশ দেন তাদের মধ্যে হিন্দ-এর নামটিও ছিল।[20]

এই চরম ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় প্রবেশের পর আরো কিছু মহিলার সংগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইতিহাসে তিনি একজন আদর্শ মুসলিম নারী হিসেবে স্বীকৃত। তিনি হিজরী ১৪, খ্রি. ৬৩৫ সনে মৃত্যুবরণ করেন।[21]

আবু সুফইয়ানের (রা) সন্তানাদি

১. মুআবিয়া (রা)

ডাকনাম আবু আবদির রহমান। উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম খলীফা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নুবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ অথবা সাত, মতান্তরে তের বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম মতটি অধিক প্রসিদ্ধ।[22] তিনি ছিলেন দীর্ঘদেহী, দৃষ্টিনন্দন চেহারার অধিকারী গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। ভবিষ্যতে তিনি যে একজন বড় মাপের মানুষ হবেন শৈশব ও কৈশরেই তার পিতা-মাতা তা আঁচ করতে পারেন। একদিন তিনি যখন হামাগুড়ি গিয়ে চলছেন তখন পিতা আবু সুফইয়ান (রা) তার মা হিন্দকে বললেন: আমার এ ছেলে ভবিষ্যতে একজন বড় মাপের মানুষ হবে। সে অবশ্যই তার গোত্রের নেতৃত্ব দানের যোগ্য হবে। হিন্দ বললেন: শুধু তার গোত্রের? তার অকল্যাণ হোক। যদি না সে গোটা আরবের নেতৃত্ব দেয়।[23] আবান ইবন উছমান বলেন: শৈশবে একদিন মু’আবিয়া তাঁর মার সংগে হাঁটছিলেন। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়েন। মা তাঁর হাত ধরে তুলতে তুলতে বলেন: ‘আল্লাহ তোমাকে না উঠান। ওঠো। এক বেদুঈন ব্যাপারটি দেখছিল। সে মায়ের কথাটি শুনে বলেন: আপনি তাকে এমন কথা বললেন কেন? আল্লাহর কসম! আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে তার গোত্রের নেতৃত্ব দিবে। বললেন: আল্লাহ তাকে না উঠান-যদি সে তার জাতির নেতৃত্ব দেয়।[24] পরবর্তীতে তিনি মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেন। তিনি হন উমাইয়্যা খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম খলীফা।

২. ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান:

তাঁকে ‘ইয়াযীদ আল-খায়র’ কল্যাণময় ইয়াযীদ বলা হতো। আবু সুফইয়ানের (রা) সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন উত্তম। মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংগে হুনায়ন যুদ্ধে যোগদান করেন। হুনায়নের ‘গনীমতের মাল’ (যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ) থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে প্রচুর পরিমাণে দান করেন।

৩. উতবা ইবন আবী সুফইয়ান:

তাঁর কুনিয়াত বা ডাকনাম ছিল আবুল ওয়ালীদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করেন। উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) তাকে তায়িফের এবং মু’আবিয়া (রা) মিসরের ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি ছিলেন একজন প্রাঞ্জলভাষী বক্তা। বলা হয়ে থাকে, উমাইয়্যা খান্দানের মধ্যে তাঁর চাইতে বড় বক্তা আর কেউ জন্মগ্রহণ করেননি। হিজরী ৪৪, মতান্তরে ৪৩ সনে তিনি মিসরে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।[25]

৪. আনবাসা ইবন আবী সুফইয়ান:

তাঁর ডাকনাম ছিল আবু ‘উছমান। আবু উমামা বলেন, যখন তাঁর জীবনের অন্তিম সময় ঘনিয়ে আসে, তিনি ভীষণ অস্থির ও অধৈৰ্য্য হয়ে পড়েন। তাঁকে দেখতে আসা লোকেরা বললো: ‘ওহে আবূ ‘উছমান! আপনি এত অস্থির ও অধৈৰ্য্য হয়ে কাঁদছেন কেন? আপনি তো একজন ভালো মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করেছেন? ইনশাআল্লাহ আপনার পরিণাম ভালো হবে!’ একথা শুনে তাঁর অস্থিরতা ও কান্নাকাটির মাত্রা আরো বেড়ে যায়। এ অবস্থায় তিনি বলেন: সূচনাতে আমি যে ভয়াবহতা দেখছি তাতে আমি কেন কাঁদবো না, কেন অস্থির হবো না। একটু পরেই আমি কি দেখবো তা তো আমার জানা নেই। এমন কোন বড় কাজ আমি করিনি যার উপর আমি নির্ভর করতে পারি।[26]

৫. উম্মু হাবীবা বিনত আবী সুফইয়ান:

তাঁর আসল নাম রামলা এবং কুনিয়াত বা ডাকনাম উম্মু হাবীবা। এ ডাকনামেই তিনি ইতহাসে প্রসিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিয়ে করে বেগমের মর্যাদা দানের কারণে তিনি উম্মুল মু’মিনীন তথা বিশ্বের মুসলিমদের মা হওয়ার গৌরব লাভ করেন। উম্মু হাবীবার (রা) মা হলেন সাফিয়্যা বিনত আবিল ‘আস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নুবুওয়াত প্রাপ্তির সতেরো (১৭) বছর পূর্বে জন্ম গ্রহণ করেন। মুআবিয়া (রা) উম্মু হাবীবার (রা) বৈমাত্ৰীয় ভাই। তাঁর প্রথম স্বামী ছিল ‘উবায়দুল্লাহ ইবন জাহাশ। ইসলামের সূচনা পর্বেই তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই ইসলাম গ্রহণ করেন। সেখানে অবস্থান কালে তাদের মেয়ে হাবীবা’র জন্ম এবং তার নামেই রামলার কুনিয়াত হয় উম্মু হাবীবা-হাবীবার মা। এরপর ‘উবায়দুল্লাহ ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু উম্মু হাবীবা (রা) ইসলামের উপর অটল থাকেন। পরে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। প্রবাস জীবনে উম্মু হাবীবা (রা) তার কন্যাসন্তানকে নিয়ে দারুন সংকটের মুখোমুখী হন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেগমের মর্যাদা লাভ করে উম্মুল মু’মিনীন-এর ম’ত সুউচ্চ সম্মান ও গৌরবের অধিকারিনী হন। হিজরী ৪০ সনে মুয়াবিয়ার খিলাফতকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[27]

৬. উম্মু হাকাম বিনত আবী সুফইয়ান:

ইতিহাসে ‘আবদুর রহমান ইবন উম্মুল হাকাম নামে পরিচিত যে ব্যক্তি তার সেই মা হলেন এই উম্মুল হাকাম। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। যখন এ আয়াত নাযিল হয়:[28]

وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ

তোমরা কাফিরদের সম্পর্ক আঁকড়ে ধরে থেক না।’

তখন ‘আয়্যাদ ইবন গানাম আল-ফিহীর সাথে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল। এ আয়াত নাযিলের পর আয়্যাদ তাকে ছেড়ে দেন। তারপর ‘আব্দুল্লাহ ইবন উছমান আছ-ছাকাফীর সাথে তার বিয়ে হয়।[29]

৭. ইযযাহ্ বিনত আবী সুফইয়ান:

দুধপান বিষয়ক উম্মু হাবীবা (রা) বর্ণিত হাদীসে ইবন শিহাব তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন। উম্মু হাবীবা (রা) একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কি আমার বোনের ব্যাপারে আগ্রহ আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আমি তাকে দিয়ে কী করবো? উম্মু হাবীবা বললেন: আপনি তাকে বিয়ে করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তুমি কি তা পছন্দ করবে? উম্মু হাবীবা (রা) বললেন: হাঁ, করবো। আমি একান্তভাবে আপনাকে সময় দিতে পারিনে। আমি চাই আমার সর্বোত্তম বোনটি আমার এ কাজের অংশীদার হোক। জবাবে রাসূল (সা) তাকে বলেন: এ কাজ তার জন্য হালাল (বৈধ নয়। কারণ, ইসলামে দুই বোনকে একসাথে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা জায়েয নেই)। হিজরী ৪৪ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[30]

৮. উমায়মা বিনত আবী সুফইয়ান:

তিনি আবু সুফইয়ান ইবন হুয়ায়তাব ইবন আবদুল উযযাও জুয়ায়বিয়া-এর মা। সুতরাং হুয়ায়তাব ইবন আবদিল উযযা তাঁর স্বামী ছিলেন। একথা ইবন কুদামা আত-তাবঈন ফী আনসাব আল-কুরাশিয়্যীন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[31]

তথ্যসূত্র :

[1] আল-ইসাবা ফী তাময়ী আস-সাহাবা-৪/৯১

[2] প্রাগুক্ত-২/১৭৮-১৭৯; উসুদুল গাবা ফী মা’রিফাতিস সাহাবা-৫/১৪৯

[3] প্রাগুক্ত

[4] প্রাগুক্ত

[5] সাহীহ আল-বুখারী, হাদীছ নং ৪২৮০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-১১/৩৯৮

[6] ইবনু হিশাম: আস-সীরাতু-৪/১৯৫; আল-ইসাবা-২/১৭৯; ড. আস-সালাবী: মুআবিয়া ইবনু আবী সুফইয়ান-২৪

[7] ইবনু কাছীর: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-১১/৩৯৭; ড. সাল্লাবী: মু’আবিয়া (রা)-২৫

[8] ড. সাল্লাবী-২৫; উসুদুল গাবা-৫/১৫০।

[9] উসুদুল গাবা-৫/১৫০

[10] প্রাগুক্ত-২/৪০৭

[11] আল-ইসাবা-২/১৭৯

[12] উসুদুল গাবা-২/৪০৭

[13] প্রাগুক্ত

[14] প্রাগুক্ত

[15] আল-ইসাবা-২/১৭৮-১৭৯

[16] প্রাগুক্ত

[17] উসুদুল গাবা-২/৪০৭; ড. সাল্লাবী-২৫

[18] ইবনু সা’দ: আত-তাবাকাত-৮/২৩৫; আসহাবে রাসূলের জীবন কথা-৬/২৬৬

[19] আল’লামূ আন-নিসা’-৫/২২৫; আসহাবে রাসূলের জীবনকথা-৬/২৭৪

[20] আনসাবুল আশরাফ-১/৩৫৭; নিসা’মিন ‘আসরিন নুবুওয়াহ-৪৮৬

[21] আসহাবে রাসূলের জীবনকথা-৬/২৬২-২৮০

[22] আল-ইসাবা-৬/১৫১; ড. সাল্লাবী-২০২।

[23] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-১১/৩৯৮

[24] সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা’-৩/১২১

[25] আত-তাবয়ীন ফী আনসাব আল-কুবাশিয়্যীন-২০৮; ড. সালাবী-৩২

[26] প্রাগুক্ত

[27] সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা’-২/২২৩; আসহাবে রাসূলের জীবনকথা-৫/২৭৮

[28] সুরাতুল মুমতাহানা-১০

[29] ড. সাল্লাবী-৩৪

[30] সাহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ১৪৪৯; সিয়ার আলাম আন-নুবালা’-২/২২২

[31] আত-তাবঈন ফী আনসাব আল-কুরাশিয়্যীন-২০৯; ড. সাল্লাবী-৩৪

সংকলনে: ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ

তথ্যসূত্র : পুরনো মাসিক পৃথিবী

মতামত দিন