জীবনী

আবু ‘আকীল আল-মুলায়লী (রা)-এর জীবনী

রচনায়: ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ

অনেক সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁর নাম আবু ‘আকীল আল-জাদী’ বলেছেন। তাঁর পরিচয় ও জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তবে সীরাতের গ্রন্থসমূহে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যার মাধ্যমে জানা যায় যে, তিনি একজন সাহাবী ছিলেন।[1] আমরা সেই ঘটনাটিই এখানে উল্লেখ করছি। কেউ বলেছেন, তার আসল নাম লাহিক ইবন মালিক।[2]

মিসওয়ার ইবন মাখরামা বলেনঃ আমরা একবার খলীফা উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলাম। পথে ‘আল-আবওয়া নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করলাম। হঠাৎ আমরা রাস্তার মধ্যে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তির মুখামুখি হলাম। তিনি আমাদেরকে লক্ষ করে বললেনঃ ওহে কাফেলার লােকেরা! আপনারা একটু থামুন। “উমার (রা) বললেনঃ ওহে শায়খ, আপনি আপনার কথা বলুন। বৃদ্ধ প্রশ্ন করলেন। তােমাদের মধ্যে কি রাসূলুল্লাহ (সা.) আছেন? ‘উমার (রা) তাঁর পাশে বিদ্যমান লােকদের। বললেনঃ তােমরা সবাই চুপ থাক, কেউ কথা বলবে না।

তারপর ‘উমার (রা) বৃদ্ধকে প্রশ্ন করলেনঃ আপনার বুদ্ধি-জ্ঞান ঠিক আছে তাে? বললেনঃ আমার বুদ্ধিই তাে আমাকে নিয়ে এসেছে। এবার ‘উমার (রা) তাঁকে বললেনঃ নাবী (সা.) তাে অনেক আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। বৃদ্ধ বললেনঃ তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন? ‘উমার। বললেনঃ হাঁ।

মিসওয়ার ইবন মাখরামা বলেনঃ এবার বৃদ্ধ এমনভাবে কাঁদতে শুরু করলেন যে, আমরা ধারণা করলাম এখনই তার বুকের দু’পাশ ফেঁটে তাঁর প্রাণটি বেরিয়ে যাবে। এরপর তিনি কিছুটা স্থির হয়ে প্রশ্ন করলেনঃ আপনি কি তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন?

উমার (রা) বললেনঃ আবু বাকর হয়েছেন।

বৃদ্ধ বললেনঃ বানূ তামীমের সেই হালকা-পাতলা লােকটি?

উমার (রা) বললেনঃ হ্যাঁ।

বৃদ্ধ বললেনঃ তিনি কি তােমাদের মধ্যে আছেন?

‘উমার (রা) বললেনঃ না।

বৃদ্ধ বললেনঃ তিনি কি মারা গেছেন?

উমার (রা) বললেনঃ হ্যাঁ। অতঃপর বৃদ্ধ এমনভাবে কাঁদলেন যে, তাঁর বুকের ভিতর থেকে উঠে আসা কান্নার শব্দ আমরা শুনতে পেলাম। তিনি একটু শান্ত হয়ে প্রশ্ন করলেনঃ তার পরবর্তী দায়িত্বশীল কে হয়েছেন?

‘উমার (রা) বললেনঃ ‘উমার ইবন আল-খাত্তাব।

বৃদ্ধ বললেনঃ বানু উমাইয়্যার সেই ফর্সা লােকটির (উছমান) ব্যাপারে তারা কি করলাে? তিনি তাে খুব নরম দিলের মানুষ।

‘উমার (রা) বললেন : হাঁ, তিনি তেমনই।

বৃদ্ধ জানতে চাইলেনঃ তােমাদের মধ্যে ‘উমার আছেন?

‘উমার বললেন : হাঁ, তিনিই এতক্ষণ আপনার সাথে কথা বলছেন।

বৃদ্ধ বললেনঃ তাহলে আমাকে সাহায্য করুন। আমি কোন সাহায্যকারী পাচ্ছি না।

এবার ‘উমার (রা) জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কে? আপনি কি কোন বিপদে পড়েছেন? এবার বৃদ্ধ নিজের পরিচয় দিলেন এভাবে : আমি বানূ মুলায়ল গােত্রের, আবু ‘আকীল’ আমার নাম। বানূ জা’য়াল গােত্রের উঁচু টিলার কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে আমার দেখা হয় তিনি আমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। আমি সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঈমান আনি। তিনি আমাকে ছাতুর শরবত পান করান। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথমে এবং আমি শেষে পান করি। আমি ক্ষুধার্থ বা তৃষ্ণার্ত হলে এখনাে সেই তৃপ্তি এবং তীব্র গরমে সেই ঠান্ডা অনুভব করি। তারপর আমি ঐ সাদা প্রান্তরের মাথায় আমার ছাগল পালের নিকট চলে যাই। সেখানে বসবাস করতে থাকি। প্রতিদিন সালাত আদায় করি। রামাদান মাসে সাওম পালন করি। এ বছর আমরা খুব বিপদে পড়েছি। সেই ছাগল পালের মধ্যে একটিমাত্র বকরি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমরা সেই বকরিটির দুধের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। গত পরশু দিন একটি নেকড়ে সেটির ওপর আক্রমণ চালায় এবং তার কিছু কাটাছেড়া অংশ পাই। এখন আমরা খুব অসহায়। আপনি আমাদেরকে সাহায্য করুন, মহান আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন।

উমার (রা) বললেনঃ আপনি বিপদে পড়েছেন, আমাকে একটু পানির কাছে নিয়ে চলুন।

মিসওয়ার বললেনঃ আমরা সেই গন্তব্যস্থলে গেলাম। আমি যেন এখনাে দেখতে পাচ্ছি, “উমার (রা) বিষন্নচিত্তে উটের লাগাম ধরে দু’হাঁটু উঁচু করে নিতম্বে ভরদিয়ে উঠের পিঠে বসে আছেন। কিছুই আহার করছেন না। সেই বৃদ্ধ ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রতীক্ষায় আছেন। লােকেরা একটু দূরে সরে গেলে তিনি পানির মালিককে ডেকে বৃদ্ধের পরিচয় দিয়ে তাঁকে বললেনঃ তিনি এখানে এলে তাঁর পরিবার সহ সকলের খাদ্য-খাবারের ব্যবস্থা করবে এবং আমরা ফিরে না আসা পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখবে।

মিসওয়ার বললেন, আমরা হাজ্জ আদায় করে উল্লেখিত স্থানে আবার ফিরে আসলাম। “উমার (রা) পানির মালিককে ডেকে বৃদ্ধের কথা জিজ্ঞেস করলেন।

সে বললোঃ তিনি জ্বর অবস্থায় আমার এখানে আসেন। আমার কাছে তিনদিন অসুস্থ অবস্থায় থাকার পর মারা যান। আমি তাকে দাফন করেছি। এই যে এখানে তাঁর কবর। মিসওয়ার বললেন, আমি যেন এখনাে দেখতে পাচ্ছি, ‘উমার (রা) লাফ দিয়ে কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর সালাত আদায় করলেন। তারপর কাঁদতে থাকেন। অতঃপর তিনি আবু ‘আকীলের (রা) পরিবারের সদস্যদের সংগে নিয়ে মাদীনায় ফিরে যান। তিনি তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাদের ভরণ-পােষণের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন।[3]

আবু ‘আকীল (রা) থেকে এ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুলাহ (সা.) কে বলতে শুনেছিঃ “তােমরা আমার প্রতি মিথ্যা আরােপ করবে না। কারণ, যে আমার প্রতি মিথ্যা আরােপ। করবে সে জাহান্নামে যাবে।[4]

তথ্যসূত্রঃ

[1] উসুদুল গাবা-৫/২২২

[2] আল-ইসাবা-৩/৩২৪

[3] উসুদুল গাবা-৫/২২২-২২৪

[4] আল-ইসাবা-৩৩২৪

লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে পুরনো পৃথিবী পত্রিকা থেকে।

মতামত দিন