ইসলামিক বই ডাউনলোড হাদীস

বই রিভিউ : হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণঃ প্রকৃতি ও পদ্ধতি

[রিভিউ লেখক : Shahadat Hossain ]

বইঃ- হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণ- প্রকৃতি ও পদ্ধতি

লেখকঃ- ড. মোহাম্মদ বেলাল হোসে

প্রকাশকঃ- বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার (গবেষণা বিভাগ)

ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় আল-কুরআনের পর দ্বিতীয় মূল উৎস হাদীস। কুরআন বিশ্বমানবতার জন্য যে বিধি-বিধান উপস্থাপন করেছে, হাদীস উক্ত বিধানবলীর ব্যাখা বিশ্লেষণ পেশ করেছে। তাই উৎস দুটি একটি অপরটির পরিপূরক। হিজরী তৃতীয় শতকে সিহাহ সিত্তার ইমামগণ হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং কঠোর শর্তারোপ ও অধিক সতকর্তার সাথে হাদীস গ্রন্থাবদ্ধ করে ইসলামী শরীআ’তে এ বিশ্বস্ততা ও প্রামাণিকতা সুনিশ্চিত করেন। নবী যুগ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি এ বিদ্যার লালন, চর্চা ও বিকাশে একদল মুহাদ্দিস আমরণ কঠোর সাধনা করে গেছেন।

বাংলা ভাষীদের নিকট মুহাদ্দিসগণের ত্যাগ ও সাধনা তুলে ধরার জন্য বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি স্টাডি সেশনের আয়োজন করে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ঐতিহ্যবাদী দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিদগ্ধ পন্ডিত ও হাদীস বিশারদগণ পরিবেশিত প্রবন্ধ হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে মুহাদ্দিসগণের সাধনা- এর বিভিন্ন দিক আলোচনা ও পর্যালোচনা করেন এবং উপস্থাপিত এ নিবন্ধের মানোন্নয়নে তারা সুচিন্তিত পরামর্শ দেন। তাদের সেই মূল্যবান পরামর্শের আলোকে এটি সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। গবেষণালব্ধ তথ্য এবং তথ্যের ধারাবাহিকতা বেশ ভালো লেগেছে। আল্লাহ তাআলা তাদের সকলে জাযায় খায়ের দান করুক। হাদিস সংকলনের পদ্ধতি ও ইতিহাস জানতে আগ্রহী প্রত্যেকেকে বইটি পড়ার পরামর্শ দিচ্ছি।

বইটিতে প্রথমে হাদিসের পরিচয় নিয়ে আলোচনা এসেছে, যার মধ্যে রয়েছে হাদীসের সংজ্ঞা, ওহী ও হাদীস, কুরআন ও হাদীসের মধ্য পার্থক্য, হাদীসের গুরুত্ব ও প্রামাণিকতা, হাদীস সংরক্ষণ, হাদীস সংগ্রহ ও ভ্রমণ এবং হাদীস সংকলন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসেছে হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে অনুসৃত নীতিমালার বিস্তারিত আলোচনা। তৃতীয় অধ্যায়ে হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে নির্বাচিত কয়েকজন খ্যাতনামা মুহাদ্দিসের শিক্ষা ও হাদীস চর্চা এবং হাদীস গ্রহণের শর্তাবলী আলোচনায় এসেছে। চতুর্থ অধ্যায়ে হাদীস সম্পর্কে প্রাচ্যবিদ ও কতিপয় আধুনিক লেখকের ভ্রান্ত ধারনার কিছু যুক্তি তুলে ধরে হয়েছে।

হাদীসের পরিচয়ঃ-

হাদীস শব্দটি আরবী অভিধানে حدث অথবা حدوث শব্দ থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে। তারপর লেখক আভিধানিক অর্থ এবং বিভিন্ন মুহাদ্দিসগণের মতে পারিভাষিক অর্থ তুলে ধরেন। ইবনে হাজার আসকালানী(রহ.) এর মতে—

“শরীআতের পরিভাষায় শুধুমাত্র নবী করীমের(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দিকে যা সম্বন্ধ করা হয়, তা-ই হাদীস। “

তারপর প্রসঙ্গ হচ্ছে ওহী ও হাদীস। আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী ও রাসূলগণের প্রতি যে বার্তা প্রেরিত হয় তাকে ওহী বলে। অহী দুই প্রকারঃ- প্রকাশ্য ওহী ও অপ্রকাশ্য ওহী। তারপরের কুরআন ও হাদীসের মধ্যে কিছু পার্থক্য তুলে ধরা হয়। এরপর হাদীসের গুরুত্ব ও প্রামাণিকতা নিয়ে আলোচনা এসেছে। হাদিস যে কুরআন সমর্থিত, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। আল-কুরআনে কোন বিষয় সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ণিত হয়েছে; কিন্তু হাদীসে উক্ত বিষয়ের বিবরণ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। হাদীস গ্রন্থরাজী অধ্যায়ন করলে দেখা যায় যে, আল-কুরআনে অসংখ্য আয়াতের ব্যাখা মহানবী(সা.) হাদীস দ্বারা উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে হাদীস যে আল-কুরআনের ভাষ্যকার, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহকে ভালোবাসার অনিবার্য দাবি হলো, তাঁর রাসূলের(সা.) অনুসরণ করা। রাসুল(সা.) কে অনুসরণ না করলে আল্লাহর ভালোবসা এবং তাঁর নিকট থেকে গুনাহ মার্জনা লাভ করা সম্ভব নয়।

এরপর হাদীস সংরক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্বয়ং রাসূল (সা.) তাঁর বাণী সংরক্ষণের জন্য সাহাবীগণকে উৎসাহিত করতেন। লেখনীর মাধ্যমেও যখন হাদীস সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন আল-কুরআনের সাথে তা মিশ্রণের আশংকা দেখা দেয়। তার পরবর্তী কিছুকাল যাবত লেখনী কার্যক্রম বন্ধ থাকে। যখন আশংকার সমাপ্তি ঘটে, তখন আবার লিখনী কার্য্ক্রম শুরু হয়। তাছাড়া মুসলমানদের সাথে বিভিন্ন চুক্তিপত্র এবং রাসূলুল্লাহর(সাঃ) কাছ থেকে বাদশাহদের নিকট যে ফরমানপত্র গুলো পাঠানো হত, সেগুলোও ইতিহাসে সংরক্ষিত অবস্থায় আছে। তারপর লেখক কিছু লিখিত পত্রের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। অনেকেরই ধারণা হাদীস লিখন নবীযুগে শুরু হয়নি, হয়েছে নব্বই বছর পর। এই ভুল ধারণাটি লেখক দূর করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।

হাদীস সংগ্রহ ও ভ্রমণঃ– এখানে আলোচনা হয়েছে হাদীস সংগ্রহের জন্য সাহাবী ও তাবেঈরা কেমন ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। সাহাবীগণ মহানবী(সাল্লাল্ললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইন্তিকালের পর সুন্নাহ শিক্ষা দেয়া ও শিক্ষা গ্রহণ করার উদ্দেশ্য মুসলিম জাহানের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। অনুরুপভাবে তাবেঈগণও হাদীস সংগ্রহের জন্য দেশ-দেশান্তরে বিক্ষিপ্তভাবে ছরিয়ে পরেন। এরপর এসেছে হাদীস সংকলনের আলোচনা, বিশাল ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অধিকাংশ সাহাবী ও তাবীঈ বিদায় নিচ্ছিলেন পৃথিবী থেকে, স্মৃতিশক্তির প্রখরতাও তাদের মত কারও ছিল না, অপরদিকে বিভিন্ন দল-উপদল জাল হাদীস বানাতে শুরু করে। তখনই উমার ইবন আব্দিল আযীয খিলাফতে অধিষ্ঠিত হলে তিনি সর্বপ্রথম হাদীস সংগ্রহ ও সংরক্ষের প্রক্রিয়া শুরু করেন। তার শাসনামলে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, ইমাম আয যুহরীর যার সংগ্রহীত হাদীসের সংখ্যা কয়েকটি উটের বোঝার সমপরিমাণ ছিল।

হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে অনুসৃত নীতিমালাঃ-

মহানবীর(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইন্তিকালের পর সাহাবীগণ পরস্পরকে সন্দেহ করতেন না। তাবীঈগণ সাহাবীগণ থেকে যে কোন বর্ণিত হাদীস নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতেন। কুখ্যাত ইয়াহুদী আব্দুল্লাহ ইবন সাবা আবির্ভূত হয়ে মুসলিমদের মধ্যে জাল হাদীস তৈরীর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাছাড়া মুসলিম সমাজ বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হওয়ার পরে প্রত্যেকেই তাদের দলীয় মতাদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে আল-কুরআনের অপব্যাখা দিতে থাকে এবং জাল হাদীস রচনার আশ্রয় নেয়। যুগ পরিক্রমায় এই ফিতনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে সাহাবী ও তাবীঈগণের মধ্যে বিজ্ঞ আলিমগণ হাদীস বর্ণনায় পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে সত্যাসত্য যাচাই শুরু করতে লাগলেন। এ সময় থেকে মুহাদ্দিসগণ সনদ ছাড়ে হাদীস গ্রহণ করতেন না। তখন থেকেই হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা সনদের উপরই নির্ভরশীল হয়ে পরে।

হাদীস সংকলনে যে সমস্ত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়, তা দুভাগে বিভক্ত। এক.রিওয়াত পদ্ধতি। দুই. দিরায়াত পদ্ধতি। তারপর লেখক এই দুই পদ্ধতির বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মহানবীর(সা) বাণী বর্ণনা, সংরক্ষণ এবং লিখে রাখার পদ্ধতি সম্বলিত জ্ঞানকে রিওয়াত বলা হয়। রিওয়ায়াত পদ্ধতির মাধ্যমে হাদীস বর্ণনারীতি ও হাদীসের মূল ভাষ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করা হয়ে থাকে। দিরায়াত শব্দের অর্থ হলো পৃথক করা, অনুসন্ধান করা। সর্বোপরি হাদীসের সনদের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নিরুপক প্রক্রিয়াকে দিরায়াত বলা হয়। এ পদ্ধতিতে হাদীস বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা, বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, স্মৃতিশক্তি, পান্ডিত্য, চরিত্র, সার্বিক আচার-আচরণ প্রভৃতি যাচাই করা হয়। দিরায়াতের বর্ণনার দিতে গিয়ে লেখক হাদীস বর্ণনাকারী ও সনদ সহীহ হওয়ার শর্তাবলী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।

তারপর হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবন চরিত রচনা অর্থাৎ ইলমু রিজালিল হাদীসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। লেখক এ শাস্ত্রের কালক্রমিক বিকাশধারা সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা তুলে ধরেন। তারপর এসেছে রিজাল বিষয়ক রচনাবলী নিয়ে আলোচনা। রিজাল বিষয়ক রচনাবলী সত্যিই অবাক হওয়ার মত। এ বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তারপর হাদীসের মূলনীতি অভিজ্ঞান এবং এ সম্পর্কে রচনাবলী নিয়ে আলোচনা এসেছে। তারপর হাদীসের সমালোচনা বিজ্ঞান, এটি এমন এক নিয়ম পদ্ধতির নাম, যার মাধ্যমে হাদীস বর্ণনাকারীর মধ্যে অন্তনির্হিত গুণাগুণ ও দোষ-ত্রুটি বিশেষ পরিভাষায় বর্ণনা করা হয়। এ বিষয়েও অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখিত কিছু গ্রন্থাবলী সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। তারপরের বিষয়বস্তু হচ্ছে জাল হাদীসের প্রতিরোধ। এর মধ্যে লেখক প্রথমে জাল হাদীসের পরিচয় তুলে ধরেন,কিভাবে তার উদ্ভব হয়, জাল হাদীসের প্রতিরোধে মুহাদ্দিসগণ কি কি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তার বিস্তারিত আলোচনা। জাল হাদীস নিয়েও অনেক গবেষণা হয়েছে যার ফলে এ বিষয় নিয়ে প্রায় তিনশর ঊর্ধ্বে প্রামাণিক গ্রন্থ রচিত হয়। তারপর ইলমু ইলালিল হাদীস, এটি এমন কিছু নীতিমালার সমষ্টি, যার মাধ্যমে হাদীসের ত্রুটি বিচ্যুতি ধরা পরে। এটি উলূমুল হাদীসের একটি সূক্ষ্ম জ্ঞানের নাম। বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন হওয়ার কারণে এ সম্পর্কিত কম গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বিষয়টি প্রত্যেকেরই জানা উচিত বলে মনে করি। পরিশেষে মুহাদ্দিসগণ কর্তৃক হাদীসের বিভাজন এবং সহীহ হাদীসের সংখ্যা নিয়ে পর্যালোচনা মূলক কথা এসেছে।

হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে নির্বাচিত, কয়েকজন খ্যাতনামা মুহাদ্দিসঃ-

মহানবীর(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহর সংরক্ষণে সাহাবী, তাবিঈ ও ততপরবর্তী মুহাদ্দিসগণ আমরণ সাধনা করে গিয়েছেন। মাত্র একটি হাদীসের সন্ধানে তাঁরা মরুভূমির বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে বেরিয়েছেন গ্রাম থকে গ্রামান্তরে, শহর থেকে শহরান্তরে, এক্ষেত্রে পথের দূরত্বকে তার তুচ্ছ মনে করেছেন। এত কষ্ট করার পর যখন হাদীস শ্রবণ করেছেন তখন এত আনন্দে আপ্লুত হয়েছেন যে, পূর্বের অবর্ণনীয় সকল কষ্ট ভুলে গেছেন। এ অধ্যায়ে নির্বাচিত কয়েকজন খ্যাতনামা মুহাদ্দিসের অবাদন সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপিত হয়েছে। সবার প্রথমে ইমাম যুহরী নিয়ে আলোচনা এসেছে। তিনি ছিলেন একাধারে হাদীসের হাফিয, আবিদ ও যাহিদ। । তারপরের নামটি হচ্ছে আল-ইমামুল আযম, প্রকৃত নাম নুমান, উপনাম আবু হানীফাহ। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী। তিনি প্রথমে ইলমুল কালাম চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন এবং অতি অল্প সময়ে এ শাস্ত্রে ব্যুতপত্তি লাভ করেন। তিনি এ বিষয়ে এত গভীরতা ও পারদর্শিতা লাভ করেন যে, লোকেরা তাঁর দিকে ইশারা করে বলত, ইনি ইলমুল কালামের শ্রেষ্ঠ ইমাম। পরববর্তীতে ইমাম হাম্মাদের নিকট ইলমুল হাদীস ও ইলমুল ফিকহ শিক্ষা লাভ করেন। তারপর এসেছে হাদীস সংকলনের ক্ষেত্রে মুসলিম মিল্লাতের পথিকৃত ইমাম মালিক(রহ.) এর আলোচনা। আল-মুয়াত্তা গ্রন্থের সম্বন্ধে ইমাম শাফিঈ বলেন,

“পৃথিবীতে আল্লাহর কিতাবের পর ইমাম মালিকের(রহ.) গ্রন্থের চেয়ে আর অধিক বিশুদ্ধ কোন গ্রন্থ নেই। “

তারপর এসেছে আল-মুসনাদ গ্রন্থের সংকলক ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ.) এর আলোচনা। এ পৃথিবীতে যে সমস্ত পন্ডিত ও মুহাদ্দিসের অক্লান্ত পরিশ্রমের বদৌলতে মহানবী(সা.) এর হাদীস লালন ও চরম উৎকর্ষে সাধিত হয়েছে ইমাম বুখারী(রহ.) ছিলেন তাদের শীর্ষস্থানীয়। তারপর যাদের আলোচনা এসেছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, ইমাম মুসলিম(রহ.), ইমাম নাসাঈ, ইমাম আবূ দাউদ(রহ.), ইমাম তিরমিযী(রহ.), ইমাম ইবনু মাজাহ(রহ.), ইমাম আল হাকেশ নায়শাপুরী(রহ.), ইমাম আদ্ দারাকুতনী(রহ.), ইমাম আল বায়হাকী(রহ.), ইমাম আত্ তাবারানী(রহ.) এবং ইমাম নাসিরুদ্দীন আল আলবানী(রহ.)।

হাদীস সম্পর্কে প্রাচ্যবিদ ও কতিপয় আধুনিক লেখকের ভ্রান্ত ধারণা ও তার অপনোদনঃ-

এ অধ্যায়টিতে হাদীসের বিরুদ্ধে প্রাচ্যবিদদের ভয়ঙ্গর সরুপ প্রকাশ পেয়েছে এবং তাদের অমূলক কথা-বার্তার যুক্তিযক্ত জবাব দেওয়া হয়েছে। তাদের গবেষণায় শুধু ধোঁকাবাজি আর মিথ্যার প্রচলন ছাড়া আর কিছুই ছিল না।সুন্নাহ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদরা মুসলিমদের মধ্যে সন্দেহের এক ধূম্রজাল বিস্তার করে রেখেছে। কতিপয় মুসলিম লেখকও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। প্রাচ্যবিদদের মধ্যে এ কাজে সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী ও উল্লেখযোগ্য ব্যাক্তিত্ব হলেন, হাঙ্গেরীর ইহুদী পন্ডিত গোল্ড যিহার। তারপর লেখক তার কিছু বিভ্রান্তির কথা তুলে ধরেন। তারপর এসেছে প্রাচ্যবিদ লিওন বুরসিয়ার আলোচনা। তিনি বলেন, হাদীস সংগ্রহের ভ্রমণাভিযান ছিল দুনিয়াবী স্বার্থসিদ্ধি ও ততকালীন উমাইয়া শাসন বিস্তারের এক গোপন ফাঁদ। লেখক লিও বুরুসিয়ার বক্তব্যের কিছু জবাব তুলে ধরেছেন। তারপর এসেছে প্রাচ্যবিদ ড. আহমাদ আমীনের বক্তব্য ও তার জবাব, মুসলিম লেখক হিসেবে তার বক্তব্য মারাত্মক ও বিপজ্জনক। তিনি বিভিন্ন অপবাদ দিয়েছেন, লেখক এগুলো উল্লেখ করে তার বক্তব্যের যুক্তিযক্ত জবাব তুলে ধরেছেন। পরিশেষে এসেছে প্রাচ্যবিদ অধ্যাপক আবূ রাইয়াহর বক্তব্য ও তাঁর জবাব। এই অধ্যায়টি পড়ে বুঝতে পারলাম, প্রাচ্যবিদরা মুসলিম উম্মাহকে কতটুকু ক্ষতি করতে চেয়েছিল, তার ঠিক গোড়াটাই উঠিয়ে ফেলতে চেয়েছিল।

মুহাদ্দিসগণ হাদীস সংগ্রহ যাচাই বাছাই ও সংকলনে যে শ্রম ব্যয় করেছেন তা আজও বিশ্বের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করছে। পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নেই যে, যেখানে ধর্ম প্রবর্তকের বাণী বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণের জন্য স্বতন্ত্র অভিজ্ঞানের জন্ম দেয়া হয়েছে; কিন্তু ইসলামের প্রিয় নবীর(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাণী সংরক্ষণ, সংকলন ও বিশুদ্ধতা নিরুপক অনেক অভিজ্ঞানের গোড়াপত্তন হয়েছে। এটি সত্যই মুসলমানদের বিরল কৃতিত্বের পরিচায়ক। প্রাচ্যবিদগণের মধ্যে কেউ কেউ হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে সংশয় পোষণ করলেও হাদীস বর্ণনাকারীগণের জীবনচরিত সম্পর্কিত একটি নতুন শাস্ত্রের গোড়াপত্তন করা মুসলিমদের একক কৃতিত্বের স্বাক্ষর হিসেব স্বীকৃতি দিতে তারা বাধ্য হয়েছে।

আমরা কখনও হাদীসের উল্টা পিঠ টা দেখি নি, দেখতে চাই ও নি। যারা দেখতে চেয়েছেন, তারা বুঝতে পেরেছেন জ্ঞানের সমুদ্র কত গভীর। হাদীস সংকলন সম্পর্কিত এর আগে কোন বই পড়ার সৌভাগ্য হয় নি। সত্যিই অবাক হতে হয়, এতগুলো ধাপ পের হয়ে এখনও এই হাদীসগুলো জীবন্ত রয়েছে। সাহাবী, তাবিঈ, তাবে তাবীঈ, মুহাদ্দিসগণ যে কঠোর পরিশ্রম করেছেন, এক একটি হাদিস সংগ্রহ, সংরক্ষণের জন্য, এর প্রতিদান তো একমাত্র আল্লাহ ই দিতে পারেন। আর অপরদিকে প্রাচ্যবিদরা চেয়েছে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে দিতে। তাদের প্রতিদান ও তারা পেয়ে যাবেন। সবচেয়ে ভাল লেগেছে হাদিস সংগ্রহের মূলনীতি অধ্যায়টি। কতভাবেই না মুহাদ্দিসগণ এক একটি হাদীস যাচাই বাছাই করেছেন। আর তাদের ঘাম ঝরানো ইতিহাস দেখলে যে কেউ অতিমুগ্ধ হবে। চলুন, আপনারাও জেনে আসুন, হাদীস সংকলনের সেই ইতিহাস। বক্ষ্যমান গ্রন্থটি ক্ষুদ্র পরিসরের হলেও অনেক গবেষণা সমৃদ্ধ মনে হয়েছে। হাদীস সংকলনের ইতিহাস, হাদীস সংগ্রহের মূলনীতি জানাটা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করি। এগুলো না জানলে, হাদীসের মূল মর্মার্থ অনেকেই উপলব্ধি করতে পারবে না। শুধু এই বইটি ই নয়, হাদীস সংকলনের ইতিহাস নিয়ে আরও অনেক বই পরার পরামর্শ দিব। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই বইটি শুরু করতে পারেন ইনশাআল্লাহ।

বইটি ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

ওয়েব সার্ভার                গুগল ড্রাইভ

লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে এখান থেকে

মতামত দিন