জীবনী নারী

ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়ার অতুলনীয় ঈমান

বিসমিল্লাহ। আলহা’মদুলিল্লাহ। ওয়াস-স্বলাতু ওয়াস সালামু আ’লা রসুলিল্লাহ। আম্মা বাআ’দ।

মহান আল্লাহর বাণীঃ

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ ءَامَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِى عِندَكَ بَيْتًا فِى الْجَنَّةِ وَنَجِّنِى مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِۦ وَنَجِّنِى مِنَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِين

অর্থঃ আর যারা ঈমান আনে তাদের জন্য আল্লাহ ফিরআ’উনের স্ত্রীর উদাহরণ পেশ করেন, যখন সে বলেছিল, “হে আমার রব্ব! আপনার নিকটে আমার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ি নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফিরআ’উন ও তার দুষ্কর্ম হতে নাজাত দিন, আর আমাকে নাজাত দিন যালিম সম্প্রদায় হতে। সুরা আত-তাহরীমঃ ১১।َ

এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম ইবনে কাষীর রহি’মাহুল্লাহ লিখেছেনঃ

এই আয়ায়ে আল্লাহ তাআ’লা মুসলমানদের জন্যে উপমা বা দৃষ্টান্ত পেশ করে বলেন, যদি মুসলমানেরা প্রয়োজনবোধে কাফিরদের সাথে মিলে-মিশে থাকে তাহলে তাদের কোন অপরাধ হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, “মুমিনগণ যেন মুমিন ব্যতীত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম যদি তোমরা তাদের (কাফিরদের) নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্যে সতর্কতা অবলম্বন কর।” সুরা আলে-ইমরানঃ ২৮।

তাবেয়ী বিদ্বান কাতাদাহ রহি’মাহুল্লাহ বলেছেন যে, “সারা বিশ্বের লোকদের মধ্যে সবচাইতে উদ্ধত লোক ছিল ফিরআ’উন। কিন্তু তার কুফুরীও তার স্ত্রীর কোন ক্ষতি করতে পারেনি। কেননা, তার স্ত্রী তাঁর যবরদস্ত ঈমানের উপর পূর্ণমাত্রায় কায়েম ছিলেন। আল্লাহ তাআ’লা ন্যায় বিচারক ও হাকিম। তিনি একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করেন না।”

সালমান রহি’মাহুল্লাহ বলেছেন যে, “ফিরাউন ঐ সতী-সাধ্বী নারীর উপর সর্বপ্রকারের নির্যাতন করতো। কঠিন গরমের সময় তাকে রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে দিতো। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ ফেরেশতাদের ডানা দ্বারা তাঁকে ছায়া করতেন এবং তাঁকে গরমের কষ্ট হতে রক্ষা করতেন। এমন কি তিনি তাকে তাঁর জান্নাতের ঘর দেখিয়ে দিতেন। ফলে তাঁর রূহ তাজা হয়ে উঠতো এবং ঈমান বৃদ্ধি পেতো। তিনি ফিরআ’উন ও মুসা আ’লাইহিস সালামের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকতেন যে, কে জয়লাভ করলো? সব সময় তিনি শুনতে পেতেন যে, মুসা আ’লাইহিস সালামই জয়লাভ করেছেন।

তখন মুসা আ’লাইহিস সালামের বারংবার বিজয় তাঁর ঈমান আনয়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি ঘোষণা করেন, “আমি মুসা ও হারুনের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।”

ফিরাউন এই খবর জানতে পেরে তার লোকজনকে বললো, “সবচেয়ে বড় পাথর তোমরা খোঁজ করে নিয়ে এসো। অতঃপর তাকে চিৎ করে শুইয়ে দাও এবং তাকে বললো, “তুমি তোমার এই ধর্ম বিশ্বাস হতে বিরত থাকো। যদি বিরত থাকে তবে ভাল কথা, সে আমার স্ত্রী। তাকে মর্যাদা সহকারে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। আর যদি না মানে, তাহলে ঐ পাথর তার উপর নিক্ষেপ করবে এবং তার মাংস টুকরো টুকরো করে ফেলবে।” অতঃপর তার লোকেরা পাথর নিয়ে আসলো এবং তাঁকে নিয়ে গেল ও চিৎ করে শুইয়ে দিলো এবং তাঁর উপর ঐ পাথর নিক্ষেপ করার জন্যে উঠালো।

ঐ সময় তিনি আকাশের দিকে তার চক্ষু উঠালেন। মহান আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দিলেন এবং তিনি জান্নাত এবং সেখানে তাঁর জন্যে যে ঘর তৈরী করা হয়েছে তা স্বচক্ষে দেখে নিলেন। ওতেই তাঁর রূহ বেরিয়ে পড়লো। যখন পাথর তার উপর নিক্ষেপ করা হয় তখন তার মধ্যে রূহ ছিলই না। তিনি শাহাদাতের সময় দুয়া করেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক। আপনার নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন।”
তাঁর দুয়ার সূক্ষ্মতার প্রতি লক্ষ্য করা যাক, প্রথমে তিনি আল্লাহর নৈকট্য কামনা করছেন, তারপর ঘরের প্রার্থনা করছেন। এই ঘটনার বর্ণনায় মারফূ’ হাদীসও এসেছে। তারপর তিনি দুয়া করছেন, “আমাকে উদ্ধার করুন ফিরআ’উন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।”

ঐ পুণ্যবতী মহিলার নাম ছিল, আসিয়া বিনতু মাযাহিম রাদিয়াল্লাহু আ’নহা। তাঁর ঈমান আনয়নের ঘটনাটি হযরত আবূল আলিয়া রহি’মাহুল্লাহ নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ

ফিরআ’উনের দারোগার স্ত্রীর ঈমান ছিল হযরত আসিয়া রাদিআল্লাহু তাআ’লা আ’নহার ঈমান আনয়নের কারণ। দারোগার স্ত্রী একদা ফিরআ’উনের কন্যার মাথার চুলে চিরুণী করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে চিরুণী তার হাত হতে পড়ে যায়। তখন তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, “কাফিররা ধ্বংস হোক।” ফিরাউনের কন্যা তার মুখে একথা শুনে বললো, “তুমি কি আমার পিতা ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালক বলে স্বীকার কর?” মহিলাটি উত্তরে বলল “আমার, তোমার পিতার এবং অন্যান্য সবারই প্রতিপালক হলেন আল্লাহ।” সে তখন ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে মহিলাটিকে খুবই মারপিট করলো। অতঃপর তার পিতাকে এ খবর দিয়ে দিলো। ফিরআ’উন মহিলাটিকে ডেকে নিয়ে নিজেই জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি আমাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত কর?” মহিলাটি জবাবে বললেন, “হ্যাঁ, আমার, তোমার এবং সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতিপালক হলেন, আল্লাহ। আমি তাঁরই ইবাদত করি।”

একথা শুনে ফিরআ’উন তার লোকদেরকে হুকুম করলো, “মহিলাটিকে চিৎ করে শুইয়ে দাও। তার হাতে পায়ে পেরেক মেরে দাও আর সাপ ছেড়ে দাও যেন তাকে কামড়াতে থাকে।” মহিলাটি এই অবস্থাতেই থাকেন। আবার একদিন ফিরআ’উন তার কাছে এসে বললো, “এখনো কি তোমার চিন্তার পরিবর্তন হয়নি। পুনরায় তিনি জবাব দিলেন, “তোমার আমার এবং সব জিনিসের প্রতিপালক হলেন একমাত্র আল্লাহ।” ফিরআ’উন বললো, “আচ্ছা, এখন আমি তোমার চোখের সামনে তোমার ছেলেকে টুকরো টুকরো করে ফেলছি। সুতরাং এখনো তোমাকে বলছি, আমার কথা মেনে নাও এবং তোমার এই দ্বীন হতে ফিরে এসো।”
মহিলাটি উত্তর দিলেন, “তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই কর।”

ঐ অত্যাচারী তখন তাঁর পুত্রকে ধরে আনতে বললো এবং তার সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ যখন বের হয় তখন সে বললো, “মা! তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আল্লাহ তোমার জন্যে বড় বড় পুণ্য রেখেছেন এবং তুমি অমুক অমুক নিয়ামত লাভ করবে।” মহিলাটি তাঁর ছেলের রূহ এভাবে বের হতে স্বচক্ষে দেখলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করলেন এবং আল্লাহ পাকের ফয়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিলেন।

ফিরআ’উন আবার তাঁকে বেধে ফেলে রাখলো এবং সাপ ছেড়ে দিলো। পুনরায় একদিন এসে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলো। মহিলাটি এবারও অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে একই জবাব দিলেন। ফিরআ’উন তাকে আবার ঐ হুমুকই দিলো এবং তাঁর আরেকটি ছেলে ধরে এনে তার চোখের সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ অনুরূপভাবেই তার মাতাকে সুসংবাদ দিলো এবং তাকে ধৈর্য ধারণে উৎসাহিত করলো।

ফিরআ’উনের স্ত্রী এই মহিলাটির বড় ছেলের রূহের সুসংবাদ শুনেছিলেন। এই ছোট ছেলেটিরও সুসংবাদ শুনলেন। সুতরাং তিনিও ঈমান আনয়ন করলেন। ঐদিকে ঐ মহিলাটির রূহ আল্লাহ তাআ’লা কবয করে নিলেন এবং তাঁর মনযিল ও মরতবা যা আল্লাহ তা’আলার নিকট ছিল তা পর্দা সরিয়ে ফিরআ’উনের স্ত্রীকে দেখিয়ে দেওয়া হলো। সুতরাং তার ঈমান বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ফিরআ’উনের কানেও তাঁর ঈমানের কথা পৌঁছে গেল। সে একদা তার সভাষদবর্গকে বললো, “তোমরা আমার স্ত্রীর কোন খবর রাখো কি? তোমরা তাকে কিরূপ মনে কর?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই তাঁর খুব প্রশংসা করলো এবং তার গুণাবলীর বর্ণনা দিলো।

ফিরআ’উন তখন তাদেরকে বললো, “না, না, তোমরা তার খবর রাখে না। সে আমি ছাড়া অন্যকে উপাস্যরূপে মেনে থাকে।” তারপর তাদের মধ্যে পরামর্শ হলো যে, তাঁকে হত্যা করে ফেলা হবে। অতঃপর তাঁর হাতে পায়ে পেরেক মেরে শুইয়ে দেয়া হলো। ঐ সময় তিনি আল্লাহ তাআ’লার নিকট প্রার্থনা করেন, “হে আমার প্রতিপালক! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন।”

আল্লাহ তা’আলা তাঁর দুআ কবুল করেন এবং পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দেন। তা দেখে তিনি হেসে ওঠেন। ঠিক ঐ সময়েই তাঁর কাছে ফিরআ’উন এসে পড়ে এবং তাঁকে হাসির অবস্থায় দেখতে পায়। তখন সে তার লোকজনকে বলে, “হে জনমণ্ডলী! তোমরা কি বিস্ময়বোধ করছে না যে, এরূপ কঠিন শাস্তির অবস্থাতেও এ মহিলা হাসতে রয়েছে? নিশ্চয়ই এর মাথা খারাপ হয়েছে।”
মোটকথা ঐ শাস্তিতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।

বিবি আসিয়ার মর্যাদাঃ

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআ’লা আ’নহুমা হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মাটিতে চারটি রেখা টানেন এবং সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেন, “এগুলো কি তা তোমরা জান কি?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।” তিনি তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, জান্নাতী রমণীদের মধ্যে চারজন হচ্ছে সর্বোত্তম। তাঁরা হচ্ছেঃ খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ, ফাতেমা বিনতু মুহা’ম্মাদ, মরইয়াযম বিনতু ইমরান এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতু মাযাহিম।” এই হাদসীসটি ইমাম আহমাদ রহি’মাহুল্লাহ স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন।

অন্য এক হাদীসে আবূ মূসা আশআরী রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “পুরুষ লোকদের মধ্যে তো পূর্ণতাপ্রাপ্ত লোক বহু রয়েছে। কিন্তু রমণীদের মধ্যে পূর্ণতাপ্রাপ্তা রমণী রয়েছে শুধুমাত্র ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া, মরিয়ম বিন্তু ইমরান ও খাদীজা বিন্তু খুওয়াইলিদ। আর সমস্ত রমণীর মধ্যে আয়েশার ফযীলত এমনই যেমন সমস্ত খাদ্যের মধ্যে সারীদ নামক খাদ্যের ফযীলত।” এই হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
____________________________________

সংগৃহীত: তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমূখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও।
———————
#জান্নাহ্

Source

মতামত দিন