ইসলামিক গল্প

বিস্ময়কর এক ঘটনা

ইমাম ইবনু জারির আত- তাবারী (রহঃ) বলেনঃ

একবার হজ্বের মৌসুমে আমি মক্কায় ছিলাম। অতঃপর লক্ষ্য করলাম, এক খোরাসানী ঘোষণা দিচ্ছেঃ ওহে হাজীগণ, ওহে মক্কা শহর ও গ্ৰামের অধিবাসীরা! আমার একটি থলে হারিয়ে গেছে, যাতে ১০০০ দিনার ছিল। সুতরাং যে ব্যক্তি থলেটি আমাকে ফিরিয়ে দিবে আল্লাহ তা’আলা তাকে উত্তম প্রতিদান দিবেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি করবেন, আর বিচার দিবসের দিন তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদিন ও সাওয়াব।

তখন মক্কা নগরীর এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে বললেনঃ হে খোরাসানী! আমাদের দেশের অবস্থা তো করুন! আর হজ্বের দিন ও মাসও নির্দিষ্ট এবং অর্থ উপার্জনের পথও বন্ধ। সম্ভবত আপনার থলেটি এমন এক বৃদ্ধ, হতদরিদ্র মুমিন পেয়েছে যে আপনার কাছে কিছু দাবি করতে চায়। সে যদি আপনাকে থলেটি ফিরিয়ে দেয়, তাহলে আপনি কি তাকে সামান্য কিছু হালাল অর্থ দিবেন?

খোরাসানীঃ সে কি পরিমান দাবি করতে পারে?

বৃদ্ধঃ দশ ভাগের এক ভাগ তথা ১০০ দিনার।

খোরাসানী এতে রাজি না হয়ে বললঃ আমি এই পরিমাণ দিতে পারবো না। বরং আমি আমার বিষয়টি আল্লাহ তা’আলার নিকট সোপর্দ করে দিলাম। সেদিনই আমি তার কাছে অভিযোগ করবো যেদিন আমরা সকলেই তার সাথে সাক্ষাত করব। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং উত্তম অভিভাবক।

ইবনু জারীর আত-তাবারী (রহঃ) বলেনঃ

আমার মনে হলো এই বৃদ্ধ লোকটিই সেই হতদরিদ্র, আর তিনিই দিনারের থলেটি পেয়েছেন এবং সেখান থেকে সামান্য কিছু তিনি আশা করছেন। তাই বৃদ্ধকে অনুসরণ করে আমি তাঁর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছলাম। অতঃপর আমার ধারণাই ঠিক হলো। শুনতে পেলাম, তিনি তার স্ত্রীকে ডেকে বলছেনঃ

— হে লুবাবাহ!

— জ্বি, আবু গাইছ!

— আজ আমি এক থলের মালিকে পেয়েছিলাম, যে থলে হারানোর ঘোষণা দিচ্ছিলো, তবে কুড়িয়ে পাওয়া ব্যক্তিকে কিছু দিতে সে নারাজ। আমি তাকে ১০০ দিনার দেওয়ার জন্য বলেছিলাম। কিন্তু সে অস্বীকার করে তার বিষয়াদি আল্লাহর দিকে সোপর্দ করে দেয়। এখন তুমিই বলো, আমি কি করতে পারি? আর আমার উপর আবশ্যক হচ্ছে সেটা ফিরিয়ে দেওয়া، আমি আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করি এবং আমার পাপ বৃদ্ধি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছি।

স্ত্রীঃ আরে আপনি তো জানেন আমি আপনার সাথে ৫০ টি বছর ধরে দারিদ্র্যতার সাথে যুদ্ধ করে ঘর সংসার করছি। আপনার ৪ মেয়ে, ২ বোন, আমি, আমার মা, এবং আপনাকে সাথে নিয়ে আমাদের মোট সদস্য সংখ্যা ৯ জন। আর আমাদের কোন ছাগল এবং কোন চারণভূমিও নেই। তাই আপনি সম্পূর্ণ মালই রেখে দিন। আমরা তা দিয়ে পরিতৃপ্ত হবো কেননা আমার ক্ষুধার্ত। আশা করা যায় পরবর্তীতে আল্লাহ তা’আলা আপনাকে সম্পদশালী করবেন অতঃপর পরিবার-পরিজনকে খাওয়ানোর পর তাকে তার অর্থ দিয়ে দেবেন। অথবা সে দিন আল্লাহই আপনার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করে দিবেন যেদিন সমস্ত রাজত্ব তাঁরই হবে।

বৃদ্ধঃ হে লুবাবাহ! এই ৮৬ বছর বয়সে এসেও আমি হারাম ভক্ষণ করবো? এত বছর দারিদ্র্যতার উপরে ধৈর্য ধারণ করে এখন নিজের নাড়িভুঁড়িকে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করবো! মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তা’আলার ক্রোধকে নিজের জন্য আবশ্যক করে নেব? অথচ আমি তো এখন আমার কবরের খুবই নিকটবর্তী। আল্লাহর শপথ! আমি এটা পারবো না।

ইবনু জারীর আত-তাবারী (রহঃ) বলেনঃ

অতঃপর আমি ফিরে আসি আর বৃদ্ধ ও তাঁর স্ত্রীর বিষয়াদি দেখে আমি ছিলাম হতভম্ব। পরের দিন প্রভাতের কোন এক সময়ে শুনতে পেলাম, থলের মালিক গতকালের ন্যায় আবার ঘোষণা দিচ্ছে। অতঃপর সেই বৃদ্ধ তার কাছে গিয়ে বললেনঃ হে খোরাসানী, গতকাল আপনাকে বলেছিলাম যে, আমাদের এই ভূমিতে শস্য উৎপাদন কম হয়। সুতরাং যে থলেটি পেয়েছে আপনি তাকে কিছু অর্থ দিয়ে অনুগ্ৰহ করুন যা শরীয়ত বিরোধী হবে না। আপনাকে বলেছিলাম, যে থলেটি পেয়েছে তাকে ১০০ দিনার দিয়ে দেন, কিন্তু আপনি রাজি হননি। তাহলে আপনি তাকে ১০ দিনার হলেও দিন, যা দিয়ে ঐ ব্যক্তির কিছুটা হলেও অভাব দূর হবে।

খোরাসানীঃ না, আমি তাও পারবো না।

পরেরদিন খোরাসানী পূর্বের ন্যায় ঘোষণা দিলেন। আবারও ঐ বৃদ্ধ লোকটি দাঁড়িয়ে বললেনঃ হে ভাই! প্রথম দিন বলেছিলাম ১০০ দিনার, পরেরদিন ১০ দিনার আর আজকে বলছি, আপনি ঐ ব্যক্তি কে ১ দিনার হলেও দিয়ে অনুগ্ৰহ করুন। যার অর্ধেক দিয়ে সে একটি মশক কিনবে, আর বাকিটা দিয়ে একটি দুধের  ছাগল কিনবে। এটা দিয়ে সে মানুষকে দুধ পান করিয়ে উপার্জন করে তার পরিবারের অভাব নিবারণ করবে, এবং সাওয়াবের আশা করবে।

খোরাসানীঃ আমি তাও দিতে পারবো না।

অবশেষে বৃদ্ধ লোকটি খোরাসানীকে টেনে নিয়ে বললেনঃ আসুন আমরা সাথে আর থলেটি নিয়ে আমাকে একটু ঘুমানোর সুযোগ দিন। এই থলেটি পাওয়ার পর থেকে আমি একটুও শান্তি পাইনি।

ইবনু জারীর আত-তাবারী (রহঃ) বলেনঃ

অতঃপর বৃদ্ধের সাথে থলের মালিকটিও চলতে শুরু করল, আমি তাদের পিছু পিছু গেলাম। বৃদ্ধ তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে মাটি খুঁড়ে থলেটি বের করে নিয়ে এসে বললেনঃ এই নিন আপনার সম্পদ। আল্লাহ তা’আলা যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন এবং তার অনুগ্রহে আমাকে রিজিক দান করেন।

খোরাসানী থলে নিয়ে ঘরের দরজা পর্যন্ত এসে বললেনঃ হে শায়েখ! আমার বাবা তো মারা গেছেন তবে মৃত্যুর আগে তিনি আমার জন্য ৩০০০ দিনার রেখে গেছেন। আর আমাকে বলে গেছেনঃ আমি যেন এ সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ বের করে তা তার অধিক হকদারদের মাঝে বিতরণ করে দেই। আর হকদারদের মাঝে বিতরণের উদ্দেশ্যেই আমি থলেকে বেঁধে নিয়ে এসেছি। আল্লাহর শপথ! আমি খোরাসান থেকে এই পর্যন্ত এসে এ সম্পদের অধিক হকদার হিসেবে আপনার চেয়ে অন্য কাউকে দেখিনি। সুতরাং আপনিই এই মাল গ্ৰহণ করুন। আল্লাহ তাতে বরকত দিবেন। আপনার বিশ্বস্ততা ও দারিদ্র্যতার উপর ধৈর্য ধারণ করার জন্য আল্লাহ তা’আলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। এই বলে খোরাসানী লোকটি বিদায় নিলেন এবং দিনারগুলো বৃদ্ধের কাছেই রেখে গেলেন।

তখন বৃদ্ধ লোকটি কেঁদে কেঁদে আল্লাহ তা’আলার নিকট দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আপনি এই মালের মালিককে তার কবরে রহম করুন এবং তার সন্তানদের উপর বরকত দান করুন।

আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

{ذَلِكُمْ يُوعَظُ بِهِ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا (٢) وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ [الطلاق: ٢، ٣]

তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান আনে এটি দ্বারা তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।

(সূরা আত-তালাক, ২-৩)

📙جمهرة الأجزاء الحديثية (ص: 251)

*———————————————————————————–*

*অনুবাদ : আজহারুল ইসলাম*

*১৪/০৪/২০২০*

*ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারাহ।*

Source

মতামত দিন