সিয়াম সুন্নাহ

সহীহ হাদীছের আলোকে শা’বান মাসের গুরুত্ব ও করণীয় আমল

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি।

মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

বলো, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।

সূরা আলে ইমরান, ৩/৩১

১. শাবান মাসে বাৎসরিক আমলনামা আল্লাহর নিকট পেশ করা হয়। কিন্তু তা কোন দিন তা অজানা:

উসামা ইবনু যায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে তো শা’বান মাসে যে পরিমাণ সাওম পালন করতে দেখি বছরের অন্য কোনো মাসে সে পরিমাণ সাওম পালন করতে দেখি না। তিনি বললেন শা’বান মাস রজব এবং রমাদ্বানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস যে মাসের (গুরুত্ব সম্পর্কে) মানুষ খবর রাখে না অথচ এ মাসে আমলনামাসমূহ আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের নিকটে উত্তোলন করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, আমার আমলনামা আল্লাহ তা’আলার নিকটে উত্তোলন করা হবে আমার সাওম পালনরত অবস্থায়।

সুনানুন নাসাঈ, হা/২৩৫৯; নাসাঈ সুনানুল কুবরা, হা/২৬৭৮; মুসনাদু আহমাদ, হা/২১৭৫৩

শাইখ আলবানী হাসান বলেছেন।

শাইখ যুবায়র সানাদ হাসান বলেছেন।

শাইখ আরনাউত্ব সানাদ হাসান বলেছেন।

২. শাবান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেন:

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা’বান এবং রমাদ্বান মাসে সাওম পালন করতেন আর সোমবার এবং বৃহষ্পতিবারের সাওম কে উত্তম মনে করতেন।

সুনানুন নাসাঈ, হা/২১৯১; দারুসসালাম, হা/২১৮৯

শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন।

শাইখ যুবায়র সহীহ বলেছেন।

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধারে (এতো অধিক) সওম পালন করতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর সওম পরিত্যাগ করবেন না। (আবার কখনো এতো বেশি) সওম পালন না করা অবস্থায় একাধারে কাটাতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর (নফল) সওম পালন করবেন না। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে রমাদ্বান ব্যতীত কোনো পুরো মাসের সওম পালন করতে দেখিনি এবং শা‘বান মাসের চেয়ে কোনো মাসে অধিক (নফল) সওম পালন করতে দেখিনি।

সহীহ বুখারী, হা/১৯৬৯; সহীহ মুসলিম, হা.এ. হা/২৬১২

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা’বান মাসে যত সিয়াম পালন করতেন সারা বছরে অন্য কোনো মাসে তিনি এতো অধিক সিয়াম পালন করতেন না। আর তিনি (লোকদের উদ্দেশ্যে) বলতেন, “তোমরা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী যত বেশি পারো আমাল করো। কেননা, আল্লাহ তা’আলা (তোমাদেরকে সাওয়াব দানে) ক্লান্ত বা বিরক্ত হবেন না যতক্ষণ তোমরা অক্ষম হয়ে না পড়বে। তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তা’আলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ‘আমাল হচ্ছে যা কোনো বান্দা অব্যাহতভাবে করে থাকে- যদিও তা পরিমাণে কম হয়।

সহীহ মুসলিম, হা/৭৮২ হা.এ. হা/২৬১৩ (সহীহ বুখারী, হা/১৯৭০)

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েক দিন ব্যতীত পূর্ণ শা’বান মাসের সাওম পালন করতেন।

সুনানুন নাসাঈ, হা/২৩৫৭

শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন।

শাইখ যুবায়র সহীহ বলেছেন।

ইবনু ‘আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদ্বান ব্যতীত কোনো মাসে সম্পূর্ণ মাসের সওম পালন করেননি। তিনি এমনভাবে (নফল) সওম পালন করতেন যে, কেউ বলতে চাইলে বলতে পারতো, আল্লাহর কসম! তিনি আর সওম পালন পরিত্যাগ করবেন না। আবার এমনভাবে (নফল) সওম ছেড়ে দিতেন যে, কেউ বলতে চাইলে বলতে পারতো আল্লাহর কসম! তিনি আর সওম পালন করবেন না।

সহীহ বুখারী, হা/১৯৭১; সহীহ মুসলিম, হা/১১৫৭

৩. রমাদ্বানকে স্বাগত জানাতে শাবানের শেষের দিকে সিয়াম রাখা নিষেধ:

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শা’বান মাসের অর্ধেক বাকী থাকতে তোমরা আর সওম পালন করো না।

সুনানুত তিরমিযী, হা/৭৩৮; সুনানু ইবনু মাজাহ, হা/১৬৫১

ইমাম তিরমিযী আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত হাদীছটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।

তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো আলিমদের মতানুযায়ী এই হাদীছটি সে সব লোকের জন্য প্রযোজ্য যে সাধারণতঃ (শা’বানে) সিয়াম পালন করে না, কিন্তু শা’বান মাসের কিছু দিন বাকী থাকতেই রমাদ্বানের সম্মানার্থে সিয়াম পালন শুরু করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্ত অভিমতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি হাদীছ আবু হুরায়রাহ (রা.)-এর মারফতেও বর্ণিত আছে।

তা এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : (শা’বানের) সিয়াম রেখে তোমরা রমাদ্বানকে স্বাগত জানাবে না। তবে কারো নির্ধারিত দিনগুলোর সিয়ামের সাথে এই দিনের সিয়ামের মিল পড়ে গেলে ভিন্ন কথা। এ হাদীছ হতে জানা গেল যে, কোন ব্যক্তির রমাদ্বানকে স্বাগত জানানোর জন্য (শা’বানের) সিয়াম রাখা মাকরূহ।

৪. পূর্ববর্তী বছরের সিয়াম বাকি থাকলে পূর্ণ করা:

‘আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার উপর রমাদ্বানের যে কাযা হয়ে যেতো তা পরবর্তী শা‘বান ব্যতীত আমি আদায় করতে পারতাম না। ইয়াহ্ইয়া (রা.) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ব্যস্ততার কারণে কিংবা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ব্যস্ততার কারণে।

সহীহ বুখারী, হা/১৯৫০; সহীহ মুসলিম, হা/১১৪৬ হা.এ. হা/২৫৭৭

৫. কেউ যদি প্রতি মাস ও সপ্তাহের সিয়াম পালনে অভ্যস্ত হয় তাহলে সেটা শা’বান মাসেও চলমান থাকবে:

আবূ হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার বন্ধু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতি মাসে তিন দিন করে সওম পালন করা এবং দু‘রাক‘আত সালাতুয-যুহা এবং ঘুমানোর পূর্বে বিতর সালাত আদায় করা।

সহীহ বুখারী, হা/১৯৮১

আবূ কাতাদাহ আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত বিশাল হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রতি মাসে তিনদিন এবং গোটা রমাদ্বান মাস সওম পালন করাই হল সারা বছর সওম পালনের সমতুল্য।

সহীহ মুসলিম, হা.এ. হা/২৬৩৭

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার (আল্লাহ তা’আলার দরবারে) আমল পেশ করা হয়। সুতরাং আমার আমলসমূহ যেন সিয়াম পালনরত অবস্থায় পেশ করা হোক এটাই আমার পছন্দনীয়।

সুনানুত তিরমিযী, হা/৭৪৭

ইমাম তিরমিযী হাদীছটি হাসান গারীব বলেছেন।

শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন।

৬. প্রত্যেক মাসেই কিছু সিয়াম পালন:

আবদুল্লাহ ইবনু শাকীক (রাহি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশা (রা.) কে বললাম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি রমাদ্বান মাস ছাড়া অন্য কোনো সময় পূর্ণ মাস সিয়াম পালন করতেন? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ তিনি আজীবন রমাদ্বান ছাড়া অন্য কোন সময় পূর্ণ এক মাস সিয়াম পালন করেননি। আর এমন কোনো মাসও অতিবাহিত হয়নি যাতে তিনি অন্তত কিছু সিয়াম পালন করেননি।

সহীহ মুসলিম, হা/১১৫৬, হা.এ. হা/২৬০৭

সর্বোপরি রমাদ্বান মাসের প্রস্তুতি নিতে হবে।

আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।

সূত্র

মতামত দিন