ইসলামী শিক্ষা সুন্নাহ

রোগব্যাধি থেকে আত্মরক্ষার জন্য আমলসমূহ

রোগব্যাধি থেকে আত্মরক্ষার জন্য ইসলামী শরীয়াহর আলোকে আমলসমূহ

জলে ও স্থলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।

আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে। সূরা রুম-৪১

  1. ঈমানী বিশ্বাসকে বিশুদ্ধ করা ও আল্লাহর উপর সঠিকভাবে তাওয়াক্কুল স্থাপন করা
  • রোগব্যাধি কি সংক্রামক ? গজব নাকি ফিতনা ? প্রতিরোধ করা সম্ভব ? শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করলেই হবে ?

ক. রোগব্যাধি সংক্রামক/ছোঁয়াচে ও কুলক্ষণে/অশুভ নয়। অর্থাৎ, রোগব্যাধি আল্লাহর ইচ্ছা বা আদেশ ছাড়া নিজে সংক্রমন করতে পারে না। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রোগাক্রান্ত করেন আবার রোগ থেকে পরিত্রান দেন। রোগব্যাধির মাধ্যমে মুমিন বান্দার গুনাহ মাফ হয়।

খ. রোগব্যাধি কাফেরদের জন্য গজব আর মুমিনদের জন্য রহমত অথবা ফিতনা (পরীক্ষা)। আল্লাহর দিকে ফিরে আসার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক আহবান। কোন মুমিন বান্দা মহামারি রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে সে শাহাদত বরণ করলো।

গ. রোগব্যাধি মোকাবেলা বা প্রতিরোধ বা এর সাথে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। এমন কথা বলা মানুষের জন্য অনুচিত। মানুষ নিজকে ক্ষতি থেকে সুরক্ষার পন্থা ও প্রচেষ্ঠা অবলম্বন করবে কিন্তু আল্লাহ যার তাকদীরে রোগ লিপিবদ্ধ রেখেছেন তা কেউ আটকাতে পারবে না।

ঘ. আল্লাহর উপর ভরসা করার পাশাপাশি রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষার পন্থা ও প্রচেষ্ঠা অবলম্বন করতে হবে। নিজের ক্ষতি করা যাবে না আবার অপরের ক্ষতি করা যাবে না – ইহা ইসলামী শরীয়তের নীতিমালা। জেনে শুনে আত্নরক্ষার ব্যবস্থা না করা আত্নহত্যার সামিল।

  1. সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত রোগব্যাধী ও বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষার দুআসমূহ চর্চা করা ও ফযীলতপূর্ণ খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করা
  • আল্লাহুম্মা ইন্নী আয়ুযুবিকা মিনাল বারাসী ওয়াল জুনূনী ওয়াল জুযামি, ওয়ামিন সাইয়্যিইল আসক্বাম।

হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট শ্বেতরোগ, পাগলামি ও কুষ্ঠ রোগ সহ সকল জটিল রোগ থেকে আশ্রয় চাই। আবূ দাউদ-১৫৫৪

  • বিসমিল্লা হিল্লাযী লা ইয়াদুররু মা‘আসমিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামাই ওয়াহুওয়াস সামীউল আলীম।

আমি শুরু করছি সেই আল্লাহর নামে, যার নামের সাথে পৃথিবী ও আকাশের কোন জিনিস ক্ষতি সাধন করতে পারে না এবং তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা।

ফযীলত: এই দু‘আটি সকাল ও বিকালে ৩ বার করে পাঠ করলে হটাৎ কোন বিপদে পড়বে না কোন কিছু তার ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। আবূ দাঊদ-৫০৮৮, তিরমিযী-৩৩৮৮

  • আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকাল আফীয়াতা ফিদ দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ।

হে আল্লাহ! তোমার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা ও সুস্থতা কামনা করছি। তিরমিযী-৩৫১৪, ইবনে মাযাহ-৩/১৮০

  • আউযু বিকালিমা তিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খ্বলাক।

আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর অসীলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার মন্দ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। মুসলিম-২০৮০

ফযীলত: এ­ই দু‘আটি সন্ধ্যার সময় ৩ বার পড়লে ঐ রাতে সকল প্রকার ক্ষতিকারক ও কষ্টদায়ক বস্ত্ত থেকে রক্ষা পাবে।

  • সূরা ফাতিহা, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ে দুই হাতের তালুতে ফু দিয়ে শরীর মাসাহ করা, অর্থাৎ রুকইয়া (ঝাড়-ফুক) করা।
  • সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস – সকাল ও বিকালে ৩ বার করে পঠনীয়। বুখারী-৫০১৭

ফযীলত: উহা পড়লে সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট হতে নিরাপদ থাকা যায়। আবূ দাঊদ-৫০৮২, তিরমিযী-৩৫৭৫

  • আল্লাহুম্মা ইন্নী আয়ুযুবিকা মিন মুনকারাতিল আখলাকি ওয়াল আমালি ওয়াল আহওয়াই ওয়াল আদওয়া।

হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই দুশ্চরিত্র, অসৎ কর্ম, কুপ্রবৃত্তি এবং কঠিন রোগসমূহ থেকে। তিরমিযী-৩৫৯১, সাহীহুল জামে-১২৯৮

  • আল্লাহুম্মা ইন্নী আয়ুযুবিকা মিন যাওয়ালি বি‘য়মাতিকা ওয়াতাহাও উলি আফিইয়াতিকা ওয়া ফুজায়াহি বিকমাতিকা ওয়াজামিয়’ ছাখতিকা।

হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই, তোমার দেয়া নেয়ামত চলে যাওয়া ও সুস্থতার পরিবর্তন হওয়া থেকে, আশ্রয় চাই তোমার পক্ষ থেকে আকষ্মিক গজব আসা ও তোমার সকল অসন্তোষ থেকে। মুসলিম-২৭৩৯

  • আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাদানি, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি ছাম‘য়ি, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাসারি লা ইলাহা ইল্লা আনতা।

হে আল্লাহ! আমার স্বাস্থ্যকে সুস্থ রাখ, আমার শ্রবণ শক্তি সুস্থ রাখ, আমার দৃষ্টি শক্তিও সুস্থ রাখ, তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আবূ দাউদ-৫০৯০

  • ঘর থেকে বের হওয়ার সময় – বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

ফযীলত: যে দুআটি পাঠ করবে সে রক্ষা পেয়েছে ও নিরাপত্তা লাভ করেছে এবং হেদায়েত প্রাপ্ত হয়েছে। আবু দাউদ-৫০৯৫

  • সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত সকাল ও বিকালের তাসবীহ-তাহলীল ও যিকর-আযকারগুলো পাঠ করা।
  • রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষা ও শেফা পাওয়ার আশায় জমজম পানি, আজওয়া খেজুর, মধু, যয়তুন তেল ও কালো জিরা খাওয়া।

 

  1. আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহের জন্য বেশি বেশি তাওবা-ইসতেগফার করা এবং ধৈর্য্য ধারণ করা
  • তাওবা করার বিশুদ্ধ দুআ পাঠ করা ঃ

আস্তাগফিরুল্লাহ / আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়াআতূবু ইলাইহ / আস্তাগফিরুল্লা হাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম, ওয়াআতূবু ইলাইহ (প্রত্যহ ১০০ বার করে পড়া) মিশকাত-৯৬১, বুখারী-৬৩০৭, আবু দাউদ-১৫১৭

  • লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনাজ জোয়ালেমিন।

তুমি ছাড়া কোন মা‘বুদ নেই। তুমি পবিত্র, তুমি মহান। নিশ্চয়ই আমি সীমালঙ্ঘন করে ফেলেছিলাম। সূরা আম্বিয়া-৮৭

  • রববানা জ্বলামনা আন ফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতার হামনা লানা কুরান নামিনাল খসিরিন।

হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের উপর যুলুম করেছি। তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না কর, আমাদের প্রতি রহম না কর তাহলে নিশ্চিত আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব। সূরা আরাফ-২৩

  • ‘সাইয়েদুল ইসতেগফার’ পাঠ করা (তাওবা-ইসতেগফার এর শ্রেষ্ঠ দুআ):

আল্লাহুম্মা আন্তা রাববী লা ইলাহা ইল্লা আন্তা খবলাকতানী, ওয়া আনা আব্দুকা ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া‘দিকা মাসতাতা‘তু, আউযুবিকা মিন শার্রি মা সানা‘তু, আবূউলাকা বি নি‘মাতিকা আলায়য়্যা ওয়া আবূউবি যামবী ফাগফিরলী ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আন্তা।

ফযীলত: রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি ভোরে (দিনের প্রথম ভাগে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইসতিগফার পড়বে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সে মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় (রাতের প্রথম ভাগে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইসতিগফার পড়বে আর ভোর হওয়ার আগেই যে মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে।’’ বুখারী-৬৩০৬

  1. অসুস্থ অবস্থায় করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ

করণীয় বিষয়সমূহ –

  • একমাত্র আল্লাহর উপর রোগ মুক্তির পূর্ণ ভরসা রাখা।
  • একমাত্র আল্লাহর নিকট অসুস্থতা থেকে সুস্থতা কামনা করা।
  • অসুস্থ অবস্থায় ধৈর্য ধারন করা ও সর্বদা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
  • সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত রোগমুক্তির দুআ সমূহ পাঠ করা ও বৈধ রুকইয়া করা।
  • ফরজ নামাজ সমূহ বাসায় ওযু বা তায়াম্মুম করে আদায় করা।
  • সুস্থতার জন্য শেফা হিসাবে নিজে কুরআন পাঠ করা।
  • পরিচিতজনদের নিকট সুস্থতার জন্য দুআ চাওয়া।
  • রোগব্যাধির সময় নিজ ঘরে/অঞ্চলে অবস্থান করা।
  • ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক শালীন পোষাক ও পর্দা অবলম্বন করা।

বর্জনীয় বিষয়সমূহ –

  • আল্লাহর উপর মূখ্য ভরসা ব্যতিরেকে চিকিৎসক বা ঔষধ এর উপর ভরসা করা।
  • সুন্নাহ দ্বারা রোগ মুক্তির জন্য সাব্যস্ত নয় এমন বিবিধ দুআ-খতম পড়া ও বখসানোর কাজ করা।
  • শরীয়াহ বিরোধী অবৈধ ঝাড়-ফুক ও যে কোন প্রকার তাবীজ, কবজ, ফিতা (তামীমা) গ্রহন করা।
  • অসুখ-বিসুখে অধৈর্য হয়ে যাওয়া এবং মৃত্যু কামনা করা।
  • অসুস্থতার জন্য আল্লাহকে প্রশ্ন করা ও নিজকে বা অন্য কাউকে দোষারোপ করে বিলাপ করা।
  • রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর সাথে শর্তসাপেক্ষে মান্নত করা।
  • সুস্থতার জন্য গায়রুল্লাহর কাছে বা কোন প্রকার অবৈধ ওসীলার মাধ্যমে দুআ করা।
  • অসুস্থ অবস্থায় অশ্লীল ও হারাম কাজ যথা – গান-বাজনা, সিনেমা, জর্দা, ধুমপান করতে থাকা।
  • ঘরের বাইরে প্রয়োজনবিহীন চলাফেরা করা ও সুস্থ লোকদের সাথে মেলা-মেশা করা।

যখন কোন জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারি আকারে রোগব্যাধীর প্রাদুর্ভাব হয়।

এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকেদের মাঝে কখোনো দেখা যায় নি। ইবনে মাযাহ-৪০১৯

উক্ত আমলগুলোর পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়াদি যথাসাধ্য পালন করা

রচনায়ঃ মো. মোশফিকুর রহমান

মতামত দিন