জীবনী

বাংলাদেশে আরবি বিস্তারের মহানায়ক : আল্লামা সুলতান যওক নদভী

নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বাংলাদেশে আরবি বিস্তারের মহানায়ক : অগ্রসর চিন্তার কিংবদন্তি আল্লামা সুলতান যওক নদভী

লিখেছেন : মুফতি এনায়েতুল্লাহ, বিভাগীয় সম্পাদক, বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম

বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো থেকে শিক্ষাগ্রহণ শেষে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বর্হিবিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র পাঠানোর চিন্তা অনেকের মনে এলেও এ কাজের বাস্তব রূপদান ও ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন তিনি।

বাংলাদেশে ইসলামি সাহিত্য ও আরবি সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব। আরবি সাহিত্যের জন্য দেশে-বিদেশে খ্যাতিমান। সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহমাতুল্লাহি আলাইহির স্নেহধন্য ও বিশিষ্ট খলিফা। রাবেতায়ে আদবে আলমে ইসলামি বাংলাদেশের ব্যুরো প্রধান। চট্টগ্রামের জামিয়া দারুল মাআরিফ আল ইসলামিয়ার মহাপরিচালক। এমন অনেক পরিচয় রয়েছে তার। বলছি আল্লামা সুলতান যওক নদভীর কথা।

জীবনের ৮০টি বসন্ত পেরিয়ে বয়সের ভারে ন্যূব্জ এই প্রাজ্ঞজন। নানা শারীরিক ব্যাধিতেও আক্রান্ত। কিন্তু ছাত্রদের কল্যাণ, কওমি শিক্ষার উন্নতি, শিক্ষার বিস্তার যার ধ্যান-জ্ঞান তাকে কী ক্লান্তি আর অসুস্থতা আটকে রাখতে পারে? তাকে না দেখলে, তার সম্পর্কে না জানলে, তার সান্নিধ্যে সময় না কাটালে এটা অনুধাবন করা যাবে না।

তার ব্যক্তিত্বের আভার কিছুটা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তার সঙ্গে কিছু বৈঠকের ফ্রেম আমার স্মৃতিতে এখনও সজীব। আমার বিশ্বাস, তার লাখো শাগরিদ, ভক্ত, অনুরক্তের কাছেও তিনি সমানভাবে প্রাণবন্ত।

ব্যক্তিত্ব, আচার-আচরণ আর চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি সমকালে অন্য অনেকের থেকে এগিয়ে। যে চিন্তাটা এখনও অনেকেই করতে কুণ্ঠিত, সেটা তিনি করেছেন আরও কয়েক দশক আগে। তার চিন্তার ফসল হিসেবে মদিনা ইউনিভার্সিতে কওমি আলেমরা উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। মূলত: মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দারুল মাআরিফের মুয়াদালার (সার্টিফিকেট মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিশেষ শিক্ষা চুক্তি) কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। দারুল মাআরিফ, পটিয়া ও ঢাকার দু-একটি কওমি মাদরাসার সঙ্গে সৌদি আরবের দু-একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুয়াদালা রয়েছে। কিন্তু ছাত্র পাঠানোর ধারাবাহিকতা ও সুনাম ধরে রাখার ক্ষেত্রে দারুল মাআরিফ অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে। এরই সূত্র ধরে, সৌদি আরবের অন্যান্য ইউনিভার্সিটি বিশেষ করে কিং সাউদ, কিং আবদুল আজিজ, জামেয়া বাহা ও জামেয়া তায়েফসহ বেশ কয়েকটি ইউনিভার্সিটি দারুল মাআরিফের সার্টিফিকেটকে মূল্যায়ন করে থাকে।

আল্লামা সুলতান যওক নদভীর প্রতি আমার মুগ্ধতা অন্য কারণে। এই মনীষী বাংলার জমিনে পবিত্র কোরআনের ভাষা আরবি ফেরি করেছেন জীবনভর। আজীবন আরবি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছেন, লিখেছেন। তার এই একনিষ্ঠ সাধনায় আলোকিত হয়েছে গোটা দেশ। এ আলোর ছটা বহির্বিশ্বেও সমান দ্যুতি ছড়িয়েছে। এই মহীরুহের বর্ণাঢ্য জীবনের পরতে পরতে রয়েছে শিক্ষার অজস্র বিষয়।

তার পড়াশোনা, লেখালেখি, ধ্যান-জ্ঞান সব আরবিকে ঘিরে। কওমি শিক্ষার মূল আবেদনকে ধরে রাখার জন্য, এ শিক্ষার আলোয় সমাজকে আলোকিত করার জন্য আরবি নিয়ে তার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার ফসল যোগ্য ও দেশবরেণ্য অগণিত ছাত্র আজ বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে।

বহুমাত্রিক যোগ্যতার কারণে তিনি দেশে যেভাবে বরেণ্য, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে সমাদৃত। গতানুগতিক সরকারি মাদরাসা (আলিয়া) শিক্ষা ব্যবস্থা ও পুরোনো কওমি শিক্ষাব্যবস্থার নিগড় ভেঙে একটি যুগোপযোগী ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার ফর্মূলা উপস্থাপন করে তিনি বেশ আলোচিত হন। বিষয়টা বলা যতটা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন আরও কঠিন। তার চিন্তার ফসল, চট্টগ্রামের জামিয়া দারুল মাআরিফ আল ইসলামিয়া। দারুল মাআরিফ ইতোমধ্যেই বিশ্বের বহু দেশের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এ জন্য সুলতান যওককে ডিঙাতে হয়েছে অনেক প্রতিকূলতা। এসব প্রতিকূলতাকে জয় করেই তিনি ইতিহাস রচনা করেছেন। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।

আমি তার কর্মের, সাধনার ও চিন্তার অনুরাগী। কর্মজীবনের সূত্র ধরে চট্টগ্রামের অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয়। কথা প্রসঙ্গে তারাও জানিয়েছেন তার প্রতি মুগ্ধতার কথা, তার জ্ঞান, ঔদার্য ও অগ্রসার চিন্তার কথা। তার শিক্ষা জীবন ও পারিবারিক অবস্থা কিংবা ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে আলোচনার চেয়ে সঙ্গতকারণেই তার কর্মবহুল জীবন আমাকে আকর্ষণ করেছে। তবে আমার দুর্ভাগ্য, আমি তার ছাত্র নই। কিন্তু দূর থেকে তার চিন্তার, গবেষণার ও কর্মের অনুরাগী। এই অনুরাগ আমাকে তার ভক্তে পরিণত করেছে।

আল্লামা সুলতান যওক নদভী দেশ-বিদেশের অসংখ্য শ্রেষ্ঠ বিদ্বান ও বুজুর্গ ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভ করেছেন। বর্হিবিশ্বের বিখ্যাত অনেকে মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিসের সনদ অর্জন করেছেন। ১৯৫৯ সালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন শেষে চন্দনাইশের মাদরাসা রশিদিয়া বশরত নগরে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্ম জীবন শুরু করেন। সেখান থেকে হজরত মাওলানা আতহার আলী রহমাতুল্লাহি আলাইহির আহবানে কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়ায় যোগ দেন। এর পর পটিয়ায়, পরে মাদরাসায়ে আজিজুল উলুম বাবুনগর হয়ে পুনরায় পটিয়া মাদরাসায় যোগ দেন। এখনে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি আরবি ভাষা একাডেমি প্রতিষ্ঠাসহ নানা সৃজনশীল কাজ করে গুণীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার সুনাম ছড়াতে থাকে। কিন্ত মনের গহীনে তিনি যে স্বপ্ন লালন করতেন, তার বাস্তবায়ন সেভাবে না হওয়ায়- সুলতান যওক নদভী ১৯৮৫ সালে পটিয়া থেকে ইস্তফা দিয়ে দারুল মাআরিফ প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু হয় নতুন ইতিহাস। যে ইতিহাসের পাঠ এখন বাংলাদেশের জন্য গর্বের, সম্মানের।

কওমি শিক্ষার মূলনীতির ওপর অটল থেকে আধুনিক উপকারী বিষয়গুলোর সমন্বয়ে গঠিত দারুল মাআরিফের সিলেবাস দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। বিশ্বের নামকরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এ শিক্ষাক্রমকে অনুমোদন করেছে। যে প্রসঙ্গ দিয়ে লেখার শুরু করেছি।

বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা সংস্কারের ডাক অনেকে দিলেও তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি শুধু ডাক দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বরং দারুল মাআরিফের মতো আদর্শ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে জাতির শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক দিনের বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়েছেন। শিক্ষা বিষয়ক এমন কয়েকটি বৈঠকে তার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ ঘটে। এটা আমার জন্য এক বিরল প্রাপ্তি। তিনি জাতীয়ভাবে যে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেন, সেটা এ সময়কার অনেক ব্যক্তি, নেতা ও বোর্ড কর্তৃপক্ষ কল্পনাও করেন না। এই চিন্তার অগ্রসরতাই সুলতান যওক নদভীকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

১৯৮৪ সালে তারই আমন্ত্রণে বিশ্ববিখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বাংলাদেশ সফর করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সৌদি আরব, ভারত, লিবিয়া, তুরস্ক, মিসর, শ্রীলংকা, কুয়েত, আফগানিস্তান, মরক্কো, ওমান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্থানসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। ১৯৯০ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত রাবেতার কনফারেন্সে যোগ দেন। এ সফরে তিনি বায়তুল্লাহ শরিফের অভ্যন্তরে প্রবেশের বিরল সুযোগ লাভ করেন। ১৪০০ হিজরিতে দারুল উলুম দেওবন্দের শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানেও তিনি যোগদান করেছেন।

আগেই বলেছি, আল্লামা সুলতান যওক নদভী একজন বিদগ্ধ সাহিত্যিক ও লেখক। বিভিন্ন ভাষায় তার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা রয়েছে। আন্তর্জাতিকমানের জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তার রচনা সম্ভার অনেক বিস্তৃত। তার বেশ কিছু কিতাব এখনও প্রকাশের অপেক্ষায়। তিনি আরবি ম্যাগাজিন মানারুশ শরক বাংলা মাসিক আল হক্ব এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। এছাড়া বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনেক মসজিদ, মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত।

কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে এম. এ (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি সাহিত্য) সমমান দেওয়ার লক্ষ্যে গঠিত বিভিন্ন কমিটিতে তিনি কাজ করেছেন এবং এখনও কাজ করছেন।

জ্ঞানতাপস সুলতান যওক নদভীর অবদান বহুমাত্রিক। কওমি শিক্ষার স্বার্থে, দ্বীন ও দেশের স্বার্থে কাজ করেছেন নিঃস্বার্থভাবে। বুদ্ধিবৃত্তিক নানা কাজের মাধ্যমে এখনও তিনি আলো ছড়াচ্ছেন। এ কর্মবীর তার মিশনকে ব্যাপৃত করেছেন নিজ সাধনা দিয়ে, আপন কর্মগুণে।

তিনি একজন স্বভাব কবি। উর্দু এবং আরবিতে রয়েছে তার অসংখ্য কবিতা। এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেন। অলস সময় কাটানোকে তিনি অপছন্দ করেন। মানুষকে কাছে টানার এক অদ্ভুত যোগ্যতা রয়েছে তার। এই মহীরুহের বর্ণাঢ্য জীবন ও সময়যাপন আপন সৌন্দর্যে অনুপম। বাহ্যিকভাবেও তিনি বেশ সুদর্শন, শান্ত-সৌম্য চেহারার অধিকারী। তার সৌজন্যবোধ ও সময়জ্ঞান অনুকরণীয় বিষয়।

দৃঢ়তাপূর্ণ আচরণ, সংক্ষিপ্ত শব্দ ও বাক্যের সমন্বয়ে কথা বলতে অভ্যস্ত তিনি। বিস্ময়কর মেধা, লক্ষে অবিচল এক ব্যক্তিত্ব তিনি। দোয়া করি তার ছায়া আমাদের ওপর আরও দীর্ঘায়িত হোক। তার স্বপ্নগুলো আরও বিস্তৃতি লাভ করুক।

সূত্র

মতামত দিন