পর্যালোচনা

আলিম সমাজকে এই ট্যাবু ভাঙতে হবে

লেখকঃ আব্দুল্লাহ মাহমুদ

শিক্ষক, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা।

আমরা যেই সমাজে দিনাতিপাত করছি, সেই সমাজের সবচেয়ে নিগৃহীত ও রদ্দি স্তরের মানুষ কারা তা নির্ধারণ করলে, আলিম সমাজের নামটা সর্বাগ্রে তালিকাভুক্ত হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে তারা আজ অবহেলিত ও দুর্গত। প্রায় সকল স্তরের জনগণ তাদেরকে দেখলে ভ্রূকুঞ্চিত করে, কপালে ভাঁজ পড়ে। ভাবে কোত্থেকে আপদ আসলো।

তারা আজ জনগণের ক্রীড়নক। সমাজপতি ও বড়লোকদের উচ্ছিষ্টভোগী। মাদরাসা ও মসজিদ কমিটির সামনে তাদের মাথা নুয়ে থাকে। মাদরাসা ও মসজিদ কমিটির লোকেরাও ভাবে, তারা আমাদের পালিত-পশু; হাতে তুলে যা দেব, তা দিয়ে দিন গুযরাবে। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন ৬ হাজার, সেই বেতনে ২৪ ঘন্টা মসজিদের রশিতে বাঁধা থাকতে হবে। মসজিদের বাইরে যাওয়া হারাম। এমনও ঘটনা জানি, এক মাদরাসার সভাপতি বলেছিলেন, ‘আরে হুজুরদের আবার বেতন কীসের? তারা তো তিন সন্ধ্যা মাদরাসাতেই খায়।’

আচ্ছা এমন কমিটি আর ওই বিড়ালের মালিকের মাঝে কি কোনো মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যে মালিক তার বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গিয়েছিলো? রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন,

لَا هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَسَقَتْهَا ، إِذْ حَبَسَتْهَا ، وَلَا هِيَ تَرَكَتْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ

সেই মালিক বিড়ালটিকে বেঁধে রাখার সময় তার খাওয়ার বন্দোবস্ত করেনি আবার জমিনের পোকামাকড় খেতে ছেড়েও দেয়নি। (সহীহ মুসলিম, ১৯৮৫)

এসব কমিটি উপযুক্ত বেতন না দিয়েই ২৪ ঘন্টা বেঁধে রাখবে আবার বাইরে কিছু ইনকামের জন্য ছাড়ও দেবে না।

তবে আলিম সমাজের এ অধপতিত অবস্থার জন্য মূলত আলিম সমাজই দায়ী। আমরা যদি আমাদের সালাফদের দিকে দেখি, দেখতে পাই, তারা সমাজের তোয়াক্কা করেননি। সমাজের ভার হয়ে দিন কাটাননি। কারো রক্তচক্ষু সহ্য করেননি। কারো সামনে সামান্য নমনীয় হননি। তারা সবসময় উঁচুমাথায় কথা বলেছেন।

কৌতূহল আসতে পারে সালাফ আর বর্তমান আলিম সমাজের মাঝে এত ব্যবধান কীভাবে? আমরা এর জবাব পাই ইমাম সুফইয়ান সাওরী রাহিমাহুল্লাহর কাছে। এক ব্যক্তি এসে দেখলো তার কাছে বেশ কিছু দিনার রয়েছে। সে-লোক তা দেখে বললো, ‘আবূ আব্দুল্লাহ, আপনার কাছেও এসব দিনার গচ্ছিত রয়েছে! এসব আপনার জন্য শোভা পায় না।’ জবাব তিনি বলেন,

اسكت، لولا هذه الدنانير لتمندل بنا هؤلاء الملوك

চুপ করো! খবরদার এমন কথা আর বলবে না। অর্থ-সম্পদ ও দিনার-দিরহাম না থাকলে এসব সমাজপতিরা আমাদেরকে রুমাল ও টিস্যু হিসেবে ব্যবহার করতো। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/২৪১)

মানুষ রুমাল ও টিস্যু ব্যবহার করে চেহারা ও শরীরের বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে। পরিষ্কার করা শেষে রুমাল ও টিস্যুর স্থান হয় কোনো নর্দমায় অথবা ডাস্টবিনে। আজকের আলিম সমাজের অবস্থা রুমাল ও টিস্যুর থেকে ভালো নয়। ইমাম ইবনু কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ ইমাম সাওরীর উক্তির ব্যাখ্যায় বলেন,

فالعالِمُ إذا مُنِحَ غنىً فقد أُعينَ على تنفيذ علمه، وإذا احتاج الناس فقد مات علمُهُ وهو ينظر

আলিমের যখন ধনসম্পদ থাকবে, তখন তিনি তার জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারবেন। আর যখন তিনি লোকের দ্বারস্থ হবেন, তখন তার জ্ঞানের অপমৃত্যু ঘটবে। মৃত্যু-দৃশ্য দেখা ছাড়া তার আর কিছুই করার থাকবে না। (ইলামুল মুওয়াক্কিঈন, ৪/২০৪)

ইমাম সুফইয়ান সাওরী আলিম সমাজকে সতর্ক করে বলেন, যতদিন তারা অর্থবিত্তে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হতে পারবে, ততদিন তাদের অবস্থার উন্নতি হবে না। তার ভাষ্য হচ্ছে,

يعجبني أن يكون صاحب الحديث مكفيا لأن الآفات إليهم أسرع وألسنة الناس إليهم أشرع .

আমি চাই, মুহাদ্দিসগণ হবেন স্বয়ংসম্পূর্ণ। কারণ, বিপদ-আপদ তাদের কাছে ধেয়ে আসে আর মানুষের রসনা তাদের তাক করে থাকে। (আল-মাদখাল ইলাস সুনান, ৩৩৭)

আলিম সমাজকে মনে রাখতে হবে, তাদের উঠে দাঁড়াতে হলে, সমাজের বুকে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে হলে, সমাজের নেতৃত্ব দিতে হলে—অর্থবিত্তে নিজেদের আগে পাকাপোক্ত করতে হবে। বর্তমানে অর্থ-সম্পদ আলিমদের রক্ষাকবচ ও ঢাল। ইমাম সুফইয়ান সাওরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

كَانَ الْمَالُ فِيمَا مَضَى يُكْرَهُ فَأَمَّا الْيَوْمَ فَهُوَ تُرْسُ الْمُؤْمِنِ

পূর্বযুগে অর্থ-সম্পদ অপছন্দের বিষয় ছিলো। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে তা মুমিনের ঢালে রূপ নিয়েছে। (হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৯৪৩৮)

মনে রাখতে হবে যুহদ মানে অর্থ-সম্পদ ত্যাগ করে নিঃস্ব ও রিক্ত থাকা নয়। আলী ইবন ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার পিতা আব্দুল্লাহ ইবন মুবারককে বলেন, ‘আপনি আমাদেরকে যুহদের পরামর্শ দেন আবার আপনি খুরাসান থেকে হারামে ইমপোর্ট এক্সপোর্ট এর ব্যবসা করেন। এমনটা কেন?’ জবাবে তিনি বলেন,

يا أبا علي إنما أفعل ذا، لأصون به وجهي، وأكرم به عرضي، وأستعين به على طاعة ربي

আবূ আলী, আমি এ ব্যবসার মাধ্যেম নিজের চেহেরাকে সংরক্ষণ করি, মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখি এবং আমার রবের ইবাদত নির্বিঘ্নে আঞ্জাম দিই। (তারীখু বাগদাদ, ১০/১৬০)

আর অর্থনৈতিকভাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে বেতনের ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। দ্বীনী জ্ঞানকে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। বরং জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য কোনো উৎসকে উপজীব্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আর দ্বীনী জ্ঞান বিতরণ করতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। দুনিয়াবি কোনো প্রতিদানের জন্য নয়। আর দুনিয়াবি প্রতিদান ছাড়াই জ্ঞান বিতরণ তখন সম্ভব হবে, যখন অর্থনৈতিকভাবে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

আমাদের সালাফগণ দ্বীনী জ্ঞানকে কখনো জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেননি। তারা ব্যবসা বা অন্য কোনো উৎস থেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এমনকি একদল সালাফের মতে, কেউ যদি দ্বীনী জ্ঞান তথা হাদীস বর্ণনা করার মাধ্যমে আয়-রোজগার করে, তবে তার হাদীস অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে। তারা দ্বীনী জ্ঞানকে জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ না করায় সমাজপতি ও শাসকগোষ্ঠী তাদেরকে রুমাল ও টিস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হননি। বরং কোনো সমাজপতি ও শাসক তাদেরকে তাদের দরবারে গিয়ে শিক্ষা দেওয়ার কথা বললে তারা দৃপ্তকণ্ঠে শুনিয়ে দিয়েছেন, ‘জ্ঞান কারো দ্বারে যায় না, জ্ঞানের দ্বারে সবাইকে আসতে হয়।’ এমন দৃপ্তঘোষণা শোনার পর তারা জ্ঞানের দ্বারে আসার পর সবাইকে ডিঙিয়ে সবার সামনে বসতে চাইলে তারা বলিষ্ঠকণ্ঠে বলেছেন, ‘জ্ঞানের মজলিসে কোনো আশরাফ আতরাফ নাই; সবাই সমান। তাই মজলিসের শেষে যেখানে জায়গা আছে সেখানেই বসে পড়েন।’

আলিম সমাজ যদি অন্য কোনো উৎস থেকে নিজেদেরকে স্বাবলম্বী করতে সামর্থ্য হন, মসজিদ-মাদরাসার চার দেয়ালে আটকে থাকার ট্যাবু ভেঙে নিজেদের পদচারণায় ব্যবসা-বাণিজ্য অঙ্গন মুখরিত করেন, তবে বুর্জোয়াদের ক্রীড়নক হতে নিজেদের মুক্ত করতে পারবেন। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বকে উচ্চকিত করতে পারবেন। ইমাম আইউব সাখতিয়ানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

الزم سوقك فإنك لا تزال كريماً مالم تحتج إلى أحد

বাজারকে আঁকড়ে ধরো। কেননা তুমি ততদিন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে ধরে রাখতে পারবে, যতদিন কারো দ্বারস্থ না হবে। (হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৩৯৩)

মুহাম্মাদ ইবন সাওর বলেন, ‘আমরা মসজিদে হারামে বসে জ্ঞানার্জন করতাম। সুফইয়ান সাওরী সেখান দিয়ে গেলে বলতেন, ‘কেন বসে আছো?’ বলতাম, ‘তো কী করতে বলছেন?’ তিনি বলতেন, ‘আল্লাহর রহমত অন্বেষণ করো, কোনো মুসলিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ো না।’ (শুআবুল ঈমান, ৬৫৬৯)

আলিম সমাজকে ২৪ ঘন্টা দ্বীনী ইলম বিতরণ করতে হবে, এমনটা না। বরং তারা একটা নির্দিষ্ট সময় জীবিকা নির্বাহ বা ব্যবসা-বাণিজ্যের পিছনে ব্যয় করবেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ফিকির করবেন। একবার ইমাম সুফইয়ান সাওরী রাহিমাহুল্লাহ ব্যবসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সেসময় এক ছাত্র একটি মাসআলা জিগ্যেস করে। সে-ছাত্র বারবার জিগ্যেস করতে থাকে। তিনি তাকে বলেন,

يا هذا اسكت فإن قلبي عند دراهمي

এই তুমি ক্ষান্ত হও। আমার মন-মগজ এখন আমার দিরহামের ভেতর আছে।

সর্বশেষে দ্বিতীয় খলীফা উমার ইবন খাত্তাবের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করব। তিনি বলেন,

يا معشر القراء ، ارْفَعُوا رُؤُوسَكُمْ فَقَدْ وَضُحَ الطَّرِيقُ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ، وَلا تَكُونُوا عِيَالا عَلَى الْمُسْلِمِينَ

আলিম সমাজ, তোমরা তোমাদের শির উঁচু করো। রাস্তা আজ স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ। কল্যাণের কাজে প্রতিযোগিতা করো। তোমরা মুসলিমদের ওপর নির্ভরশীল হয়ো না। (শুআবুল ঈমান, ১১৬৩)

Source

মতামত দিন