ইসলামিক গল্প

স্ত্রীদের প্রতি উমামাহ বিনত হারিসের অত্যন্ত মূল্যবান উপদেশ

সংকলনেঃ আবদুল্লাহ মাহমুদ

আওফ বিন মুলহিম শায়বানী স্বীয় কন্যা উম্মু ইয়াসের আমর বিন হাজারের সঙ্গে বিবাহ দেন। সদ্য বিবাহিত কন্যাকে শ্বশুরালয়ের পথে বিদায় জানানোর সময় উম্মু ইয়াসের মা উমামাহ বিনত হারিস কিছু অত্যন্ত মূল্যবান উপদেশ দেন।

তিনি তার কন্যাকে বলেন, হে আমার স্নেহের কন্যা, তুমি এক নামিদামি বংশের মেয়ে। তোমার পরিবারের সুনাম-সুখ্যাতি সর্বজন বিদিত। তোমার রূপ-লাবণ্য ও সৌন্দর্যর কথা সবার জানা। উঁচু মর্যাদা, নামিদামি বংশ ও আকর্ষণীয় সৌন্দর্য থাকলেই যদি উপদেশ দেওয়ার প্রয়োজন না পড়ত, তাহলে তোমাকে উপদেশ দিতাম না। কিন্তু ব্যাপারটা এরূপ নয়। উপদেশ একজন গাফেল মানুষের মাঝে সচেতনতাবোধ তৈরি করে এবং জ্ঞানীকে আরোও ভাবতে শেখায়।

হে আমার প্রিয়, পিতার ঐশ্বর্য ও ধন-দৌলত, পিতা-মাতার নিখাঁদ মায়া-মুহাব্বত ও অগাধ ভালোবাসা এবং স্নেহের পরশ যদি নারীদের স্বামীর প্রয়োজন পূরণ করত, তাহলে আমি তোমার বিবাহ দিতাম না। কিন্তু স্রষ্টার অমোঘ বিধান যে এরূপ নয়। পুরুষের জন্যই নারীকে আর নারীদের জন্য পুরুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

হে আমার কলিজার টুকরা, তুমি এতদিন যে জায়গায় লালিত-পালিত হয়ে বড় হলে, তা ছেড়ে অজানা জায়গায় চলে যাচ্ছ। এতদিন যাবৎ যারা তোমার আপনজন ও পরিবার-পরিজন ছিল, যাদের আঁচলের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছ, যাদেরকে সবসময় কাছে পেয়েছ, আজ তাদেরকে বিদায় জানিয়ে অপরিচিত লোকদের সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে যাচ্ছ। এমন একজনকে পথচলার সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে চলেছ, যার সাথে না আছে তোমার পূর্ব-পরিচয় আর না আছে হৃদয়ের কোনো লেনাদেনা। আজ থেকে সে তোমার মালিকানা গ্রহণ করে বাদশাহর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। তবে চিন্তা করো না, তুমি তার সেবিকা হলে সেও তোমার বিশ্বস্ত সেবকে পরিণত হবে।

তোমাকে দশটা উপদেশ দিচ্ছি, যা বাস্তবায়ন করলে তোমাদের বন্ধন অতি সুদৃঢ় হবে।

প্রথম উপদেশ : অল্পে তুষ্ট থাকবে। হে আমার আদুরে কন্যা, স্বামীর গৃহে অল্পে তুষ্ট থাকার অভ্যাস গড়ে তুলবে। কৃচ্ছতার সাথে জীবন অতিবাহিত করবে। স্বামীর সংসার যা পাও তাই খাবে এবং তাতে সন্তুষ্ট থাকবে। বিলাসী জীবনের কথা চিন্তাই করবে না। তোমার প্রিয়তম তোমাকে পোশাক-আশাক হিসেবে যা দেবে তা পেয়েই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে। কোনো কিছুর জন্য জোর করবে না এবং চাপ দেবে না। জেনে রেখো অন্তরের তৃপ্তি সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।

দ্বিতীয় উপদেশ : স্বামীর আনুগত্য করবে। আমার প্রিয় কন্যা, তোমার স্বামী কী বলছে তা খুব মনোযোগ সহকারে শুনবে। তার প্রতিটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে। সে যা আদেশ দেবে তা পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কোনো কথা ও আদেশের ব্যাপারে অবহেলা করবে না। কোনো কিছু বললে গোমড়ামুখি হয়ে থাকবে না। তুমি তোমার রবের সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন করতে চাইলে তোমার স্বামীর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন করো।

তৃতীয় উপদেশ : সাজ-সজ্জা ও রূপের দ্বারা স্বামীকে মাতাল করবে। হে আমার নয়নের মণি, পুরুষেরা মেয়েদের কাজ দেখে যতটা আনন্দিত ও খুশি হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দিত ও খুশি হয় তাদের সাজসজ্জা দেখে। তাই দর্শনে, শ্রবণে, সুগন্ধে ও পারিপাট্যে তোমার স্বামীর মন ভরে দেবে। স্বামীর দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় ও কামনীয় হওয়ার জন্য পরিপাটি থাকবে এবং সাজসজ্জা করবে। তার মনোরঞ্জনের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করবে। তাকে দেওয়ানা করার জন্য সুসজ্জিত রাখবে। এভাবে স্বামীর কাছে রূপে বাহারে অনিন্দ্য সুন্দরী হয়ে উপস্থিত হবে।

চতুর্থ উপদেশ : সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে। হে আমার বিচক্ষণ কন্যা, তোমার প্রতি তোমার স্বামীর চোখ আটকিয়ে রাখার জন্য সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে। সুরমা ও কাজল লাগিয়ে নয়ন যুগলকে তির বানাবে। সে তির তোমার স্বামীর বুকে বিদ্ধ করবে। তোমার শরীর থেকে তোমার স্বামী যেন সব সময় সুঘ্রাণ পায়। সুঘ্রাণে যেন সে মাতোয়ারা থাকে। তার অপছন্দনীয় কোনো কিছু যেন তোমার কাছে দেখতে না পায়।

পঞ্চম উপদেশ : সময় মত খানা-পিনার ব্যবস্থা করবে। হে আমার দায়িত্ববান কন্যা, তুমি তোমার স্বামীর খানা-পিনার ব্যাপারে সজাগ থাকবে। সময় মত তার ব্যবস্থা করবে। ক্ষুধার প্রচন্ডতা মানুষ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বানিয়ে দেয়। তার পছন্দনীয় খাবারের ব্যবস্থা করবে। খাবারটা যথাসাধ্য সুস্বাদু করার চেষ্টা করবে।

ষষ্ঠ উপদেশ : তার বিশ্রামের ব্যাপারে যত্নবান হবে। আমার মহব্বতের কন্যা, তোমার স্বামীর বিশ্রাম ও নিদ্রার প্রতি বিশেষ যত্নবান হবে। সে কখন ঘুমায় ও বিশ্রাম করে তা জেনে নেবে। সে সময় কখনো তাকে বিরক্ত করবে না। তার ঘুমের ও বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটাবে না। কেননা বিশ্রাম ও নিদ্রা অসম্পূর্ণ রয়ে গেলে মন-মেজাজ ও ব্যবহার রুক্ষ্ম, খসখসে ও খিটখিটে হয়ে যায়। অল্প কথায় রেগে যায়। আচার-ব্যবহার ও কথাবার্তায় মর্জিত মনোভাব থাকে না। মায়া-মহব্বত দূর হয়ে যায়।

সপ্তম উপদেশ : স্বামী সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ করবে। আমার কলিজার টুকরা, তুমি তোমার স্বামীর সম্পদ ও মালামালের পূর্ণাঙ্গ হিফাযত করবে। তার সম্পদ অপচয় করবে না এবং বিলাসিতায় উড়িয়ে দেবে না। তার অনুমতি ব্যতীত কোথাও কোনো খরচ করবে না। তুমি পারিবারিক জীবনে কতটুকু দায়িত্বশীলা তা সম্পদ সংরক্ষণের মাধ্যমে ফুটে ওঠবে। তাই কখনো এক্ষেত্রে তোমার স্বামীর তোমার থেকে আস্থা হারাতে দেবে না।

অষ্টম উপদেশ : তার পরিবার-পরিজনের খেদমত করবে। হে আমার সু-কন্যা, তুমি সাধ্যমত তোমার স্বামীর পরিবারের লোকদের এবং আত্মীয়-স্বজনের খেদমত করবে। তার পরিবারের লোকদের এবং আত্মীয়-স্বজনদের নিজের পরিবারের লোক ও আত্মীয়-স্বজন মনে করবে। তাদের সাথে ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে তোমার স্বামীর মন জয় করতে সক্ষম হবে।

নবম উপদেশ : স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি রাখবে। হে আমার আদরের দুলালী, তুমি তোমার স্বামীকে সম্মান করবে, শ্রদ্ধার চোখে দেখবে এবং ভক্তি করবে। কখনো তাকে অবহেলা করবে না। কখনো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে না। তার পছন্দ-অপছন্দকে সম্মান জানাবে। তোমার শ্রদ্ধা ও ভক্তি তার গভীরে নাড়া দেবে। তোমার প্রতি তার ভিন্ন রকমের ভালোবাসা সৃষ্টি করবে।

দশম উপদেশ : গোপন জিনিস ফাঁস করবে না। হে আমার প্রিয় কন্যা, একটি দাম্পত্য-জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কত গোপন জিনিস থাকে। সেসব গোপন জিনিস ও গোপন কথা কারো সামনে প্রকাশ করবে না। তুমি যদি গোপন কথা ও গোপন জিনিস ফাঁস করে দাও, তাহলে চিরদিনের জন্য তোমার থেকে তার আস্থা হারিয়ে যাবে। কোনো দিনই তোমাকে সে আর বিশ্বাস করবে না। তোমাকে আর কোনোদিন তার সুখ-দুঃখের সাথী বলে গন্য করবে না। তোমার থেকে সে সমসময় দূরত্ব বজায় রাখবে।

তোমাকে আরও কিছু কথা বলি শোনো, স্বামীর দুঃখে দুঃখী হবে। তার কষ্টে কষ্ট অনুভব করবে। তার দুঃখ-কষ্টের সময় কখনো মুখে হাসির রেখা ফুটাবে না। আর তার খুশিতে খুশি হবে এবং তার আনন্দের সময় তার আনন্দের সাথী হবে। তার খুশি ও আনন্দের সময় মুখ ভারী করে থাকবে না।

তাকে পরিপূর্ণ সম্মান করবে, ইজ্জত দেবে। তার সম্মানহানী হয় ও ইজ্জতে আঘাত লাগে এমন কাজ কখনো করতে যাবে না। সে কখনো কথা বললে বা মতামত দিরে তার সাথে সহমত পোষান করবে। তার কথা ও মতের বিরোধিতা করবে না। ঠোঁটকাটা হবে না।
হে আমার আদরের কন্যা, তোমার স্বামীর ইচ্ছা ও পছন্দের কাছে তোমার ইচ্ছা ও পছন্দকে বিসর্জন দিয়ে দেবে। স্বরণ রেখো, যতদিন তোমার পছন্দ-অপছন্দকে তার পছন্দ-অপছন্দের কাজে বিসর্জন না দেবে এবং তার ইচ্ছার কাছে তোমার ইচ্ছাকে জলাঞ্জলি না দেবে, ততদিন তার প্রেম-ভালোবাসা ও মহাব্বত অর্জন করতে পারবে না। অথচ দাম্পত্য-জীবনকে মধুময় করতে যে-কোন মূল্যে তা অর্জন করতেই হবে।

তোমার জন্য সর্বদা আমার দুআ থাকবে, আল্লাহ তোমাকে যেন তাঁর কল্যাণের চাদরে আবৃত করে এবং তাঁর দয়ায় হিফাযত করে।
তিনি যেসব উপদেশ দেন সেসব উপদেশ তার কন্যা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। এ কারণে তার দাম্পত্য-জীবন মধুময় হয়ে যায়। তার স্বামীর কাছে রাণীতে পরিণত হয়।

(স্বামী স্ত্রী বিষয়ক অপ্রকাশিত একটি পাণ্ডুলিপি থেকে)

সূত্র

মতামত দিন