বিদআত

মহামারী থেকে বাঁচতে সারা দেশে সমস্বরে আজান

মহামারী থেকে বাঁচতে সারা দেশে সমস্বরে আজান: বিদআতের এক নতুন রেকর্ড এবং এর বড় বড় ৫টি ক্ষতি

আমাদের দেশে আজানের সুরে সুরে প্রভাত আসে আবার আজানের সুরে সুরে সন্ধ্যা নামে। এই ছোট্ট দেশটিতে সরকারী হিসেবে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক মসজিদ রয়েছে। এতগুলো মসজিদ থেকে প্রতিদিন পাঁচ বার করে প্রায় ১২,৫০০০০ বা সাড়ে বারো লক্ষ বার আজানের ধ্বনি উচ্চারিত হয়। এত আজানের পরও মসজিদগুলোতে মুসল্লির সংখ্যা মুসলিম জনসংখ্যার তুলনায় খুবই নগণ্য। তারপর আবার ঘটা করে রাত দশটার পর কিছু মানুষ একসাথে দল বেধে সমস্বরে আজান দিয়ে এক নতুন বিদআতের নতুন রেকর্ড স্থাপন করল।

এই বিদআত আমাদের দেশে এর আগে কখনোই দেখা যায়নি- যদিও ইতোপূর্বে দেশে অনেক ধ্বংসাত্মক ও বড় বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিল।

যাহোক, এই সমস্বরে আজান দ্বারা কি কি ক্ষতি হয়েছে সেগুলো থেকে নিম্নে মাত্র ৫টি বিষয় উল্লেখ করা হল:

❖ ১) দ্বীনের নামে এক নতুন বিদআত চালু করা হল-যা আমাদের দেশের মানুষ ইতোপূর্বে আর কখনো দেখেনি।

আর বিদআত হল, দ্বীন ধ্বংসের অন্যতম একটি কারণ। যেমন: ফুযাইল ইবনু আয়ায (রহ.) বলেন, “বিদআতির কোন আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যে ব্যক্তি বিদআতপন্থীকে সহযোগিতা করল সে যেন দ্বীন ধ্বংস করতে সহযোগিতা করল।” (খাছায়িছূ আহলিস সুন্নাহ)

❖ ২) যারা এই বিদআতের পক্ষে ফতোয়া দিল এবং যারা তা বাস্তবায়ন করল উভয়েই দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন ও পরিবর্তন সাধনের অপরাধে অপরাধী হয়ে থাকবে। আর যারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে সংযোজন-বিয়োজন এবং পরিবর্তন-পরিবর্ধন করবে তাদের জন্য ভয়াবহ দু:সংবাদ অপেক্ষা করছে। আর তা হল, এরা তওবা না করে মারা গেলে কিয়ামতের দিন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাউজে কাউসারের পানি থেকে বঞ্চিত হবে। যেমন হাদিসে এসেছে,

সাহাল ইবনে সাআদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

إِنِّي فَرَطُكُمْ عَلَى الْحَوْضِ مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ ، وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا ، لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونِي ، ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ ، فَأَقُولُ : إِنَّهُمْ مِنِّي ، فَيُقَالُ : إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ ، فَأَقُولُ : سُحْقًا ، سُحْقًا ، لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي

“আমি হাওজে কাওসারে তোমাদের অপেক্ষায় থাকব। যে ব্যক্তি সেখানে আসবে সে পানি পান করবে। আর যে ব্যক্তি একবার পানি পান করবে তার কখনো তৃষ্ণা থাকবে না। কিছু লোক এমন আসবে যাদেরকে আমি চিনব। তারাও আমাকে চিনবে। আমি মনে করব, তারা আমার উম্মত। তারপরও তাদেরকে আমার নিকট পর্যন্ত পৌঁছতে দেয়া হবে না। আমি বলব, এরা তো আমার উম্মত।

আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনি দুনিয়া থেকে চলে আসার পর এসব লোকেরা কী কী বিদআত সৃষ্টি করেছিলো।

তারপর আমি বলব, “দূর হোক, দূর হোক সে সকল লোক, যারা আমার পর দ্বীনের মধ্যে পরিবর্তন সাধন করেছে।” (বুখারী ও মুসলিম)

❖ ৩) ভবিষ্যতে আবারো কোনও দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের মুখে এই নিয়ম অনুসরণ করে এই বিদআত বাস্তবায়ন করা হলে পরবর্তীতে যত মানুষ এ কারণে গুনাহগার হবে আজকে যারা এই বিদআতের পথ দেখিয়ে গেলো তারাও তাদের সমপরিমাণ গুনাহের অংশিদার হবে। যেমন: হাদিসে এসেছে,

وَمَنْ سَنَّ في الإسْلامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ مِنْ غَيرِ أنْ يَنْقُصَ مِنْ أوْزَارِهمْ شَيءٌ

“যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করবে, তার উপর তার নিজের এবং ঐ লোকদের গুনাহ বর্তাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের গোনাহর কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।” (মুসলিম ২৩৯৮)

❖ ৪) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিদের বিপক্ষে অবস্থান।

কারণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কখনোই সাহাবিদেরকে দলবদ্ধভাবে সমস্বরে আজান দেওয়ার নির্দেশ দেন নি। অথচ সমগ্র উম্মত তাঁর আনুগত্য করার এবং তার বিপরীত পথে না চলার জন্য আদিষ্ট।

আল্লাহর রাসূলের আদিষ্ট পথের বিপরীতে পথ চলা আল্লাহর আজাব আসার অন্যতম কারণ। যেমন: কুরআনের সতর্কতা বাণী:

فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

“অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” (সূরা নূর: ৬৩)

১৮ হিজরি মোতাবেক ৬৪০ খৃষ্টাব্দে ওমর রা. এর শাসন আমলে শাম দেশে

(সিরিয়ায়) ‘তাউনে আমওয়াস’ নামক মহামারীতে বহু সাহাবী সহ প্রায় ২৫,০০০ (পঁচিশ হাজার) মুসলিম দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করলেও তখনকার সাহাবায়ে কেরাম কখনোই এই জাতীয় কাজ করেন নি।

সুতরাং আজকে যারা এই বিদআত করল তারা সাহাবিদের বিপরীত পথের অনুসরণ করল- এ কথায় কোন সন্দেহ নেই। এটিও একটি ধ্বংসাত্মক আচরণ। আল্লাহ ক্ষমা করুন।

❖ ৫) রাতে যখন বহু মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছিল তখন হঠাৎ করে এভাবে সমস্বরে আজান দেওয়ায় বহু মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কেউ ভাবছে, কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। আর কেউ ভাবছে ইমাম মাহাদী চলে এসেছে ইত্যাদি। ঘুমন্ত শিশুরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে জাগ্রত হয়েছে। অসুস্থ লোকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা ভোররাতে উঠে তাহাজ্জুদ সালাতে অভস্ত তাদের ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ায় হয়ত তাদের তাহাজ্জুদ পড়েতে সমস্যা হয়েছে।

সুতরাং যারা এই বিদআতি কাজ করার কারণে এভাবে মানুষের ক্ষতি করল তারা দু দিক থেকে গুনাহগার হবে। যথা:

– এক. বিদআত করার কারণে।

– দুই. মানুষকে কষ্ট দেয়ার কারণে।

বিদআত করা যেমন হারাম তেমনি বিদআতি কাজ দ্বারা মানুষকে কষ্ট দেয়া আরেক হারাম। আল্লাহ এদেরকে ক্ষমা ও হেদায়াত করুন। আমীন।

পরিশেষ মহান আল্লাহর কাছে দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে সব ধরণের ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে হেফাজত করেন এবং সকল প্রকার রোগ-ব্যাধি, ভাইরাস মহামারী থেকে আশু মুক্তি দান করেন। আমীন।

আল্লাহু আলাম।

আরও পড়ুন:

– করোনা ভাইরাস, মহামারী ও বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে ‘তাকবীর’ ধ্বনি দেয়ার বিধান

‘- সম্মিলিত আজান’ প্রসঙ্গে বিদআতিদের পেশকৃত হাদিস সমূহের পর্যালোচনা এবং খণ্ডন

Source

মতামত দিন