আখলাক

ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষের সাথে যে আচরণ অবশ্যই পরিতাজ্য

আমরা মুসলিমরা পারস্পরিক দ্বীনের কথা, উপকারী কথা স্মরণ করিয়ে দিবো, এটা ঈমানেরই একটা দাবি। এই কাজটা হয় আল্লাহকে ভালোবেসে, অপরকে ভালোবেসে। আমরা জানি আল্লাহই সকল হিদায়াতের মালিক, তিনি সুন্দর, তিনি কোমলচিত্ত। তাই, কাউকে উপদেশ দিতে হলে সেটা হবে ভালোবেসে। যাকে চিনিনা, এমন কাউকে অপ্রয়োজনীয় ও অযাচিত উপদেশ দেয়াও উচিত নয়; তা করতে হয় প্রজ্ঞার সাথে। তবে যাদের আমরা চিনি, জানি, ভালোবাসি, তাদের যদি আমরা দেখি বিষণ্ন, দুঃখে জর্জরিত, তখন সচেতনভাবেই পাশে থাকা উচিত। তাকে এমন কথা বলা উচিত নয় যাতে সে আহত হয়। বরং বুদ্ধিমত্তার সাথে, ভালোবেসেই কথা বলতে হবে যে জিনিসটায় তার উপকার হয়। মানুষ অনেক সময় উপদেশ ছাড়াই কাছের মানুষদের সান্নিধ্যে পেলেই সঠিক বুঝ পেয়ে যায়, অনেক সময় তাদের হয়ত বকা দিতে হয়। এই ব্যালান্সটা তখনই সম্ভব, যখন আমরা ওই মানুষটাকে জানবো ও ভালোবাসবো।


তবে কেউ যখন ডিপ্রেসড থাকে, তার অবস্থা আসলে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না বলেই সে ডিপ্রেশনে ভুগে। সচেতনভাবেই তাদের পাশে থাকতে হবে, উপদেশও খেয়াল করে দেয়া উচিত। অন্তত এমন কথা বলা উচিত নয় যা হয়ত তাকে আরো আহত করবে। সচরাচর যে বিষয়গুলো সহজেই একজন ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষকে আমরা বলে ফেলি কিন্তু সেগুলো তাকে কষ্টও দিতে পারে এমন বিষয়গুলো হলো–

১) “জীবনের ভালো বিষয়গুলোর দিকে দেখো” 

– আসলে সে তো ভালো দিক ত সে দেখতে পাচ্ছে না বলেই সে বিষণ্ণ, ডিপ্রেসড। এভাবে বললে হয়ত তাকে অন্যায়ভাবে জাজ করা হয়ে যেতে পারে। সে মনে করতে পারে সে জীবনের ভালো দিকগুলো দেখতে পায় না, সে আসলে অকৃতজ্ঞ। এই ইঙ্গিতে সে নিজের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে। আমরা এই উপদেশগুলো মানুষটিকে বুঝে তবেই দিবো…

২) “সবর করো, ধৈর্য ধরো!” 

– কেউ যদি ডিপ্রেসড থাকে, তাকে যদি বলতে থাকা হয় যে “ধৈর্য ধরো… ধৈর্য ধরো”– অনেক সময়েই এটা এক ধরনের জাজমেন্ট করা হয়। এতে করে বলেই দেয়া হচ্ছে ইঙ্গিতে যে সে সবর করছে না, যে আসলে ধৈর্যহীন। হয়ত তার এখন এই কথাটা শোনা প্রয়োজন নেই, বরং যে কথা শুনলে, তার আল্লাহর উপরে, নিজের উপরে আস্থা বৃদ্ধি পাবে এমন কথা বললে সে হয়ত আপনাতেই ধৈর্যধারণ করবে আল্লাহর কাছ থেকে বিনিময় পাওয়ার আশায়…

৩) “এই দোয়া পড়ো, ঐ দোয়া পড়ো…”

– দু’আ করলে, আল্লাহর স্মরণ করলে তা অবশ্যই মানুষের হৃদয়কে প্রশান্ত করে, মনের শান্তির কারণ হয়। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়।” [১]। কিন্তু কেউ যখন ডিপ্রেসড, তাকে গিয়ে যদি আমরা বলে ফেলি যে, “এই দোয়া পড়ো, ঐ দোয়া পড়ো…” তাতে হয়ত একটা জাজমেন্ট স্পষ্ট থাকে যে আসলে ডিপ্রেসড ব্যক্তি দোয়া পড়ে না। এতটুকু জ্ঞানও হয়ত তার নাই! আল্লাহ তো অন্তরের কথাই জানেন, একদম দোয়ার শব্দই তো লাগে না, তাইনা? এটা আমরা জেনে বুঝেই যদি তার প্রতি সহমর্মী হয়ে আরো উপকারী পদ্ধতি হিসেবে দোয়ার কিছু একটা সামনে রেখে দিই, আল্লাহ জানেন, হয়ত নিজে থেকেই সে আগ্রহী হয়ে আল্লাহর কাছে আরবি দোয়াগুলো দিয়েই চাইবে। কিন্তু আমাদের আচরণ হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও ভালোবাসাপূর্ণ।

8)”আরেহ, বাদ দাও এইসব ডিপ্রেশন, এগুলা কোনো ব্যাপারই নাহ..” 

– এই কথা বলা খুব বাজে একটা কাজ। যে মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগেনি সে ভাবতেও পারে না এর অনুভূতিটা কেমন। এখনকার সামাজিক জীবনে এটা নানানভাবে লোকজনকে আঁকড়ে ধরে। তবে ঈমানদারগণ ইনশাআল্লাহ সহজেই বেরিয়ে আসতে পারবে। এই বিশ্বাস নিজে রেখে অপর ভাই/বোনের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে উদারতার হাত বাড়িয়ে দেয়া দরকার। কিন্তু এসব অনুভূতিগুলোকে যখন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে বলা হয়, তখন সে এতে সংকুচিত হয়ে যাবে, আরো খারাপ ফিল করবে, অপমানিত অনুভব করবে। আমরা হয়ত তাকে আরো সুন্দর কোনো কাজে তার সংগী করে নিতে পারি যাতে লোকের উপকার আছে, যেখানে ব্যস্ত হয়ে সে বিষণ্ণ অনুভূতিকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার সুযোগ পাবে না।

৫) “তোমার চেয়েও লোকে অনেক খারাপ অবস্থায় আছে …”

– এই ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে খুব প্রচলিত। হয়ত যখন তখন অসাবধান হয়ে অন্যকে আমরা বলে বসি, “দেখো তুমি এটুকুতেই এরকম মন খারাপ, ওই যে দেখো ইয়েমেনের লোকেরা না খেয়ে আছে। ওদের দিকে তাকিয়ে হলেও ভালো থাকো।” — এটা ঠিক নয়। ইয়েমেনের শিশুরা খেতে পারছে না, এটা খুবই বড় সত্য। কিন্তু তার মানে তো এটা না যে আমাদের জীবনের কষ্টগুলো মিথ্যে। বরং, অপরের দিকে ভালোবাসা আমাদের নিজেদেরকেও ভালোবাসার পথ সুগম করে দেয়। পরোপকার করতে চাওয়ার ইচ্ছে আমাদের অন্তরকে উদার করে দেয়, ঈমানকে বাড়িয়ে দেয়। তাই এমনভাবে না বলে বরং মানুষটি যেভাবে নিজের কষ্টকে ভুলে ভালো কাজে উৎসাহী হবে, আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে জীবনের কাজে ব্যস্ত হবে এমন কিছু বলা উচিত।

মোটকথা, সচেতনভাবে মানুষের সাথে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে হবে। অনেকসময় আমাদের অনেকের কেবল প্রয়োজন হয় ভালোবাসা, সহমর্মিতা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে উত্তম আখলাক দান করুন, দ্বীনের উত্তম বুঝ দান করুন, আমাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।

রেফারেন্সঃ

[১] সূরা আর-রাদ, আয়াত ২৮ http://tanzil.net/#trans/bn.bengali/13:28

[২] শেইখ আজহার নাসেরের আলোচনা শুনুনঃ https://www.youtube.com/watch?v=MPhYITkCJ_0

লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে এখান থেকে

মতামত দিন