ইসলামী শিক্ষা

বার চান্দের ফযীলত : রজব মাস

রজব মাস

রজব মাসকে নিয়ে যত বেশি মিথ্যা হাদীস তৈরি করা হয়েছে, তত বেশি আর কোন মাসকে নিয়ে করা হয় নি। সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউল সানী, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানী এই ৫ মাসের ফযীলত বা খাস ইবাদত বিষয়ক যা কিছু বানোয়াট কথাবার্তা তা মূলত গত কয়েক শত বৎসর যাবত ভারতীয় উপমহাদেশেই প্রচলিত হয়েছে। ৫ম/৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত মাউযূ হাদীস বা ফযীলতের বইগুলিতেও এ সকল মাসের উল্লেখ পাওয়া যায় না। এ সকল যুগে যে সকল নেককার সরলপ্রাণ বুযুর্গ ফযীলত ও আমলের বিষয়ে সত্য-মিথ্যা সকল কথাই জমা করে লিখতেন তাদের বই পুস্তকেও এই মাসগুলির কোনো প্রকারের উল্লেখ নেই। তাঁরা মূলত রজব মাস দিয়েই তাদের আলোচনা শুরু করতেন এবং মুহাররাম মাস দিয়ে শেষ করতেন।

আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, রজব মাস ইসলামী শরীয়তের ‘হারাম’ অর্থাৎ নিষিদ্ধ বা সম্মানিত মাসগুলির অন্যতম। জাহিলী যুগ থেকেই আরবরা ‘ইবরাহীম(আ) এর শরীয়ত’ অনুসারে এই মাসগুলির সম্মান করত। তবে ক্রমান্বয়ে তাদের মধ্যে অনেক কুসংস্কার ও রসম রেওয়াজ প্রবেশ করে। জাহিলী যুগে আরবরা এই মাসকে বিশেষভাবে সম্মান করত। এই মাসে তারা আতীরাহ নামক এক প্রকার কুরবানী করতো এবং উৎসব করতো। হাদীস শরীফে তা নিষেধ করা হয়েছে।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২০৮৩; মুসলিম আস সহীহ, ৩/১৫৬৪)।

‘হারাম’ মাস হিসেবে সাধারণ মর্যাদা ছাড়া ‘রজব’ মাসের মর্যাদায় কোনো সহীহ হাদীসে কিছু উল্লেখ করা হয় নি। এই মাসের কোনোরূপ মর্যাদা, এই মাসের কোনো দিনে বা রাতে কোনো বিশেষ সালাত, সিয়াম, যিকর, দোয়া, তিলাওয়াত বা কোনো বিশেষ ইবাদতের কোনো বিশেষ ফযীলত আছে এই মর্মে রাসূলুল্লাহ(সা) থেকে কোনোরূপ কোনো হাদীস সহীহ বা গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। পরবর্তী যুগের তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীগণ হতে কিছু কথা পাওয়া যায়। কিন্তু এ বিষযে অনেক জাল ও বানোয়াট কথা প্রচলিত রয়েছে। যেহেতু আমাদের দেশে সাধারণভাবে ২৭শে রজব ছাড়া অন্য কোনো দিবস বা রাত্রিকেন্দ্রিক জাল হাদীসগুলি তেমন প্রসিদ্ধ নয়, সেহেতু ২৭শে রজবের বিষয়ে কিছু বিস্তারিত আলোচনা এবং বাকি বিষয়গুলি সংক্ষেপে আলোচনার ইচ্ছা করছি। মহান আল্লাহর দরবারে তাওফীক প্রার্থনা করছি।

প্রথমত, সাধারণভাবে রজব মাসের মর্যাদা

সাধারণভাবে রজব মাসের মর্যাদা, এই মাসে কী কী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে এবং এই মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যে কোনো সময়ে বা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকারের সালাত, সিয়াম, দান, দোয়া ইত্যাদি ইবাদত করলে কী অকল্পনীয় সাওয়াব বা পুরস্কার পাওয়া যাবে তার বর্ণনায় অনেক জাল হাদীস বানানো হয়েছে। আমাদের দেশের প্রচলিত ‘বার চাঁদের ফযীলত’ ও আমল-ওযীফা বিষয়ক বইগুলিতে এগুলির সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়।

যেমন, অন্য মাসের উপর রজবের মর্যাদা তেমনি, যেমন সাধারণ মানুষের কথার উপরে কুরআনের মর্যাদা……..। এই মাসে নূহ(আ) ও তাঁর সহযাত্রীগণ নৌকায় আরোহন করেন….। এই মাসেই নৌকা পানিতে ভেসেছিল….। এ মাসেই রক্ষা পেয়েছিল। এ মাসেই আদমের তাওবা কবুল হয়। এ মাসেই ইবরাহীম(আ) ও ঈসা(আ) এর জন্ম। এ মাসেই মূসার জন্য সমুদ্র দ্বিখন্ডিত হয়। ……এই মাসের প্রথম তারিখে রাসূলুল্লাহ(সা) এর জন্ম। এই মাসের ২৭ তারিখে তিনি নব্যুয়ত প্রাপ্ত হন। …এই মাসের ২৭ তারিখে তিনি মেরাজ গমন করেন। …..এই মাসে সালাত, সিয়াম, দান, সদকা, যিকর, দুরূদ, দোয়া ইত্যাদি নেক আমল করলে তার সাওয়াব বৃদ্ধি পায় বা বহুগুণ বেড়ে যায়….।ইত্যাদি সবই ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা ও জাল হাদীস। পূর্ববর্তী অনেক বুযুর্গের আমল ওযীফা ও ফাযাইল বিষয়ক গ্রন্থে এগুলির সমাবেশ ঘটেছে। তবে আমাদের সমাজের সাধারণ ধার্মিক মুসলমানদের মাঝে এগুলির প্রচলন কম। এ জন্য এগুলির বিস্তারিত আলোচনা বর্জন করছি।

দ্বিতীয়ত, রজব মাসের সালাত

রজব মাসে সাধারণভাবে এবং রজব মাসের ১ তারিখ, ১ম শুক্রবার, ৩, ৪, ৫ তারিখ, ১৫ তারিখ, ২৭ তারিখ, শেষ দিনে বা অন্যান্য বিশেষ দিনে বা রাতে বিশেষ সালাত আদায়ের বিশেষ পদ্ধতি ও সেগুলির অভাবনীয় পুরস্কারের ফিরিস্তি দিয়ে অনেক জাল হাদীস প্রচারিত হয়েছে।পূর্ববর্তী অনেক বুযুর্গের আমল ওযীফা ও ফাযাইল বিষয়ক পুস্তাকাদিতে এবং আমাদের দেশে বার চাঁদের ফযীলত, আমল-ওযীফা ও অন্যান্য পুস্তকে এগুলির কিছু কথা পাওয়া যায়। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলির প্রচলন কম। এজন্য এগুলির বিস্তারিত আলোচনা করছি না। মুহাদ্দিসগণ এক্ষেত্রে যে মূলনীতি উল্লেখ করেছেন তা বলেই শেষ করছি।

আল্লামা ইবনু রাজাব, ইবনু হাজার আসকালানী, সুয়ূতী, মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস একবাক্যে বলেছেন, রজব মাসে বিশেষ কোন সালাত বা রজব মাসের কোন দিনে বা রাতে কোন সময়ে কোন সালাত আদায় করলে বিশেষ সাওয়াব পাওয়া যাবে এই মর্মে একটি হাদীসও কোন গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বাতিল ও বানোয়াট। (ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৪; ইবনু হাজার আসকালানী, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৯-৮০; আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৫৮-৯০)।

তৃতীয়ত, রজব মাসের দান, যিকর ইত্যাদি

রজব মাসের যিকর, দান, দোয়া, দুরূদ ইত্যাদি নেক আমলের বিষয়েও একই কথা। রজব মাসে এ সকল নেক আমল করলে বিশেষ কোন সাওয়াব হবে বা সাধারণ সাওয়াব বৃদ্ধি পাবে এই মর্মে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সবই বাতিল ও ভিত্তিহীন। (ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৭; ইবনু হাজার আসকালানী, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৯-৮০; আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৫৮-৯০)।

চতুর্থত, রজব মাসের সিয়াম

সবচেয়ে বেশি জাল হাদীস প্রচার হয়েছে রজব মাসের সিয়াম পালন বিষয়ে। বিভিন্নভাবে এই মাসে সিয়াম পালনের উৎসাহ দিয়ে জালিয়াতগণ হাদীস জাল করেছে। কোন কোন জাল হাদীসে সাধারণভাবে রজব মাসে সিয়াম পালন করলে কত অভাবনীয় সাওয়াব তা বলা হয়েছে। কোনটিতে রজব মাসের নির্ধারিত কিছু দিনের সিয়াম পালনের বিভিন্ন বানোয়াট সাওয়াব পালনের কথা বলা হয়েছে। কোনটিতে রজব মাসের ১ টি সিয়াম পালনের কি সাওয়াব, ২ টি সিয়ামের কি সাওয়াব, ৩টির কি সাওয়াব….৩০ টি সিয়ামের কত সাওয়াব তা বলা হয়েছে। মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, রজব মাসের সিয়াম পালনের বিশেষ সাওয়াব বা রজব মাসের বিশেষ কোন দিনে সিয়াম পালনের উৎসাহ জ্ঞাপক সকল হাদীসই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে কোন কথাই নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি।

পঞ্চমত, লাইলাতুল রাগাইব

রজব মাস বিষয়ক জাল হাদীসের অন্যতম হলো লাইলাতুল রাগাইব ও সেই রাত্রির বিশেষ সালাত বিষয়ক জাল হাদীস। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই রাত্রির নামকরণ, ফযীলত, এই রাত্রির সালাতের ফযীলত, রাক’আত সংখ্যা, সূরা কিারয়াত , পদ্ধতি সবকিছুই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা। কিন্তু বিষয়টি অনেক মুসলিম দেশে ব্যাপক প্রচার লাভ করেছে।

প্রথমত কিছু জালিয়াত এ রাত্রির নামকরণ ও এ বিষয়ক কিছু আজগুবি গল্প বানায়। ক্রমান্বয়ে বিষয়টি আকর্ষণীয় ওয়াযে পরিণত হয়। জাল হাদীসের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা সাধারণ মানুষের চিত্তাকর্ষক হয় এবং কোন একটি জাল হাদীস একবার বাজার পেলে তখন অন্যান্য জালিয়াতও বিভিন্ন সনদে তা বানিয়ে বলতে থাকে। এভাবে অনেক জাল হাদীস সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। সালাতুল রাগাইব বিষয়ক হাদীসগুলিও সেইরূপ। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পরে এই জাল হাদীসগুলি প্রচার ও প্রসিদ্ধি লাভ করলে সাধারণ মুসল্লীগণ উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে অনেক দেশে ঘটা করে লাইলাতুল রাগাইব পালন করতে শুরু করেন। এ সকল সমাজে ‘লাইলাতুল রাগাইব’ আমাদের দেশের ‘লাইলাতুল বরাত’ এর মতই উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়।

এ বানোয়াট সালাতটি আমাদের দেশে অতটা প্রসিদ্ধি লাভ করে নি। এজন্য এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি না। এর সার সংক্ষেপ হলো, রজব মাসের প্রথম শুক্রবারের রাত্রি হলো ‘লাইলাতুল রাগাইব’ বা আশা আকাঙ্খা পূরণের রাত। রজবের প্রথম বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করে, বৃহস্পতিবারের দিবাগত শুক্রবারের রাত্রিতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে ১২ রাক’য়াত সালাত নির্ধারিত সূরা, আয়াত ও দোয়া দুরূদ দিয়ে আদায় করবে। …..তাহলে এই ব্যক্তি এত এত……পুরস্কার লাভ করবে।…….এর সাথে আরো অনেক কল্প কাহিনী যোগ করা হয়েছে এ সকল জাল হাদীসে।

এ সকল হাদীসের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে মুহাদ্দিসগণ সেগুলির সূত্র ও উৎস নিরীক্ষা করে এর জালিয়াতির বিষয় নিশ্চিত করেছেন। মুসলিম উম্মাহর সকল মুহাদ্দিস একমত যে, ‘লাইলাতুল রাগাইব’ ও ‘সালাতুল রাগাইব’ বিষয়ক সকল কথা মিথ্যা, জাল ও বানোয়াট।

ষষ্ঠত, রজব মাসের ২৭ তারিখ

বর্তমানে আমাদের সমাজে ২৭ শে রজব মিরাজের রাত বলেই প্রসিদ্ধ। সেই হিসেবেই আমাদের দেশের মুসলিমগণ এই রাতটি পালন করে থাকেন। কিন্তু এই প্রসিদ্ধির আগেও রজব মাসের ২৭ তারিখ বিষয়ক আরো অনেক কথা প্রচলিত হয়েছিল এবং এই তারিখের দিবসে ও রাতে ইবাদত বন্দেগীর বিষয়ে অনেক জাল কথা প্রচলিত হয়েছিল। প্রথমে আমরা ‘লাইলাতুল মিরাজ’ সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। এরপর এই দিন সম্পর্কে প্রচলিত জাল ও বানোয়াট হাদীসগুলি আলোচনা করব, ইনশাল্লাহ।

ক. লাইলাতুল মিরাজ

ইসরা ও মিরাজের ঘটনা বিভিন্নভাবে কুরআন কারীমে ও অনেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে প্রায় অর্ধশহ সাহাবী থেকে মিরাজের ঘটনার বিভিন্ন দিক ছোট বা বড় আকারে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোনো হাদীসে রাসূলুল্লাহ(সা) হতে মিরাজের তারিখ সম্পর্কে একটি কথাও বর্ণিত হয় নি। সাহাবীগণ তাঁকে কখনো তারিখ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন বলেও জানা যায় না। পরবর্তী যুগের তাবেয়ীদেরও একই অবস্থা; তাঁরা এ সকল হাদীস সাহাবাদের কাছে শিখেছেন, কিন্তু তাঁরা তারিখ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন না। কারণ, তাঁদের কাছে তারিখের বিষয়টির কোনো মূল্য ছিল না, এ সকল হাদীসের শিক্ষা গ্রহণই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল। ফলে তারিখের বিষয়ে পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যায়। মি‘রাজ একবার না একাধিকবার হয়েছে, কোন বৎসর হয়েছে, কোন মাসে হয়েছে, কোন তারিখে হয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে অনেক মতবিরোধ রয়েছে এবং প্রায় ২০টি মত রয়েছে।

মাসের ক্ষেত্রে অনেকেই বলেছেন রবিউল আউয়াল মাসের ২৭ তারিখ। কেউ বলছেন রবউস সানী মাসে, কেউ বলছেন রজব মাসে, কেউ বলছেন রমজান মাসে, কেউ বলছেন শাওয়াল মাসে, কেউ বলেছেন যিলকদ মাসে, কেউ বলেছেন যিলহাজ্জ্ব মাসে। তারিখের বিষয়ে আরো অনেক মতবিরোধ আছে।

দ্বিতীয় হিজরী শতক হতে তাবেয়ী ঐতিহাসিকগণ মিরাজের ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন নি। পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ মি‘রাজের তারিখ বিষয়ক মতভেদ ও কারণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইবনু কাসীর(৭৭৪ হি), ইবনু হাজার আসকালানী(৮৫২ হি), আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল কাসতালানী(৯২৩ হি), মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আশ শামী(৯৪২ হি), আব্দুল হাই লাখনাবী(১৩০৪ হি) ও অন্যান্যরা এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।

এত মতবিরোধের কারণ হলো হাদীস শরীফে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয় নি এবং সাহাবীগণও কিছু বলেন নি। তাবে-তাবেয়ীদের যুগে তারিখ নিয়ে কথা শুরু হয়, কিন্তু কেউই সঠিক সমাধান দিতে না পারায় তাঁদের যুগ ও পরবর্তী যুগে এত মতবিরোধ হয়। এই মতবিরোধ হতে আমরা বুঝতে পারি যে, কয়েক শতক আগেও শবে মেরাজ বলতে কোনো নির্দিষ্ট রাত ছিল না।

এভাবে আমরা দেখেছি যে, রজব মাসের ২৭ তারিখে মি‘রাজ হয়েছিল, বা এই তারিখটি ‘লাইলাতুল মি‘রাজ’, এ্ই কথাটি তাবেয়ী ও পরবর্তী যুগের ঐতিহাসিকদের অনেক মতের একটি মত মাত্র। এই কথাটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। রাসূলুল্লাহ(সা) হতে এই তারিখে মি‘রাজ হওয়া সম্পর্কে কোনো কিছুই সহীহ বা যয়ীফ সনদে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই ঐতিহাসিকদের মতামত বা বানোয়াট কথাবার্তা।

আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করছি যে, কোনো কোনো জাল হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, রজব মাসের ২৭ তারিখে রাসূলুল্লাহ(সা) জন্মগ্রহণ করেন, নবুয়ত লাভ করেন……….ইত্যাদি। এগুলিও বাতিল ও মিথ্যা কথা।

খ. ২৭শে রজবের ইবাদত

মি‘রাজের রাত্রিতে ইবাদত বন্দেগী করলে বিশেষ কোনো সাওয়াব হবে এই বিষয়ে একটি সহীহ ও যয়ীফ হাদীসও নেই। মি‘রাজের রাত কোনটি তাই হাদীসে বলা হয় নি, সেখানে রাত পালনের কথা কিভাবে আসে। তবে ২৭ শে রজবের দিনে এবং রাতে ইবাদত বন্দেগীর ফযীলতের বিষযে কিছু জাল হাদীস প্রচলিত আছে। এ সকল জাল হাদীসে মি‘রাজের রাত হিসেবে নয় বরং রাসূলুল্লাহ(সা) এর নবুয়্যত প্রাপ্তির দিন হিসেবে বা একটি ফযীলতের দিন হিসেবে ‘২৭শে রজব’-কে বিশেষ মর্যাদাময় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এইরূপ একটি জাল হাদীসে বলা হয়েছেঃ “রজব মাসের মধ্যে একটি দিন আছে, কেউ যদি এই দিনে সিয়াম পালন করে এবং সেই দিনের রাতে দাঁড়িয়ে (সালাতে ইবাদত রত) থাকে তাহলে সে ১০০ বৎসর সিয়াম পালন করার ও রাত জেগে সালাত আদায়ের সাওয়াব লাভ করবে। সেই দিনটি হলো রজব মাসের ২৭ তারিখ। এই দিনেই মুহাম্মাদ(সা) নুবয়ত লাভ করেন, এই দিনেই সর্বপ্রথম জিবরাঈল মুহাম্মাদ (সা) এর উপর অবতরণ করেন।”(জোযকোনী, আল আবাতিল, ২/৭১৪; সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ১১৭)।

অন্য একটি জাল হাদীসের ভাষা নিম্নরূপঃ যদি কেউ রজব মাসের ২৭ তারিখে ১২ রাকায়াত সালাত আদায় করে, প্রত্যেক রাকায়াতে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পাঠ করে, সালাত শেষ হলে সে বসা অবস্থাতেই ৭ বার সূরা ফাতিহা পাঠ করে এবং এরপর ৪ বার ‘সুবহানাল্লাহ, ওয়ালহামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুওআতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যূল আজিম’ বলে, অতঃপর সকালে সিয়াম শুরু করে, তবে আল্লাহ তার ৬০ বৎসরের পাপরাশি মাফ করে দিবেন। এই রাতেই মুহাম্মাদ(সা)নবুয়ত পেয়েছিলেন।” (ইবনু হাজার, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৫২)।

“রজব মাসের ২৭ তারিখ আমি নবুয়ত পেয়েছি। কাজেই যে ব্যক্তি এই দিনে সিয়াম পালন করবে তার ৬০ মাসের গোনাহের কাফফারা হবে।”(ইবনু হাজার, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৬৪)।

আরেকটি জাল হাদীসে বলা হয়েছে, ইবনু আব্বাস ২৭ শে রজবের সকাল হতে ইতিকাফ শুরু করতেন। যোহর পর্যন্ত সালাতে রত থাকতেন। যোহরের পরে অমুক অমুক সূরা দিয়ে চার রাকায়াত সালাত আদায় করতেন…… এবং আসর পর্যন্ত দোয়ায় রত থাকতেন…..। তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ(সা) এরূপ করতেন।”(আব্দুল হাই লাখনাবী, আল আসার, পৃ. ৭৮)। এগুলি সবই জঘন্য মিথ্যা কথা।

২৭ শে রজবের ফযীলতে এবং এই দিনে ও রাতে সালাত, সিয়াম, দোয়া ইত্যাদি ইবাদতের ফযীলতে অনুরূপ আরো অনেক মিথ্যা কথা জালিয়াতগণ রাসূলুল্লাহ(সা) এর নামে প্রচার করেছে। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, ২৭ শে রজব সম্পর্কে হাদীস নামে যা কিছু প্রচলিত সবই ভিত্তিহীন, বাতিল ও জাল। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি, মুহাদ্দিসগণ একমত যে, রজব মাস এবং এই মাসের কোনো দিন বা রাতের বিশেষ ফযীলতের বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদীসই ভিত্তিহীন। ২৭ শে রজব বিষয়ক হাদীসগুলিও এ সকল বাতিলের অন্তর্ভুক্ত। ইবনু হাজার আসকালানী, মোল্লা আলী কারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল আজলূনী, আব্দুল হাই লাখনবী, দরবেশ হুত প্রমুখ মুহাদ্দিস বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ২৭শে রজবের ফযীলত, এই তারিখের রাত্রে ইবাদত বা দিনের সিয়াম পালনের বিষয়ে বর্ণিত সকল কথাই জাল, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

সূত্র : 

মতামত দিন