ইসলামী শিক্ষা

‘দুনিয়াবী পড়াশোনা’কে ইবাদাতে পরিণত করা-৪

 (পূর্বের পর্বগুলি ১ম পর্ব     ২য় পর্ব     ৩য় পর্ব)

অনেক লম্বা ভূমিকা দিয়ে ফেলেছি মনে হয়। আমার মত বিশ্ব বাচালের জন্য এটা অস্বাভাবিক কিছু না অবশ্য। যাই হোক, আজকের পর্ব থেকে ইনশাল্লাহ আমি একদম সুনির্দিষ্ট করে পয়েন্ট আকারে বলতে থাকবো যে আইন বিষয়ে পড়ে আমরা কিভাবে বৃহত্তর পরিসরে অবদান রাখতে পারি।

তবে তার আগে ২য় পর্বে উল্লেখ করা ‘উম্মাহর জন্য বড় কিছু করা’ বলতে আমি কি বুঝিয়েছি সেটা একটু বলে নেয়া দরকার মনে করছি। আমি মনে করি মুসলিমরা In general are people of Impact! তাই নিজে খাইলাম, ঘুমাইলাম, ক্যারিয়ার গড়লাম, মা-বাবা হইলাম, বাড়ি করলাম, গাড়ি করলাম, নাতি নাত্নীর মুখ দেখলাম তারপর বুড়া বয়সে হাজ্জ করলাম, দাড়ি রাখলাম, বোরখা পরলাম আর এমন বাচ্চা রেখে গেলাম যারা আমি মারা যাওয়ার পর হুজুর ডেকে কুরআন খতম দিলো আর এতিম খাওয়ায় দিলো- এই যে একটা বৃত্ত আমরা আমাদের চারপাশে অহরহ দেখি, একজন প্রকৃত মুসলিম তার ঊর্ধ্বে।

সে জানে যে দুনিয়াতে সে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে, সেই উদ্দেশ্যটা সে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারে এবং সে নিজের জীবন ও পরিবার ছাড়াও আরো ২-৫টা মানুষের জীবনে ‘Impact’ রাখতে চেষ্টা করে। হয়তো সফল হয়, হয়তো হয় না, কিন্তু চেষ্টার কমতি রাখে না। এখন সে কিভাবে এই ‘Impact’ রাখার চেষ্টা করবে সেটা তার Strength and weakness এর উপর নির্ভর করে। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে পড়ুয়া, রিসার্চ করতে ভালোবাসি। তাই আমি নিজের জন্য বেছে নিয়েছি পিএইচডি করা ও ইনশাল্লাহ পরে Academia তে থাকতে চাই রিসার্চের মধ্যে।

অর্থনীতি পড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার পরিকল্পনা নাই যদিও আল্লাহই ভালো জানেন আমাদের ভবিষ্যৎ। এখন যাদের বই পড়তে গেলেই ঘুম আসে, নিঃ সন্দেহে এই পথ তাদের জন্য নয়। যদি এমন হয় যে আপনি বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন তাহলে একটা স্কুলের টিচার হওয়ার মাধ্যমে আপনি contribute করতে পারেন। এখন সমাজ এই Way of contribution গুলোর মাঝে নানা ক্রম বানিয়েছে। কোনোটা বেশি প্রেস্টিজিয়াস, কোনোটা না। আমি যখন বড় কিছু করার কথা বলেছি, সেই দৃষ্টিভঙ্গীতে সমাজের বানানো এই ক্রমের কোনো মূল্য নেই ইনশাল্লাহ। সেখানে একজন স্কুল টিচার একজন বিশিষ্ট রিসার্চারের চেয়ে বেশি Impact রাখতে সমর্থ হতে পারেন। তাই এই নোট পড়ে কেউ যদি ভাবেন যে আমি জনে জনে মেয়েদের পিএইচডি করে রিসার্চার হতে বলছি, তাহলে সেটার আমার ব্যর্থতা, আমি বুঝাতে পারি নি আমার বক্তব্য।

এখন আমি আইন বিষয়ে পড়ার গুরুত্ব ও এর মাধ্যমে অবদান রাখার ব্যাপারে আমার নিজস্ব মতামত বলবো। এখানে আবারো বলে রাখা ভালো যে এটা আমার উর্বর মস্তিষ্কজাত চিন্তা, অনেক ডিসিপ্লিন নিয়েই আমার এরকম নিজস্ব চিন্তা আছে। এজন্য আমি স্বপ্ন দেখি একসময় একটা কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠান খোলার যেখানে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের মানুষ কিছুটা দিক নির্দেশনা পাবে তাদের সাব্জেক্টের ইসলামীকরণের ব্যাপারে। এবার মূল পয়েন্টে আসি।

আইন পেশা ছেলে ও মেয়েদের উভয়ের জন্য দারুণ একটা পেশা যেখানে contribute করার বিশাল সুযোগ আছে। একটি রাষ্ট্রের জন্য ন্যায্য বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা কাউকে বলে বুঝাতে হবে না আশা করি। একটি জাতিকে ধ্বংসের জন্য আইন ও শিক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট করে দেয়াই যথেষ্ট- খুব সম্ভবত এটা লর্ড ক্লাইভের একটা উক্তি। তাই একজন মুসলিম একজন সৎ ও নিরপেক্ষ আইনজীবি, বিচারক হওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

এত গেল একটা আদর্শ পরিস্থিতি। এবার বাস্তবে নেমে আসা যাক। আমরা যেহেতু এখন মানব রচিত আইন ব্যবস্থার মাঝে বাস করছি তাই ইসলামপন্থীরা নানা ধরণের জুলুমের শিকার। প্রচলিত আইন ব্যবস্থার মাঝেই যতটুকু সম্ভব তাদেরকে ন্যায় বিচার দেয়াটা যেন সম্ভব হয় (অন্যায়ভাবে গ্রেফতার হলে ইত্যাদি) সেজন্য আমাদের প্রচুর প্র্যাক্টিসিং ল ইয়ার দরকার যারা প্রচলিত সিস্টেমের ব্যাপারে খুবই দক্ষ।

কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে বর্তমানে কোর্টের যে পরিবেশ তা একজন প্র্যাক্টিসিং মুসলিম মেয়ের জন্য মারাত্মক বৈরী। কিন্তু তা হলে কি একটা মেয়ে আইন নিয়ে পড়বে না?

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি পড়বে, পড়া উচিৎ। আসুন দেখা যাক কিভাবে সে এই বিষয় নিয়ে পড়ে অবদান রাখতে পারে।

প্রথমত, যখন একটা মেয়ে ‘আইন’ As a discipline পড়বে তখন সে শরীয়াহ আইন গুলোকে একটা অন্য আলোয় দেখার সুযোগ পাবে। আমরা হয়তোবা সবাই এটা বুঝি যে ইসলাম নিয়ে যত আক্রমণ, বিতর্ক হয় সেগুলোর অধিকাংশেরই উৎস হচ্ছে শরীয়াহ আইন। ইসলামে আল্লাহর কন্সেপ্ট নিয়ে আক্রমণ করার কিছু নাই, আমি দেখিও নাই হতে। তাই আমাদের এমন দক্ষ মানব সম্পদ দরকার যারা প্রচলিত আইন নিয়ে গভীরভাবে জানবে, সাথে শরীয়াহ আইন নিয়ে জানবে। এটা জানলে তারা জ্ঞানের ভিত্তিতে তুলনা করতে পারবে প্রচলিত আইনের সাথে।

একটা উদাহরণ দেই- এটা খুব কমন কথা যে ইসলামে চোরের শাস্তি হাত কাটা। এটাকে বর্বর প্রথা হিসেবে আখ্যায়িত করে ইসলামকে পশ্চাৎপদ হিসেবে তুলে ধরা হয়। আমার মনে আছে যে হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ বইটাতে কোনো বাচ্চা ছেলে গাছের নিচে পরে থাকা ফল না বলে কুড়িয়ে নিয়েছিল বলে তার হাত কেটে দেয়া হয়েছিল এমন কিছু ছিলো। আমার এক্স্যাক্টলি মনে নাই, আমি বইটা পুরাটা পড়িনাই বলেই মনে পরে। তখন বাসায় ইত্তেফাক রাখা হত, ইত্তেফাকে এটা ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হচ্ছিল তখন কিছু অংশ পড়েছিলাম মনে হয়। যাই হোক, আমাদের বিবিএ সিলেবাসে Business law একটা কোর্স ছিলো। সেখানে আমার প্রথম আইন বিষয়টার সাথে exposure হয়। তখন আমি সেখানে দেখেছিলাম যে কখনই কোনো একটা বিষয়ে ‘ল’ এটা বলে এভাবে এক কথায় বলা যায় না। বিশেষ করে ক্রিমিন্যাল ল এর ক্ষেত্রে। বিষয়টা জটিল এবং সূক্ষ্ম। মানে delicate যাকে বলে। যে কোনো কাজের শাস্তি অমুক সেটা বলার আগে কোন প্রেক্ষিতে, কোন শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এটার প্রয়োগ করা যাবে আর কখন যাবে না এরকম বহু কিছু বলা থাকে। ঠিক এই ব্যাপারটা ইসলামী আইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পরে যখন IOU তে ইসলামিক লিগ্যাল সিস্টেমের উপর কোর্স করেছি তখন এই হাত কাটার শাস্তি প্রয়োগের শর্ত, পরিস্থিতি এরকম সব কিছু বিস্তারিত পড়েছি। যেমন একটা শর্ত হচ্ছে যে চুরিকৃত মালটার মূল্য ন্যুনতম চল্লিশ দিরহামের সমমানের হতে হবে। তাহলে এখন আপনারাই বলেন গাছের তলায় কুড়িয়ে পাওয়া ফলের ক্ষেত্রে এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে?

পরবর্তীতে আমি ইসলামী শাস্তি আইন নামে একটা বই পড়েছিলাম (কেউ আগ্রহী হলে এই লিংকে গিয়ে পড়তে পারেন)। যেখানে ইসলামের শাস্তি আইনের ব্যাপারগুলো অসাধারণ নৈপুণ্যের সাথে তুলে ধরা হয়েছিলো। বলাই বাহুল্য বইয়ের লেখক একজন আইনের অধ্যাপক।

আমি ঠিক জানিনা আমার প্রথম পয়েন্টটা আমি ঠিক মত বুঝাতে পেরেছি নাকি কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে ইসলামের তথাকথিত বিতর্কিত শরীয়াহ আইনগুলোর প্রজ্ঞা সাধারণ জনগণের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরার জন্য আমাদের প্রচুর মানব সম্পদ দরকার যারা প্রচলিত আইনের সাথে তুলনা করে করে ব্যাপারগুলো বুঝানোর চেষ্টা করবে।

কেউ যদি এমনিতে শুধু শরীয়াহ নিয়ে পড়ে তাহলে তার অ্যাপ্রোচ, আর যে প্রচলিত আইন নিয়ে পড়েছে, তারপর শরীয়াহ আইন নিয়ে পড়েছে তার অ্যাপ্রোচ স্বাভাবিকভাবেই আলাদা হবে। ২য় গ্রুপের অ্যাপ্রোচ তুলনামূলকভাবে বেশী Effective হবে বলে আমার কাছে মনে হয়। (আল্লাহই ভালো জানেন)

(চলবে ইনশাল্লাহ)

– Hamida Mubasshera

মতামত দিন